করোনা পরবর্তী শিক্ষাদান: যেসব উদ্যোগ ও কৌশল জরুরি

কভিড-১৯ মহামারীর প্রকোপ ঠেকাতে এ বছরের ১৭ মার্চ সব ধরনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধের ঘোষণা দেয় সরকার। এর ফলে শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক শিক্ষাজীবন ও শিক্ষণ প্রক্রিয়া দারুণভাবে ব্যাহত হয়। পুরো পৃথিবী এখনও করোনামুক্ত নয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আসন্ন শীতে বাংলাদেশে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ ধেয়ে আসছে। অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ হয়ে থাকা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কবে খুলবে তা কেউ বলতে পারছে না। অন্যদিকে, দেখতে দেখতে প্রায় আট মাস হয়ে গেল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ হয়ে আছে। যদিও, অনলাইন ক্লাস ও সংসদ টেলিভিশনে শিক্ষা কার্যক্রম চলমান আছে। করোনার প্রকোপ কমে গেলে এক সময় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ধীরে ধীরে খোলা শুরু করবে। করোনা পরবর্তী শিক্ষাদান এক সঙ্গে যেমন চ্যালেঞ্জিং সেই সঙ্গে যথাযথ উদ্যোগ ও কৌশল অবলম্বনের মাধ্যমে সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করাও সম্ভব। সেক্ষেত্রে এই আট মাসের শিক্ষা ও অভিজ্ঞতাকে বিশ্লেষণ করা জরুরি। এ কথা অনস্বীকার্য যে, স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করতে পারলেই তবে কেবল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলার চিন্তা করা যাবে। কিন্তু শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক শিক্ষা জীবনে ফেরানোই হবে করোনা পরবর্তী সময়ে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এই দীর্ঘ আটমাসে শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন রকম সামাজিক বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছে। উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত, দরিদ্র, নব্যদরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে এই বাস্তবতা স্বতন্ত্ররূপে হাজির হয়েছে। যেমন, দরিদ্র, নব্যদরিদ্র্য ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অনেক শিক্ষার্থীকেই করোনার সময়ে বিভিন্ন ভাবে পরিবারকে সহযোগিতা করতে হয়েছে। অনেক শিক্ষার্থীকেই বেছে নিতে হয়েছে আয়-রোজগারের পথ। অন্যদিকে অধিকাংশ পরিবারেই ছিল তীব্র খাদ্য সংকট। প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের শিক্ষার্থীদের ওপর করোনার প্রভাব শীর্ষক ব্র্যাকের গবেষণার ফলাফলে উঠে এসেছে, করোনার সময়ে প্রায় ৫৫ শতাংশ শিক্ষার্থীকে গৃহস্থলি কাজ ও পরিবারকে সহযোগিতা করতে হয়েছে। সেই সঙ্গে প্রায় ২২ শতাংশ শিক্ষার্থীর পরিবারেই ছিল খাদ্য সংকট। অন্যদিকে যেসব পরিবারে খাদ্য সংকট ছিল না কিংবা শিক্ষার্থীদের কোন রকম আয়রোজগারের সঙ্গে যুক্ত থাকতে হয়নি সেসব পরিবারের প্রায় ২৭ শতাংশ শিক্ষার্থী শুধুমাত্র গল্প-গুজব করে দিন অতিবাহিত করেছে। অন্যদিকে, বিদ্যালয় থেকে সঠিক নির্দেশনা না পাওয়া ৪৪ শতাংশ, পরিবার থেকে সাহায্য না পাওয়া ১৯ শতাংশ এবং ঘরে পড়ার উপযুক্ত পরিবেশ না পাওয়ার ১১ শতাংশসহ বিভিন্ন কারণে ব্যহত হয়েছে তাদের শিক্ষণ প্রক্রিয়া।

