প্রিয় বই- ‘পুতুল নাচের ইতিকথা’ -মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়

এক অদ্ভুত রঙ্গমঞ্চ আমাদের এ জীবন।প্রতিটি মানুষের স্বতন্ত্র জীবন বৈচিত্র্য, নর-নারীর এক অমোঘ আকর্ষণ,যুগ যুগ ধরে টিকে থাকা ভুয়োদর্শনের উপর অন্ধবিশ্বাস,সার্থক জীবনের নামে এক মরীচিকার পিছে ছুটে চলা এইসব মিলিয়ে ফুলে-ফেঁপে ওঠা জীবনকে সঙ্গী করে আমাদের বেঁচে থাকা।
বইটিতে মানিক বন্দোপাধ্যায় বলেছেন,এক গ্রাম্য যাপিত-জীবনের গল্প।আপাত দৃষ্টিতে যাকে বৈচিত্র্যহীন,সঙ্কীর্ণ স্বকেন্দ্রিক বলে ভুল হয়।কিন্তু মানিক দেখিয়েছেন এর মাঝেও আছে কত বৈচিত্র্য, কত রহস্য,ক্ষুদ্র-বৃহৎ ঘটনা প্রবাহের কত বিশাল প্রভাব সেখানকার মানুষগুলোর জীবনে।তারা বাস করে এক ঘোর লাগা জীবনে।সেখানে নিজেদের জীবন কেউ পরিবর্তন করতে পারেনা।নিজেদের সৃষ্ট সুতোর জালে নিজেরাই আটকে পড়ে অনেকটা পুতুলের মত নেচে যায় তারা অদৃশ্য কোন শক্তির দ্বারা প্রভাবিত হয়ে।

শশী নিজের সাথেই দ্বন্দ্বযুদ্ধে জড়িয়ে পড়া পরাজিত এক সত্তা।হৃদয়,আবেগের বশবর্তী হয়েও সে চায় যুক্তি দ্বারা জীবন চালনা করতে।তাই সে বারবার নিজের কাছে নিজেই পরাজিত হয়।কুসুম শশীকে ভালোবাসে।সামাজিক বিধি-নিষেধের তোয়াক্কা না করেও শশীকে প্রেম নিবেদন করে নানা উপায়ে।কিন্তু শশীর বিক্ষিপ্ত মনের অস্থিরতা তার অনুভূতিগুলোকে অবহেলা করে।মৃত্যু ঘটে কুসুমের হৃদয়ের।প্রকৃতপক্ষে মানবসৃষ্ট এই সঙ্কীর্ণ সমাজে আমরা অনেকেই শশীর মতই বেঁচে থাকি।নিজের আবেগকে জোর করে অবদমিত করি সামাজিকতা নামক এক দুর্ভেদ্য যুক্তির জালে জড়িয়ে।

ঘোর লাগিয়েছে কুমুদের বোহেমিয়ান জীবনধারা।অনর্থক চাওয়া-পাওয়ার জালে আটকে পড়া এ জীবনকে এক চমৎকার অর্থহীন অর্থ দিয়ে ফেলেছে সে।প্রত্যাশার পাহাড় অবহেলা করে বেঁচে থাকাকে রূপ দিয়েছে এক গতিশীল কাব্যে,এক ছন্নছাড়া জাদুবাস্তবতায়।জীবন মানে তার কাছে শুধু কোন কিছুর মোহে ছুটে বেড়ানো নয়,বরং নির্মোহ এক প্রত্যাশায় জীবনকেই ছুটিয়ে বেড়ানো।

যাদবের ঘটনার মধ্য দিয়ে মানিক আমাদের জানিয়ে গেছেন সত্যের মোড়কে ঢাকা এক ভয়াবহ মিথ্যের গল্প।যুগ যুগ ধরে হয়তোবা এভাবেই টিকে আছে আপাত দৃষ্টিতে পাপ-পতনের হাত থেকে জীবনকে বাঁচিয়ে চলার নামে জীবনকে সঙ্কীর্ণ করে ফেলা কোন ভুয়োদর্শন

