দ্যা গ্রেটেস্ট , মাই ওন স্টোরি

সর্বকালের সেরা মুষ্টিযোদ্ধার আত্মজীবনী ‘দ্য গ্রেটেস্ট – মাই ওন স্টোরি’ । মোহাম্মদ আলীর জবানীতে লিখেছেন রিচার্ড ডারহাম।
‘কালের কন্ঠ’তে ধারাবাহিক ভাবে অনুবাদ করছি আমি। ভালো হচ্ছে নাকি খারাপ, সেই প্রতিক্রিয়া জানার জন্যে সিসিবিতে দেয়ার লোভটাও সামলানো গেল না! আজ দিচ্ছি ধারাবাহিকের পরের কিছু পর্ব।
(অনেক দিন ফাঁকিবাজি করলাম। লম্বা সময় ধরে এই ধারাবাহিকটার অনেক পর্ব সিসিবিতে দিচ্ছিনা। কাইয়ুম ভাইকে একটা কমেন্টে বলসিলাম সামনে অনেক পর্ব আসতেসে, আজকে চলে আসলো।)
আলি-৭
জ্ঞান ফিরতেই মনে হলো মুখের ভেতরটা কাঁটাতার দিয়ে ঠাসা! পাশেই এক ডাক্তার মনোযোগ দিয়ে এক্স -রে প্লেট দেখছে। আমাকে জেগে উঠতে দেখেই অত্যন্ত আগ্রহ নিয়ে আমাকে বোঝাতে শুরু করলো সে, “ এই দেখো। এখানেই আঘাত পেয়েছিলে তুমি, এখান থেকে দাঁত তুলতে হয়েছে। চোয়ালের সবচেয়ে দূর্বল জায়গায় আঘাত পেয়েছিলে তুমি।” মুখের ভেতরটা তারে ভর্তি,টুকরো টুকরো হাড় গুলোকে তার দিয়ে বেঁধেই তো জোড়া লাগানো হয়েছে। বলেই চলেছে ডাক্তার, তিন থেকে চার মাসের মধ্যেই ভালো হয়ে যাবে। তখন মনে হবে একদম নতুন।” আমি কিছু বলতে চাইছিলাম, তখন ডাক্তারটা হাসতে হাসতে বললো, ওহ, তোমাকে তো বলাই হয়নি। বেশ কিছুদিন ভালো করে কথা বলতে পারছো না তুমি, শুধু দাঁত নাড়িয়ে যতটুকু বলতে পার”। অনেকণ ধরে মনে মনে সাহস জুটিয়ে নিয়ে মুখটা খুললাম, “ এটাই আমার সবচেয়ে বড় শাস্তি, নরটনকে একটা উচিত শিক্ষা দিতেই হবে”।
আমি জানি যা বলেছি তা অস্ফুট কিছু অবোধ্য শব্দ ছাড়া আর কিছুই নয়, তাই শুনে অন্যরা হাসলো। কিন্তু আমি জানি নরটনের সঙ্গে এর বদলা নিতেই হবে। তবে এই লড়াইএর পর সবচেয়ে বেশি ভুগছে মরিয়ম, আমাদের ৬ বছরের মেয়ে এবং অন্যান্য বাচ্চারা। ওদের মা-বাবা দুজনেই হাসপাতালে, ওরা কি ভালো আছে?
