সমান্তরাল

কথা বলা ছাড়া অন্য কোনো কাজে মোবাইল ফোন ব্যবহারের ব্যাপারটা আশরাফ সাহেব একদমই বোঝেন না। সবুজ বাটন চেপে কথা শুরু। আর লাল বাটন চেপে কথা শেষ। এর বাইরে মোবাইল ফোন বিষয়ে তার জ্ঞান ডাবল জিরো। তিন দশকের বেশি সময় ধরে সরকারি চাকরি করে অবসর নিয়ে এখন নামকরা প্রাইভেট কোম্পানিতে গুরুত্বপূর্ণ চেয়ারে বসে থাকা লোকটার ইংরেজি জ্ঞান খারাপ না। ছেলেরা ছোট থাকতে প্রতিদিন সন্ধ্যায় গ্রামার বই নিয়ে বসতেন তিনি। ছোট ছেলেটা ট্রান্সলেশনে দুর্বল ছিল। বড়টা টেন্স পারতো কম। নীল মলাটের বইটার নাম এখনও মনে আছে- অ্যাডভান্সড লারনার্স কমিউনিকেটিভ ইংলিশ। লেখকের নাম সম্ভবত চৌধুরী। বয়স ষাটের ঘরের দিকে এগোচ্ছে দ্রুতই। মরিচা পড়ছে স্মৃতিশক্তিতে।

যে মানুষটা গোটা বিশেক অফিসিয়াল চিঠির খুঁটিনাটি চেক করে দেখেন প্রতিদিন, সেই মানুষটাই মোবাইল ফোনের ইংরেজি বোঝেন না কেন এটা তার নিজের কাছেও এক অন্তহীন রহস্য। একটু আগেই তার ফোনে একটা মেসেজ এসেছে। গলির মাথায় ইদ্রিসের দোকান থেকে তিনি যখন ফোনে টাকা ভরেন তখন এরকম একটা মেসেজ আসে। ইয়োর ট্রান্সসেকশন আইডি নাম্বার ……………। বিচ্ছিরি একটা সংখ্যা। তবু তিনি এই মেসেজগুলো ডিলিট করেন না। আজকের ঘটনাটা আলাদা। মেসেজটা পাঠিয়েছে তার ছোটছেলে মুহিত।

পরপর তিনবার পড়লেন আশরাফ সাহেব। তার এই ছেলেটা অন্যদের মত হয়নি। বড়মেয়ে ঈদে মায়ের জন্য শাড়ি কেনে। ছোটমেয়ে নিজের হাতে সেলাই করে আনে মায়ের সালোয়ার কামিজ, সায়া, ব্লাউজ। বড় ছেলেটা কুরবানির গরু কেনার টাকা তুলে দেয় মায়ের হাতে। ছোট ছেলেটাই ব্যতিক্রম। সে কারো জন্য কিছু কেনে না। নিজের জন্য আবোল তাবোল কীসব লেখা টি-শার্ট কেনে। আর একই রঙের ফতুয়া কেনে বাবার জন্য। ছেলেমেয়েদের ভেতর বড় মেয়েটাকেই সবচেয়ে বেশি ভালোবাসেন আশরাফ সাহেব। কিন্তু ছোট ছেলেটা মাঝে মাঝেই তার কলিজা ধরে মোচড় দেয়। ছেলেটাকে তিনি ঠিক বুঝে উঠতে পারেন না।

আজকেও ছেলেটা একই কাজ করেছে। তৃতীয়বার মেসেজ পড়া শেষ করে বেয়ারা লোকমানকে ডাক দিলেন আশরাফ সাহেব।
– স্যার, কিছু লাগবে?
– অফিসের মাইক্রোবাসটা কি বাইরে?
– বড়সাহেব নিসিলেন, এইমাত্র গ্যারেজে ঢুকসে। স্যার, আপনার কী গাড়ি লাগবে?
– তুমি ড্রাইভারকে একটু খবর দাও। আমি এমডি স্যারকে বলে আসছি।

