মায়ের সাথে ঈদ শেষে বিষণ্ণ মনে ঘরে ফেরার কড়চা… (১)


বিষণ্ণ পথ, বিষণ্ণ পথিক…. (আলস্যভরে আসন থেকে না উঠে পথের ছবি তুলতে গিয়ে এদের মাথাগুলো এড়ানো গেল না!)

এবারের ঈদুল আযহা কাটালাম ছোটভাই উৎপলের বাসায়, রংপুরে। আমাকে কাছে পেয়ে ওরা সবাই উৎফুল্ল ছিল, আমিও ছিলাম। গিয়েছিলাম মূলতঃ অসুস্থ মা’কে কয়েকদিনের জন্য দেখে আসতে, ঈদুল আযহা’র পাঁচ সপ্তাহ আগে, স্ত্রী-পুত্রকে ঢাকায় রেখে। কিন্তু সেখানে যাওয়ার পর আম্মার সাথে থেকে যেতে ইচ্ছে হচ্ছিল, ফেরার দিনক্ষণ ঠিক করতে মন সায় দিচ্ছিল না। এর মধ্যে দ্রুত কিছু ঘটনা ঘটে যাচ্ছিল। করোনার মারণ ছোবল মারাত্মক আকার ধারণ করছিল বিধায় সরকারও ‘কঠোর লকডাউন’, ‘শাটডাউন’ ইত্যাদি রক্ষণাত্মক অস্ত্র প্রয়োগের সিদ্ধান্ত নেয়। এ সবের মধ্যে ঘরে ফেরার ফিরতি ভ্রমণের আয়োজন করতে মন মোটেই সায় দিচ্ছিল না। উৎপলও খুব জোর করে বলছিল, “এবারের ঈদটা আমাদের সাথেই করে যান”। আমার পরিবারের সবাই তাতে সমর্থনও দিল। আমিও খুশি হয়ে রংপুরে ঈদ করার সিদ্ধান্ত নিলাম, যদিও জানি আমার ঘরে ফেরাটা এখন নেহায়েৎ প্রয়োজন, কারণ এই এক মাসে নানা টুকটাক কাজ জমে গেছে, যা সামলানো জরুরি।

রংপুরে এবারে মোট এক মাস এক সপ্তাহ ছিলাম। যেদিন ঢাকা থেকে রংপুরে যাচ্ছিলাম, সেদিন বগুড়ার মাঝিরা সেবানিবাস অতিক্রম করার সময় হালিমা-শফিকের কথা মনে পড়ে যাচ্ছিল। ওরা দু’জন ছিল আমাদের সংসার শুরু করার পর প্রথম গৃহকর্মী বা ‘ডমেস্টিক এইড’। ১৯৮৭ সালে আমি প্রবাসে যাবার আগে ওদের বিয়ে দিয়ে গিয়েছিলাম এবং শফিকের জন্য ঢাকায় একটি ছোটখাট চাকুরির ব্যবস্থা করে গিয়েছিলাম। সেই থেকে ওরা বেশ সুখেই তাদের ঘর-সংসার করে যাচ্ছিল বলে আমি প্রবাসে বসে খবর পাচ্ছিলাম। ওদের এই ছোট সংসারের ছোট ছোট সুখের কথা জেনে আমি প্রসন্ন বোধ করতাম। দেশে ফিরে আসার পর শফিক আমাকে অনুরোধ করেছিল তাকে ঢাকা থেকে বগুড়া বা রংপুরে যেন বদলি’র ব্যবস্থা করি। তখন রংপুরে কোন ভ্যাকান্সি ছিল না, তবে বগুড়ায় বদলির অনুরোধটি রক্ষা করতে আমাকে মোটেই বেগ পেতে হয়নি। কারণ, সবাই চায় প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে ঢাকায় বদলি হতে, আর সে চাচ্ছিল ঢাকা ছেড়ে বগুড়ায় বদলি হতে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বলার পর খুব দ্রুতই শফিকের বগুড়ায় বদলি’র আদেশ আসে। সেই তখন থেকেই ওরা ওদের যাবতীয় সঞ্চয় সংগ্রহ করে এবং বাকিটা শফিক অফিসের জিপি ফান্ড থেকে ঋণ গ্রহণ করে বগুড়ায় একটা তিন কক্ষের ‘মাটির বাড়ি’ ক্রয় করে সেখানেই থিতু হয়।

