শান্তির দেশ ভুটান ভ্রমণ — ১

প্রায় হঠাৎ করেই এক অনির্ধারিত সাক্ষাতে আমরা চার বন্ধু দম্পতি ইচ্ছে প্রকাশ করলাম, শান্তির দেশ ভুটান সফরে যাব। শুধু ইচ্ছে প্রকাশ করলেই তো হবেনা, অর্থকড়ি ছাড়াও কিছু কাঠ খড়ও পোড়াতে হবে। আমাদের মধ্যে সবচেয়ে কম কথা বলে যে বন্ধুটি, সেই দায়িত্ব নিল সবার পক্ষ থেকে হোটেল বুকিং, টিকেট বুকিং, তথ্য উপাত্ত সংগ্রহ ইত্যাদি আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করার। শুধু তাই নয়, ০৬ মে ১৭ তারিখে তার বাসায় বাকী তিন যুগলকে দাওয়াত করে সফরের উপর একটা নাতিদীর্ঘ প্রারম্ভিক ব্রীফিং দিল এবং টিকেট ও হোটেল বুকিং এর কাগজপত্র হস্তান্তর করলো। এর আগে সবার সাথে আলোচনা করেই প্রস্তাবিত সফরের তারিখ ১৫ থেকে ২০ মে, ২০১৭ হবে বলে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল। কম কথা বলা লোকেরা যে কাজে পটু হয়, এ কথা সে আবারো প্রমাণ করলো। আর তারপর বন্ধু দম্পতি ও তাদের সুযোগ্য পুত্রদ্বয় সস্ত্রীক আমাদেরকে এক রসনারোচক নৈশভোজে আপ্যায়ন করে কিছুটা খোশ গল্পের পর রাত হয়ে যাওয়ায় বাইরে ঝমঝমে বৃষ্টির মাঝে বিদায় দিল। বিদায় নেয়ার আগে অবশ্য বন্ধু পত্নীগণ পোশাক পরিচ্ছদ, সাথে নেয়া প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র, ঔষধপত্র ইত্যাদি জরুরী কিছু বিষয় নিয়ে এবং আমরা বন্ধুরা কে কখন কার বাসা থেকে ক’টায় রওনা দিয়ে ক’টায় বিমানবন্দরে পৌঁছবো, সে সময়সূচী নির্ধারণ করে যে যার মত বাড়ী ফিরে আসলাম।

আজ সে প্রত্যাশিত সফর শুরু হবার প্রথম দিন। এর আগে বহুবার বিদেশ সফর করলেও প্রতিবারই বিদেশ যাত্রার প্রাক্কালে আমার কিছুটা চিত্ত চাঞ্চল্য দেখা দেয়। এবারেও দিল। সংগৃহীত খবরে জেনেছি, এ সময়ে ভুটানে রাতে বেশ শীত পড়ে। তাই শীতের কাপড় কী কী নেব, সে ব্যাপারে একটা চিন্তা ছিল। গত ক’দিন ঢাকায় যে ভ্যাপসা গরম পড়েছে, তাতে এই গরমের মধ্যে শীতের কাপড়ের কথা চিন্তা করলেই গরম আরো বেড়ে যায়। আমি যদিও শীতে সহজে কাবু হই না, কিন্তু গিন্নী তা মানতে রাজী নন। জোর করে একাধিক শীতের কাপড় পুরে অহেতুক স্যুটকেস ভারী করতে বাধ্য করলেন। গতরাতে ‘অনন্যা’ শপিং মলে গিয়ে একটা হাতব্যাগ কিনে নিয়ে এসেছি, যা সফরের জন্য বেশ উপযুক্ত মনে হলো। সেটাতে ট্রাভেল ডকুমেন্টস, প্রয়োজনীয় ঔষধপত্রসহ কিছু ফার্সট এইড সামগ্রী, গরম হাতমোজা, মাফলার, কানটুপি ইত্যাদি ভরে নিলাম। আগেই সাব্যস্ত হয়েছিল আমরা বাসা থেকে সকাল সোয়া ছ’টায় রওনা দিব, প্লেন ওড়ার সময় ছিল ০৮-৫০। রওনা দিতে দিতে সাড়ে ছ’টা বেজে গেল। বড় সংসার, ছেলেপুলে নাতনিসহ একসাথে থাকি। তাই গিন্নীর শেষ মুহূর্তের কিছু নজরদারি ও ব্রীফিং থেকেই যায়, ফলে শেষ মুহূর্তের তাড়াহড়োও অবশ্যম্ভাবী হয়ে ওঠে।