আবার, বিকল্প শিক্ষণ পদ্ধতি হিসেবে অনলাইন ক্লাস ও সংসদ টেলিভিশনের কার্যকরিতাও বিভিন্ন কারণে প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। ব্র্যাকের একই গবেষণায় দেখা যায়, প্রায় ৫৬ শতাংশ শিক্ষার্থী এই ধরণের শিক্ষণ প্রক্রিয়ায় অংশ নেয়নি। এর মাঝে ৪০ শতাংশ ভাগ গ্রামাঞ্চলের শিক্ষার্থী, ২৫ শতাংশ ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী, ৩২ শতাংশ মাদ্রাসার শিক্ষার্থী এবং ৩৯ শতাংশ প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী। অংশগ্রহণ না করা শিক্ষার্থীদের প্রায় ৭১ শতাংশ প্রযুক্তিগত অবকাঠামো (টিভি, ইলেকট্রিসিটি, ইন্টারনেট একসেস প্রভৃতি) এবং ২১ শতাংশ শিক্ষার্থী প্রয়োজনীয় তথ্যের অভাবে ক্লাসে অংশ নিতে পারে নি। অন্যদিকে যারা অংশ নিয়েছে তাদের মধ্যে প্রায় ৪৪ শতাংশ মনে করেছে এই ধরণের শিক্ষণ পদ্ধতি খুব একটা কার্যকরী নয়। শিক্ষার্থীদের শিক্ষণ প্রক্রিয়া ব্যহত হবার পাশপাশি তাদের মধ্যে বিভিন্ন রকমের আসক্তি দেখা দিয়েছে যা তাদের মানসিক স্বাস্থ্যে আঘাত হেনেছে। দীর্ঘদিন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকার কারণে একদিকে যেমন তাদের দৈনন্দিন রুটিনে পরিবর্তন এনেছে অন্যদিকে বেড়েছে ভবিষ্যত নিয়ে আশঙ্কা ও দুঃশ্চিন্তা। গবেষণা বলছে, করোনাকালীন সময়ে ১৭ দশমিক ৭ শতাংশ শিক্ষার্থীর মানসিক স্বাস্থ্য খারাপ হয়েছে। ফলে প্রায় ১৩ শতাংশ শিক্ষার্থীরা পড়াশোনার ওপর বিরূপ মনোভাব পোষণ করেছে। একই সঙ্গে বেড়েছে বিবিধ রকম আসক্তি। প্রায় ১৯ শতাংশ শিক্ষার্থীদের মধ্যে ইন্টারনেট আসক্তি দেখা দিয়েছে। এছাড়া বেড়েছে শিশু নির্যাতনের মতো ঘটনা।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করোনা দীর্ঘস্থায়ী হলে প্রায় ৪৫ শতাংশ ভাগ মাধ্যমিকের শিক্ষার্থীরা স্কুলে ফিরবে না। স্বাভাবিক ভাবেই ‘ড্রপ-আউট’ এর সংখ্যা বেড়ে যাবে। কিন্তু বিবিধ প্রতিকূলতা পেরিয়ে যারা ফিরবে কিংবা যারা একটু সহযোগিতা পেলেই ফিরতে পারে তাদের জন্য কী উদ্যোগ নেয়া দরকার তা ভাবা জরুরি। যেহেতু অনেক শিক্ষার্থী করোনাকালীন সময়ে সরাসরি আয় উৎপাদনকারী কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত থেকেছে তাই এই জনগোষ্ঠীকে স্কুলে ফেরাতে চাইলে অবশ্যই পর্যাপ্ত উপবৃত্তির ব্যবস্থা করতে হবে। একই সঙ্গে প্রান্তিক জনগোষ্ঠির জন্য বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটের সঙ্গে মিল রেখে ‘মিড ডে মিল’ চালু করা যেতে পারে। যেহেতু শিক্ষণ একটি চলমান প্রক্রিয়া ফলে একে গতিশীল করতে হলে কিছু কৌশল অবলম্বন করা যেতে পারে। দীর্ঘ সময় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকার কারণে শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি হয়েছে। তা থেকে উত্তরণের জন্য প্রত্যেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কাউনসেলিং ইউনিট গঠন করতে হবে। পাশাপাশি প্রত্যেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত বিনোদনের ব্যবস্থা করতে হবে। গবেষণায় দেখা গেছে, অনলাইন ক্লাস ও সংসদ টেলিভিশনের শিক্ষণ প্রক্রিয়া ততোটা কার্যকর হয়নি। এর কারণ হিসেবে উঠে এসেছে প্রযুক্তিগত অবকাঠামোর অভাব, অপ্রতুল প্রশিক্ষণ এবং অরিয়েন্টেশন, তথ্যপ্রাপ্তির অভাব, ভাষাগত সমস্যা, একমুখী যোগাযোগ সহ বিবিধ কারণ। ফলে আগামির দিনগুলোয় এই ধরণের পরিস্থিতি সামাল দেয়ার জন্য শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রস্তুত হতে হবে। আলাদা বাজেট বরাদ্দের মাধ্যমে অবকাঠামোগত উন্নয়নের পাশপাশি শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। যা তাদের ভবিষ্যতে এই ধরণের শিক্ষাদান ও গ্রহণে অভ্যস্ত করে তুলবে। পাশপাশি ‘টেকনো-বৈষম্য’ দূর করে পিছিয়ে রাখা জনগোষ্ঠীকে প্রযুক্তিগত সেবার আওতায় আনতে হবে। অনলাইন ও সংসদ টেলিভিশনের ক্লাসগুলোকে আরও বোধগম্য ও মজার করে তুলতে হবে। অন্যদিকে, যেহেতু করোনা দীর্ঘস্থায়ী রূপ নিয়েছে এবং ভবিষ্যতে যেকোন সময় এর প্রকোপ বাড়তে পারে ফলে পাঠ্যপুস্তকের কারিকুলামে করোনা সচেতনতা মূলক লেখাও সিলেবাসে অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি। অনেক শিক্ষার্থীই দীর্ঘ সময় প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনা ও পরীক্ষার বাইরে ছিল এবং অনেকেরই পাঠ্যপুস্তকের সঙ্গে কোনো সংযোগ ছিল না। তাই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলার পরপরই তাদের পরীক্ষা কিংবা পড়াশোনার চাপ থেকে মুক্তি দিতে হবে। আবার, যেহেতু অটোপাসের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের এক ক্লাস উত্তীর্ণ করে দেয়া হয়েছে ফলে অপেক্ষাকৃত দুর্বল শিক্ষার্থীদের আলাদা যত্ন নেয়ার মাধ্যমে বিগত শ্রেণির গুরুত্বপুর্ণ বিষয়গুলো সম্পর্কে ক্লাস নিতে হবে।

করোনা পরবর্তী শিক্ষাদান কঠিন এক চ্যালেঞ্জ। কিন্তু সরকার, এনজিও, শিক্ষক, অভিভাবক, জনপ্রতিনিধি, ম্যানেজিং কমিটির সদস্য, মিডিয়াসহ সবার সমন্বিত উদ্যোগ ও যথাযথ কৌশল অবলম্বনের মাধ্যমে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করা সম্ভব।

(দৈনিক বণিক বার্তার সম্পাদকীয়তে বিগত ১৮ নভেম্বর, ২০২০ প্রকাশিত এই লেখাটা রইলো সিসিবির পাঠকদের জন্য।)

১,৫৬৫ বার দেখা হয়েছে

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।