এমডি মোস্তাফিজুর রহমান খুবই ভদ্রলোক। গাড়ি কোথায় যাবে, কখন ফিরবে, এসব কিছুই জিগ্যেস করলেন না। শুধু রুম থেকে বেরিয়ে যাবার সময় হাসিমুখে আশরাফ সাহেবকে বললেন, সাবধানে যাবেন।

– হ্যালো, লিপির আম্মা? শোন, আমি অফিসের কাজে একটু বাইরে যাচ্ছি
– কোথায় যাচ্ছ?
– বড়বাজারের দিকে যাচ্ছি। অফিসের মাইক্রো আছে। ফিরতে দেরি হবে
– কয়টা বাজবে?
– দশটা বাজতে পারে
– এখন বাজে সাড়ে তিনটা, এতো কেনাকাটা একদিনে না করলে হয়না?
– জরুরি দরকার, আমি চেষ্টা করবো তাড়াতাড়ি ফেরার
– আটটার দিকে প্রেশারের ওষুধটা খেয়ে নিও
– আচ্ছা, এখন রাখি তাহলে
– চশমা আছে সাথে?
– হ্যাঁ আছে, লায়লা এখন রাখি।

ফোন রেখে আশরাফ সাহেব মেসেজ অপশনে ঢুকলেন। মুহিতের মেসেজটা আবার পড়লেন। আবারো পড়লেন। ড্রাইভার ছেলেটা নতুন এসেছে। আস্তে চলছে মাইক্রো। সাবধানে গিয়ার বদল হচ্ছে।

– এভাবে চালালে তো ভোর হয়ে যাবে পৌঁছতে। একটু জোরে চালাও। হাসতে হাসতেই বললেন আশরাফ সাহেব। ড্রাইভার গতি বাড়িয়ে দিলো।
– স্যার, সত্তুরের উপর যাইতে বড়স্যারের নিষেধ আছে
– আচ্ছা সত্তরেই চালাও, আমাকে কিন্তু সন্ধ্যার আগে পৌঁছায় দিতে হবে
– অসুবিধা নাই স্যার, যাইতে পারবো
– এসি বন্ধ করে দাও তো জয়নাল, আমি জানালা খুলে দিচ্ছি

আশরাফ সাহেবের হাত নিশপিশ করছে। ছেলের মেসেজ তিনি আর পড়তে চান না। বাঁ হাতে শক্ত করে চেপে ধরে রেখেছেন মোবাইল ফোন। দীর্ঘ চাকরিজীবনে তিনি সহজে ধৈর্য হারান নি। লায়লার মত রাগী স্ত্রীর সামনেও ধৈর্য হারান নি কখনোই। শক্ত মনের মানুষ হিসেবে তার সুনাম ছিল বরাবরই। কিন্তু আজকে তিনি মনকে শক্ত করতে পারছেন না। আশরাফ সাহেব আবার ঢুকলেন ইনবক্স ফোল্ডারে।

“বাবা, এটা তোমার কাছে পাঠানো আমার প্রথম মেসেজ। আজকে বাবা দিবস। কাছে থাকলে বলতে পারতাম না, দূরে থাকাতেই ভালো হয়েছে। আমি তোমাকে কত ভালোবাসি সেটা মুখে কোনোদিন বলিনি, কিন্তু আমার কাজকর্মে তুমি সেটা খুব ভালোভাবেই টের পাও। ছোটবেলায় মা যখন আমাকে মারত, তখন আমি মাকে বলতাম বাবা আসুক অফিস থেকে, বাবা তোমাকে বকা দেবে। তুমি সত্যিই অফিস থেকে এসে মাকে বকতে। মার খাওয়ার সময় আমি কাঁদতাম না, কিন্তু তুমি অফিস থেকে এসে জড়িয়ে ধরলেই আমি কেঁদে দিতাম। মধ্যবিত্ত সংসারে আমার অনেক ছেলেমানুষি শখ হয়তো পূরণ করতে পারো নি, কিন্তু আমাকে কখনোই জানতে দাওনি তোমার সংগ্রামের কথা।”