আমরাও রওনা দিলাম, আকাশও কালো মেঘে ছেয়ে এলো। যে বন্ধুটি সবচেয়ে দূরে থাকে, মাঝপথ থেকে তাকে একটা কল দিলাম। শুনি সে এবং অপর এক বন্ধু ইতোমধ্যে বিমানবন্দরে পৌঁছে গেছে। বৃষ্টি ও বাতাস শুরু হলো, এতে গত ক’দিনের ভ্যাপসা গরমের অবসান হবে বলে মনে মনে স্বস্তি পেলাম। আবার একই সাথে পাহাড়ের দেশ ভুটানে ঝড় বৃষ্টি হলে বিমান ওঠা নামা বিপজ্জনক হয়ে উঠবে কিনা সে চিন্তাও মনে দেখা দিল। যাহোক, খুব দ্রুতই বিমানবন্দরে পৌঁছে গাড়ী থেকে নেমেই দেখি আমাদের অপর বন্ধু দম্পতি ট্রলী নিয়ে ঢুকছে। হাই হ্যালো বলে আমরাও একটা ট্রলী নিয়ে লাইনের পেছনে গিয়ে দাঁড়ালাম। লাইনটা বেশ দীর্ঘ ছিল। কর্তব্যরত আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এক সদস্য কাছে এসে কোন সাহায্য লাগবে কিনা তা নীচুস্বরে জিজ্ঞেস করলো। আমি তার এ মহানুভবতায় অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, কিসের সাহায্য? সে মৃদু হেসে জানালো, লাইন ছাড়াই ভেতরে ঢুকিয়ে দেবে। মুহূর্তের মধ্যে আমার চোখে তার সেই মহানুভব চেহারাটা পাল্টে গিয়ে এক অসৎ ও লোভী ব্যক্তির আকৃতি ধারণ করলো। আমিও হেসেই তাকে বললাম, “ভাইরে, আমি লাইন মানা লোক। সারাটা জীবন লাইন মেনেই এসেছি। এ লাইনটাও আমাকে ধরে রাখতে পারবেনা। আমি যথাসময়ে এগিয়ে যাব”। অগত্যা সে নিরাশ হয়ে পিছু হটলো। কিছুক্ষণ পরই দেখি এক ব্যক্তি সপরিবারে তার পিছু পিছু গট গট করে হেঁটে গিয়ে প্রায় বিনা বাধায় গেট অতিক্রম করলো। ভাবলাম, এভাবেই মানুষ অধৈর্যের মূল্য অসৎভাবে পরিশোধ করে এবং সমাজ শৃঙ্খ্লা হারায়, যার নমুনা আমরা হরহামেশা ঢাকার রাস্তায় দেখে থাকি।

প্রাথমিক সিকিউরিটি চেকিং সম্পন্ন করে মনিটরের পর্দায় চেক-ইন গেট খুঁজে বের করে সেখানে গিয়ে দেখি, চেক-ইন কার্যক্রম তখনো শুরুই হয়নি। প্রবাসগামী ভাইদের সনির্বন্ধ অনুরোধে বন্ধুদের একজন তাদের এম্বারকেশন কার্ড একের পর এক পূরণ করে দিচ্ছিল। এতে ওরা খুব উপকৃত বোধ করছিল। এক সময়ে চেক-ইন প্রক্রিয়া শুরু হলো। আমাদের আট জনের কাজ একসাথে সম্পন্ন হলো। Druk Air এর একজন কর্তব্যরত কর্মকর্তা আমাদের জানালেন, প্লেন এখনো আসেনি, দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে ঘন্টাখানেক দেরী হবে। এটাও জানালেন, তাড়াহুড়োর কিছু নেই। প্লেনের মোট যাত্রী সংখ্যা আমাদের আটজন সহ মোট বারজন। আমাদেরকে ইমিগ্রেশন কমপ্লিট করে কোন একটা লাউঞ্জে অপেক্ষা করতে বললেন। প্লেন ছাড়ার সময় হয়ে আসলে ওনারা নিজেরাই আমাদের খুঁজে বের করে প্লেনে বসিয়ে দেবেন বলে জানালেন। অগত্যা আমরা তাই করলাম। ইমিগ্রেশন আনুষ্ঠানিকতাদি সম্পন্ন করে আমরা UCBL এর Imperial Lounge এ গিয়ে বসলাম। মাত্র ১২ জন যাত্রীর কথাটা নিয়ে ভাবছিলাম। অথচ আমরা যখন টিকেট কাটার চেষ্টা করছিলাম, তখন আসন খালি নেই বলে ট্রাভেল এজেন্ট একের পর এক তারিখ পরিবর্তন করছিল। ড্রুক এয়ারের অবস্থাও আমাদের বাংলাদেশ বিমান কিংবা বাংলাদেশ রেলওয়ের মত হচ্ছে কিনা, সেকথাই ভাবছিলাম। যাত্রার শুরুতেই এই বিলম্ব ঘটা শুরুতে কিছুটা অনভিপ্রেত বলে মনে হলেও, লাউঞ্জে বসে ব্রেকফাস্ট করার পর যখন আমাদের বেটার হাফদের ফটো শুটিং শুরু হলো, তখন মনে হয়েছিলো এ বিলম্বটুকুর নিতান্ত প্রয়োজন ছিল। বিদেশ যাত্রার আনন্দের চেয়ে দেশে বসেই নিত্যনৈমিত্তিক রুটিন থেকে এ অপ্রত্যাশিত অবকাশ লাভ কম আনন্দদায়ক ছিলনা।

