হেকমত আলিদের দিন

কদিন ধরেই বাঁ চোখের পাতাটা নাচছে হেকমত আলির। লক্ষণটা নাকি শুভ কিন্তু শুভ ভাবার কোন কারণ খুঁজে পাচ্ছেন না এই অবসর প্রাপ্ত আমলা। সেই পাকিস্তান আমলে সরকারী চাকুরিতে ঢুকেছিলেন, বাংলাদেশ হওয়ার সময় ট্রেনিং এ ছিলেন ইংল্যান্ডে। তারপর স্বাধীন দেশের ফাঁকা পদে এসে ফেঁদে বসেছেন। একে ওকে এটা ওটা বুঝিয়ে নিজের পকেটটা ভরানোর কায়দাটা ভালোই জানতেন। হল জীবনে এই করেই তো কত বন্ধুর ঘাড় ভেঙ্গে খেয়েছেন! এভাবেই একদিন এই মন্ত্রণালয়, ঐ দপ্তর ঘুরে একসময় অবসর। ছেলে মেয়েদের বাইরে পড়তে পাঠিয়েছিলেন, আর ফেরেনি। মাঝে সাঝে একটু ফোন, বাবা ভালো আছো, বুকের ব্যথাটা কমেছে এই ব্যস। বিয়েটা কমবয়সে করেছিলেন, এক ধনী পিতার কন্যাকে পড়াশোনার সাথে সাথে প্রেমের পাঠটাও দিতেন। যদিও নজর ছিলো ওয়ারির বাড়িটার আংশিক মালিকানার দিকে। সেই বৌ ও আজকাল আর সময় দেয় না। বছরের ছমাসই থাকেন দেশের বাইরে, ছেলেমেয়েদের কাছে। অবসর জীবনটা তাই খুব একাই কাটে হেকমত সাহেবের। আর একটা জিনিষের খুব অভাব লাগে তার কাছে, গুণমুগ্ধ শ্রোতার। যখন চাকরিতে ছিলেন তখন আশে পাশে শোনার লোকের অভাব ছিলো না। প্রাইমারি স্কুলের পুরষ্কার বিতরণী থেকে অর্থনৈতিক সমিতির সাধারণ সভা , দাওয়াত পেলে কোথাও না করতেন না। হাত নেড়ে, চোখের ভাষায়, গলার স্বর উঠিয়ে নামিয়ে ভালোই বলতে পারতেন তিনি। আর বিলেতের ট্রেনিং এ একটা জিনিষ বুঝেছিলেন, ইংরেজিটা হলো প্রভুর ভাষা। তাই সাধারণ কথাটাই মাঝে মাঝে ইংরেজিতে বলতেন জনাব হেকমত, তাতে হাততালিটা বেশি পাওয়া যেত। আর হলভরা দর্শকের হাততালির আওয়াজ শুনে যে তৃপ্তি, বিশেষ একটা মাত্র ব্যাপারের সঙ্গেই তার তুলনা করা যায়! সেই মুগ্ধ শ্রোতার কাজটাও ঘুচিয়েছিলো টেলিভিশন চ্যানেলগুলো। অনিদ্রা রোগে এমনিতেই ঘুম আসে না, আর চ্যানেলগুলোরও ২৪ ঘন্টা অনুষ্ঠান চালানো দরকার। এই দুয়ে মিলে কপাল খুলে গেলো হেকমত সাহেবের। সাবেক উচ্চপদস্থ আমলা, ভালো বলিয়ে আর কি চাই। সারা দিনের ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো নিয়ে সরকারের মুন্ডুপাত আর দেশ ও জাতির চোখ খুলে দেয়ার মহান দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে মাঠে নেমে পড়লেন তিনি। তীর্যক মন্তব্য করে সাড়াও ফেলে দিলেন তিনি। আর তার অনুষ্ঠানে কিছু উটকো ফোনে “অনাকাংখিত” কিছু ঘটনা গণমাধ্যমে তার পরিচিতি আরও বাড়িয়ে দিলো। যদিও ব্যাপারটা একেবারেই “কাংখিত”, কারণ ততদিনে লোকে “কোনটা খায়” এই জিনিষটা ভালোই বুঝেগিয়েছিলেন ঝানু আমলা হেকমত। নিজের লোক দিয়ে ফোন করিয়ে উল্টোপাল্টা কথা বলিয়ে স্পটলাইটটা নিজের উপর নিয়ে আসতে খুব বেশিদিন লাগে নি তার। তাইতো টিভি চ্যানেলগুলোতে ব্যস্ত মডেল বা তারকা সংবাদ পাঠিকাদের মতো তার টেকো মাথা চেহারাটাও চোখে পড়ে। কিন্তু কদিন ধরেই একটু মনমরা হয়ে ছিলেন তিনি, কারণ আর কিছুই না “বিষয়ের” অভাব।
