প্রস্থান

“তাই সবার মত উঠতে হবে আমাকেও কাধে/ বয়ে এতে হবে একই গঙ্গায়/ আমি অন্য কারো হাতের মুঠোয় এক মুঠো ছাই/ আমি অন্য কিছু নই আমি সবাই……।” আজ সকালে উঠেছি অনেক আগে। সবাই ক্লাসে গেছে, আমার ক্লাস শুরু হতে তখনও দেরি। বসে বসে অঞ্জনের এই গানটা শুঞ্ছিলাম, মৃত্যূর কথা ভাবছিলাম। জীবনের চূরান্তটা যদি অন্য সবার মত হল, তবে তো আমি আসলেই আর দশজনের মতো। এখানে কোন তর্ক নেই, ব্যাবধান নেই- সবই এক।

আমার মা ছিল হুমায়ুন আজাদের “আমাদের মা” কবিতার মত। সারাটা দিন বিরাজ করত আমাদের মাঝে। মা ছিল আমার “দুধ-ভাতের” থালার মত। দুধ দিয়ে ভাত খেয়েছিলাম কয়েকবার। শেষ কবে খেয়েছি, তার শুধু দৃশটা মনে আছে, মা দুধ ভাত মেখে দিল। আর দশটা দূর্ভাগা তরূনের মত যখন একা একা অসুস্থ্য শরীরে পড়ে থাকি জ্বরের সময়, আমার মা তখন আর দশটা হারানো মানুষের মত শুয়ে থাকে মাটির গর্ভে, ছবি হয়ে থাকে আমার কাছে।

আমার পাশের বাড়িতে একটা ছোট ছেলে থাকত, নিতিশ। নিতিশের বোলিং-ব্যাটিং ছিল সৌরভ গাঙ্গুলীর মত। ওর সপ্ন ছিল দাদার মত ক্রিকেটার হবে। তিন ভাইয়ের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ, ইশ্বর যেন ক্রিকেটিয় প্রতিভা ঢেলে দিয়েছিল তাকে। ওদের মেজজন ছিল আমাদের ক্লাবের ওধিনায়ক। বসে বসে ছোটর খেলা দেখত আর ভাবত, “ছোটটা মাত করবে”   আমাদের খেলার জায়গাটার নাম ছিল অদ্ভুত “ময়দানে জাং!” সেই ময়দানে জাং এর সেই দিনগুলি আর নেই। হঠাত করেই নিতিশ অসুস্থ্য। ধরা পড়ল রক্তে ক্যান্সার। প্রয়োজনের চেয়েও বেশি অর্থ জোগাড় হল। কিন্তু অন্য দশজনের মতই অসামান্য এই ছেলেটি চার কাধে উঠল। আর অন্য সবার বেলার মতই “হরিবোল” ধব্নিত হল মানুষের মুখে, খই ছড়িয়ে গেল পথে পথে। ছাই হয়ে বয়ে গেল নদীতে, অরূন উদয় ক্রিকেট ক্লাবের ২৭ বছরের ইতিহাসের সবছেয়ে বড় বিস্ময়। না, বাড়িয়ে বলছি না, সত্যিই বড় বিস্ময় ছিল ও। ছুটিতে যখন বাড়ি যাই, রাতে দেখি ময়দানে জাং এ পাশের বাড়ীর উজ্বল বাতি জলে। “এই সাদাকালো শহর সেতো সাদাকালোই থাকে আমি যতই রঙিন নিয়ন জালাই…”- অঞ্জনের কাছে কলকাতা আর আমার কাছে পাড়ার ক্রিকেট খেলার জায়গা ময়দানে জাং, বিবর্ণ থেকে যায়। যখন চিঠিপত্রের সময় ছিল, ডাকপিয়ন সাইকেলের বেল চাপলে বাসার সবাই দোউড়ে যেতাম। নিশ্চই কোন কাছের মানুষ স্মরন করছে, একজনের কাছে চিঠি আসলেও তাতে সবার কুশল জিজ্ঞাসা থাকত। চিঠি নিয়ে আসতেন যিনি, কিছুটা মোটাসোটা গড়নের কালো করে এক পঞ্চাশোর্ধ মানুষ। চোখে চশমা, নাকের নিচে গোফ। যখন ছোট ছিলাম, চিঠি আমিই নিতাম তার হাত থেকে। চিঠি দেয়ার সময় সহাস্যে জিজ্ঞেস করতেন, “বাবু, ভাল আছ?” বছর তিনেক আগের কথা, বাসায় ছিলাম। ততদিনে চিঠি বিদায় নিয়েছে। ডাকপিয়নের বেল শুনে ভাবলাম কোন জরূরী কাগজ। গিয়ে দেখি এক তরূণ পোস্টম্যান। হঠাত কেন জানি মনে হল সেই চাচার কথা। “আচ্ছা ভাই, একজন চাচা যে আসতেন চিঠি-পত্র নিয়ে, উনি কি retire…..” কথাটা শেষ হওয়ার আগেই উত্তর, “উনি মারা গেছেন তিন মাস আগে। আমি তার ছেলে, আব্বা মারা যাওয়ার পর তার শূন্য পদে আমি নিয়োগ পাইছি।” সেদিন মনে হচ্ছিল, “ইশ্বর! আমাকে এক ঘন্টার জন্য শিশু করে দাও, কেদে বুক ভাসাই, হালকা হয়ে যাই।” অনাত্নীয় মানুষ, আত্নীয়ের বার্তা বয়ে আনতে আনতে কবে আত্নীয় হয়ে গিয়েছিলেন, আমি টের পাইনি। আর দশজন আত্নীয়ের মত এই “আত্নীয়ও” আজ হাওয়ায় মিলিয়ে গেছেন।

