পর্বতশৃঙ্গে

পর্বতশৃঙ্গে

“পাহাড়-চুড়ায় দাঁড়িয়ে মনে হয়েছিল

আমি এই পৃথিবীকে পদতলে রেখেছি

এই আক্ষরিক সত্যের কাছে যুক্তি মূর্ছা যায়”। – সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

সত্যজিত রায়ের ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’ ছবিটি আমি দেখি ১৯৯২ কি ৯৩ সনে। ১৯৬২ সনে কলকাতায় মুক্তি পাওয়া এই ছবিটা যদিও ব্যবসা সফলতার মুখ দেখেনি অথবা আন্তর্জাতিক কোন চলচ্চিত্র উৎসবে পুরস্কার পায়নি, তারপরেও আমার মনে হয়েছে সত্যজিতের চলচ্চিত্রগুলোর মধ্যে অন্যতম শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র এটা। প্রকৃতিই যে একটা সিনেমার মুখ্য চরিত্র হতে পারে তার অনবদ্য উদাহরন এই ছবি। এক রায় বাহাদুরের পরিবার দার্জিলিং বেড়াতে এসেছেন। পরিবারের সদস্যগুলো শ্রেণী সমাজের ভণ্ডামি, কৃত্রিমতা, অন্তসারহীনতা ও কুপমন্ডুকতাকে ধারন করার কারনে কখনই মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারেনা এবং তাদের দৃষ্টি নিবদ্ধ থাকে নীচের দিকে। তাদের এই সমস্যাসঙ্কুল অবনত জীবনের প্রতিফলন ঘটে কাঞ্চজঙ্ঘার দৃশ্যাবলীতেও! ১৭ দিনের এই ভ্রমনে একবারের জন্যেও কাঞ্চজঙ্ঘার দর্শন পাওয়া যায়না। কাঞ্চনজঙ্ঘা তার মুখ লুকিয়ে রাখে কুয়াশা আর তুষারের অবগুণ্ঠনে। অবশেষে ভ্রমনের শেষপ্রান্তে যখন তাদের মনের কুয়াশা দূরীভূত হয়ে যায়, তখনি শুধুমাত্র শেষ বেলায় রৌদ্র ছায়ার সাথে লুকোচুরি খেলার পর কাঞ্চনজঙ্ঘা তাঁর স্বর্ণালী আভা ছড়াতে শুরু করে!

২০১০ সালে আমি সরকারী কাজে সেনাবাহিনীর আরও কয়েকজনের সাথে গিয়েছিলাম জার্মানির মিউনিখে। জার্মানির একটা আই টি কোম্পানির বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা দেখে আসাই আমাদের এই বিদেশ ভ্রমনের প্রধান উদ্দেশ্য। এই কোম্পানির আগ্রহের কারনেই আমরা দেখতে গিয়েছি আল্পস পর্বতমালাতে অবস্থিত ২,৯৬২ মিটার উঁচু ৎসুগষ্পিৎসে (Zugspitze) জার্মানির সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ। জার্মানি আর অস্ট্রিয়ার সংযোগ স্থলে অবস্থিত এই পর্বতশৃঙ্গ। আমার জীবনে এটাই সর্বপ্রথম কোন পর্বতশৃঙ্গে আরোহণ। আমরা যখন পর্বতের পাদদেশে পৌঁছলাম তখন প্রায় দুপুর। দূরে সোনালি রোদে ৎসুগষ্পিৎসে’র শীর্ষ চিকচিক করছে। তিনভাবে এই পর্বত শীর্ষে আরোহণ করা যায়। মাউনটেইন ট্র্যাকিং এর মাধ্যমে, ক্যাবল কারের মাধ্যমে আর ট্রেনে চড়ে। আমাদের গাইড এক প্রাণবন্ত জার্মান যুবক, নাম ফিলিপ। ওকে দেখলে বা ওর সাথে কথা বললে কখনই জার্মানরা যে ভীষণ অহংকারী জাতি, কখনই আপনার তা মনে হবেনা। ফিলিপ সিদ্ধান্ত নিলো আমরা শৃঙ্গে উঠবো ক্যাবল কারে এবং ওখান থেকে নেমে আসবো ট্রেনে করে।

