সেনাবাহিনীর এক্সারসাইজ এবং আমার বন্ধু হারানো!

সেনাবাহিনীর এক্সারসাইজ এবং আমার বন্ধু হারানো!

“হঠাৎ রাস্তায় অফিস অঞ্চলে
হারিয়ে যাওয়া মুখ চমকে দিয়ে বলে
বন্ধু কি খবর বল
কত দিন দেখা হয়নি”!!

১৯৯০ সাল। ‘স্কুল অফ মিলিটারি ইন্টেলিজেন্স’ এর ছাত্র অফিসার হিসেবে অনুশীলনের জন্য কুমিল্লা সেনানিবাস হতে ঢাকায় এসেছি।‘মোবাইল সারভেইলেন্স এক্সারসাইজ’। আমি সাবজেক্ট। অর্থাৎ আমি আমার প্রশিক্ষকদের চোখকে ফাঁকি দিয়ে বা এনটি-সারভেইলেন্স টেকনিক ব্যাবহার করে ছদ্মবেশে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নির্দিষ্ট রাস্তা, সেই রাস্তার অলিগলি, এমনকি রাস্তা সংলগ্ন দোকানপাট অথবা বিল্ডিং গুলোর আশ্রয় ব্যাবহার করে আমি শাহবাগ থেকে হোটেল সোনার গাঁ পর্যন্ত আসবো। যদিও আমি ছদ্মবেশে আছি, তা সত্ত্বেও আমাকে আমার প্রশিক্ষকরা নিবিড় ভাবে চেনেন-জানেন! কারন প্রথমতঃ তারা সবাই আমার পূর্বপরিচিত এবং দ্বিতীয়ত আমার এক্সারসাইজ প্ল্যানে আমি আমার ছদ্মবেশের পরিচয়, আমার ছবি সবই তদেরকে ফরমালি হ্যান্ড ওভার করেছি। এমনকি আমি যত বড়ই গোয়েন্দা হইনা কেন মেইন রাস্তা থেকে ৫০ গজের বেশি দূরের অলিতে গলিতে লুকিয়ে যেয়ে আমি যাতে তাদের বিব্রত না করি সে বিষয়ে সুস্পষ্ট নির্দেশনা দেয়া আছে!

কাজেই এক্সারসাইজ যখন শুরু হল তখন আমাকে শেখানো এনটি-সারভেইলেন্স টেকনিকগুলোর কোনটাই আমার কোন কাজে আসলো না। বরং কিছু কিছু সময়ে আমি দৌড় দিয়ে যখন ইন্সট্রাকটর থেকে দূরে সরে যেতাম, শুধুমাত্র তখন তারা আমার চেয়ে কিছুটা বেশি ডিসএডভেনটেজিয়াস সিচুয়েশনে পরতেন, কারন একজন প্রবল প্রানশক্তির একজন উঠতি বয়সের গতিময় কিশোরের সাথে একজন পড়ন্ত যৌবনের মানুষের কখনই দৌড়ে পেরে ওঠার কথা না! দৌড় ছাড়া অন্য সময়গুলোতে আমার অবস্থা শ্রী কৃষ্ণের রাধার মতন! আমি হয়ত একটা দোকানে কোন কিছু কেনার ভান করছি। ডানে ঘাড় ফেরাতেই দেখি আমার ইন্সট্রাকটর মাত্র দু’গজ দূরত্ব থেকে আমার দিকে চেয়ে মৃদু হাসছেন। আমি হয়ত ফুটপাথের ওপর থেকে নিচু হয়ে কিছু একটা তোলার চেষ্টা করছি। হঠাৎ আমার কোমরে মৃদু স্পর্শ! আমি পিছন ফিরতেই দেখি তিনি আমার দিকে সহাস্য মুখে তাকিয়ে আছেন ! মোট কথা আমি রাধার মতন চোখ খুললেও দেখি কৃষ্ণরূপী আমার ইন্সট্রাকটরকে ; চোখ বন্ধ রাখলেও দেখি তাকেই। এমন প্রেমময় অবস্থা আমার !

