একটি তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন

বি.দ্র. এই পোস্টের লেখক “সত্য কোন দিন চাপা থাকে না” টাইপের ফালতু তত্ত্বে বিশ্বাসী। অতএব কাহিনীটি একটি সত্য ঘটনা থেকে প্রণোদিত। যতটুকু প্রকাশ করলে শুধু স্যারদের উপর দোষ চাপানো যায় ততটুকুই দেয়া হল। নামগুলো কাল্পনিক। কারোর সাথে মিলে গেলে লেখক দায়ী নয়।

সন্ধ্যা ৭টা। ইভনিং প্রেপ চলছে। এখন আবার থার্ড টার্মের টার্ম-এন্ড পরীক্ষা। আমি পড়ি ক্লাস এইটে। আগের দুই টার্মে মাশাল্লাহ(!) রেজাল্ট করায় সায়েন্স পাওয়ার জন্য একটু সিরিয়াসলি পড়ছিলাম। হঠাৎ জাকির ভাই এসে বললেন, “মুয়াজ ভাইকে হারুন স্যার ডাকতেছে”। দুরুদুরু বুকে হাজির হলাম বাংলা ডিপার্টমেন্টে। সেখানে দেখি, ডিপার্টমেন্টাল হেড হারুন স্যার বসে আছেন চার-পাঁচজন শিক্ষক পরিবেষ্টিত হয়ে। স্যার বললেন, “ভেতরে এস। (ভেতরে যাওয়ার পর) শুনলাম তুমি নাকি পরীক্ষার প্রশ্ন আগেই পেয়ে গেছ।” বলে কি, প্রশ্ন কি গাছে ধরে নাকি? তারপরও ‘বুঝি নাই’ এমন একটা ভাব নিয়ে বললাম, “জ্বি স্যার?”। “কি, বুঝ নাই? যখন ঘাড় ধরে কলেজ থেকে বের করে দেব তখন বুঝবে”। সিনিয়র হলে অন্য ব্যাপার। কিন্ত ক্লাস এইটের একটা ছেলের কাছে এই হুমকি অনেক কিছু। তখন আমার মাথায় কলেজ আউট পরবর্তী ঘটনাগুলো মাথায় আসতে লাগলো। কল্পনা করলাম, ব্যাগ এন্ড ব্যাগেজ নিয়ে বাসায় ফেরত যাচ্ছি। হাই স্যারের ডাকে আবার বাস্তবে ফিরে এলাম। “বল কয়টা পরীক্ষার প্রশ্ন পেয়েছ”। “স্যার কোন প্রশ্ন পাই নাই”। তারপর, কিচ্ছু হবেনা-কাউকে বলব না-অথরিটিকে জানাব না এই রকম হাজারো বুঝ দেয়ার কথা চলতে থাকল। নিজে করলে স্বীকার করতাম। কিন্ত এইটা তো পুরাই সায়েন্স ফিকশন। ডিনারের ঘন্টা পড়ায় তখনকার মত বাঁচলাম। ডিনারের সময় জানলাম, আমার এক দোস্ত (আরেক হাউসের) নাকি পিওন আলমগীর ভাইকে কোন এক ভাবে প্যাঁচে ফেলে তার কাছ থেকে প্রশ্ন আদায় করে ধরা পরেছে। আমাকে জেরা করার কারণ, আমি হয়ত কোন তথ্য জানতে পারি। আমার ঘাড়ে দোষটা চাপালে হয়ত আমি সব বলেও দিতে পারি।নাইট প্রেপের পর আবার হাউস মাস্টার অফিসে ডাক পরল। এবার আমি একা না, পুরো ক্লাস (শুধু আমাদের হাউসের)। অফিসে ঢুকে যা দেখলাম,  তাতে আর আকাশ থেকে পরলাম না, একেবারে মাথায় হাত দিয়ে বসে পরলাম। স্টোর রুম থেকে আমার ব্যাগ এনে রাখা হয়েছে। অর্থাৎ, আমাকে এখনই কলেজ থেকে বের করে দেয়া হবে।  হায়, এই ছিল কপালে! পরের দোষে শিরশ্ছেদ! সৃষ্টিকর্তাকে ধিক্কার দিতে দিতে ভেতরে ঢুকলাম। এইবার হাই স্যার একটু সোজাসাপ্টাই বললেন কি হয়েছে সব বলতে, না হলে এই মুহূর্তেই আমাকে বহিষ্কার করা হবে। আমি পরলাম দোটানায়, বন্ধুকে বাঁচাতে গিয়ে কলেজ আউট হয়ে ইতিহাসের পাতায় স্মরণীয় হয়ে থাকব, নাকি নিজের চামড়া বাঁচাতে সব বলে দেব। কিন্ত শরীরে যে বইছে ক্যাডেট কলেজের রক্ত। তাই সিদ্ধান্ত নিলাম জাবতাক হ্যা জান কিছুই বলব না। ফলশ্রুতিতে তেমন কিছু না হলেও দেড় ঘণ্টা গ্যাজ খেলাম এবং আমি আর আরেফিন দু’টো করে বেতের বাড়ি খেলাম। কোন মিমাংসা ছাড়াই সে দিনের অধিবেশন মুলতবি হল।

এভাবে আরো এক সপ্তাহ স্যাররা নানা পদ্ধতি প্রয়োগ করেও কোন সিদ্ধান্তে পৌছতে পারলেন না। এদিকে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেবার সময় ঘনিয়ে আসছে। তখন হাই স্যার এলেন ত্রাণকর্তা হয়ে। স্যার একটি সুন্দর গল্প তৈরি করলেন। আমার কাজ হল প্রধান সাক্ষী হিসেবে শুধু স্বাক্ষর করা। একমাস পর প্রায় ৪০ পৃষ্ঠার একটি তদন্ত রিপোর্টে আমার স্বাক্ষর নেয়া হল। আমিও স্বাক্ষর করে হাঁপ ছেড়ে বাঁচলাম।

(এর কিছুদিন পরেই আমার সেই বন্ধুটিকে কলেজ ছাড়তে হল। তাকে বাঁচানোর জন্য অবশ্য সবাই কম বেশী চেষ্টা করেছিল। কিন্ত অপরাধটা আবার গুরুতর কিনা! তাই কোন কাজ হয় নি।)

৮৮৬ বার দেখা হয়েছে

৫ টি মন্তব্য : “একটি তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন”

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।