ইন্দ্রাণী টকিজ

<<কেড়ে নিয়ে যায় তার পৃথিবী>>
স্টেশন পাড়ার পশ্চিম প্রান্তে একটা নোংরা ডোবা। ডোবাটার পাড়ে ধস্তাধস্তি করে দাঁড়িয়ে থাকা কুঁড়েঘরের ঘুপচি বাড়িগুলোর একটায় থাকে সে। সময় তখন রাত ১১টা বেজে ১৫। একটা বয়সী দীর্ঘস্বাস; নিজেই এখন নিজের বড় শত্রু কিংবা গলগ্রহ, গলগ্রহই হবে। কাছাকাছি একটা বাসা থেকে উঠতি বয়সী কোন ছেলের বাজান গানের শব্দ ভেসে আসে, “দূর ইশারায় বহু দূরে/আছড়ে পড়ে আকাশ/ কি হয় তোদের একটু খানি আদর বেশি মাখা/আদর বেশি মাখা……”। খুবই কাকতালীয়, এই গানটা যে ছবির, সেটা যখন তার কর্মস্থলের সিনেমা হলে চলেছিল, সেই শেষবারের মত সোনালী অতীত ফিরে এসেছিল। সাদাকালো যুগের মত সেই ভীড়; “হাউস ফুল” নোটিশ বোর্ড সে নিজেই অন্ততঃ পাঁচ দিন টাঙিয়েছিল হলের বাইরে, টিকিট পেতে উম্মাতাল জনতার সামনে। ডিসির সামনে দাঁড়িয়ে অজস্র টিকিট চেক করে দর্শকদের ভেতরে নেয়া, সেই শেষবার। ছবিটা সে নিজেও দেখেছিল।
সেই অতীতের সোনালী সময়টা তার হলে শেষ সেবারই এসেছিল। তার আগে কয়েক বছর ধরে সারা দেশে যখন একের পর সিনেমা হল বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, তখন সেই শনির দশা তারও হয়েছিল। ভাল ছবি নেই, সস্তা আর নীল ছবি চালিয়ে হল টিকিয়ে রাখতে চেয়েছিল মালিক, পরিনামে পুলিশের ঝামেলা। হল চলত না ঠিক মত, কোন মাসেই ঠিক মত বেতন পেত না। সেবারই শেষ বারের মত ভাল বেতন পেয়েছিল, একদিন পোলাও আর মুরগী পর্যন্ত কিনে এনেছিল বাসায়। তারপর থেকে আবারও সেই আগের অবস্থা। ভাত জোগানই এখন দুস্কর। সামান্য ভাতের জন্য দেনা হয়ে হয়ে এখন পাড়ায় বের হওয়া যায় না। তারপর সে আবার সিনেমা হলের কর্মচারী, যা এখন সভ্য সমাজে নিষিদ্ধ হয়ে যাচ্ছে প্রায়; তাই ঘরের বাইরে এলেই পাড়ার রাস্তায়, গলিতে চোখ জোড়াগুলো কেমন কুঁচকে যায়।
কি মনে করে যেন পেছনে বাঁশের দেয়ালে টাঙানো ছোট্ট আয়নায় নিজের চেহারাটা একবার দেখল সে। মুখে বয়সের ছাপ অনেক বেশি পড়েছে। ষাটোর্ধ চেহারাটা দেখলে মনে হয় সত্তুর। দাড়ি তো সেই কবেই পেকেছে, অনাহারে অর্ধাহারে চেহারা শরীর সব ভেঙে পড়েছে। অথচ পাড়ায় তার চেয়ে বেশি বয়সী মোস্তফা জাবের দেখতে এখনও কত ভাল আছে, নিজের নাতিকে নিয়ে রোজ সকালে যখন হাঁটতে বেড়ায় তখন সারা পাড়া তাকে সালাম ঠুকে।
মোস্তফার জন্যই সেই সাদা কালো যুগে আরেকবার ফিরে যায় সে। রাজ্জাকের ছবি আসলেই সদ্য বিবাহীত মোস্তফা তার বাসায় ধর্না দিত এক জোড়া ফ্রী পাসের জন্য। এখন সেই মোস্তফা কত সম্মানের মানুষ! আর সে? সস্তা অশ্লীল ছবি চলার সময় বিশেষ বিশেষ দৃশ্য শুরু হলে জড়াজীর্ন, বিধঃস্ত ডিসি গ্যালারী থেকে গুটিকয়েক দর্শকের হাজারো অশ্লীল গালাগালী, উল্লাস আর শিষের শব্দ ভেসে আসে দরজার বাইরে তার কাছে। চুপচাপ দাঁড়িয়ে থেকে সন্তান বয়সীদের সেসব নিরবে সহ্য করে সে, ষাট বছর বয়স পেড়িয়ে যাওয়া এক পরাজিত মানুষ। ভেতরে এখন আর টর্চ মারে না সে; মালিকের নিষেধ, এতে করে এসব হাতের পাঁচ দর্শকও যেন বিনা বাধায় ছবি দেখার লোভে হলেও যেন হলে আসে।