ক্যাবল কারটা যখন আমাদেরকে নিয়ে পাহাড়ের ওপর দিয়ে মহাশুন্যের মধ্য দিয়ে চলা শুরু করল আমার মনে হল আমি বোরাকে করে চলে যাচ্ছি পৃথিবী থেকে দূরের কোন গ্রহে, যেখান থেকে আমি আর কোনোদিন ফিরে নাও আসতে পারি! আমার মনে পরে গেল সুদূর বঙ্গোপসাগরের মোহনায় অবস্থিত আমার প্রিয় দেশ, আমার পরিবার এবং আমার দুই মেয়েকে। আর যদি কোনদিন ফিরে না আসা হয়! অথবা ক্যাবল কারের তার ছিঁড়ে আমি যদি পরে যাই বরফাচ্ছাদিত কোন গহীন উপতাক্যায়! দূরে আরও কয়েকটা ক্যাবল কার চলছে। একবার মনে হল আমাদের ক্যাবল কারটা ওপর থেকে নেমে আসা আর একটি ক্যাবল কারের সাথে লেগে যাবে! আমি মনে মনে ভীষণ শঙ্কিত। একসময়ে আমরা নীল আকাশের পটভূমিতে সবুজ সাদায় আবৃত ছোট বড় পাহাড়গুলোকে অতিক্রম করে মেঘের রাজ্যে ঢুকে পড়লাম! আমাদের ক্যাবল কারের চারপাশ জুড়ে মেঘ! কুয়াশায় ভিজে যাবার কারনে ক্যাবল কারের ভেতর থেকে কিছুই আর দৃশ্যমান নয়। আমি এসি’র ভেতরেও ঘেমে উঠছি। মাধ্যাকর্ষণের টানে আমার শরীরের মধ্যে শিরশির অনুভব করছি। আমার মনে পরে গেল ছোটবেলায় পড়া ‘মেঘনাদ বধ’ কাব্যের কথা। মেঘনাদের অন্য নাম ছিল ইন্দ্রজিত যিনি মেঘকে আড়াল হিশেবে ব্যবহার করে শত্রুদের ওপর তীর ছুড়তেন। আমি বুঝতে পারলাম, এটা কবির পাগলা কল্পনা ছাড়া আর কিছুই ছিলনা। কারন, মেঘের ভেতর বা পিছন থেকে কখনই দূরের বা কাছের কিছুই দেখতে পাওয়া সম্ভব নয়, তা সে শত্রু বা মিত্র যেই হোকনা কেন!

ক্যাবল কার থেকে নামার সময়ে মনে হল স্পেস ষ্টেশন থেকে নামছি! মহাশুন্যের ভেতরে এরা নগর গড়ে রেখেছে! বিল্ডিং গুলোর ভেতর থেকে কোনোভাবেই বোঝার উপায় নেই যে, আমি পৃথিবী পৃষ্ঠ থেকে অনেক ওপরে উঠে এসেছি। সবচেয়ে উঁচুতলাটা কাঠের দেয়াল দিয়ে ঘেরা। চারপাশটায় কাঁচের জানালা । কিন্তু কুয়াশার কারনে কিছুই দেখা যাচ্ছেনা। খুব শীত করছে। আমাদেরকে উত্তপ্ত করার জন্যে ফিলিপ বিয়ার এবং কফির অর্ডার দেয়। এই খানেই ঘটলো সবচেয়ে মজার ব্যাপার। এহসান ফিলিপের সাথে বাংলাদেশের শেয়ার বাজার নিয়ে কথা বলা শুরু করে দিয়েছে। সে এমনভাবে কথা বলছে যে মনে হচ্ছে সে এখান থেকে শুধুমাত্র বাংলাদেশের শেয়ার বাজার নয়, পুরো পৃথিবীর অর্থনীতিকেই নিয়ন্ত্রন করতে সক্ষম! ফিলিপ মুগ্ধভাবে তার কথা শুনছে। আমার হাসি পেয়ে গেল। অলিম্পাস থেকে দেবতা জিউস অথবা অন্নপূর্ণা থেকে শিব বোধ হয় এভাবেই মর্তের মানুষদের সকল কার্যক্রম নিয়ন্ত্রন করতেন। আমার ঘুনাক্ষুরেও মনে হল না এর মাত্র দুই মাস পরেই বাংলাদেশের শেয়ার বাজারে প্রবল ধ্বস নামবে যা নিয়ন্ত্রন করার ক্ষমতা খোদ সরকার কেন, মহাশক্তিশালী শিব বা দেবতা জিউসেরও থাকবেনা!

