একজন রইচ উদ্দিন

বয়স ঠিক কত হবে? ১৩ বা ১৪। নাম রইচ উদ্দিন।সবেমাত্র নবম শ্রেণীর পাঠ চুকিয়েছেন। স্বভাবগত চাঞ্চল্যে মন তার উড়ে বেড়ায়। পরের বাগানের ফল  চুরি করে, নয়ত বিকেলে ফুটবল আর নদীতে ঝাপাঝাপিতে দিন কেটে যায় তার নদীর স্রোতের মত। কিন্তু এরই মাঝে সময়টা থমকে দাঁড়ায়। ৭০- এর শেষের দিকের কথা। মাঝে মাঝে এলাকার বড় ভাইদের কাছ থেকে দেশের অবস্থা শুনে একটুআধটু। ইচ্ছা থাকলেও সবসময় সবকিছু জানা হয়ে উঠে না তার। কারণটা আর কিছুই নয়; তার বাড়ি যে একেবারে দেশের দক্ষিণ প্রান্তে আর সেখানে সব খবর সময়মত পৌঁছায়ও না ।জন্ম তার সুন্দরবনের কোল ঘেঁষা ছায়া সুনিবিড়-সবুজে ঘেরা গ্রাম গদাইপুরে। এ দেশের ভাগ্যে কি আছে? ঢাকাতে কি ঘটছে? মুজিব কি সিদ্ধান্ত নিচ্ছে? এইসব খবর তার পেতে পেতে একটু দেরি হয়ে যায়। তবুও তার কিশোর মনে স্বপ্নের দানা বাঁধে এবার এই দেশ স্বাধীন হবেই।

মার্চের শুরুর দিকে পাকিস্তানি সাবমেরিন পি এন এস ম্যাংরো ফ্রান্সের তুলন সাবমেরিন ডকইয়ার্ডে যায় পাকিস্তানি সাবমেরিনারদের প্রশিক্ষন দেয়ার জন্য। সেই ৪১ জন সাবমেরিনারদের মধ্যে ১৩ জন ছিলেন বাঙালি অফিসার। তারা আন্তর্জাতিক প্রচার মাধ্যমে ২৫ মার্চের গণহত্যার কথা শুনে পালিয়ে বাংলাদেশে চলে আসার সিদ্ধান্ত নেন। এর মধ্যে ৮ জন ৩০ মার্চ বাংলাদেশের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। ৯ এপ্রিল ১৯৭১ তারা দিল্লিতে এসে পৌছান। এখানে তাদের নাম উল্লেখ করা হলোঃ-

  1. মোঃ রহমতউল্লাহ।
  2. মোঃ সৈয়দ মোশাররফ হোসেন।
  3. মোঃ শেখ আমানউল্লাহ।
  4. মোঃ আবদুল ওয়াহেদ চৌধুরী।
  5. মোঃ আহসানউল্লাহ।
  6. মোঃ আবদুর রকিব মিয়া।
  7. মো আবদুর রহমান আবেদ।
  8. মোঃ বদিউল আলম।

তারপর উক্ত ৮জনের সাথে আরো কয়েকজনকে একত্র করে ২০ জনের একটি গেরিলা দল গঠন করে তাদের ভারতে বিশেষ ট্রেনিং দেয়া হয়। তারপর তারা দেশে আসলে তাদের সাথে কর্নেল ওসমানীর দেখা করানো হয়। তখন ওসমানী নৌ-কমান্ডো বাহিনী গঠনের সিদ্ধান্ত নেন।

ওসমানীর সিদ্ধান্তে নৌ-কমান্ডো সেক্টর খোলার পর বাছাইকৃত গেরিলাদের ট্রেনিং দেয়ার উদ্দেশ্যে ঐতিহাসিক পলাশীর স্মৃতিসৌধের পাশে ভাগীরথী নদীর তীরে ২৩ মে ১৯৭১ তারিখে একটি গোপন ট্রেনিং ক্যাম্প খোলা হয়। এই ট্রেনিং ক্যাম্পের সাংকেতিক নাম দেয়া হয় সি-২ পি (C-2 P)। এখানে ট্রেনিং দেয়ার উদ্দেশ্যে অন্যান্য সেক্টরসমূহের বিভিন্ন শিবির থেকে জুন মাসের শুরুর দিকে প্রায় ৩০০ জন বাছাইকৃত যোদ্ধা সংগ্রহ করা হয়। ট্রেনিং ক্যাম্পে এদের কি ধরনের প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে সে বিষয়টি এতই গোপনীয় ছিল যে, সেক্টর কমান্ডারদের মধ্যেও শুধুমাত্র যার এলাকায় অপারেশন চালানো হবে তিনি ব্যাতিত আর কেউ এই সম্পর্কে জানতেন না।