প্রত্যেক সকালেই বান্ডিনি আসে এক গাদা খবর নিয়ে। যেমন আজকে সে বললো, “ হাওয়ার্ড কোসেল বলছে তুমি নাকি শেষ হয়ে গেছ। সাড়ে তিন বছরের নির্বাসনের পর তোমার মাঝে নাকি আগের সেই ধার আর নেই। ঐ বাজে লোকটা তোমাকে সস্তা প্রমাণ করতে চায়,অথচ মাত্র গতকালকেই সে বলছিলো তুমি অনেক বড় মাপের বক্সার”।
আমি দাঁতের ফাঁক দিয়ে অনেক কষ্টে কিছু শব্দ বের করি, “কোসেল কে দোষ দিও না। আমিই দায়ী, ডুবন্ত জাহাজে একমাত্র বোকারাই থাকে”।
একটা সময় আমাকে ঘিরেই উচ্ছাস ছিলো অনেক ভক্ত, অনুরাগিদের। এখন সবাই নরটনের পিছনে ছুটছে। এটা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন,তারচেয়েও অবাক করার বিষয় আমি এটা মানসিক ভাবে মেনেও নিয়েছি।
দ্বিতীয় দিন সকালে আচমকা একটা খবর পেলাম, নরটনের ম্যানেজার নাকি আমার ফোন করেছিলো। “সে বলেছে, নরটন নাকি এখানে এসে আমাকে সম্মান দেখাতে চায়” বললো কিলরয়। “ এটা কি ঠিক হবে?” ক্যাপ্টেন জোশেফ তো শুনে লাফিয়ে উঠলো, “সে কি চায় এখানে”? বান্ডিনি ওকে শান্ত করলো আর আমি ভাবছি এবারই প্রথম! হ্যাঁ এবারই প্রথম কোন বিজয়ী আমাকে দেখতে আসছে, আর আমি মার খেয়ে হাসপাতালের বিছানায়।
আমি অবশ্য খবর পেয়েছিলাম, আমার সাথে লড়াইটা জেতার পর বেশ বাহারী পোশাকেই ঘুরে বেড়িয়েছিলো নরটন। কালো স্কিনটাইট প্যান্ট,উজ্জ্বল রঙ এর বুক খোলা ইতালিয়ান শার্ট। অবশ্য বিজয়ীদের একটু “নায়ক” হতেই হয়!
নার্স নিয়ে এলো নরটন আর ওর ম্যানেজার ফুচ কে,আস্তে আস্তে কিছু কথা হলো নরটনের সঙ্গে-
“ফুচ খুব ভালো ম্যানেজার”-কোন উত্তর নেই।
কি মনে হয়, ওর অন্যান্য বক্সারদেরতো আমি হারিয়েছি, তুমি জিতে গেলে কিভাবে? রহস্যটা কি?
আমার মনে হয় ফুচ আমাকে পছন্দ করে, “পছন্দ না হলে আমি কাউকে নেই না”-জানিয়ে দিলো ফুচ। কাউকে অপছন্দ হলেই তাকে ছাড়িয়ে দেই আমি একজন ফাইটারকে নিজের ছেলের মতো ভালবাসতে হয়,শুধু টাকার জন্য সে তোমার হয়ে মার খাবে এটা ভাবা অন্যায়”।
“ভাবছি ওকে হেভিওয়েট চ্যাম্পিয়নশিপে নামাবো, কি বলো ?” জানতে চাইলো ফুচ।
তারমানে জর্জের বিপক্ষে।
ওকে হারাতে পারলে এক মিলিয়ন পাওয়া যাবে,স্যাডলার এই সুযোগটা নেবেই।
নরটনকে দেখলাম, ওর চোখে মুখে বিজয়ীর আত্মবিশ্বাস।
তুমি একজন ভালো বক্সার নরটন, তমার হাতে বেশ কিছু ভালো মার আছে। পিছু হটো না, কারও কাছ থেকে লুকিয়ে থেকো না”।।
আলী-৮

হাসপাতালে আসার আগেও নরটন এর সাথে আমার দু একবার দেখা হয়েছিলো, আমার ট্রেনিং ক্যাম্পে বোধহয় এসেছিলো একবার। চলে যাবার আগে বললো, ‘তোমার পাঞ্চিং ব্যাগটা দারুণ, হাত চালালেই অন্যরকম লাগে।’ ‘ওটা তোমার জন্য উপহার, তুমি নিয়ে যাও‘ বললাম আমি। এমন সময় চেয়ার ছেড়ে উঠে এলো ফুচ, একটা ছবি, প্লিজ! বাচ্চাদের দেখাবার জন্য। কোন ছবি নয়, নিষেধ করলো বান্ডিনি, আর আমি কিছু বললাম না। ‘সৌভাগ্যক্রমে’ ওদের সঙ্গে একজন পেশাদার ফটোগ্রাফার ছিলো, সেই ছবিটা তুললো। ভাঙ্গা চোয়াল নিয়ে বিছানায় শুয়ে থাকা আমার মাথার কাছে
হাস্যোজ্জ্বল নরটন!