বছর দশেক আগে একবার সপরিবারে সড়কপথে রংপুরে গিয়েছিলাম। রংপুর থেকে ফেরার পথে সেদিনও ওদের কথা মনে পড়ে যাওয়াতে বগুড়ার কাছাকাছি এসে ওদেরকে ফোন দিয়েছিলাম। আমাদের অবস্থানের কথা জানতে পেরে শফিক কথা না বাড়িয়ে একটা ল্যান্ডমার্কের কথা উল্লেখ করে বলেছিল, ‘স্যার আপনি ঐ জায়গায় এসে একটু থামবেন, আমি রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকবো শুধু আপনাদেরকে একটু দেখার জন্য’। তাই হলো, শফিকের সাথে দেখা হলো, কিন্তু ও ছাড়ার পাত্র নয়। বললো, ‘স্যার, শুধু দশ মিনিটের জন্য একটু আমাদের বাসায় চলেন, আমাদের নতুন বাড়িটা একটু দেখে যান’। তখন প্রায় দুপুর হয়ে গিয়েছিল বিধায় আমরা একটু ইতস্ততঃ করছিলাম। কিন্তু ও যখন বললো, ‘স্যার আপনারা যদি এখান থেকে আমাদের বাড়ি না গিয়ে ঢাকা ফিরে যান, তাহলে হালিমা কিন্তু অনেক কান্নাকাটি করবে’। ওর এ কথাটা শুনে আর না করতে পারলাম না। ওদের গৃহে প্রবেশ করতেই হালিমা সালাম করে আমার স্ত্রীকে জড়িয়ে ধরে কান্না শুরু করে দিল। আমি বুঝলাম, সে কান্নাটা ছিল আনন্দের কান্না, আমাদেরকে পেয়ে ও ভীষণ উচ্ছ্বসিত ও আনন্দিত হয়েছিল, আমরাও ওকে এবং ওর সুখের সংসার দেখে খুবই সন্তুষ্ট হয়েছিলাম। আমরা যদি না আসতাম, তাহলেও শফিকের কথা অনুযায়ী হালিমা হয়তো সত্য সত্যই কাঁদতো, কিন্তু সে কান্নাটি হতো বেদনার, আর এ কান্নাটি আনন্দের। যাহোক, দশ মিনিট গড়িয়ে ঘন্টা পার হলো, তবুও ওরা ছাড়তে চাইছিল না। আসার সময় হালিমা তড়িঘড়ি করে একটা ব্যাগ ভরে তার গাছের কাঁচা ও পাকা মিলিয়ে বেশ কিছু পেঁপে, পেয়ারা, লেবু ইত্যাদি শফিকের হাতে দিয়ে বললো গাড়ীতে তুলে দিতে। ঢাকায় ফিরে পরদিন ওর পাকা পেঁপে একটা খেয়ে দেখলাম খুবই মিষ্টি স্বাদ। এমন চমৎকার পাকা পেঁপের স্বাদ আমি ঢাকায় কেনা পেঁপেতে কখনো পাইনি।

এবারে রংপুরে পৌঁছানোর পর আমি ওদের কুশল জানতে চেয়ে শফিককে ফোন করি। ফোনটা হালিমা ধরেছিল এবং আমি রংপুরে এসেছি শুনে সে আবার আব্দার করে বসলো ফেরার পথে যেন একবার ওদেরকে দেখে যাই। একে একে আমাদের পরিবারের সবার নাম ধরে ধরে কুশল জিজ্ঞাসা করে নিয়ে সে পুনরায় তার আব্দারের পুনরাবৃত্তি করলো। অনেক বলেও আমাকে রাজী করাতে না পেরে সে পরদিন আবার শফিককে দিয়ে ফোন করিয়েছিল। এর পর ওরা আরও কয়েকদিন ফোন করে আন্মার কুশল জিজ্ঞাসা করেছিলো। শফিক একজন অত্যন্ত সাদাসিধে (আমরা হেয় করে যাকে ‘হাবাগোবা’ বলি) মানুষ। আমলে ও আচরণে সে একজন পুরোদস্তুর ধার্মিক মানুষ। তার নিরঙ্কুশ সততাকে আমি শ্রদ্ধা করি। একদিন কথা শেষ করে আমি ওকে আমার এবং আমার পরিবারের জন্য দোয়া করতে বলি। আমার কথা শুনে সে বললো, ‘স্যার, আপনার জন্যে, আম্মার (আমার স্ত্রীর) জন্যে এবং ভাইয়াদের জন্য আমি সবসময় প্রতি নামাজান্তে দোয়া করি’। তার পরের কথাটা আমার মনে গাঁথা রয়ে গেছে, কারণ, তখন ঘূর্ণাক্ষরে বুঝতে না পারলেও, শেষ পর্যন্ত সে কথাটাই হয়েছিল আমাকে বলা ওর শেষ কথা। সে বলেছিল, “স্যার, আপনি আমার জন্য যা করেছেন, তার ঋণ কি কখনো শোধ করা সম্ভব”?