“লোডশেডিং” হয়েছে, “দ্রবমূল্য”র আর আগের মতো মার্কেট ভ্যালু নেই, পাশা পাল্টে যাওয়ায় যথেচ্ছা সরকারের বিষেদগারও করা যাচ্ছে না। তাই কথাবার্তা গুলো আর আগের মতো জমছে না। সাহিত্যের সঙ্গে হেকমত সাহেবের সম্পর্কটা আদায় কাঁচকলায় না হলেও কাছাকাছি। তাই পহেলা বৈশাখ, রবীন্দ্র নজরুল জয়ন্তী, কিংবা নিদেন পক্ষে মে দিবসের অনুষ্ঠানেও ডাক পড়েনি তার। আশা করেছিলেন সামনে বাজেট আসছে, ব্যস্ততা বাড়বে। তা আর হলো কই? কোথাকার কোন মুসা না ইসা, সে নাকি হিমালয় পাহাড়ের চূড়া থেকে ঘুরে এসেছে! আরে বাবা যৌবনে জরিপের কাজে রাঙ্গামাটি বান্দরবনের পাহাড়ে কম ঘুরেছেন নাকি। সরকারী ডাকবাংলোতে থাকা, সেখানকার বাবুর্চির রান্না…তোফা তোফা। হিমালয়টাও নিশ্চয়ই ওরকম, আরেকটু উঁচু এই যা। ওখানেও নাকি ঘাটে ঘাটে বেস ক্যাম্প আছে, ফোন করা যায় তাহলে আর চিন্তা কি। ঠান্ডাটা একটু বেশি আর খাড়া তাই দড়ি দড়া নিয়ে উঠতে হয়। নেহাত বয়েস হয়ে গেছে আর পুরনো বাতের ব্যথাটা বেড়েছে। নইলে অমন একটা পাহাড়ে চড়াটা কোন ব্যাপার হলো। শীর্ষ স্থানীয় দৈনিকে ছাপা হওয়া মুসার হাসিমুখের ছবিটা দেখে এটাই ভাবছিলেন হেকমত সাহেব। এই কদিন আলোচনার টেবিলে মুসাই থাকবে, যত্তসব। একটা ছেলে পাহাড়ে উঠেছে বলে কি মাথা কিনে ফেলেছে নাকি? দেশের এই অস্থিরতা, বাণিজ্য ঘাটতি, সীমান্ত সংঘাত, যানজট এসব নিয়ে আলোচনা না করলে দেশ এগোবে কিভাবে? রমিজ কে ডেকে চা দিতে বলে এসব ভাবতে ভাবতেই মনে মনে গজরাচ্ছিলেন তিনি। এমন সময় চালু হিন্দি গানের রিংটোনে বেজে উঠলো তার কদিন আগেই কেনা দামী মোবাইল খানা। স্ক্রিনে নাম দেখলেন, শরিফ সদরুল। একটা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের শিক্ষক। টক শো গুলোতে মাঝে মাঝেই তাদের একসঙ্গে দেখা যায়। পর্দায় তাদের মধ্যে তীব্র বিতর্ক আর মতবিরোধ হলেও বাইরে তাদের ভালোই মিল। হেকমত সাহেবও বুঝে গিয়েছেন, তাদের জুটিটা পাবলিক “খায়”।
কি হেকমত সাহেব, খোঁজ খবর রাখছেন কিছু? ২২ জন তো শেষ…
আরে ছাড়ুনতো এসব, হয়েছে টা কি? এদেশে এত্তো মানুষে মানুষে গিজগিজ…
আরে “চোখ” টিভিতে দেখুন, ওরা লাইভ দেখাচ্ছে…
আচ্ছা দেখছি।