“বাবা, আমার এই জীবনের সবচেয়ে বড় পুরস্কার তুমি। সবচেয়ে দামি সম্পদ। সবচেয়ে অহংকারের জায়গা তুমি। বিখ্যাত কিংবা মহান মানুষদের জীবনী আমাকে প্রভাবিত করেনা। আমার কাছে তুমি এদের সবার চেয়ে সেরা। জানি আমি তোমার কাছে শ্রেষ্ঠ সন্তান হতে পারিনি, কিন্তু আমার কাছে তুমিই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ বাবা, শ্রেষ্ঠ মানুষ, শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্ব।”

“বাবা, আমি তোমাকে জড়িয়ে ধরে এই কথাগুলো বলতে পারিনা, তাই মেসেজ করলাম। কিন্তু তুমি তোমার বাবাকে কিছুই বলতে পারো নি কোনোদিন। গ্রাম থেকে অনেক দূরে চাকরি করার কারণে দাদাজানের কাছাকাছিও থাকতে পারো নি। দাদাজানকে তুমি কত ভালোবাসো সেটা আমি কিছুটা হলেও বুঝি। উনি বেঁচে থাকলে তোমাকে বলতাম একবারের জন্য হলেও আজকে সব সংকোচ ঝেড়ে ফেলে দাও। বুকের ভেতরের সব কথা বলে দাও তোমার বাবাকে। কিন্তু সেই সুযোগ নেই। তাই বলবো, অফিসের মাইক্রো নিয়ে এক্ষুনি বাড়িতে রওনা দাও। দাদাজানের কবরের পাশে দাঁড়িয়ে আটান্ন বছরের না বলা সব কথা বলে দাও। ছোটবেলায় আমি যেমন তোমাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতাম, তুমি তোমার বাবার কবর ছুঁয়ে সেভাবে কেঁদে বুক ভাসাও। আমি জানি, দাদাজান সব শুনবেন। দাদাজানের আত্মা তোমার মাথায় স্নেহের পরশ বুলিয়ে যাবে। কারণ তিনিও পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ বাবা ছিলেন।”

বিকেলের রোদ এসে পড়ছে কালো পিচের নির্জন রাস্তায়। দুপাশে ধানক্ষেত। নতুন বৃষ্টিতে নতুন ধান রোপা হয়েছে জমিতে। গাছের পাতার ফাঁক গলে উঁকি দিচ্ছে সূর্য। নির্জন হাইওয়ে ধরে ছুটে যাচ্ছেন আশরাফ সাহেব। একপাশের খোলা জানালা দিয়ে ঢুকে মাইক্রোবাসকে তীক্ষ্ণ বর্শার মতন এফোঁড় ওফোঁড় করে বেরিয়ে যাওয়া বাতাস এলোমেলো করে দিচ্ছে আশরাফ সাহেবের ফিনফিনে চুল, সাদা হয়ে যাওয়া দাঁড়ি। বাবার স্মৃতি এফোঁড় ওফোঁড় করে দিচ্ছে তার বৃদ্ধ হৃদপিণ্ডকে। বাতাসের দমকে শুকিয়ে যাচ্ছে চোখ থেকে নেমে আসা নোনতা জলের স্রোত। না, ভুল বললাম। তিনি আশরাফ সাহেব নন। তিনি আশরাফ। তালবাড়িয়া গ্রামের দরিদ্র রাজমিস্ত্রী শেখ আবুল হোসেনের মেজো ছেলে আশরাফ।

১,৫৪৫ বার দেখা হয়েছে

১৬ টি মন্তব্য : “সমান্তরাল”

  1. মোকাব্বির (৯৮-০৪)

    দিনে অন্তত একবার হলেও মানিব্যাগ খোলা হয়ে থাকে বিভিন্ন কারণে। শত ব্যস্ততার মাঝেও প্রতিবার প্রায় এক সেকেন্ড ব্যয় করা হয় ছবিটির পেছনে। এ আমার প্রতিদিনের সাদাকালো বাবা দিবস।

    লেখার জন্য :hatsoff: লেখা দিতে থাক।


    \\\তুমি আসবে বলে, হে স্বাধীনতা
    অবুঝ শিশু হামাগুড়ি দিল পিতামাতার লাশের ওপর।\\\

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।