দেশের ডাকে কিশোর রইচ উদ্দিন তার এলাকার সহযোদ্ধাদের সাথে যোগ দিল ট্রেনিং ক্যাম্পে। মাকে ছেড়ে যেতে তার খুব খারাপ লাগছিল কিন্তু তার মা তাকে বাঁধা তিনি মানেন নি। তিনি মায়ের কাছ থেকে দোয়া নিয়ে চলে গেলেন।

ট্রেনিং শুরু হবার আগেই বাছাইকৃত যোদ্ধাদের বলে দেয়া হয় যে এটি একটি সুইসাইডাল অপারেশন বা আত্মঘাতী যুদ্ধ হবে। তাই অপারেশনের সময় যেকোন মূল্যে অপারেশন সফল করারা উদ্দেশ্যে প্রয়োজনে তাদের প্রাণ দিতে হতে পারে। তাই প্রশিক্ষণের শুরুতেই প্রত্যেক প্রশিক্ষণার্থীদের ছবি সহ একটি সম্মতিসূচক ফর্মে স্বাক্ষর নেয়া হতো।ফর্মে লেখা থাকতো যে, আমি দেশের স্বাধীনতার জন্য জীবন বিসর্জন দিতে সম্মত হয়েই এই প্রশিক্ষণ গ্রহণ করছি, আর যুদ্ধে আমার মৃত্যু ঘটলে কেউ দায়ী থাকবে না

নৌ-কমান্ডোদের ঐ প্রশিক্ষণ ক্যাম্পের দায়িত্বে ছিলেন ভারতীয় নেভাল অফিসার লেঃ কমান্ডার জি এম মার্টিস। প্রশিক্ষকদের মধ্যে ফ্রান্স থেকে পালিয়ে আসা ৮ জন সাব-মেরিনার ছাড়াও আরো ছিলেন মিঃ গুপ্ত, পি কে ভট্টাচার্য, কে সিং, এল সিং, মারাঠি নানা বুজ এবং সমীর কুমার দাশসহ আরো কয়েকজন।

ট্রেনিং এর দুটো অংশ ছিল। সবাইকে প্রয়োজনীয় স্থলযুদ্ধ যেমনঃ- গ্রেনেড নিক্ষেপ, এক্সপ্লোসিভের ব্যবহার, স্টেনগান রিভলবার চালানো, আন-আর্মড কমব্যাট(খালি হাতে যুদ্ধ) ইত্যাদি শিখতে হতো। আর জলযুদ্ধের ট্রেনিঙের মধ্যে ছিল বিভিন্ন ধরনের সাঁতার  যেমনঃ- বুকে ৫-৬কেজি ওজনের পাথর বেধে সাঁতার , চিৎ সাঁতার , কোন মতে পানির উপরে নাক ভাসিয়ে একটানা অনেক্ষন সাঁতার, পানিতে  সাঁতরিয়ে এবং ডুব সাঁতার দিয়ে লিমপেট মাইন ব্যবহার, স্রোতের প্রতিকূলে সাঁতার , জাহাজের কেবল ভাঙা ইত্যাদি কঠিন সব প্রশিক্ষণ দেয়া হত তীব্র খরস্রোতা ভাগীরথী নদীতে। শীত-বর্ষায় একটানা ৪৮ ঘণ্টা পানিতে থাকার অভ্যাস করতে হয় সব যোদ্ধাকে।

টানা দুই মাসের ট্রেনিঙের পর এপ্রিলের ২য় সপ্তাহে সহযোদ্ধা ও কমান্ডার রহমত উল্লাহকে সাথে নিয়ে এক দিনের জন্য যাত্রা বিরতি করেন রইচ উদ্দিন তার বাড়িতে। বাড়িতে আসার পর দেখেন তার মা ঠিক মত নাওয়াখাওয়া ছেড়ে দিয়েছেন। বাড়ির লোকজন থেকে জানলেন মা তার সারা দিন রাত কেঁদেই কাটান। তখন কিশোর মনে শুধু একটি কথাই আসে তোমার দোয়ায় ভাল থাকবো মা। ছেলেকে কাছে পেয়ে নিজ হাতে যত্ন করে খাওয়ালেন তার মা। তারপর চলে গেলেন তাদের নতুন ক্যাম্পে।

