সত্যজিৎ এর “নায়ক”

সিনেমা আমার কম দেখা হয়। মাঝে মাঝে এর তার থেকে শুনে শুনে দু’য়েকটা সিনেমা দেখা হয়। এর মাঝে অবশ্য বাংলা সিনেমার পরিমাণ খুব কম, প্রায় নেই বললেই চলে। অভিজ্ঞতা যা আছে তার কিছুটা আগে দেখা শুক্রবার দুপুর তিনটা বিশের বাংলা সিনেমার সুবাদে। ব্যাপারটা নিয়ে আগে তেমন একটা গা করি নি কিন্তু কয়েক দিন বাংলা সিনেমা কে প্রটেকশন দেওয়া নিয়ে শুরু হওয়া বির্তক ব্লগের পাতা গড়িয়ে আমাদের আড্ডাতেও একদিন এসে পরল। সেই আড্ডাতেই তর্ক করতে করতে হঠাত টের পেলাম বাংলা সিনেমা সম্পর্কে আমার জ্ঞান অল্প কয়েকটা সিনেমার মধ্যেই সীমাবন্ধ। আর এর থেকে মুক্তির একমাত্র উপায় হল বেশী বেশী বাংলা সিনেমা দেখা। আমার স্বল্প জ্ঞানে বাংলা সিনেমার পরিচালকদের মধ্যে ছোটকাল থেকেই শুনে আসছি সত্যজিতের নাম। তাই সত্যজিৎ এর পুরো মুভি কালেকশনটাই কিনে ফেললাম গতকাল রাইফেলস স্কয়ার থেকে। এর মধ্যে প্রথমেই দেখা হল “নায়ক”।

নায়কের কাহিনী গড়ে উঠেছে পর্দার এক নায়ক কে ঘিরে। সিনেমার শুরুতে পত্রিকার একটা খবর আমাদের জানান দেয় নায়কের উদ্দাম জীবন সম্পর্কে। নায়ক চলছেন দিল্লী, জাতীয় পুরষ্কার আনতে। নায়কের সেই ট্রেন যাত্রা আর সেই যাত্রার সঙ্গী একটি ধনাঢ্য পরিবার, কাজ বাগিয়ে নিতে উন্মুখ এক ছোট ব্যবসায়ী, এক নারী বিষয়ক আধুনিক ম্যাগাজিনের মহিলা সম্পাদক, সিনেমা বিদ্বেষী এক বৃ্দ্ধ এই সব নিয়েই “নায়ক” সিনেমার গল্প। এই যাত্রায় আরেকটি সঙ্গী অবশ্য থাকে, তবে অলক্ষ্যে। সে নায়কের স্মৃতি। আর এসব নিয়েই সত্যজিতের “নায়ক”।

সম্ভবত এরকম গল্প,উপন্যাস কিংবা সিনেমার সংখ্যা নিতান্তই কম না, যেখানে একটা যাত্রা কে ঘিরে গল্প আবর্তিত হয়। এরকম একটা বহুল ব্যবহৃত গল্পের উপর নির্মিত প্লটের সিনেমাও আমার ভাল লেগে যায় কারণ এর নির্মাণ। সবচেয়ে ভাল লাগে পুরান স্মৃতি কে তুলে আনার ক্ষেত্রে পরিচালকের সুস্থিরতা। কোন তাড়াহুড়া নেই সেখানে। আধুনিকা পত্রিকার সম্পাদিকা যে কিনা পাশের সহযাত্রীনির কৌ্তুহল মেটানোর জন্য কিংবা তার প্রতি নায়কের তাচ্ছিল্য কে কাটিয়ে তুলার জন্য আগ্রহী হয় নায়কের সাক্ষাৎকার গ্রহণে। নায়ক অরিন্দম, যার দাপুটে অভিনয়ের আড়ালে ঢাকা পরে থাকে তার অতীত, সেই অতীতের সুতা ধরেই টান দেয় সম্পাদিকা কিংবা নায়ক নিজেই আগ্রহী হয়ে উঠে সে অতীত প্রকাশে। আর এর মাঝে দিয়েই উঠে আসে নায়কের টানাপোড়েন, প্রকাশ পায় রূপালী পর্দার এই মানুষটাও আসলে সামান্য মানুষ ছাড়া কিছুই নয়।