কিছুটা বিভ্রান্ত হয়ে হলেও দৌড়-লুকোচুরি ধরনের ছেলেবেলার খেলাধুলার মধ্য দিয়েই আমি হোটেল শেরাটনের কাছে চলে আসতে সমর্থ হলাম। আমার ইন্সট্রাকটর আরিফ স্যার দৌড়ে পিছিয়ে পরার কারনে আমার থেকে প্রায় ২০০ গজ পিছনে। কিন্তু বিপত্তিটা ঘটলো হোটেল গেটে আসার পর। আমার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে আমার ক্যাডেট কলেজের বন্ধু শাহিন! কলেজ থেকে বের হবার পর দীর্ঘ সাত বছর পর আমার সাথে তার দেখা। আমাকে পেয়ে সে ভীষণ আত্মহারা! গেটের পাশে দাঁড়িয়েই আমার সাথে গল্প শুরু করে দিল। আমাদের ক্লাসের সবচেয়ে ভদ্র এবং দার্শনিক টাইপের ছেলে। একবার ফজলুল হক হাউজের কমন টয়লেটে ক্লাস সেভেনের নতুন এক ক্যাডেট টয়লেটের দরজা বন্ধ করতে ভুলে গেছে। শাহিন হাত মুখ ধুতে ঢুকেছে বাথরুমে। ছেলেটা শাহিনকে দেখে ভয়ে অথবা সম্মান দেখানোর জন্য দরজা খোলা টয়লেটের ভেতর থেকেই দাঁড়িয়ে গেল। অন্য কেউ হলে হয়ত ফান করত। কিন্তু শাহিন ভদ্রতার সাথে প্রবল ব্যক্তিত্ব নিয়ে তাকে আশ্বস্ত করে বলল, “ বস ,বস!” এমন মানুষকে আমি এভইড করি কিভাবে ? অথচ আরিফ স্যার আমার প্রায় ২৫/৩০ গজ দূরত্বের মধ্যে চলে এসেছেন। একটু পরেই আমাকে ধরে ফেলবেন। আমি শাহিনকে বললাম, “ শাহিন আমি একটু ‘পি’ করার জন্য ভেতরে যাচ্ছি! তুমি একটু দাঁড়াও।” বলেই তাকে কিছু বলার অবকাশ না দিয়ে হোটেল শেরাটনের এর ভেতরে ঢুকে পিছনের দরজা দিয়ে লক্ষন সেনের মতন পালিয়ে গেলাম !

শাহিনের সাথে আমার আর কোনদিন দেখা হয়নি। বুয়েটে পড়াশুনা শেষ করে আমেরিকাতে সে গিয়েছিল উচ্চতর পড়াশুনার জন্য। সেখানে এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় আমাদের এই বন্ধুটি চিরতরে হারিয়ে যায়!

শাহিনের মৃত্যু এখনও আমাকে অপরাধী করে রেখেছে। কালে ভদ্রে আমি যখনি হোটেল শেরাটনের গেইট অতিক্রম করি আমার মনে হয় শাহিন এখনও আমার জন্য অপেক্ষা করছে!

“সমুদ্রের জলে আমি থুতু ফেলেছিলাম
কেউ দেখেনি, কেউ টের পায়নি
প্রবল ঢেউ এর মধ্যে ফেনার মাথায়
মিশে গিয়েছিল আমার থুতু
তবু আমার লজ্জা হয়, এতদিন পর আমি শুনতে পাই
সমুদ্রের অভিশাপ”। – সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

– মোহাম্মদ আসাদুল্লাহ

৯৬৪ বার দেখা হয়েছে

২ টি মন্তব্য : “সেনাবাহিনীর এক্সারসাইজ এবং আমার বন্ধু হারানো!”

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।