গোপালের চরিত্র আমাদের দেখিয়েছে ভয়াবহ স্বার্থপর ও আত্মকেন্দ্রিক এক মানুষের জীবনযাত্রাকে।যারা সুখ খোঁজে অর্থ-সম্পদে,ক্ষমতার প্রকাশে।আর চায় এসবের মাঝেই তাদের অস্তিত্বকে অমর করতে।
নানা বিচিত্র চরিত্রের জীবনধারার মাঝে আরো আছে মতির মত অপরিণত,আবেগী নারীর গল্পকথা, পরাণের মত উত্তাপহীন জীবনমুখী চরিত্র,আছে ভালোবাসার ভুল মায়ায় জড়ানো জয়ার জীবনকাহিনীও।

জীবনের নানা বিচিত্র ভাবপ্রবণতা,নানা শ্রেণী ও সমাজের ভিন্ন ভিন্ন চরিত্রের গল্পগাঁথা,যুক্তি দিয়ে জীবন চালাতে গিয়ে হৃদয়ের মৃত্যু এসবই মানিক অত্যন্ত মুন্সীয়ানার সাথে ফুটিয়ে তুলেছেন এই কালজয়ী উপন্যাসে।

এই বই মনের এক কোণে কেন যেন একটা হাহাকারের সুর বাজিয়ে দেয়। আসলেই কি আমরা তাহলে পুতুল?নিয়তির অদৃশ্য শক্তির দ্বারা চালিত এক অনিবার্য স্রোতের টানে ভেসে চলেছি?নাকি আমাদের ভয়,জীবন সম্পর্কে অজ্ঞতা,বিকাশের পথে নিজেদেরই সৃষ্ট অন্তরায় এসবই আমাদের পুতুল বানিয়ে নাচাচ্ছে? সমাজ,সংসার সব কি আসলেই মিছে?জীবনের ভার বয়ে নিরন্তর শুধু শুন্যতার দিকেই ছুটে চলা?নাকি ক্ষুদ্র এ জীবনকে নিজের মত করে স্বার্থপর বানিয়ে বেঁচে থাকা?
হয়তোবা জীবন মানেই এভাবে বিচিত্র ভাবে, খাপছাড়া ভাবে বেঁচে থাকা।জীবনকে শ্রদ্ধা করে তাকে আনন্দময় করে তুলে সবার সাথে যুক্ত হয়ে,বাঁচার মত করে বেঁচে থাকা।এটাই হয়তো আমাদের জীবন নামের পুতুল নাচের ইতিকথা।

১,৬৮৮ বার দেখা হয়েছে

৮ টি মন্তব্য : “প্রিয় বই- ‘পুতুল নাচের ইতিকথা’ -মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়”

  1. সাবিনা চৌধুরী (৮৩-৮৮)

    প্রতি দুই বছর পরপর যারা নিজের বাড়ি বেড়াতে আসে তাদের জন্য ফ্রন্টরোল ছাড়া গতি নাই, ভাইয়া! লাগাও দশটা!

    সেই কোনকালে পড়েছিলাম পুতুলনাচের ইতিকথা বইটি। চরিত্রগুলোর নামও মনে নেই প্রায়। তোমার সাথে হারানো একটা সময় ঘুরে এলাম যেন!

    ঈদের শুভেচ্ছা রইল, ভাইয়া!

    জবাব দিন
  2. আমিন (১৯৯৬-২০০২)

    'পুতুল নাচের ইতিকথা' -- উপন্যাসটি পড়া হয়েছিলো আজ থেকে প্রায় বছর আট আগে। খুব সম্ভবত আমার পড়া (যদিও তালিকা খুবই ছোট) সেরা উপন্যাসের তালিকা করলে এটা মোটামুটি প্রথম দিকে থাকবে। লেখাটা পড়ে শেষ করবার পরে মাঠা ঝিমঝিম করছিলো একটা চমৎকার কিছু শেষ করবার আনন্দে এবং জীবনের অন্তর্নিহিত বিষণ্ণতার সন্ধান লাভের হতাশায় অদ্ভুত অনুভূতি কাজ করেছিল।