পাড়ায় যে কোন বাড়িতে কোন অনুষ্ঠান হলেই এক সময় তার দাওয়াত থাকতই। হলে টিকেট পাওয়া, মন মত যায়গায় রিজার্ভেশন- কত দরকারে মানুষ আসত তার কাছে! এখন সামান্য ভাত আর আলু সেদ্ধ খাবে বলে মানুষের কাছে হাত পাততে হয়। যারা টিকেটের জন্য আসত সেই মানুষরা ঠিকই টিকেট পেয়েছে, কিন্তু এখন সে এক থালা ভাত পায় না। হেরে গেছে সে, হলের ভেতরের জীর্ণ গ্যালারী, ফোম ছেঁড়া ছাড়পোকার আবাস সীটগুলো আর পুরন পর্দা- নিয়মিত তাকে দুয়ো দেয়, পাড়ার মানুষ এড়িয়ে যাওয়ার ভ্রু কোঁচকায়।
না, সবখানে হয়ত হারে নি সে। বৌ অকালে টাইফয়েডে মারা গেলেও নিজের একমাত্র সন্তান, মেয়েটাকে ক্লাস এইট পর্যন্ত পড়িয়ে সরকারী কেরানীর ঘরে বিয়ে দিয়েছিল। প্রাণাধিক প্রিয় সেই মেয়ের সাথে এখন আর যোগাযোগ নেই। যে হল ছিল একসময় তার জীবন, আনন্দ; সেই এখন তার জন্য প্রায় মৃত্যূপুরী। মানুষ এখন তাকে চেনে না, কথা বলার মানুষ নেই। পাওনা টাকার জন্য পাড়ার মুদির দোকানি জব্বার উদ্দিন এসেছিল আজ বিকেলেই, শাসিয়ে গেছে। সে সিনেমা হলের কর্মচারী জন্যই হয়ত ভদ্র লোকেরা এড়িয়ে যায়, নিজের মেয়ে যোগাযোগ রাখে না, বিয়াই-বিয়াইন দেখা হলে মুখ ফিরিয়ে অন্য দিকে চলে যায়। পরাজয়, নিয়তির কাছে হেরে যাওয়া।
গানটা আবারও খেয়াল হয়, “দূরের মানুষ, কাছের মানুষ………………” কাছের মানুষরা তো একে একে দূরেই চলে গেল। কাছে আছে শুধু দড়িতে ঝুলে থাকা কয়েকটা তালি তাপ্পি মারা কাপড়, একটা বিবর্ণ গামছা, বিছানার উল্টোদিকে ওপাশে একটা কেরোসিনের স্টোভ, কয়েকটা থালা বাসন আর হাড়ি পাতিল। একটা চল্লিশ পাওয়ারের বাল্ব জলছে, আগে অবশ্য একশ পাওয়ার জ্বলত। এরাও আজ থেকে হয়ত সিনেমা হলের ঐ বিধঃস্ত গালারীর মত অচল হয়ে গিয়ে তাকে কটাক্ষ করবে, দুয়ো দেবে। না, সে হারবে না, দুয়ো নেবে না।
অবশেষে তার প্রিয়, বহু স্মৃতি বিজড়িত “ইন্দ্রাণী টকীজ” সিনেমা হলটাও বন্ধ হয়ে যাছে। ভাল ছবি আসে না। দর্শক নেই। ছেলে ছোকড়া আর নিম্ন শ্রেণীর লোকেরাও ক্লান্ত সব ছবিতে একই ব্যাপার স্যাপ্যার দেখতে দেখতে। হল আর চলবে না, মালিক হলটা জমি সহ বেচে দিচ্ছে। ওটা ভেঙে মার্কেট হবে। সারা জীবন এই একটি কাজই ছিল তার জীবিকা, একটি হল নিয়েই ছিল তার পৃথিবীটা। ভাল হোক আর এখন যত মন্দই হোক; তাও একটা পৃথিবী তো ছিল, সেই পৃথিবীটা তার কেড়ে নিয়ে গেল।
“দূর ইশারায়, বহু দূরে/ আছড়ে পড়ে আকাশ/ কি হয় তোদের একটু খানি, আদর বেশি মাখা/ আদর বেশি মাখা………………।।দূরের মানুষ, কাছের মানুষ” গানটা বাজতে থাকে কেন জানি। মাঝে মাঝে কিছু ব্যাপার কাকতালীয় ভাবে ঘটতে থাকে, মানুষ যার কোন ব্যাখ্যা দিতে পারে না।

