অ্যানাপোলিসের ডায়েরী : ২

২৪ শে আগস্ট , ২০১৩:  সার্ভারে কাজ চলছে দেখে রুমের ইন্টারনেট বেশ কয়েকদিন ধরেই ডাউন। ইন্টারনেট বলতে ক্লাসরুমের ওয়াই-ফাই ই এখন ভরসা। যে আমি ৪/৫ দিন আগেও ক্লাসরুম থেকে বের হওয়ার জন্য সবসময় হাসফাস করতাম, সেই আমি ই এখন ক্লাসরুমে পারলে কাথা বালিশ নিয়ে আস্তানা গেড়ে ফেলেছি।ক্লাস শেষ হয়ে যায়, আমি ডেস্ক থেকে নড়িনা। আমার প্রফেসরের এর ধারণা বিদ্যার্জনের প্রতি আমার আগ্রহ রাতারাতি বেড়ে গেছে।শিক্ষক মহোদয় ব্যাপক আনন্দিত।মানুষ জন আনন্দ পেলে ভালোই লাগে। তাই,আপাতত উনার ভুল ভাঙ্গানোর কোন কারন দেখছিনা !আর নরমালি ,লাঞ্চ/ ডিনারে যাওয়ার আগে সবসময় ই অনলাইনে ডাইনিং এর মেন্যু টা চেক করে দেখি। আজ লাঞ্চের মেন্যুতে ভাতের নাম দেখতে পেলাম। প্রায় ২ সপ্তাহ পর মনে হয় ! দিনখানা আজকে ভালোই যাবে দেখা যায় !

অন এ ডিফারেন্ট নোট, সবসময় পাশের ডেস্কে বসা স্বর্ণকেশী মেয়েটা যে এক্সট্রিম লেভেলের সুন্দরী , এটা বুঝতে আমার পুরো একটা সেমিস্টার লাগলো। 
যাই হোক, এটলিস্ট বুঝতে তো পারলাম। বেটার লেট দ্যান নেভার !
বটমলাইন : ইউনিফর্ম জিনিসটা মেয়েদের সৌন্দর্য খুব সুন্দর ভাবে ঢেকে রাখে।

৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৩:  ক্যাডেট কলেজে যখন ছিলাম , তখন রাতের বেলা দূরের ঢাকা টাঙ্গাইল মহাসড়কের বাসের আওয়াজ শুনতে পেতাম। ইচ্ছে করতো বাসগুলোয় চড়ে বাসায় চলে যাই। এরপর বিএমএ তে যখন ছিলাম তখন প্রতিনিয়ত শুনতাম পাশের লাইন দিয়ে চলা ট্রেনের সাইরেন ও ঝিকঝিক শব্দ। পাঙ্গা খেতাম  আর মনে মনে স্বপ্ন দেখতাম ট্রেনে চেপে বাসায় চলে যাচ্ছি। বিএনএ তে রুমের জানালা দিয়েই দেখতে পেতাম কর্ণফুলী নদীর বুক চিরে চলা অগুণতি জাহাজের কোনটা দেশে ঢুকছে , আবার কোনটা অজানার উদ্দেশ্যে চলে যাচ্ছে। অবশ্য সেই জাহাজে চড়ে কোথাও যেতে কখনো ইচ্ছে হয়নি।আর  এই একাডেমিতে আমার এখন  সত্যিকার ভাবেই চির উন্নত মম শির হয়ে গেছে। আকাশের মেঘ ঘেষে চলা উড়োজাহাজ দেখি। লম্বা সময় ধরে তাকিয়ে থাকি। আর কিছু দেখে লাভ নেই যে.. দেশে ফিরার কোনো সুন্দর স্বপ্ন দেখতে চাইলে সেখানে প্লেন ছাড়া আর কোনো যানবাহনের ফ্যান্টাসি করে তো লাভ নেই.. যতক্ষণ দৃষ্টিসীমায় থাকে , ততক্ষণ প্লেন গুলোর দিকে তাকিয়ে থাকি। আর ভাবি , এইতো আর কয়েকটা দিন ! এরপর আমিও ওরকম একটা মহাপতঙ্গে চড়ে ঘরে ফিরে যাবো।