খুলনা জেলার দাকোপ উপজেলা। চালনা সমুদ্র বন্দরের প্রবেশ পথ। খরস্রোতা পশুর ও হাড়িয়াভাঙ্গা নদীর মিলন স্থান। সেখানেই বাঁধা আছে পাকিস্থানি গানবোট। অপারেশান জ্যাকপট এর অংশ হিসেবে দলনেতা রহমত উল্লাহর নির্দেশে সহযোদ্ধা শাহদাত,শামসের, কাদেরকে সাথে নিয়ে অপারেশান চালান রইচ উদ্দিন। প্রত্যেকে  একটি করে লিমপেট মাইন,ছুরি,একজোড়া সাঁতারের ফিন দেওয়া হল। প্রচণ্ড শীতের রাত।মাঝ রাতের পরে তাদের অপারেশান শুরু হল। শুধু একটা করে আন্ডার ওয়্যার পরা। গায়ে ও মাথায় শ্যাওলা জড়িয়ে ডুবসাঁতার দিয়ে পৌঁছে গেলেন তারা গন্তব্যে। তারপর সাবধানে মাইন বেঁধে ফিরে আসার পালা। তারা যখন দূরে এসে নদী থেকে উঠল তখন তাদের সাথে শাহদাতকে না দেখে বুকটা আঁতকে উঠল তার। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে তাদেরকে চলে যেতে হল। প্রায় ভোর হয়ে আসছে। বেশীক্ষণ এখানে থাকা নিরাপদ নয়। পাশেই রাজাকার ও পাকিস্থানি বাহিনীর ক্যাম্প। তাড়াতাড়ি আত্মগোপন করতে হবে। ধরা পড়লে সাক্ষাত মৃত্যু এবং সব প্ল্যান ভেস্তে যাবে। কিছুক্ষণ পরে মাইন বিস্ফোরিত হল। তারা নিরাপদ জায়গায় চলে গেলেন। এইভাবেই অপারেশান সার্থক হল। শাহদাত অবশ্য পরে ফিরে আসেছিল ক্যাম্পে। সে স্রোতের টানে যেয়ে রাজাকার ও পাকিস্থানি ক্যাম্পের পাশে এসে পড়ে। কোনরকমে উঠে যেয়ে পালায় পাশের ধান ক্ষেতে। তারপর যখন মাইন বিস্ফোরিত হয় সেই সময় গ্রামের লোকের সাহায্য নিয়ে ফিরে এসে ক্যাম্পে। দাকোপ শত্রু মুক্ত হবার পর তারা চলে যান সাতক্ষীরা জেলার মুন্সিগঞ্জ থানায়। সেখানে ও তারা একটি সফল গানবোট অপারেশান চালায়।

রইচ উদ্দিন এর সাহসিকতা দলের সবাইকে প্রেরণা যোগায়। এই কিশোর ছেলেকে দলনেতা খুব পছন্দ করতেন। যে কোন অপারেশান এ রইচ সবার আগে এগিয়ে যেত। দলনেতা তাকে নিজের ছোট ভাইয়ের মত দেখতেন। রইচ দলনেতাকে দাদা বলে ডাকতেন। তবে তাকে নিয়ে দলনেতার একটা অজানা আতঙ্কও হত; এত ছোট একটা ছেলে। না জানি কি হয়!!!!

নৌ অপারেশান শেষ হবার পর নভেম্বরের শুরুর দিকে আসেপাশের সব ক্যাম্পের যোদ্ধারা একত্রিত হন আশাশুনি ক্যাম্পে। প্রায় একশত যোদ্ধা একত্রিত হয়ে সম্মুখ সমরে অংশ নেন। দখল করে নেন রাজাকার ও মিলিটারি ক্যাম্প। আশাশুনি শত্রু মুক্ত হয় তখন। দেশ তখন শত্রু মুক্ত হতে শুরু করছে। মুক্তিবাহিনী আস্তে আস্তে ঢাকার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। তারা সেখান থেকে চলে আসলেন দক্ষিণ অঞ্চলের সব চেয়ে বড় পাকিস্থানি ঘাঁটি গল্লামারির দিকে। তাদের সাথে অন্যান্য ক্যাম্পের যোদ্ধারাও যোগ দিচ্ছে। গেরিলা পদ্ধতিতে আক্রমণ করা হল সেখানে। পরে মর্টার শেল, স্টেনগান, এলএমজি ব্যবহার করে গুঁড়িয়ে দেয়াহল পাকিস্থানি ঘাঁটি। এরপর খুলনা শত্রু মুক্ত হয়। এই সময় রইচ আহত হন। তার পিঠে ও পায়ে গুলি লাগে। যদিও আঘাত তাকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। পরে চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে উঠেন।