এই সিনামায় আমার কাছে সবচেয়ে কৌ্তূহলের মূহর্ত হচ্ছে কাজ বাগিয়ে নিতে ইচ্ছুক এক ছোট ব্যবসায়ী আর তার স্ত্রীর সংলাপ। যেখানে দেখা যায় সেই ছোট ব্যবসায়ী কাজ বাগিয়ে নিতে তার স্ত্রীর সাহায্য চায়। অর্থাৎ সে চায় তার স্ত্রী তার এক ধনাঢ্য ব্যবসায়ীর সাথে হেসে কথা বলুক, তার পাশে গিয়ে বসুক। কিন্তু স্ত্রীর তাতে সায় নেয়। স্ত্রী চায় ফিল্মে নামার সুযোগ। ট্রেনের করিডোরে নায়ক কে একা পেয়ে প্রকাশ করেও ফেলে তার ইচ্ছে। নায়ক জানায় এতে তার স্বামীর অনুমতি লাগবে। কিন্তু ফিল্ম বড় নোংরা জগত বলে তাতে অনিচ্ছা জানায় সেই ব্যবসায়ী। আর সেখানেই উঠে আসে মানব ইতিহাসের সেই পুরাতন কেচ্ছা, দর কাষাকষি। স্ত্রী জানিয়ে দেয় সে হেসে হেসে কথা বলতে ইচ্ছুক যদি স্বামী তাকে ফিল্মে নামার সুযোগ দেয়। আর এখানে পরিচালক হয়ত আমাদের ইঙ্গিত দেন আমাদের চিরন্তন দূর্বলতার। যেখানে নিজের ইচ্ছে কে পূরণ করতে গিয়ে আমাদের অনেক সময় অনেক বড় ছাড় স্বীকার করে নিতে হয়, হোক না সে যতই অনৈতিক। হয়ত সে ইঙ্গিত আমাদের পতনেরও।

আমার মতে একজন প্রকৃ্ত শিল্প স্রষ্টা কখনোই তার চারপাশ কে অস্বীকার করতে পারেন না, হোক না সে সুরকার, সাহিত্যিক কিংবা পরিচালক। আর সত্যজিতও তার ব্যতিক্রম নন। তাই মূল গল্পের চারপাশে গড়ে উঠে আর ছোট ছোট অনেক গল্প। যে গল্প কখনো সেই ধনাঢ্য পরিবারের, কখনো কাজ বাগিয়ে নিতে ইচ্ছুক ছোট ব্যবসায়ীর আবার কখনো সিনেমা বিদ্বেষী সেই বৃ্দ্ধের। সেই গল্প গুলো আমাদের সুক্ষ ভাবে জানান দেয় আমাদের চারপাশের অসঙ্গতি গুলোর।

আর এই সব শেষে একটা কথাই বলা যায়, নতুন করে বাংলা সিনেমা কে হাতড়ে বের করার জন্য “নায়ক” খুব একটা খারাপ সিনেমা না।

২,৮৭৬ বার দেখা হয়েছে

৩৯ টি মন্তব্য : “সত্যজিৎ এর “নায়ক””

  1. আহমদ (৮৮-৯৪)

    রাশেদ,
    খুব ভাল লাগল লেখাটা পড়ে। ৫ তারা। :clap:
    সিনেমাটা দেখা হয়নি, তবে তোমার লেখা পড়ে দেখার ইচ্ছা বেড়ে গেল।
    সত্যজিতের আগন্তুক দেখেছো? আমার প্রিয় ছবিগুলোর মধ্যে একটা। তুমি ওটার রিভিউ লিখলে আমি মনযোগ দিয়ে পড়ার ইচ্ছা ব্যক্ত করছি।
    যাই হোক, চমতকার লিখেছো। রিভিউটা পড়ে মনে হল, এত ছোট্ট রিভিউ কেন।
    অফটপিকঃ তোমার সাবজেক্ট কি?