১৩ ই সেপ্টেম্বর , ২০১৩:  ঘটনা ১ : আজ বিকালে প্যারেডে চিফ গেস্ট ছিলেন জন হান্টসম্যান। উতাহ স্টেটের প্রাক্তন গভর্নর। তার সময় উতাহ স্টেট বেস্ট গভর্ণড স্টেট হিসেবে অ্যাওয়ার্ড পেয়েছিল !ইন্দোনেশিয়া, চীন ও সিঙ্গাপুরের প্রাক্তন মার্কিন রাষ্ট্রদূত। লাস্ট প্রেসিডেন্ট ইলেকশনে রিপাবলিকান নমিনেশন দৌড়ে মিট রমনির প্রধাণ প্রতিদ্বন্দী। জন কেরির পর সেক্রেটারি অফ স্টেট এর ও অপশন হিসেবে ছিলেন উনি..এছাড়া উনি ফোর্ড মোটর কোম্পানিরও ডিরেক্টর।
ঘটনা ২ : ছেলেটার নাম উইলিয়াম হান্টসম্যান। লিডারশিপ ক্লাসে প্রথম পরিচয়। বেশ ফুর্তিবাজ ও মিশুক। কোনো প্যাচ ঘোচ নেই ভেতরে।কয়েকদিনের মাঝেই খুব ভালো ফ্রেন্ডশিপ হয়ে যায়.. ১ বছর ধরে জানাশোনা এই ছেলেটার সাথে। এখন আজ বিকালে প্যারেডে যখন চিফ গেস্টের জীবনী পড়া হচ্ছিল, তখন শেষের দিকে বলা হলো তার ছেলে নেভাল একাডেমি তে আমাদের ক্লাসের স্টুডেন্ট। থার্ড কোম্পানির উইলিয়াম হান্টসম্যান।খাটি ব্যাক্কল হয়ে গেলাম। আরে এতো দেখি উইল এর বাপ ! ওর কথা বার্তা ,আচার আচরণ দেখে আমি ভাবছিলাম ও মনে হয় উতাহ র সাধারণ কোনো পরিবারের ছেলে।১ টা বছর ধরে পরিচয়, অথচ ছেলেটা ভুলেও একবারের জন্য ও বলেনি যে তার বাপ এই লোক.. এমনকি ছিটেফোটা কোনো হিন্টস ও দেয় নাই.. ঘটনাটা আমাকে বেশ নাড়া দিয়ে গেছে।একটা লাইফ লেসন পেয়েছি। অনেকের কাছে হিউমিলিটি বিষয়ক অনেক উপদেশ শুনেছি। চোখের সামনে এরকম দৃষ্টান্ত দেখলে মনের চোখ সত্যিকার ভাবেই খুলে যায়..

১৫ ই নভেম্বর , ২০১৩ : টেড ম্যাকলালাহান। আমার এই সেমিস্টারের ফিজিক্স টিচার। আমরা মাঝে মাঝে “দুষ্টুমি” করে আড়ালে উনাকে “গ্র্যান্ড পা টেড” বলে ডাকি .. ফর্মার নেভাল এভিয়েটর। ক্লাস অফ ১৯৬০ এর গ্র্যাজুয়েট.. বেশ মজার মানুষ!
আজ সকালে জিমে গিয়ে গ্র্যান্ড পা টেড এর সাথে দেখা হয়ে গেল.. কানে ইয়ারফোন লাগিয়ে রানিং মেশিনে ননস্টপ দৌড়াচ্ছেন। আমাকে দেখে ,”হোয়াটস আপ, মিস্টার উজরাত” বলে হাত নাড়ালেন। এরপর আবার দৌড়ানো তে মনোযোগ দিলেন। পুরাই মাননীয় স্পীকার হয়ে গেলাম। ৮০ বছরের একজন মানুষ সকাল ৬ টায় জিমে এসে প্রবল উদ্যমে এভাবে ব্যায়াম করার জোশ কোথায় পান আল্লাহ ই জানেন! কত বিষয় নিয়ে সারাদিন আমরা কত অভিযোগই না করি কিছুটা লজ্জা লাগলো এসব ভেবে। খুব ভালো করে বুঝতে পারলাম যে সত্যিকারের তারুণ্যের সাথে বয়সের কোন সম্পর্ক নেই.. মানসিক দৈন্যতা কাটিয়ে উঠাটা মনে হয় আমাদের প্রজন্মের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
থ্যাঙ্ক ইউ গ্র্যান্ড পা টেড ফর গিভিং মি দা লেসন অফ দা ডে !