পরদিন সকালেই বুঝতে পারলাম, ছবিটা বাচ্চাদের দেখানোর জন্য ছিলো না, বরং দুনিয়াকে দেখানোর জন্য। সব বড় বড় কাগজে ছাপা হলো সেই ছবি, শিকারী আর শিকার। আমি স্বিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম। যা কিছুই হোক না কেন নরটনকে একটা উচিত শিা দিতেই হবে। আমাকে যদি বিনে পয়সায় লড়তে হয় তাও আমি রাজি।
সকালে জর্জ ফোরম্যানের ম্যানেজার ডিক স্যাডলার এলো তার উকিল হ্যারি বার্নেটকে নিয়ে। স্যাডলারের সঙ্গে আমার প্রথম দেখা হয়েছিলো ১৭ বছর বয়সে। আমার লুইভিল এর স্পন্সররা তখন আমাকে পাঠিয়ে ছিলো স্যান ডিয়াগোতে, আর্চি মুরের ক্যাম্পে। সেখানে আমার প্রশিক্ষক ছিলো টাকমাথার লোকটা। এখন আমার সামনে চুলহীন মাথা থেকে টুপিটা খুলে মাথা চুলকোচ্ছে । ‘কি ব্যাপার, এখানে কি মনে করে?‘ ‘ফোরম্যান এর সাথে লড়াই এর জন্য ৫ মিলিয়ন ডলার দেবে বলছে, দুনিয়া তোমার আর ফোরম্যানের লড়াই দেখতে চায় আলী। এই খেলায় এখনো তুমিই সবচেয়ে বড় নাম! আর কোন বক্সারের জন্যে স্পনসররা এতো টাকা দেবে না। আমি তোমাকে শুধু একটা কথাই বলতে চাই, এই সুযোগটা হাত ফস্কে বেরিয়ে যেতে দিও না। কারণ এটা একটা খেতাব জেতার লড়াই চোয়ালটা সেরে উঠলেই এই লড়াইটা হবে, তারপর আমাদের কাছে থাকবে অঢেল টাকা। নরম জুতোটা মেঝের সঙ্গে ঘসতে ঘসতে চকচকে চোখে বলে যাচ্ছে স্যাডলার, ‘ মনে কর টাকার উপর দাঁড়িয়ে আছো তুমি,এটা ৫ মিলিয়ন ডলারের মামলা। বোকামি করোনা’।
সেরে উঠলেই তুমি জর্জের বিপে রিং এ নামছো।
সেরে উঠে আমি নরটনকে সবার আগে রিং এর ভেতর চাই।
হা ঈশ্বর! তোমাকে নতুন করে কিছু প্রমাণ করতে হবে না আলি। ৫ মিলিয়ন অংকটাএকবার ভাবো। চাইলে ওরা আরো বাড়াবে, আমি কথা বলবো।
আমি নরটনের সঙ্গে আবার লড়তে চাই
দেখো। স্যাডলার থামছে না, ‘আমি তোমার বন্ধু, তোমার ভালো চাই।’
সে কথা বলতে বলতে আমার বিছানার অনেক কাছে চলে এসেছিলো। ভাঙ্গা চোয়াল নাড়িয়ে কথা বলতে কষ্ট হলেও বললাম, তুমি যদি আমার সত্যিকারের বন্ধু হয়ে থাকো, জর্জের আগেই আমাকে নরটনের সঙ্গে লড়তে দাও। আমি জানি জর্জের পরের লড়াই নরটনের সঙ্গেই, আমাকে একটা সুযোগ দাও।
গলার ভেতরটা জ্বলছে, মাথাটা দপদপ করছে।
আমরা টাকার জন্য লড়ি আলি, প্রতিশোধের জন্য নয়।
এটা টাকার প্রশ্ন নয়, তুমি জানো স্যাডলার। আমাকে শুধু ফোরম্যানের আগে নরটনের মুখোমুখি হবার সুযোগ দাও।
আলী-৯
যোদ্ধা কখনো একা হারে না

‘কি আর করা! তাহলে সেরে উঠে নরটনকেই দেখে নিচ্ছো তুমি’-হার মানল স্যাডলার। ‘আমি জানি তুমি নরটনের চাইতে ভালো,কিন্তু বক্সিং এ কৌশলও একটা ব্যাপার। জর্জ হয়তো ওকে তেলাপোকার মতই পিষে ফেলবে, কিন্তু তোমার বক্সিং স্টাইলের সঙ্গে ব্যাপারটা ঠিক যায়না’ আমাকে আবারো বোঝানোর চেষ্টা করছে স্যাডলার, ‘আর তোমার পে ফোরম্যানকে হারানোই সোজা।’