হেকমত সাহেব রিমোট খুঁজে তার ৪২ ইঞ্চি প্লাজমা টিভিটা ছাড়লেন। টিভিতে টকশো করে পাওয়া টাকাতেই ভালো করে টিভি দেখার ব্যবস্থা, কই এর তেলে কই ভাজা আরকি। রিমোট টিপে চোখ টিভিতে গেলেন। চ্যানেলটা ভালো, প্রডিউসার ছেলেটা খাতির করে, গেলে ভালো নাস্তা টাস্তা আনিয়ে খাওয়ায়। একদিন কথায় কথা পুর্বানীর কেক এর কথা বলেছিলেন, এরপর স্টুডিওতে গেলেই বের হওয়ার পর তার জন্য পুর্বানীর কেক থাকে।
রাজধানীর বেগুনবাড়ীতে একটু বহুতল ভবন কাত হয়ে পরে গেলে…… ক্যামেরায় রিপোর্টারকে দেখা যাচ্ছে না, শুধু কন্ঠটা শোনা যাচ্ছে। আর ৪২ ইঞ্চি ঝকঝকে পর্দা জুড়ে শোকাহত মানুষের মাতম, কান্না, স্বজনহারানোর যন্ত্রণা। “পাশের টিনের বস্তির বেশিরভাগ মানুষ তখন ঘুমিয়ে ছিলেন…” আবারও বলছে রিপোর্টার মেয়েটা। আরে মেয়েটা দেখতে সুন্দর আছে তো, একে রিপোর্টিং এ না দিয়ে টকশো উপস্থাপনাতে দেয় না কেন?…রাজউকের উদাসীনতা, বিল্ডিং কোড না মানা, অনুমোদনহীন ভবন নির্মান…মেয়েটা বলেই যাচ্ছে দেখি। এবার বাচ্চাকোলে এক ভুক্তভোগী মহিলাকে দেখা যাচ্ছে, “ আমার চাইর বছরের মাইয়াটা… বিকট একটা শব্দ শুইনা কোলের পোলাটা লইয়া দৌড় পাইরা বাইর হইসি, মাইয়াটারে ডাকবারও পারি নাই। কাইলকা বাচ্চাডারে জামা কিন্যা দিমু কইসিলাম…আল্লাগো…
নাহ, বয়সে কিছুটা ছোট অধ্যাপকের উপর খানিকটা বিরক্তই হন হেকমত সাহেব। লেখাপড়া আর আইন জানলে কি হবে “নিউজ সেন্স”টাই এখনো তৈরি হয়নি। দূর্যোগ মন্ত্রী যায়নি, গণপূর্ত মন্ত্রী যায়নি এমনকি ডিএমপি কমিশনারকেও দেখা যায়নি। বিশ্বকাপের বাজারে এই নিউজ সেনসেসনালাইজ হবে না। হুঁ বাবা, বিশ্বকাপ বলে কথা। বাংলাদেশ খেলুক আর নাই খেলুক পতাকা ওড়ানো চাই, রাত জেগে খেলা দেখা চাই। আরে আছেটা কি হাফপ্যান্ট পড়া ঐ লোকগুলোর বলের পেছনে ছোটাছুটির মধ্যে! মাঝে আইপিএলটা অবশ্য বেশ ভালোই মজা নিয়ে দেখেছিলেন। গ্যালারিতে বলিউডের নায়িকারা ছিলো, চার ছক্কা হলে বেশ দারুণ নাচ ছিলো, সন্ধ্যেটা ভালোই কেটে যেতো। এই আইপিএল নিয়ে ভারতে কত সুন্দর টকশো হচ্ছিলো। ৩ ঘন্টার খেলার আগে, পরে ও মাঝে মিলিয়ে ৬ ঘন্টার টকশো। বাংলাদেশেও কি এমন করা যেতো না। কথায় কথায় সিনেমা, গানে, বিজ্ঞাপণে প্রতিবেশী দেশের উদাহারণ দেওয়া হয়। এর মধ্যে টকশো আসলে ক্ষতিটা কোথায়?
ক্রিকেটটা তাও অবসর জীবনে খানিকটা সময় কাটানোর সঙ্গী ছিলো বলে ব্যাটিং আর বোলিং এর তফাতটা বোঝেন। তাছাড়া বাংলাদেশ যেহেতু খেলে, বেশ কিছু উপলক্ষ্যে তাকে এ ব্যাপারে একটু বলতেও হয়েছে। সাংবাদিকগুলো যা হয়েছে না, কোন একটা ম্যাচ জিতলেই পত্রিকার প্রথম পাতায় ছেপে দেয়। একটু আধটু ক্রিকেট না জানলে সংবাদপত্র পর্যালোচনা অনুষ্ঠানগুলোতে তো ঝামেলাতেই পড়তে হতো। কিন্তু ফুটবল একদম নয়! সেই কবে ম্যারাডোনার খেলা দেখেছিলেন, তাই আর্জেন্টিনার নামটা