ট্রেডিশন কন্ট্রাডিকশন।

কলেজের নতুন এডজুটেন্ট এসেছে, আমরাও ক্লাস ১২ এ নতুন উঠলাম মাত্র। এডজুটেন্ট স্যার যাই ধরেন আমরা ট্রেডিশন এর দোহাই দিয়ে পার পেয়ে যাই। পি.টি গ্রাউন্ডে লেট হ্ল; “স্যার এটা আমাদের কলেজের ট্রেডিশন”, সবার যেন উত্তর মুখস্থ ছিল। কলেজে ক্লাস ৭-এ এই “ট্রেডিশন”-এর খপ্পরে পড়ে নিজের “কনডিশন” খারাপ হয়ে গিয়েছিল।

ক্লাস সেভেন হ্ল গতর খাটা ক্লাস। সিনিয়রদের ফাইফরমাশ খাটতে খাটতে কোন ফাঁকে যে ক্লাস সেভেন পার করলাম টের পাই নাই। সবচেয়ে বঞ্চিত ক্লাস হ্ল এই ক্লাস। এখন অবশ্য সিনেমার সীন বদলায় গেছে, ক্লাস সেভেনের এক পোলার কথায় কলেজের প্রিন্সিপাল থেকে এ.জি সব এক ঘাটে পানি খায়। সেই ক্লাস সেভেন থেকে যে দৌড় শুরু করলাম এখনো দৌড়ের উপরেই আছি। আমার গাইড হেলাল ভাই আমাকে যখন রিসিভ করে কেমন কেমন করে যেন আমার কোমরের বেল্টের দিকে তাকাচ্ছিল, অতীব সন্দেহজনক। কিছুক্ষন পরেই টের পেলাম যখন আমার কোমরের বেল্ট খুলে মায়ের হাতে ধরায় দিল। এত স্মার্ট একটা ভাব নিয়ে গেলাম, নাহ সব ক্যাডেটই দেখি আনস্মার্ট! তখনও ভাবতে পারি নাই আমার স্মার্টনেসের আরও দফারফা হওয়া বাকি। কিছুক্ষন হাঁটার পর হেলাল ভাই বলে হাত সুইং কইরো না। তখনতো আমি প্রতিবাদী, বাপ-মা সাথে আছে তাই সাহসও বেশি। বাপ-মা চলে যাওয়ার পরের কাহিনী আর নাই বা বললাম। পরে শুনলাম এটা নাকি কলেজের ট্রেডিশন। শুরু হ্ল কলেজের আরও ট্রেডিশন এর সাথে মোলাকাত। প্রথম সপ্তাহ ত খুব মজায় খাওয়া দাওয়া করেছি। ১নং টেবিলে সব ক্লাসমেট একসাথে। পরে ছুটি থেকে এসে নতুন টেবিলের ওয়েটারগিরির দায়িত্ব আমিই নিলাম। ডাইনিং হ্ল ছিল একটা যুদ্ধহ্মেত্র ক্লাস সেভেনের জন্য। টেবিলে হাত রাখার প্রশ্ন ত উঠেই না; টেবিল মোছা, বেঞ্চ মোছা(আমাদের সময় খালি টেবিল লিডার চেয়ার পেত, রি-ইউনিয়নে গিয়ে দেখলাম সব চেয়ার), গ্লাসে পানি ঢালা, সবাইকে চা দেওয়া আমার ‘নৈতিক’ দায়িত্ব হয়ে গেল। ক্লাস সেভেনের সবগুলারে একটা করে ওয়েটারগিরির ছোটখাট ডিপ্লোমা সার্টিফিকেট দেওয়া উচিত। পরে না হয় রান্নাবান্না শিখে টমি মিয়ার মত কিচেন দেওয়া যাবে। আমি সব করতে রাজি ছিলাম কিন্তু ডাইনিং হলে যেতে রাজি ছিলাম না, সেটা না খেয়ে হলেও। টেবিলে আমার কোন না কোন ফল্ট বের হত ফলস্বরূপ রাতে লাইটস আউটের পর লকারের কোনায় গিয়ে লংআপ। আরেক যন্ত্রণা হ্ল ফল-ইন। ডিউটি ক্যাডেট বাঁশি পড়ার পাঁচ মিনিট আগে পাঠিয়ে দিত ফল-ইনে। এবার ৩০ মিনিট দাঁড়িয়ে থাকা। হঠাৎ একদিন শুনি বিকাল বেলায় হাফপ্যান্ট, সেন্ডো গেঞ্জি, ব্লাক সু, ব্যারেট ক্যাপ, আর কোমরে বেল্ট ঝুলিয়ে ড্রিল প্রাক্টিসে যেতে হবে, আমার খালি ব্রিটিশ আমলের হাফপ্যান্ট পুলিশের কথা মনে পড়ছিল। খালি একটাই স্বান্তনা ক্লাস এইট ছাড়া কেউ পানিশমেন্ট দিত না। সব সুদে আসলে উসুল হত নভিসেস প্যারেডের আগের রাতে, নভিসেস প্যারেডে ক্লাস সেভেনের জুতা পালিস করতে হত ক্লাস এইটের গাইডকেই কিনা। যাক ট্রেডিশনের একটু সুফল পাওয়া গেল। প্যারেন্টস ডে-র দিন এক সিনিয়র ভাই ডেকে জিজ্ঞেস করলেন ভাই বোন আছে কিনা। উত্তর শুনে ইন্টারেস্টেড মনে হ্ল না। ৫বছর পরে ডায়লগ গুলো আগের মতই ছিল খালি ঘটনার পাত্ররা অন্য। যাই হোক খারাপ সময়ও এক সময় শেষ হয়।

৪,৪১৮ বার দেখা হয়েছে

৭৭ টি মন্তব্য : “ট্রেডিশন কন্ট্রাডিকশন।”

  1. হেলাল ভাই ছিল তোর গাইড,আর আমার রুমমেট!!তাইলেই বুঝ!!প্রিন্সিপাল ইন্সপেকশনের আগে হঠাৱ উনার শুচিবায়ু বেড়ে যেত এবং আমাকে দিয়ে কমপক্ষে ৪ বার রুম না মোছালে তা কাটত না!!