    চ্যারিটি বিগিনস এট হোম

    জবাব দিন
    • রাশেদ (৯৯-০৫)

      পড়ার জন্য ধন্যবাদ আহমদ ভাই 🙂
      নাহ আগন্তুক দেখা হয় নি। পুরা কালেকশনের ভিতর মাত্র "নায়ক" দেখা হল। এর আগে অবশ্য খালি হীরক রাজার দেশ আর বাক্স বদল দেখা হয়েছিল। আশা করি আস্তে আস্তে দেখা হয়ে যাবে। আর এটাকে আসলে ঠিক রিভিও হিসেবে ধরা যায় না। কারণ কোন জিনিস নিয়ে রিভিও লিখতে গেলে সেটা নিয়ে মোটামুটি জ্ঞান থাকা লাগে আর সিনেমার ক্ষেত্রে সেটা আমার খুবই অল্প। এটাকে বরং ধরতে পারেন একটা সিনেমা দেখে ভাল লেগেছে তার প্রতিক্রিয়া। তবে চেষ্টা করব এর পর থেকে সিনেমা নিয়ে লিখলে আরেকটু বড় করে লিখতে।

      আর আমার সাবজেক্ট লোক প্রশাসন 🙂


      মানুষ তার স্বপ্নের সমান বড়

      জবাব দিন
  2. আদনান (১৯৯৪-২০০০)

    তোর লেখা পড়ে অনেকদিন আগে দেখা মুভিটা মনে পরে গেল । মুভির অনেক কিছুই মনে নাই । তবে অভিনেতা অভিনেত্রী কারা ছিল বললি না তো । যারা দেখেনি যানতে পারতো । তবে রিভিউ ভাল লেগেছে :clap:

    জবাব দিন
  3. নূপুর কান্তি দাশ (৮৪-৯০)

    সত্যজিতের সেরা ছবির একটি।
    ''নায়ক"-এ উত্তমকুমারের অভিনয় ছিলো অসাধারণ।
    বারেবারে দেখার মতো ছবি।
    শর্মিলা ঠাকুর-ও অসাধারণ ছিলেন।
    একটা ছোট্ট ট্রেন ভ্রমণ, আর তাতে এতো গল্প,
    জীবনের এতোটা অনুষঙ্গ --- সত্যজিতের পক্ষেই বুঝি
    আঁকা সম্ভব এমন ছবি।

    জবাব দিন
  4. টিটো রহমান (৯৪-০০)

    অসাধারণ ফিল্ম।
    মজার ব্যাপার হলো- ট্রেনের দোলাদুলি যাই থাকুক না কেন পুরোটাই ইনডোরে শ্যুট করা।
    একবারের জন্যও কি মনে হয়!!!!!!

    তখন উত্তমকুমারের জয়জয়কার দিন। মূলধারার নায়ক সে। কিন্তু সত্যজিতের নায়ক সৌমিত্র। আর তার ছবিকেও তখন ঠিক মূলধারার বলা যেতো না। সেরকম সময়ে `নায়ক' ফিল্মটি টোটাল ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি ও দশর্কদের জন্য একটা বিশাল খোঁচা ছিলো কি না তাই ভাবছি :-B

    যেহেতু সত্যজিত একবারে কিনেছ কাজেই একবারেই অপু ট্রিলজিটা(পথের পাঁচালী, অপরাজিত, অপুর সংসার) দেখো
    এছাড়া কাপুরুষ-মহাপুরুষ, অরণ্যের দিনরাত্রি, চারুলতা, গোপী গাইন বাঘা বাইন, হীরক রাজার দেশে সবসময়ই আমার ফেভারিট
    এছাড়া একটা জায়গায় আমার আর সত্যজিতের বেশ মিল আছে। কাঞ্চনজঙ্ঘা ছবিটা দুজনেরই প্রিয় ;)) ;)) ;))