দেশ স্বাধীন হল। অনেকটা পথ ও পেরিয়ে গেছে। সেই কিশোর যোদ্ধা আজ বয়সের ভারে একটু ক্লান্ত। যুদ্ধ শেষে পড়াশুনার পাঠ চুকিয়ে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে চাকুরীতে যোগ দেন। এখন অখণ্ড অবসর। ধর্মকর্ম আর নাতি পুতিদের সাথে গল্প করে দিন কাটে তার। নিজের ভিতরের দেশপ্রেম তার ছাত্রদের মনের গভীরে বীজ হিসেবে বপন করে আসছেন তিনি। যে দেশপ্রেমের শিখা শত শত নতুন প্রজন্মের মাঝে জ্বলবে কালের পর কাল ধরে।

(সম্পর্কে তিনি আমার নানা। আমি তার তৃতীয় প্রজন্ম। আমার মায়ের দূর সম্পর্কের চাচা। তার সাথে যখন শেষবার দেখা হয়েছিল তখন তার কাছ থেকে মুক্তিযুদ্ধের গল্প শুনছিলাম। এবার তাকে নিয়ে একটু লিখলাম। যদি আমার লেখার মাধ্যমে দু একজন মানুষ ও জানতে পারে তার মত সাহসী মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্ব গাঁথা সেটাই আমার প্রাপ্তি। )

তথ্য সংগ্রহঃ উইকি পিডিয়া।

১,৬৮৯ বার দেখা হয়েছে

১৭ টি মন্তব্য : “একজন রইচ উদ্দিন”

  1. সন্ধি (১৯৯৯-২০০৫)

    :clap: সাবাশ তানভীর, চালায় যা। আমাদের নিজের সামর্থের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের যতটুকু অজানা কাহিনী, বিভিন্ন মানুষের অজানা অবদান, আত্মত্যাগ তুলে আনা উচিত আমাদের সার্থে। তোর এই উদ্যোগ কে ::salute::

    জবাব দিন
  2. সুষমা (১৯৯৯-২০০৫)

    এই লেখাটার জন্য তোর অনেক কষ্ট করতে হইসে বুঝা যায়,কিন্তু এইরকম একটা বিষয় লেখার জন্য বেছে এত তথ্য সংগ্রহ করার জন্য তোকে ::salute:: ::salute:: আর চরম হইসে লেখাটা

    জবাব দিন
  3. মুসতাকীম (২০০২-২০০৮)

    ভাইয়া চমৎকার লেখা :hatsoff: :hatsoff: :hatsoff:


    "আমি খুব ভাল করে জানি, ব্যক্তিগত জীবনে আমার অহংকার করার মত কিছু নেই। কিন্তু আমার ভাষাটা নিয়ে তো আমি অহংকার করতেই পারি।"

    জবাব দিন
  4. তাওসীফ হামীম (০২-০৬)

    অসাধারণ,সত্য কথা বলতে এই জাতীয় লেখা পড়তেই ব্লগে ঢুকি,মনটা ভালো হয়ে গেল, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস,সংরক্ষণ,এবং বিদেশী লেখকদের কিছু লেখা অনুবাদ প্রচণ্ড প্রয়োজন। আমার সাথে কষ্ট করে ফেশবুকে একটু যোগাযোগ করতে পারবেন? আমি আপনাকে আগেও একটা কমেন্টে বলেছিলাম,যদি উৎসাহী না হন তবে ভিন্ন কথা।
    যাই হোক সুন্দর লেখার জন্য আরো একবার সাধুবাদ রইল।


    চাঁদ ও আকাশের মতো আমরাও মিশে গিয়েছিলাম সবুজ গহীন অরণ্যে।

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।