স্যাডলারের মুখ থেকে নিশ্চিত হবার পর আমি আর ঐ প্রসংগটাতেই গেলাম না, ‘ কত দিনে সেরে উঠতে পারবো বলে তোমার মনে হয়?’ স্যাডলার নিজে একসময় বক্সার ছিলো, এর পর ট্রেনার, ম্যানেজার। এই ব্যাপারটা সে ডাক্তারদের চাইতেও ভালো জানে! চোয়াল ভাঙ্গা, খুলি ফাটা, কানের পর্দা ফেটে গেছে, দাঁতের পাটি নড়ে গেছে এমন হাজারো বক্সারকে সে কাছ থেকে দেখেছে।
প্রশ্নটা শুনে স্যাডলার এমন ভাবে ছাদের দিকে তাকিয়ে থাকলো, যেন মনে হচ্ছে যে কোন মূহুর্তে ছাদে কোন উত্তর ভেসে উঠবে! তারপর টুপিটা আলতো করে পেছনে ঠেলে দিয়ে বললো, ‘যদি চুপ করে থাকো, তাহলে তিন মাস, কি চার।এখান থেকে ছাড়া পেলেই বাড়ী যাবে, চুপ থাকবে , সেটাই সবচেয়ে বড় ঔষধ।’ এর মাঝে খবরের কাগজ, জিম, সব কিছু থেকে দূরে থাকো, রিং এর পাশ মাড়িও না, এমন কোথাও যায় যেখানে তুমি নিশ্চিন্তে থাকতে পারো। লুইভিলে চলে যাও, বলে আবারো টুপিটা ঠিক করলো ফোরম্যানের ম্যানেজার। তারপর নরম জুতা পায়ে হালকা নাচের চালে চলে গেলো। কথাতো দিয়ে গেলো লোকটা, এবার রাখতে পারলে হয়।
দিনে বেশ ক’বারই বেলিন্ডার খবরাখবর পাচ্ছি, কিন্তু খবর পাওয়া আর নিজ চোখে দেখার ফারাকটা অনেক বেশি। নিজের পায়ে একটু শক্তি ফিরে পেতেই আমি বেলিন্ডাকে দেখার জন্য পাগল হয়ে উঠলাম। রুমের বাইরে যেয়ে বাইরে যাবার মতো পোষাক খুঁজতে লাগলাম। একদিন জামা বদলাচ্ছি, এমন সময় ডাক্তার এলো, বললো আমার বাইরে যাওয়া নিষিদ্ধ। এরপর জামা-কাপড়ও নিয়ে গেলো। কি আর করা , ‘নগ্নগাত্রেই’ হাসপাতালে ঘুরে বেড়ানো শুরু করলাম। এরপর পোষাক ফিরিয়ে দেয়া ছাড়া উপায় কি?
গাড়ি করে হাসপাতালে পৌঁছে দিলো কিলরয়, আর এলিভেটরে করে সোজা বেলিন্ডার রুমের বারান্দায়। নার্স আটকালো দরজায়, ‘কে আপনি’? হ্যাঁ করে মুখের ভেতরে তারের জঙ্গলটা দেখিয়ে বললাম ‘ড্রাকুলা’। আর কোন প্রশ্ন করেনি কেউ! রুমে ঢুকে দেখি বেলিন্ডা কি যেন লিখছে,।ওর মা আইনেজ ও আছেন সঙ্গে।
‘ও হয়তো এখন কথা বলতে চাচ্ছে না’ আইনেজ বললেন, কিন্তু বেলিন্ডার চোখ তার মায়ের উল্টোটাই বলছে। ওর সাথে গাঁটছড়া বাঁধার পর থেকে বেলিন্ডাই আমার সবচাইতে বড় সমর্থক। সুজিকে বলেছিলাম হাসপাতালে ওকে যেন খুব সাদামাটা একটা রুমে থাকতে দেয়। সাদামাটার মানেটা বোধহয় বোঝেনি কর্তৃপ, রুমের দেয়ালে ছিলো ক্রুশবিদ্ধ যিশুর এক বিশাল ছবি। ওটা সরানো আগ পর্যন্ত নাকি চিৎকার করেছে বেলিন্ডা। আর মাঝে মাঝেই নাকি ঘোর লাগা মানুষের মতো বলে যেত , লড়াইটা কে জিতেছে, কে জিতেছে আজ? ডাক্তারদের কেউ যখন বলতো তোমার স্বামী , মোহাম্মদ আলী, তখুনি সে আবারো চিৎকার করতো, আলী তো মারা গেছে! আলী আর নেই!
