পরিবারের কনিষ্ঠতম সন্তান

ফ্যামিলির ছোট ছেলে কিংবা ছোট মেয়ে হওয়াটা যতখানি সৌভাগ্যের, মাঝে মধ্যে ঠিক ততখানিই বিড়ম্বনার। শৈশবে যেমন সবার আদরের মধ্যমণি হয়ে থাকার বিশ্বজয়ী অভিজ্ঞতা হয়, তেমনি সামান্য ভুল করলেই নিয়মিত বিরতিতে উইকেট পড়ার মতন চারিপাশ থেকে নিয়মিত বিরতিতে ছ্যাঁচানি চলতে থাকে। ……আদর পেয়ে পেয়ে মাথায় উঠসো…… ছোটমানুষ, ছোটমানুষের মতই থাকো…… অল্প বয়সে বেশি পাকা পাকা কথা শিখসো…… তোমার ভাইয়া/আপু কোনোদিন এমন করার সাহস পায়নাই আর তুমি কিনা…… এত্তো সাহস…… !!!

বড়ভাই/বোনের ছায়ায় ঢাকা পড়ে যায় পরের বছরগুলো। ভাইয়ার পিছে পিছে খেলতে যায় ছেলেটা। ছোটমানুষ। খেলায় জায়গা পায়। নাম হয় ‘দুধভাত’। সবার ব্যাটিং শেষ হলে তার হাতে গছিয়ে দেওয়া হয় ভারি ব্যাট। গড়িয়ে গড়িয়ে বোলিং করে কেউ একজন। আঙুল গুনে গুনে। একটা। দুইটা। তিনটা। খেলা শেষ। সোনার বাংলাদেশ।

আপুর চারপাশে তিন ফুট ব্যাসার্ধের বৃত্ত এঁকে সারাদিন সেটার ভেতর পড়ে থাকে মেয়েটা। আপু চুলে বেণী করে, সে করে ঝুঁটি। আপু পরে থ্রি পিস, হাঁটু ছুঁই ছুঁই ফ্রকের সাথে গলায় লাল ওড়না জড়িয়ে মেয়েটা ঘুরে বেড়ায় ঘরময়। ফুঁড়ুৎ ফুঁড়ুৎ চড়ুইপাখি। আপু চোখে মাখে কাজল, মেয়েটা ধরে বায়না। ঠোঁট ফুলিয়ে আর সহসাই গালে লালচে আভা এনে মুহূর্তের ভেতর কাউকে ম্যানেজ করার কাজটা সম্ভবত পিচ্চি মেয়ের চেয়ে কেউ ভালো পারেনা।

সময়ের সাথে সাথে ছেলেটা/মেয়েটা বড় হয়। তবুও ‘ছোটমানুষ’ ট্যাগ সে কোনোদিনই খুলে ফেলতে পারেনা। তাইতো বাজারে ব্যাগ হাতে ছেলেটাকে মাঝে মধ্যেই ছুটতে হয় এক কেজি আলু কিনতে। কিংবা কোকোলা ন্যুডলস। এক হালি ডিম। বড়জোর হাফ কেজি অস্ট্রেলিয়ান আপেল। আর বড়ভাই বাবার সাথে গরু কিনতে হাটে যায় কুরবানির ঈদে, নিজের রুমে দরজা চাপিয়ে গান শোনে, বন্ধুর বাসায় লুকিয়ে তাস পেটায় আর আড্ডা জমায়। দেরি করে বাসায় ফেরে। খেয়ে দেয়ে ঘুম পাড়ে। তার ব্যাপক ভাব। কারণ তিনি ফ্যামিলির বড় ছেলে।

মেয়েটার দুর্ভোগ চূড়ান্তে ওঠে হাইস্কুলে পা রাখতেই। বড়বোনের মতন এতো রক্ষনশীল হতে না পারার খোঁটা শুনতে শুনতে ঝালাপালা হয় কর্ণমূল। ক্লিপ-রাবারের তোয়াক্কা না করে খোলা চুলে একদিন গেলেই মায়ের কোপে পড়তে হয়। আপুর শাসানি শুনতে হয়। সন্দেহের তীর এসে বিঁধতে থাকে একিলিসের গোঁড়ালিতে। অভিমান হয়। প্রচণ্ড অভিমান। সাথে হয় ছোটমেয়ে হয়ে জন্মানোর তীব্র আক্ষেপ।

ছেলেটা কিংবা মেয়েটা কৈশোর পেরোয়। টিন এজ শেষ করে ঠিকঠাক চোখ ফুঁটতেই আবার সিনারিও চেইঞ্জ হয়। আস্তে আস্তে সব কিছু বুঝতে শেখে সে। ছোট ছেলে কিংবা ছোটমেয়ে হয়ে জন্মানোর অতুলনীয় সৌভাগ্য চোখের সামনে স্পষ্ট হতে থাকে। জীবনটাকে বড় সুন্দর মনে হয়। বাবা-মা আর আপু-ভাইয়ার সাথে আজীবন ছেলেমানুষি করার পার্মানেন্ট লাইসেন্স নিজের হাতের মুঠোয় দেখতে পেয়ে সে অভিভূত হয়। চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে হয়, সহস্র জন্মে তোমার ছোটভাই হয়েই জন্মাতে চাই ভাইয়া! সহস্র জন্মে তোমার ছোট বোনটি হয়েই থাকতে চাই আপু! সহস্র জন্মে বাবা-মায়ের ছোট্ট সন্তানটি হয়েই কোল জুড়ে বসতে চাই!

৬৯৩ বার দেখা হয়েছে

৬ টি মন্তব্য : “পরিবারের কনিষ্ঠতম সন্তান”

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।