পর্বতের চুড়ায় কয়েক বর্গ হাত জায়গা জুড়ে বরফ জমে আছে। বছরের কোন সময়েই নাকি এই বরফ গলেনা! পাশেই দেয়ালে ভারতীয় এক সন্তের বানী দেয়ালের গায়ে লিপিবদ্ধ করে রাখা হয়েছে। তিনি চিরন্তন শান্তির কথা বলেছেন। আমার মনে হল পর্বতের চূড়া দেবতা বা সন্তদের জন্যেই বসবাসের জন্য ঠিক জায়গা, আমার মতন সাধারন মানুষের জন্যে নয়! আমার খুব শীত করছে। আমি সীমান্তের দুই পারে থাকা জার্মান এবং অস্ট্রিয়ার দুই দোকান থেকে আমার দুই মেয়ের জন্যে স্যুভেনির কেনার জন্যে ব্যস্ত হয়ে পড়ি!

– মোহাম্মদ আসাদুল্লাহ

৩,১২৯ বার দেখা হয়েছে

৫ টি মন্তব্য : “পর্বতশৃঙ্গে”

  1. ইসতিয়াক আহমেদ (৯৮-০৪)

    পাহাড়ের টান বড় কঠিন ভাই, সেই কলেজে রাতে জানালা দিয়ে দেখা এক টুকরো আকাশ আর ছোট কিছু টিলার টান আজো পিছু ছাড়েনা


    শ্রান্ত পথিক আমি, বেলাশেষে-
    চারপাশে অভেদ্য-দুর্গম পাঁচিল তুলে
    বসে থাকি নষ্ট ঘরে
    হিসাবের খাতা মেলে খুঁজি কতোটা অপচয় হলো।

    জবাব দিন
  2. রাজীব (১৯৯০-১৯৯৬)

    কাঞ্চনজংঘা আমারো প্রিয় ছবি।
    সেভাবে দর্শকপ্রিয় না হবার কারণ হয়ত এতে অনেক জ্ঞানী টাইপ কথা আছে, ঠিক যেমন টি রয়েছে আগন্তুক এ।


    এখনো বিষের পেয়ালা ঠোঁটের সামনে তুলে ধরা হয় নি, তুমি কথা বলো। (১২০) - হুমায়ুন আজাদ

    জবাব দিন
  3. খায়রুল আহসান (৬৭-৭৩)

    অবশেষে ভ্রমনের শেষপ্রান্তে যখন তাদের মনের কুয়াশা দূরীভূত হয়ে যায়, তখনি শুধুমাত্র শেষ বেলায় রৌদ্র ছায়ার সাথে লুকোচুরি খেলার পর কাঞ্চনজঙ্ঘা তাঁর স্বর্ণালী আভা ছড়াতে শুরু করে! - খুব সুন্দরভাবে রিলেট করেছো।

    জবাব দিন
  4. খায়রুল আহসান (৬৭-৭৩)

    "আমার মনে হল পর্বতের চূড়া দেবতা বা সন্তদের জন্যেই বসবাসের জন্য ঠিক জায়গা, আমার মতন সাধারন মানুষের জন্যে নয়!" - হ্যাঁ, ঠিক বলেছো। পর্বতাবাস সাধারণের জন্যে নয়, এটা চিরন্তন সত্য কথা।
    লেখা বরাবরের মতই ভালো লেগেছে।

    জবাব দিন

মওন্তব্য করুন : খায়রুল আহসান (৬৭-৭৩)

জবাব দিতে না চাইলে এখানে ক্লিক করুন।

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।