এর পরে কয়েকদিন ওরা নিশ্চুপ ছিল। আমিও অসুস্থ আম্মাকে নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম বলে ওদের নীরবতাকে লক্ষ্য করিনি। হঠাৎ একদিন রাত সাড়ে এগারটায় শফিকের ফোন থেকে রিং আসায় আমি অবাক হই এবং মনে কু-ডাক শুনতে পাই। শফিকের মেয়ে কান্নাজড়িত কন্ঠে জানালো, ‘বাবার খুব কাশি হচ্ছে, প্রচন্ড শ্বাসকষ্টের জন্য হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিলাম। ওরা বাবাকে আইসিইউ তে নিয়ে গেছে, আমাদেরকে দেখতে দেয় নাই’। আইসিইউ তে শফিক তিনটে দিনও পার করতে পারেনি। করোনার ছোবলে তিন দিন পুরো হবার কয়েক ঘন্টা আগেই সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে পরলোকের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছিল। শফিকের এক ছেলে, এক মেয়ে- উভয়কে বিয়ে দিয়েছে এবং উভয়ের ঘরে একটি করে শিশু সন্তান রয়েছে। ওরা যখন ঢাকায় ছিল, ছেলেটিকে আমি ব্যক্তিগতভাবে কোচিং করে মোটামুটি একটা ভাল স্কুলে ভর্তি করে দিয়েছিলাম। সে ছেলেটি আজ বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একজন গর্বিত সৈনিক। লকডাউনের মাঝে চরম বিড়ম্বনা ও প্রতিকূলতা কাটিয়ে সে কোনমতে শফিকের মৃত্যুর দিন সকালে খোলাহাটি থেকে বগুড়ায় এসে পৌঁছেছিল, আর শফিক মারা যায় সন্ধ্যার কিছুক্ষণ পর। হালিমাকে জিজ্ঞেস করলাম, “মাত্র সাত-আট দিন আগেই তোদের দু’জনের সাথে কথা বললাম, তখন তো তোরা দু’জনেই ভাল ছিলি। এখন তুইও অনেক কাশছিস, আর শফিক তো চলেই গেল। কী এমন ঘটেছিল এর মধ্যে”? সে বললো, লকডাউন শুরু হবার আগের রাতে শফিক অস্থির হয়ে বাজারে গিয়েছিল এবং সেখান থেকে অনেক সওদা (প্রায় পাঁচ হাজার টাকার, যা ওদের জন্যে অবশ্যই অনেক) নিয়ে এসেছিল। সে কাঁদতে কাঁদতে বললো, এ বাজারের একটা কিছুও সে মুখে দিয়ে যেতে পারলো না! গত বছর আমার আপন ভাগ্নে মাহমুদ মনোয়ার স্বয়ং একজন চিকিৎসক হয়েও করোনাক্রান্ত হয়ে মাত্র ৪৬ বৎসর বয়সে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায় মাত্র তিন দিনের মাথায় ইন্তেকাল করেছিল। করোনাক্রান্ত রোগীদের মধ্যে অনেকেই ভাগ্যবান হয়ে থাকেন, তারা ঘরে বসেই সুষ্ঠু চিকিৎসার মাধ্যমে সুস্থ হন। অনেকে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসার পর সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে আসেন, আর অনেক অভাগা ব্যক্তি হাসপাতাল থেকে দ্রুত প্রস্থান করেন, তবে বাড়ির উদ্দেশ্যে নয়, অনন্তলোকের পানে। এটাই জীবনের বহুমাত্রিকতা!