দেখতে দেখতে এক ঘন্টার জায়গায় তিনটে ঘন্টা কখন যে পার হয়ে গেল, তা টেরই পাইনি। ইতোমধ্যে ড্রুক এয়ারের সেই কর্মকর্তাটি একবার আমাদের লাউঞ্জে এসে বিলম্বের জন্য দুঃখ প্রকাশ করে তাদের এয়ারলাইনের আতিথেয়তায় নাস্তা করার জন্য বলাকা রেস্টুরেন্টে যাবার অনুরোধ জানিয়ে গেলেন। কিন্তু এক পেটে আর ক’বার নাস্তা করা যায়? আমরা তাকে ধন্যবাদ জানিয়ে পুরুষরা আড্ডা ও আলাপচারিতায় এবং মহিলারা ফটো সেশনে মনোনিবেশ করলাম। সাড়ে এগারটার সময় প্লেনে চড়ার ডাক পড়লো। তড়িঘড়ি করে যে যার হাতব্যাগ গুছিয়ে রওনা হ’লাম, সবার শেষের জন কেউ কিছু ফেলে গেল কিনা তা দেখে নিল। আমাদের মধ্যে কেউ একজন তথ্য সংগ্রহ করেছিল যে ভুটানের পারো বিমানবন্দরটি পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত। অনেক পাহার কাটিয়ে পাইলটকে সেখানে অবতরণ করতে হয়। তাই ঝানু পাইলট না হলে কেউ পারোতে প্লেন নামাতে পারেনা। এ নিয়ে মহিলাদের কেউ কেউ একটু সংশয়ে ছিলেন, উদ্বিগ্নও ছিলেন। মাত্র সোয়া এক ঘন্টার আকাশপথ, যেন নিমেষেই শেষ হয়ে গেল। প্লেন আকাশে উড়ে কিছুদূর যাওয়ার পর থেকে মেঘের দেশে প্রবেশ করলাম। কী সুন্দর সাদা তুলোর পেঁজার মত মেঘ। ইচ্ছেমত প্লেনটা মেঘের মাঝে হারিয়ে যাচ্ছিল, আবার কিছুক্ষণ পর পর মুখ বের করছিল। মেঘের সাথে এ লুকোচুরি খেলা জানালার পাশে বসে উপভোগ করছিলাম। মাঝ আকাশে মাঝে মাঝে বৃষ্টির দেখা পাচ্ছিলাম, সেই সাথে ক্ষণে ক্ষণে ঝাঁকুনিও অনুভব করছিলাম। এক সময় পাইলট ঘোষনা দিলেন, আমরা নামছি। পারো’র পাহাড়ের কথা আগেই বলেছি। সে আশঙ্কা তো ছিলই, সেই সাথে যোগ হয়েছিল আবহাওয়ার টারবুলেন্স। নামার সময় যখন কয়েকটা জায়গায় প্রচন্ড ঝাঁকুনি খেলাম, তখন পেছন থেকে আসা একজন ভয়ার্ত যাত্রীর আর্ত চীৎকার পরিবেশটাকে আরো আশঙ্কাময় করে তুলছিল। যাহোক, সব আশঙ্কার অবসান ঘটিয়ে আমরা অবশেষে সফলভাবে পারোতে অবতরণ করলাম।

চলবে…..
পারো বিমান বন্দর
১৫ মে ২০১৭


“ইম্পেরিয়াল” লাউঞ্জে বসে…


জানালার কাঁচ দিয়ে দেখা….
Through the plane window…


মেঘের সাথে প্লেনের লুকোচুরি খেলা…
The plane and the clouds playing hide and seek….


কম্পমান উড়োজাহাজ থেকে দৃশ্যমান সমতলভূমি…
Land view from a sliding plane…


আমরা নামছি….
Descending….


পারো’র আকাশ দেখে বিমুগ্ধ….


বিমানবন্দরের নিকটবর্তী পারোর পাহাড়ী উপত্যকায় জনবসতি ও চাষবাস।
Farmland and habitation in the valleys, near Paro Airport.


উচ্চতার প্রতিযোগিতায় বৃক্ষ ও পাহাড়
Coniferous trees standing high


পাহাড়ের পাদদেশে এবং উপত্যকায় মনুষ্য বসতির স্পন্দন। নীল সাদা মেঘের পেঁজা ছবিটির সৌন্দর্য বাড়িয়ে দিয়েছে।
Life sprouts in the valleys and terraces. The white blue patches of the sky adds to the beauty of the picture.


পাহাড়ী নদী বয়ে চলে
A hilly nullah flows along


পাহাড় মেঘ ও মানুষ-ঋজুতা ও দৃঢ়তা, কাঠিন্য ও পেলবতার এক অতীন্দ্রিয় সমন্বয়!
Dark shades of hard mountains, soft patches of white clouds and human habitation- a mystic combination!


সব শেষে, এই আমি….
Me myself, at the end…

৪,২৬১ বার দেখা হয়েছে

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।