    প্রতিক্রিয়া ভালো হয়েছে 🙂 :thumbup:
    সত্যজ্যিতের সিরিজের মতো চলতে থাকুক তোমার প্রতিক্রিয়া সিরিজ :hug:


    আপনারে আমি খুঁজিয়া বেড়াই

    জবাব দিন
  5. মুস্তাকিম (৯৪-০০)

    টিটো, আমি যতখানি জানি উত্তম কুমার পর্দার বাইরেও যখন পাবলিক ফেস করত, একজন নায়কের মতই থাকতে চাইত। ছবির শেষ দৃশ্যটা মনে করলে এটাকে একটা খোঁচা মনে হতেও পারে। আর কাস্টিংটাও দেখ! একদম মানিয়ে যায়।সত্যজিতের এই একটা ছবিতেই উত্তম অভিনয় করেছে।

    জবাব দিন
    • রিফাত (২০০২-২০০৮)

      ভাই ....সেই সময় নায়ক বলতে উত্তম কুমার কেই বুঝাত...তাই উত্তম কে দিয়েই এই সিনেমা করার মধ্যে নিশ্চয় কোনো ব্যাপার আছে !!!...

      এই ছবির পরের বছর সত্যজিত উত্তম কে নিয়ে আর ১ টা ছবি করে....'চিড়িয়াখানা '....একটি গোয়েন্দা থ্রিলার...বেশ.ইন্টারেস্টিং কাহিনী...

      জবাব দিন
  6. রিফাত (২০০২-২০০৮)

    প্রথম মুগ্ধতা অরন্যের দিনরাত্রি দেখে.....এরপর শুরু হয় আমার সত্যজিত গবেষনা.....আমি তার ২৩ খানা ছবি দেখছি...বাকি আছে ৫ খানা...এছাড়া তার কয়েকটি ডকুমেন্টারি....পুত্র সন্দীপ রায়ের প্রায় সবকটি ছবি...দেখা হয়ে গেছে...বুঝতেই পারছেন সত্যজিত কে আমি সিনেমার গুরু মানি....গুরুর সাথে আমার আবার ব্যক্তিগত জীবনের কিঞ্চিত মিল আছে...! 🙂

    আর ভাই দেশে আইসাই কালেকসন টা যোগার করতে হবে...সব ছবি আছে?..মূল্য কত?...

    এরপর,আমার সবসময়ের প্রিয় অরন্যের দিনরাত্রি...দেখে ফেলান...কামরুল ভাই এই ছবি সম্পর্কে ১ টা সুন্দর কথা বলেন --
    এখানে সত্যজিত তার সময় কে ছাড়িয়ে গেছেন..."
    এছাড়া মহানগর ,জন-অরন্যে.,কাঞ্চনজঙ্ঘা..শেষ করা যাবে না সব গুলাই দেখে ফেলান !!..আর সত্যজিত এর মুভি নিয়া পোস্ট দেয়ার জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ 🙂

    জবাব দিন
  7. আহসান আকাশ (৯৬-০২)

    সত্যজিতের কালেকশনটা জোগাড় করে ফেললাম, আর নায়ক দিয়েই শুরু করলাম। মুভিটা দেখা শুরু করেছিলাম একদম শেষ রাতে... সম্ভাবনা ছিল শেষ না করেই ঘুমিয়ে যাবার, কিন্তু দেখতে দেখতে ভোর হয়ে গিয়েছে কিন্তু ঘুম আসেনি। এতেই বোঝা যায় ছবিটা আমাকে কতটুকু ধরে রেখেছিল।

    এরপরে কোনটা দেখছো?


    আমি বাংলায় মাতি উল্লাসে, করি বাংলায় হাহাকার
    আমি সব দেখে শুনে, ক্ষেপে গিয়ে করি বাংলায় চিৎকার ৷

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।