১৬ ই নভেম্বর , ২০১৩  : আজব এক রুমের বাসিন্দা আমি.. রুম নাম্বার ৫৩২০, রুমের নাম,”ডেঞ্জার জোন” হ্যা! টপ গান মুভির ডেঞ্জার জোন গান থেকে ইন্সপায়ারড হয়ে আমরা রুমের নাম দিয়েছি। বাসিন্দা ৩ জন.. একজন মুসলিম, একজন ক্রিশ্চিয়ান , একজন জিউয়িস। রুম মেট দুজনের একজন জর্জিয়ার আরেকজন লং আইল্যানড এর.. একজন পড়ালেখা শেষ করে কানে ইয়ার মাফ লাগিয়ে ১১ টার মাঝে কম্বল মুড়ি দিয়ে ঘুম দেয়, আরেকজন ১১ টার পর ধীরে সুস্থে পড়ালেখা শুরু করে.. বন-জঙ্গল, বৃষ্টি, জোত্স্না তে তার প্রবল আগ্রহ। এমাজনে অর্ডার দিয়ে পরশু সে একটা হ্যামক কিনেছে। নিজের বেড বাদ দিয়ে সে এখন ঝুলন্ত হ্যামকে ঘুমানো শুরু করেছে।  একজন শীতের ভয়ে গরম পানিতে শাওয়ার নিতেও ভয় পায়, আরেকজন ঠান্ডা পানির নিচে ঘড়ি ধরে পাক্কা আধাঘন্টা দাড়িয়ে থাকে। দুজনই প্রবল ভাবে এলকোহলিক। কিন্তু বেচারারা কেউ ২১ বছর পুরো না করায় লিগালি কিছু কিনতে পারেনা। তাই উইকেন্ডের সময় আমার কাছে এসে প্রায় জিনিস পত্র কিনে দেওয়ার জন্য ধর্না দেয়.. এদের সাথে কাটানো প্রত্যেকটা দিনই অদ্ভুত রকমের ইন্টারেস্টিং ! আজ বছরের শেষ হোম ফুটবল গেমের জন্য রুম এর পক্ষ থেকে একটা ব্যানার বানিয়ে নিয়ে গেলাম। আইজ গলা ফাটাইয়া চিয়ার আপ করবো তিন জন মিলে !  

বি.দ্র : বিচ্ছিন্ন ভাবে দিনলিপি গুলো আমার যেমন ইচ্ছে লেখা কবিতার খাতা তথা ফেসবুকে লিখেছিলাম। এখন কেন জানি  একত্র করে একসাথে দিয়ে দিতে ইচ্ছে হলো..

১,৪০৪ বার দেখা হয়েছে

১৮ টি মন্তব্য : “অ্যানাপোলিসের ডায়েরী : ২”

  1. মাহমুদ (১৯৯০-৯৬)

    ফাঁকিবাজী বলো আর যা'ই বলো, লেখাটা খুব ভালো লেগেছে। সাধারণ ঘটনার স্মৃতিচারণের ফাঁকে ম্যোরাল গুলোর উপস্থাপণাও চমৎকার!

    এখন থেকে ফেসবুকের পাশাপাশি সিসিবিতেও 'যেমন খুশি তেমন' লেখা চাই। 🙂


    There is no royal road to science, and only those who do not dread the fatiguing climb of its steep paths have a chance of gaining its luminous summits.- Karl Marx

    জবাব দিন
  2. জিহাদ (৯৯-০৫)

    আমার তো ধারণা ইউনিফর্মে কিছু কিছু মেয়েকে সাধারণের চেয়ে বেশি সুন্দর লাগে।

    আর তোমাদের মেনুতে ভাতের সাথে কী থাকে?

    তোমার এই সিরিজ আমি অত্যন্ত আগ্রহ নিয়ে পড়ি। আরো নিয়মিত লিখো।


    সাতেও নাই, পাঁচেও নাই

    জবাব দিন
    • নাফিস (২০০৪-১০)

      মেন্যু তে ভাত ই থাকেনা ভাই ! এ নিয়ে অনেক মনোকষ্ট 🙁 আর কালে ভদ্রে থাকলেও সাথে স্টেক অথবা চিলি কন কেম নামক এক জাতীয় অখাদ্য খাবার। সবাই স্টেক নিয়ে নিলে আমি স্টেকের তলায় জমা পরা ঝোল জাতীয় এক তরল পদার্থ নিয়ে ভাতের সাথে মাখিয়ে ফেলি চুপি চুপি 😀
      আর ইউনিফর্ম এর ব্যাপারটা হয়তো রিলেটিভ। আমার কাছে মনে হয় চুল খোলা রাখা আর বেধে রাখাটাই মেইন জিনিস 😛 ইউনিফর্মে থাকলে আবার চুল লুকিয়ে রাখতে হয় এখানে। তাই মনে হয় 🙂

      জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।