শফিকের মৃত্যুর দু’দিন আগে আমার কলেজ-মেট সায়েদ আলি করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। গত সাতই জুলাই আমার আপন ফুফাতো বোনের ছেলে মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের ময়মনসিংহ বিভাগের বিভাগীয় প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে করোনাক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে মাত্র কয়েকদিন চিকিৎসাধীন থেকে খুব দ্রুতই এ পৃথিবী ছেড়ে চলে যায়, সে কথা “স্মৃতির জোয়ারে ভাসা-৩” পর্বে উল্লেখ করেছিলাম। গত ১৫ই জুলাই তারিখে আমার বন্ধু মুস্তাফিজুর রহমানের বড় ছেলে মাশুকুর রহমানও মাত্র ৩৭ বৎসর বয়সে করোনায় আক্রান্ত হয়ে ২৫ দিনের মত চিকিৎসাধীন থেকে পরলোকের উদ্দেশ্যে যাত্রা করে। এরা সবাই ছিল আমার অতি পরিচিত বিশেষ জন/নিকটাত্মীয়। মাত্র এক মাসের ব্যবধানে এতগুলো নিকটজন এ পৃথিবী থেকে চিরবিদায় নিয়ে চলে গেল, এ কারণে এবারে ঈদের দিনে মনটা ভীষণ ভারাক্রান্ত ছিল। এ ছাড়া মায়ের অসুস্থতা তো আছেই!

এ ভারাক্রান্ত অবস্থায় ঢাকা ফিরে আসার যাত্রা পরিকল্পনা করতে মোটেও ইচ্ছে হচ্ছিল না। পুনর্বার ‘লকডাউন’ ২৩ জুলাই থেকে কার্যকর হবে, না ২৭ জুলাই থেকে, এ নিয়েও মিডিয়াগুলোর খবরে একটা অনিশ্চয়তা ছিল। ঈদের পরদিন লাঞ্চের পর আমার একজন সহকারীকে বাস টার্মিনালে পাঠিয়ে দুটো টিকেট ক্রয়ের জন্য চেষ্টা করতে বললাম। সে সেখান থেকে জানালো, সন্ধ্যার আগে আর কোন বাস যাবে না বলে কাউন্টার থেকে বলা হচ্ছে, তবে এর মাঝেও যাত্রী পুরা হলে একটা দুটা করে বাস ছেড়ে যাচ্ছে। কেউ নিশ্চিত করে কোন সিদ্ধান্তের কথা বলছে না। এ কথা শুনে আমি আম্মাকে সালাম করে ওনার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে দ্রুত রওনা হলাম। মাত্র বিশ মিনিটের মাথায় টার্মিনালে পৌঁছে দেখি, এনা পরিবহনের একটা এসি বাস কেবল যাত্রা শুরু করে বাস টার্মিনাল থেকে রাস্তায় ওঠার জন্য নাক বের করে অপেক্ষা করছে। সুপারভাইজার কে জিজ্ঞাসা করলাম, দুটো সীট হবে কিনা। উনি প্রথমে বললেন, একটা হবে, তবে ভাড়া বেশি দিতে হবে। একটা সীট নিতে আমি অনিচ্ছা প্রকাশ করায় খানিক পরে উনি বললেন, দুটোই হবে, ‘তবে একটা ফাস্টে অপরটা লাস্টে’ (আসন সারির)। ভাগ্য আমার প্রতি সুপ্রসন্ন ছিল বলেই হয়তো এ যাত্রায় অপ্রত্যাশিতভাবে আমি দুটো সীট পেয়ে গেলাম। আমি ও আমার সহকারী ত্বরিত বাসে উঠে আসন গ্রহণ করলাম।

চলবে….. (পরের পর্বে সমাপ্য)

ঢাকা
২৪ জুলাই ২০২১
শব্দ সংখ্যাঃ ১৩৪৯

১৯৯ বার দেখা হয়েছে

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।