    আমার কাছে দারুণ লেগেছিলো শশী এবং কুমুদ দুটি পরস্পর বিপরীত চরিত্রের পাশাপাশি এগিয়ে যাওয়া। দিন শেষে মানিক অবশ্য হুট করেই কুমুদকে সরিয়ে দিয়ে পুতল নাচের ইতিকথার মাঝে শশীর অন্তর্দ্বন্দ্বকেও মুখ্য করে ফেলেছেল। ফ্রয়েডীয় মনস্তত্ত্বের দ্বারা মানিক খুব প্রভাবিত ছিলেন সেটা এই উপন্যাসে বুঝা যায় খুব পরিষ্কারভাবে। একটি দৃশ্যের কথা মনে করে আমার খুবই হাহাকার লাগে। সেটা হলো কুসুমদের বাড়ির জায়টা পরিত্যক্ত হয়ে যাওয়ার পরে তার পাশ দিয়ে যাবার সময়ে শশীর বিষণ্ণতা বোধ। অনেক আগে পড়া বলে উপন্যাসের আরো সূক্ষ্ম দিক নিয়ে বিস্তারিত বলতে পারছি না।

    তবে মুগ্ধ হলাম তোমার দেখার চোখে। বয়সের তুলনায় তোমার পাঠকসত্ত্বাকে একটু বেশিই পরিণত মনে হল।

    পাঠ প্রতিক্রিয়া লেখালেখি জারি থাকুক।

    শুভকামনা।

    জবাব দিন
    • সৌরভ(০৬-১২)

      ধন্যবাদ ভাইয়া।
      পাঠক নামক সত্ত্বাটির জন্মানোর পিছনে আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যার ও তাঁর বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের অবদান একদম পুরোভাগে।এই রিভিউটাও মূলত আমি পাঠচক্রে বইটা পড়বার পর লিখেছিলাম।
      আমার জীবনে খুব বেশী মাত্রায় প্রভাব ফেলা আর অসম্ভব ভালো লাগা একটি উপন্যাস এটি। বরাবরই ফ্রয়েডীজম দ্বারা আক্রান্ত মানিকের এই উপন্যাসে সার্ত্রে কিংবা কাম্যুর মত অস্তিত্ববাদের ও বেশ খানিকটা ছোঁয়া দিয়ে গেছেন মানিক।সম্পূর্ণ আমাদের সমাজভিত্তিক। সেই সাথে প্রবল ভাবে নাড়া দিয়ে গেছেন সমাজের বেশ কিছু গেড়ে বসা দর্শনকেও 😛 ।
      নিয়তিতে আমার আস্থা বরাবরই কম ছিল।তারপর ও মাঝে সাঝে মনে হয় আসলেই আমরা মনে হয় পুতুল।আড়ালে বসে ভাগ্য নামক এক অদৃশ্য শক্তি নেড়ে চলেছে।
      আবারো ধন্যবাদ কস্ট করে এহেন রসকষহীন একটা লেখা পড়বার জন্য 😀


      মুক্তি হোক আলোয় আলোয়...

      জবাব দিন
  3. পারভেজ (৭৮-৮৪)

    এটা পড়ে বুঝলাম, অসময়ে মানিকে হাতেখড়ি হওয়াটা ভুল ছিল।
    ৭৯ সালে ক্লাস এইটে থাকতে পড়েছিলাম এই পুতুল নাচের ইতিকথা আর পদ্মানদির মাঝি।
    পরে ছবি দেখে ওটার অন্তর্নিহিত অর্থ কিছুটা হলেও উদ্ধার করতে পেরেছিলাম।
    কিন্তু এটা আসলে বিস্মৃতির অতলেই চলে গেছে।
    অন্তত আমার জন্য।
    বুঝলাম - "আবার পড়িতে হইবে........."


    Do not argue with an idiot they drag you down to their level and beat you with experience.

    জবাব দিন
    • সৌরভ(০৬-১২)

      'পুতুল নাচের ইতিকথা' আমিও ক্লাস ইলেভেনে থাকতে একবার হাতে নিছিলাম ভাই 😛
      বলা বাহুল্য কিচ্ছুই বুঝি নাই, এক স্যার ছিলেন উনি শুধু ফ্রয়েডিজম নিয়েই কথা বলতেন।
      এটা বিশ্বসাহিত্যে জায়গা করে নেবার মতই একটা বই ,সময় করে পড়ে ফেলেন ভাই 🙂


      মুক্তি হোক আলোয় আলোয়...

      জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।