জানেন। আর কফির সুবাদে ব্রাজিলের নামটা শুনেছেন। কিন্তু এরা কে এখন কেমন খেলে, কারা খেলছে এই নিয়ে একদমই হদিশ রাখেন না তিনি। তাই বিশ্বকাপের সময় যে ফুটবল নিয়ে গলাবাজী করে কিছুটা চেহারা দেখাবেন এই সুযোগটাও হচ্ছে না। আর মানুষ খেলার কথা শুনতে চায় খেলোয়াড়ের কাছ থেকে, কিন্তু হেকমত সাহেবের তো “ফাইল টেবিল” খেলা ছাড়া আর কোন খেলাই যে খেলেননি। তাই ভাবছিলেন এই জৈষ্ঠমাসে দেশের বাড়িতে গিয়ে একটু আম কাঠাল খেয়ে আসবেন। দেশেও একটা বাগান বাড়ী মতো বানিয়েছেন তিনি, এক গ্রাম সম্পর্কের ভাস্তে আছে, সেই দেখে। ফলটা মূলটা দেয়, গেলে খাতির তোয়াজ করে আর কি চাই।
কদিন ঘরেই তাই দেশে যাবার কথা ভাবছিলেন তিনি, কিন্তু বৃহস্পতিবারের রাত পালটে দিলো সব। নিমতলীর রুনার গায়ে হলুদের অনুষ্ঠানে সবার গায়ে ছড়িয়ে গেলো হলুদ আগুন। মানুষ আবারো দেখলো নিজেদের অসহায়ত্ব, ২০০ গজ দুরের ফায়ার স্টেসনের গাড়ি এলো দেরীতে, পানির উৎস খুঁজে পেতে নষ্ট হলো আরো কিছু সময়, এরমধ্যেই হয়তো পুড়ে কয়লা হয়ে গেছে আদৃতা। কিন্তু এই আঁচ অভিজাত এলাকায় বাস করা হেকমত আলীর শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত রুমের ভেতরে পৌঁছায়নি। স্যাটেলাইট টেলিভিশনের তার বেয়ে পৌঁছেছে শুধুই “সংবাদ”। ঝকঝকে টিভি পর্দায় আগুনের লেলিহান শিখা দেখতে থাকা হেকমত আলীর চোখটা কেমন যেন চকচক করে ওঠে। পরপর দুই দিন দুইটা “স্টোরি”। রাজউক, পিডিবি, ডেসকো সহ অনেকের চৌদ্দগুষ্ঠী উদ্ধারের এখনই সময়। টক শো তে কিসের মুসা, কিসের বিশ্বকাপ? দিন আবারো আসছে…প্রযোজকের ফোন, চ্যানেলের গাড়ী, খামের ভেতর চেক… আচ্ছা বেগুনবাড়ীর ঘটনার রিপোর্টার মেয়েটা যেন কোন চ্যানেলের ছিলো? চোখ টিভির না বাইশে টেলিভিশনের…নাহ…একদম মনে পড়ছে না…
( কোনকিছু কারো সাথে মিলে গেলে তা নিতান্ত কাকতাল মাত্র। সবই মূর্খ ব্লগারের অনুর্বর মস্তিষ্কের কল্পনা মাত্র)

১,৯৯৭ বার দেখা হয়েছে

২৪ টি মন্তব্য : “হেকমত আলিদের দিন”

  1. আহসান আকাশ (৯৬-০২)

    দারুন লিখেছ সামি... সমস্যা হচ্ছে হেকমত আলীদের সংখ্যা দিনে দিনে দেড়ে চলেছে।


    আমি বাংলায় মাতি উল্লাসে, করি বাংলায় হাহাকার
    আমি সব দেখে শুনে, ক্ষেপে গিয়ে করি বাংলায় চিৎকার ৷

    জবাব দিন
  2. কামরুল হাসান (৯৪-০০)

    দুষ্ট ছেলে। এইসব কথা সবার সামনে বলা নিষেধ জানিস না।


    ---------------------------------------------------------------------------
    বালক জানে না তো কতোটা হেঁটে এলে
    ফেরার পথ নেই, থাকে না কোনো কালে।।

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।