খেজুরে আলাপ – ১

বৃষ্টির রিমঝিম শব্দে সকালে ঘুম ভাঙলো। বেশ হিমহিম রোমান্টিক আবহাওয়া। ব্যাচেলর মানুষ, বিছানায় একাই ঘুমাই। কাঁথাটাকে আরেকটু জোরে আঁকড়ে ধরে পাশ ফিরলাম। মাথার মধ্যে জসীমউদ্দীনের কবিতা উঁকি দিয়ে গেল:
“আজিকে বাহিরে শুধু কলকল ঝরঝর চারিধারে
বেণুবনে বায়ু নাড়ে এলোকেশ, মন যেন চায় কারে।“

এই আবহাওয়ায় অফিসে যাওয়ার মোটেই ইচ্ছা জাগে না। যাব কি যাব না করতে করতে না যাওয়ার সিদ্ধান্তটা চূড়ান্ত করে ফেল্লাম। অফিসে একটা ফোন করে দিয়ে নিশ্চিন্ত মনে আবার চোখ বুজলাম। ঘুম হবে না, শুধু বৃষ্টির শব্দ উপভোগ করা।

বিছানা ছাড়ার পর টের পেলাম বাসার কেউ-ই আজ অফিসে যায়নি। না আপু, না দুলাভাই। আপুকে দেখলাম দুপুরের জন্য খিচুড়ি আর গরুর মাংস রাঁধার তোড়জোর করছে। দিনটা আজ ভালোই যাবে মনে হচ্ছে। আজ অফিস ফাঁকি মারাটা পুরাই সার্থক!

নাস্তা করে গরম চায়ে আয়েশ করে চুমুক দিতে দিতে রবিনের মেসেজ পেলাম। আজ তানভীরের জন্মদিন। মেসেজ করে উইশ জানিয়ে ট্রিট কখন দিবে জানতে চাইলাম। উত্তর এলো : “বয়স পঁচিশ বছর পার হলে ট্রিট দিতে হয় না।“ কোনোভাবেই ব্যাটাকে ভজাতে না পেরে একটা “মেসেজকাব্য‌” (যেটার কথা রবিন এর আগে বলেছে) কয়েকজনকে পাঠালাম। সেটা হচ্ছে এমন:

“বয়স হলো পঁচিশ প্লাস,
ট্রিট যখন চাইতে গেলাম
তানভীর হলো হতাশ।
মানি না মানবো না
তানভীর কে ছাড়বো না
বয়স যত বেশি হবে
ট্রিট তত বড় হবে।
আওয়াজ তারচেয়ে বড় করে
চলো সবাই বলি তারে-
‘হ্যাপী বার্থডে এ এ এ’।”

ওর একটা ইচ্ছা ছিলো, তার জন্মদিনে যেন একটা পোস্ট দেয়া হয়। রবিন সেই কাজটা যথাযথভাবে পালন করায় ট্রিট দেয়াটা এখন তানভীরের একটা নৈতিক দায়িত্বের মধ্যে পড়ে বলেই আমার মনে হয়। আপনারা কি বলেন?

বৃষ্টির একটা আশ্চর্য প্রভাব আছে আমাদের স্মৃতির উপর। কিছু কিছু টুকরো স্মৃতি হুট করে মাথায় এসেই আবার মিলিয়ে যায়। আমার মনে নাড়া দিয়ে গেল এস এস সি-র পরের ছুটির কিছু স্মৃতি। বৃষ্টি এলেই বল নিয়ে চলে যেতাম সার্কিট হাউস বা ঈদগাহ মাঠে। মাঠের পাশেই বড় পুকুর। বৃষ্টিভেজা মাঠে খেলা শেষে বৃষ্টির মাঝেই পুকুরে ঝাঁপাঝাঁপি। আহা, কি মজা!

আমার কাছে পুকুরে বৃষ্টি পড়ার চেয়ে পিচঢালা চওড়া রাস্তায় বৃষ্টি পড়া দেখতে বেশি ভালো লাগে। ফোঁটাগুলো রাস্তায় পড়ে চারধারে ছিটকে যায়। লাখ লাখ বৃষ্টির ফোঁটা যখন এভাবে পড়তে থাকে তখন একটা অন্যরকম সৌন্দর্যের সৃষ্টি হয়। মাঝে মাঝে রিকশা বা গাড়ির চাকা ওগুলোকে পিষ্ট করে সামনে এগিয়ে যায়, কিন্তু বৃষ্টির অবিশ্রান্ত ফোঁটাগুলো অবিরত নেমে আসতে থাকে পৃথিবীর বুকে।

বৃষ্টি নামলে আরও মনে পড়ে যায় আমার প্রথম প্রেমের কথা। বৃষ্টি নামলেই দুজনে বেরিয়ে পড়তাম রিকশা নিয়ে। ভার্সিটির একটু সামনেই একটা পাকা রাস্তা চলে গেছে গ্রামের ভিতর দিয়ে। রিকশায় পাশাপাশি দুজন বসলেই একটা ওম চলে আসে। হিমহিম ভাবের মাঝে এই আমেজটুকু একেবারেই আলাদা।

রিকশায় যেতে যেতে রাস্তায় বৃষ্টির ফোঁটা পড়তে দেখা, সেই আশ্চর্য ওম উপভোগ করা আর…….

থাক। এক্ষেত্রে না হয় একটু স্বার্থপরই হলাম। আনন্দ বা বেদনা, যা-ই হোক না কেন, সেটুকু থাকুক না হয় আমার মাঝেই।

৯৬০ বার দেখা হয়েছে

১১ টি মন্তব্য : “খেজুরে আলাপ – ১”

  1. আহমদ (৮৮-৯৪)
    বৃষ্টি নামলে আরও মনে পড়ে যায় আমার প্রথম প্রেমের কথা। বৃষ্টি নামলেই দুজনে বেরিয়ে পড়তাম রিকশা নিয়ে। ভার্সিটির একটু সামনেই একটা পাকা রাস্তা চলে গেছে গ্রামের ভিতর দিয়ে। রিকশায় পাশাপাশি দুজন বসলেই একটা ওম চলে আসে। হিমহিম ভাবের মাঝে এই আমেজটুকু একেবারেই আলাদা।

    ;;) ;)) :dreamy:

    লেখা ভাল ছিল মুস্তাকিম। ৫ তারা।


    চ্যারিটি বিগিনস এট হোম

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।