    জবাব দিন
  2. সেভেন এ প্রথম পানিসমেন্ট খাইলাম টেবিলে ডাল না থাকার জন্য। সবাই যে স্যুপ এর মত ডাল খাইব এটা না বোঝার ফলস্বরূপ লাঞ্চ এর পর ২৯ নং রূমে আমার পানিসমেন্ট খাওয়া শুরু হয়ছিল।

    জবাব দিন
  3. জুতা গাইড পালিশ করত?? আমাদের তো একমাস আগের থেকে প্রিপারেশন চলত। আমার এক ক্লাসমেটের গাইড তারে দিয়েই জুতা পালিশ করাতো, কিন্তু যেই টুয়েল্ভ রাউন্ডে আসত তখন সেই জুতা কোলে নিয়ে ঘুরত। অবস্থা বুঝ!

    জবাব দিন
  4. ড্রিল গ্রাউন্ডে তাহের স্টাফের প্রথম ডায়লগটা জীবনেও ভুলুম না.."সুস্থ দেহে সুন্দর মন"কোথায় লেখা আছে জানিনা...কিভাবে যাবা তাও জানিনা..খালি জানি প্রথম ১০ জন থাকবা..বাকিদের ব্যবস্থা আছে..টাচ অ্যান্ড ব্যাক ।শ্যুট....

    জবাব দিন
  5. ভাই ডাইনিং এ যেতে সেভেনে কি যে ভয় লাগতো...একটা দোয়া আছে.."ফাবি আইয়্যি আলা ই...তুকাজ্জিবান" এইটা ৩ বার পড়ে নাকি কারো দিকে তাকিয়ে ফু
    দিলে নাকি ওর রহমত পাওয়া যায়..আমার ক্লাস সেভেনের সারা ডাইনিং গেছে এই ফু দিতে দিতে...টেবিলে সবাই আসলে সবার জন্য ৩ বার করে করে মোট ৩০ বার পড়ে সবার দিকে তাকিয়ে খালি ফু দিতাম...
    একবার এক ভাইয়া বলতসে "তুমি টেবিলে বিড়বিড় করে কি পড়?এতো পড়ালেখা কিসের...."..উনাকে তো আর আসল কাহিনী বলতে পারি নাই....

    জবাব দিন
  6. fuad,
    আমার এখনো মনে আসে গ্লাস আর চায়ের কাপ কেমনে সাজাতে হয়.....
    হেলাল ভাইয়ের সাথে আমার শেষ দেখা হইছিল সুইমিং পুলে...পুলের হটাৎ কে যেন গাঁয়ের
    উপর পড়ল...ঘুরে দেখি হেলাল ভাই .........। 😀

    জবাব দিন
  7. আরে সে পারে না মাসরুফ ভাই, হুদাই আসছে মাতব্বরী করতে। আমাদের কলেজে এক ডিজাইনে বেশিদিন সাজানো যাইত না। কিছু উদাহরণ দেইঃ
    ১। ১-৪-৩-২-১
    ২। প্লেট গুছায় তার পর তার চারপাশ দিয়ে রাউন্ড
    ৩। ৫-৪-৩
    ...এবং আরও...:)

    জবাব দিন
  8. @বন্য, ওফ তাইলে বাঁচতাম, তোর জ্বালায় তো বলগাইতে পারি না। তাড়াতাড়ি হার্টটারে রেস্ট দে।

    @মাসরুফ ভাই, দিপালীদিকে না পাওয়ার সৌভাগ্য এখন পর্যন্ত কোন ব্যাচের হয় নাই।

    জবাব দিন
  9. এবং মনজুরের সেই ছলোছলো মায়াবী চোখ দেখে ভাইয়া তাকে হাত দিয়ে ব্রেড খাওয়ার পারমিশন দিত..আব আমরা নাদানরা শুধু চেয়ে থাকতাম আর দীর্ঘশ্বাস ফেলতাম...ঠিক না দোস্ত???

    জবাব দিন
  10. মূল লেখার উপর মন্তব্যঃ
    B4 the novices parade, আমার লেখা ২টা প্যারোডিঃ

    ১।
    সকাল ছ'টায় তোমরা যখন ঘুমাও কম্বল মুড়ে
    ঠিক সেসময় মোদের তখন দেহেতে ঘাম ঝরে।
    সন্ধ্যে ছ'টায় তোমরা যখন রাখ স্যুয়েটার জড়ে
    ঠিক সেসময় মোদের তখন চোখদুটো জলে ভরে।

    ২।
    দিন রাত এখানে থমকে আছে
    বদ্ধ কলেজের কঠিন নিয়মে,
    প্রতি নিঃশ্বাসে বাড়ি যাবার দিন আমি গুণছি,
    শোনো, কুমিল্লা কেন্দ্রীয় কারাগার (ককক)
    থেকে আমি বলছি।

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।