<<আমাদের সাধারন ভাবনা>>
“একটা ব্যাপার খেয়াল করেছিস, বাংলাদেশের সিনেমা হলগুলোর নাম কিন্তু খুব চমৎকার!”
“কি রকম?”
“মিনাক্ষী, লক্ষ্মী, দিপালী, রাজদূত, ইন্দ্রাণী, কল্পনা, বলাকা, ছন্দা এসব নাম শুনলে কী মনে পড়ে, বল তো!”
“কী আবার! সিনেমা হলগুলোর নাম।”
“বাংলাদেশের সিনেমা হলগুলোর নাম কি চমৎকার, তাই না?”
“হ্যা, ছবিগুলও ওরকম হলে আরও ভাল হত। নামে কি বা যায় আসে। একসময় তো নামের মত কাজও ছিল। আমার দাদা বলত যে দাদিকে নিয়ে সে প্রায়ই ছবি দেখতে যেত। ছবি দেখার পর দাদি নাকি অন্যরকম হয়ে যেত আবেগে। রাজ্জাক আর সুজাতা দাদা দাদির সবচেয়ে প্রিয় ছিল।”
“আমার বাপের প্রিয় ছিল আনোয়ার হোসেন।”
“এখন শালার ছবি দেখা মানেই হল পিসিতে বসে হয় হিন্দি অথবা ইংলিশ মুভি। আর বাংলা ছবি দেখা মানে তো হচ্ছে কলকাতার ছবি। হঠাৎ সিনেমা হলের নাম নিচ্ছিস কেন?”
“এই যে পেপারটা দেখ, একটা খবর দিয়েছে।”
“আরে খবর আর কী হবে, একের পর হল বন্ধ হয়ে যাচ্ছে কিংবা কোন হলে পুলিশ কর্তৃক নীল ছবির প্রিন্ট জব্দ। শালা বেজন্মা পরিচালক আর প্রডিউসারগুলার দোষ। এত কাট পিস! এই তো কয়েকদিন আগে একটা রিপোর্ট দেখলাম এক সাংবাদিকের, এক রিকশাওয়ালা বলছে যে আগে কাটপিস আর নীল ছবি দেখতে তার ভালই লাগত। এখন সেও একঘেয়েমি লাগে তার, সে আর হলে যায় না। হল মালিকরা আর কী করবে? ওদের তো উপার্জনের ব্যাপার আছে। হল ভেঙ্গে মার্কেট দিচ্ছে বা বিক্রি করে দিচ্ছে।”
“এই খবরটা কিন্তু অন্যরকম।”
“কী?”
“এক সিনেমা হল কর্মচারীর আত্নহত্যা। বগুরার শহরের ঘটনা।”
“কী হল?”
“নিঃসঙ্গ জীবন, আয় নাই। বোধ হয় অভাবের জন্য আত্নহত্যা।”
“খবরটা পড়।”
“বগুরায় সিনেমা হল কর্মচারীর আত্নহত্যা-বগুরা শহরের স্টেশন পাড়ার নিজ বাসায় হালিম হোসেন(৬২) নামে ‘ইন্দ্রাণী টকিজ’ সিনেমা হলের জনৈক হল কর্মী আত্নহত্যা করেছেন। গতকাল সকালে ডাকাডাকি করে কোন সাড়া না পেয়ে প্রতিবেশিরা তার বেড়ার ঘরের ফাঁক দিয়ে টিনের ছাদের নিচে কাঠের করি বর্গার সাথে তার ঝুলন্ত লাশ দেখে পুলিশকে খবর দিলে পরে পুলিশ তার লাশ উদ্ধার করে। ময়না তদন্তের পর পুলিশ আত্নহত্যার খবরটি নিশ্চিত করেছে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, সকালে প্রতিবেশি মিনহাজ আলম ব্যাক্তিগত দরকারে তাকে ডাকতে এলে কোন সাড়া শব্দ না পেয়ে বেড়ার ফাঁক দিয়ে ভেতরে উঁকি দিলে তাকে ঝুলন্ত অবস্থায় দেখেন। পরে তার ডাকাডাকিতে আরও লোকজন হাজির হলে পরে পুলিশকে খবর দেয়া হয়। পুলিশ তার লাশ তার একমাত্র ওয়ারিশ তার মেয়ে সায়রা বেগম(২৭) কে বুঝিয়ে দিয়েছে বলে জানিয়েছেন বগুরা থানার ওসি নিয়ামতুল্লাহ খান। প্রতিবেশিদের দেয়া খবর অনুযায়ী জানা যায় যে, তার স্ত্রী ছিল না। চার বছর আগে স্ত্রী মারা যান, নিজের মেয়ের বিয়ের পর তিনি একাকী জীবন যাপন করতেন। শহরের ইন্দ্রাণী টকিজ সিনেমা হলের টিকেট চেকার তিনি কাজ করতেন। অনেক ঋণ ও দেনার কারনে তিনি হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়েছিলেন। পাড়ার কারও সাথে শেষের দিকে তার তেমন যোগাযোগ ছিল না। আর্থিক কারন আর হতাশার কারনে তিনি আত্নহত্যা করতে পারেন বলে পুলিশের ধারনা। এ নিয়ে থানায় কোন ডায়রী হয় নি।”
“হুম, সিম্পল কেস। বৌ বেঁচে নেই, মেয়ে কাছে নেই। দেনার দায়ে জর্জরিত অবস্থায় হতাশায় আত্নহত্যা। আচ্ছা বাদ দে, এরকম কত আত্নহত্যা হচ্ছে প্রতিদিন। প্রেম করে আত্নহত্যা, বেকারত্ন, পারিবারিক কলহ আরও কত কি।”
“হুম, সেটাই।”
“আচ্ছা খেলার খবরটা দেখ তো, আজকে স্প্যানিশ লিগের মাচ ফিক্সচার দেয়ার কথা। এইবার বার্সা আর রিয়ালের কোন খেলা মিস দেয়া যাবে না।”

