পাঁচ মিনিট বিরহের গল্প/ ৪

– তোমার নতুন রুমমেটের সমস্যা কী?
– হার্টের সমস্যা মনে হয়
– নাফিস, ঠিকমতো কথা বলো
– জি, অবশ্যই অবশ্যই
– তোমার সমস্যা কী?
– বিরাট সমস্যা
– মাইর চিনো?
– জি, চিনি
– খামচি চিনো?
– জি, চিনি। যাদের নখ বড় তারা খামচি দেয়, যেমন বাঘ, সিংহ, বিড়াল ইত্যাদি
– আমি বাঘ নাকি সিংহ?
– বিড়াল
– দিবো খামচি?
– স্যরি স্যরি, তুমি বাঘ
– কোনো বাঘের নাম আনিকা হয় নাকি?
– তোমার নাম রিচার্ড পার্কার
– থ্যাংক ইউ
– হে হে
– গুড বয়
– হে হে

আজকের দিনটা শুরু হল রুমমেট সংক্রান্ত ঝামেলা দিয়ে। নাফিস আগেই জানতো আজকে তাকে এই জেরার মুখে পড়তে হবে। তাই পূর্বপ্রস্তুতি নেয়া ছিল, যেভাবেই হোক রুমমেটের প্রসঙ্গ এড়াতে হবে। যাক বাবা, আপাতত এড়ানো গেল। সামনে কী হবে নাফিস জানেনা। আনিকার মতিগতি বোঝা তার সাধ্য নয়।

– সেহরি করেছ আজকে?
– হ্যাঁ, করলাম তো
– ঠিকমতো?
– হ্যাঁ বাবা, ঠিকমতো
– আমি তোমার বাবা লাগি?
– হ্যাঁ আনিকা, ঠিকমতো সেহরি করেছি
– মেন্যু কী ছিল?
– দ্য গ্রেট পাতলা ডাল অ্যান্ড মিক্সড ভেজিটেবল
– মেসে আর কিছু দিতে পারেনা? ভেজিটেবল খেয়ে খেয়ে তুমিও ভেজিটেবল হয়ে যাচ্ছ
– ঘটনা সত্য
– কতবার বলেছি সেহরিতে একটা ডিম ভেজে নিতে, মনে থাকেনা?
– সময় পাইনা
– সময় পাবা কীভাবে? আজান দেয়ার আধঘণ্টা আগে ডেকে দিতাম প্রতিদিন, তোমার রুমমেটের যন্ত্রণায় সেটাও করতে পারছিনা।

নাফিস কান খাঁড়া করে রাখে। আনিকার প্রত্যেকটা কথা খেয়াল করে শুনতে হবে। খুব ভেবেচিন্তে উত্তর দিতে হবে। আনিকার জেরার মুখে ভেঙে পড়া চলবে না।
– আচ্ছা, তোমার রুমমেটের সমস্যাটা বলো তো
– ওর ঘুমের ডিস্টার্ব হয়
– তুমি ফিসফিস করে কথা বলতে পারো না?
– ওর ঘুম মেসের ডালের চেয়েও পাতলা
– হেডফোনে কথা বললেও ঘুম ভেঙে যাবে?
– অবশ্যই যাবে
– তার মানে রাতে কথা বলা আপাতত একদম বন্ধ?
– অ্যাঁ মানে, অনেকটা সেরকমই
– এই রুমমেট বিদায় করো
– রোজার মাসটাই শুধু থাকবে
– না, তুমি দুইদিনের মধ্যেই বিদায় করবা
– আনিকা, প্লিজ বোঝার চেষ্টা করো
– কী বুঝবো?
– অলরেডি উঠে গেছে, এখন হঠাৎ বিদায় করে দেয়া যায়না, আর উনি ফারুকের দুলাভাই
– তাতে কী? তোমার তো দুলাভাই না
– এই ব্যাপারে ক্লাসের পরে কথা বলি? তুমি ক্লাসে যাও, আমি এখানে বসি কিছুক্ষণ।
– ইডিয়ট!