কতজনের কথা লিখব আমি? শীতকালে সকালবেলায় পরিস্কার ডেকচি হাতে ছোট ছোট ভাপা পিঠা ফেরী করা সেই বৃদ্ধ, টিউবওয়েল মেরামত করতে আসা সেই বয়স্ক মিস্ত্রী, মুদি দোকানদার হাশেম চাচা- কতজন? শেষ করছি বাবার কথা দিয়ে। মা কিংবা বাবার কথা লিখে শেষ করার মত নয়। বাবা তার প্রয়ানের আগে বলেছিলেন দুঃখ না করতে। বাবার প্রয়ান হয়েছিল অনেক শান্তিতে, সেজন্য কোন দুঃখ নেই। কিন্তু তাই বলে কি দুঃখকে ভুলে থাকা যায়? Alfred Tennyson এর কবিতার শিরোনামটা বারবার বুকে বাজতে থাকে, “TEARS, IDLE TEARS” । অলস অশ্রু, চোখ থেকে গড়ায় না, চোখের ভেতরে টলমল করে।

উৎসর্গ- যাদের কথা এই কলামে লেখার মত মানসিক শক্তি আমার নেই, ক্যাডেট কলেজ জীবনের বন্ধু তাসনিম(শাহ মোঃ তাওনিম রাফি), রাজশাহী ক্যাডেট কলেজের আমাদের সতীর্থ অপূর্ব এবং আমার এক ব্যাচ জুনিয়ার হাবিব, অনেক ভুলের জন্য যাকে একসময় অনেক শাস্তি দিয়েছিলাম- তারা হারিয়ে গেছে আমাদের পৃথিবী থেকে, জীবন থেকে নয়।

লেখার সময়-   ২৭ মার্চ, ২০১২

বেলা ৯:৪০-১০:৪0 (Quality control Class)

বি.দ্র- এই কলামের প্রতিটি ঘটনা ও চরিত্র সত্য।

 

৫৯৫ বার দেখা হয়েছে

৬ টি মন্তব্য : “প্রস্থান”

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।