৮৩৩ বার দেখা হয়েছে

৫ টি মন্তব্য : “ইন্দ্রাণী টকিজ”

  1. নূপুর কান্তি দাশ (৮৪-৯০)

    গল্পটা ভালো লেগেছে রিদওয়ান, তবে দুর্দান্ত লাগেনি আগেরগুলোর মতো।
    বাংলাদেশের সিনেমাহলগুলোর পড়তি দশা নিয়ে গল্পের আয়োজন, ভাবনাটা বেশ উপভোগ করলাম। তবে গল্পের ভেতরে আরো কিছু আশা করছিলাম -একজন পরাজিত মানুষের কথার ভেতরের কিছু কথা।

    জবাব দিন
  2. রিদওয়ান (২০০২-২০০৮)

    আপনার মন্তব্যের জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ ভাইয়া। অনেক দিন সিসিবিতে ঢোকা হচ্ছিল না। আসলে গল্পটাতে মনে হয় আরও কিছু থাকা উচিত ছিল। আরও যত্নবান হওয়ার চেষ্ঠা করব। আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ ভাইয়া। :salute:

    জবাব দিন
  3. আলীম (২০০১-২০০৭)

    অপটপিক কিছু কথা,

    একটি লিটল ম্যাক'এর জন্য, বইমেলা থেকেই যাত্রা শুরু। ১৫ জানুয়ারীর ভিতরে লেখা পাঠাবার ঠিকানা, paglaraza@gmail.com. ব্যক্তিগত যোগাযোগ- আলীম হায়দার, ০১৭১৭-৫২২২০৬।

    লেখা পেলে মেইলে উত্তর জানাবো।


    -আলীম হায়দার.1312.

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।