রোজা রেখে কতগুলো মিথ্যা বলতে হল! তবুও উদ্ধার পাওয়া গেল না। পার্কের বেঞ্চে হেলান দিয়ে বসল নাফিস। মোবাইল ফোনটা হাতে নিল। ফারুকের কাছে একটা কল করা দরকার। ওর পরিচিত ডায়াগনস্টিক সেন্টার আছে। রেফারেন্স নিয়ে গেলে বিল কিছু কমিয়ে রাখতে পারে। ব্যালেন্স চেক করে মনটা আরও খারাপ হয়ে গেল। দুই টাকা বায়ান্ন পয়সা। ফারুকের সাথে কথা শেষ করা সম্ভব না।
– হ্যালো ফারুক, তুই কই?
– মেসে আছি, ক্লাসে যাই নাই
– আব্বা কই?
– ঘুমাচ্ছে
– কাশি কমেছে?
– কমেছে একটু
– তোর কাছে কি ডিম আছে?
– আজকে সেহরিতেই তো চাচাকে শেষ ডিমটা ভেজে দিলি
– স্যরি, ভুলে গেছি
– কিনে আনিস
– হ্যাঁ, আচ্ছা তোর ওই ডাক্তার ফুপার ডায়াগনস্টিক সেন্টারে নিয়ে যেতে পারবি আজকে?
– ফোন করেছিলাম, ফুপা ঢাকার বাইরে, আগামী সপ্তাহয় আসবে
– ও, আচ্ছা, আব্বার দিকে একটু খেয়াল রাখিস, আমি ইফতারের আগেই চলে আসবো
– ঠিক আছে
– রাখি দোস্ত

সিমেন্টের বেঞ্চে লম্বা হয়ে শুয়ে থাকে নাফিস। আনিকা সবসময় এমন জেদ ধরে থাকে। সত্যি কথাটা তাকে বলে দেওয়ার সাহস নেই নাফিসের। হাতে টাকা নেই। একদম নেই। পরশু পপুলারে টেস্ট করানোর জন্য একগাদা টাকা খরচ হয়ে গেল। টিউশনির টাকা হাতে আসবে আরও দুই সপ্তাহ পর। প্রচণ্ড লজ্জা পেলেও আনিকার দেয়া টাকা দিয়েই মাসের শেষটা চালাতে হয় তার। হাতে কিছু টাকা ধরিয়ে দেয় আর বলে ডিম কিনে নিও, বিস্কুট কিনে নিও, কলা কিনে নিও। মাঝে মাঝে নিজেই কিনে দেয়।

নতুন রুমমেট আসেনি। যিনি এসেছেন তিনি নাফিসের সাথে বিছানা শেয়ার করছেন। সিঙ্গেল বেড, সিঙ্গেল বেডশিট, সিঙ্গেল বালিশ, দুইজন মানুষ। একজন নাফিস, অন্যজন তার বাবা। আলাউদ্দিন সাহেব মেসে উঠেছেন পাঁচদিন হয়ে গেল। আরও সপ্তাহখানেক তো থাকতেই হবে। টেস্টের রেজাল্ট দিয়েছে গতকাল। নাফিস বিশ্বাস করতে পারছেনা। আজীবন অধূমপায়ী নিতান্ত সাধাসিধে লোকটার কেন ফুসফুস ক্যানসার হবে? কেন? কেন?

ঘড়ির কাঁটা ষাটের ঘর ছুঁই ছুঁই করছে। ক্লাস শেষ হবে এখনই। আনিকার জন্য এতো অধীর আগ্রহে কেন অপেক্ষা করছে নাফিস? হাতের নরম পাতা ছুঁয়ে দেবার জন্য? নাকি ডিম কেনার টাকা হাতে পাবার জন্য?

২,৩৫৬ বার দেখা হয়েছে

১৭ টি মন্তব্য : “পাঁচ মিনিট বিরহের গল্প/ ৪”

  1. সামিউল(২০০৪-১০)

    ধুস শালা মনটা খারাপ করে দিলি...
    কয়দিন আগে আমার আম্মারেও টেস্ট করাইসি। আল্লাহ্‌র রহমতে খারাপ কিছু ধরা পড়ে নাই।
    তোর নায়ক এত বলদ ক্যান?? নিজের প্রেমিকারেও কইতে পারেনা বাপের কথা??????
    ধুস শালা...... (সম্পাদিত)


    ... কে হায় হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগাতে ভালবাসে!

    জবাব দিন
  2. সোহান (২০০৪-১০)

    নাহ। তোর গল্প পড়া বাদ দিতে হবে। হার্টের মাঝে হালকা ব্যাথা অনুভব হয়। 🙁 🙁 আর আনিকা চরিত্রতার প্রেমে পড়ে যেতে পারি। সেটা নিশ্চয়ই তোর নায়কের জন্য ভাল হবে না। =))
    এপার্ট ফ্রম ফাইজলামি... ভাল্লাগসে পড়তে। :thumbup: :thumbup:


    আমি সিগারেটের ছাই, জানালার ধুলো। চাইলেই ফু দিতে পার। ঊড়ে যাব।

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।