আমি বুঝতে পারছিলাম, একজন যোদ্ধা কখনো একা হারে না। তার সাথে সাথে হেরে যায় সেই মানুষগুলো, যারা তাকে ঘিরে রাখে। যারা তাকে ভালোবাসে, তার জন্য গলা ফাটিয়ে চেঁচায়, বিজয়ে উল্লাস করে, যারা আমাকে নিয়ে গর্ব করে সবাই আজ পরাজিতের কাতারে। আর এই সব কিছু মেনে নিয়েই আমাকে রিং এর ভেতর ঢুকতে হয়। একটা লড়াইতে রাজি হওয়া মানেই এর পরবর্তী অংশটুকুও মেনে নেওয়া, বিজয়ের আনন্দ কি পরাজয়ের গ্লানি। তা সে যতোই খারাপ লাগুক না কেন।
***
আলী-১০

বেলিন্ডার চোখে মুখে তখনো অবিশ্বাস, আমি ঝুঁকে তার কাছে গিয়ে বললাম, ‘লী সোনা,আমি এখনো মারা যায়নি। ওরা আমাকে মেরে ফেলতে পারে না, তুমি কি এটা জানো না? ওরা মোহাম্মদ আলীকে মারতে পারবে না, এই কথাটা তোমাকে আমি বলিনি? ওদের কথায় কান দিওনা। এত তাড়াতাড়ি আমি তোমাকে ছেড়ে যাচ্ছি না। এতণে বেলিন্ডা আমাকে ভালো করে দেখলো, আমি একটু ঘনিষ্ঠ হয়ে তাকে জড়িয়ে বললাম, ‘ দুই এক দিনের মধ্যেই আমরা বাড়ি যাচ্ছে, তুমি তৈরী তো? উত্তরে আমার দিকে তাকিয়ে একটু হাসলো সে।
এরপর অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকলো আমার মুখের দিকে, কেউ নিশ্চয়ই ওকে বলেনি আমার চোয়াল ভাঙ্গা! তখন এক মূহুর্তের জন্য নিঃশ্বাস বন্ধ করে ভাবলাম, তারপর ওকে চুমু খেলাম। আর নিজেই নিজেকে বললাম, সিনেমার ড্রাকুলারা বোধ হয় এভাবেই চুমু খায়!
সপ্তাহ খানেক বাদে বেলিন্ডা যখন সুস্থ হয়ে উঠবে তখনি হয়তো স্যান ডিয়াগোর কথা মনে করে বলবে, আমি আর কখনোই তোমার লড়াই দেখতে যাবো না। কারণ কেউ যখন তোমাকে ঘুঁষি মারে, আমার মনে হয় আঘাতটা আমার গায়ে লাগছে। কিন্তু তাকে যেতেই হবে, পরেরবার আমি যখন নরটনকে কষে কয়েক ঘা লাগাবো তখন হয়তো তার ব্যথার বদলা নেওয়া যাবে।
আমি ওর কানে কানে আস্তে করে বললাম, ‘আমি কখনো হারিনি। আল্লাহ আমাকে শুদ্ধ করেছেন মাত্র,তার নিয়ম না মানার সামান্য শাস্তি নিয়েছেন ।আমি ঠিকমতো অনুশীলন করিনি, বিশ্রাম নেইনি। আগের দিন সারারাত ধরে খেলেছি। বক্সিং ম্যাচ সামান্য কিছু নয়, অথচ আমি তা হালকা ভাবে নিয়েছিলাম। আল্লাহ আমাকে জাগিয়ে দিয়েছেন, তিনি আমাকে মনে করিয়ে দিয়েছেন আমার লক্ষেরর কথা। আমি নিশানা থেকে সরে আসছিলাম, আল্লাহ আবারো আমাকে সঠিক পথে তুলে এনেছেন।’
আমি বিশ্বাস করতে শুরু করেছিলাম আমি অজেয়, তাই আমি ঠিকমতো অনুশীলন করিনি, জীবনে শৃংখলা ছিলো না, মনোযোগ কমে এসেছিলো। এখন আমি বুঝতে পারছি খুব সহজ অনেকগুলো জয়, অনেক পরাজয়ের মতোই একজন বক্সারের জীবন শেষ করে দেয়। ফ্রেজিয়ারের সঙ্গে লড়াই এর পর থেকেই বাকী লড়াই গুলো জিততে খুব একটা কষ্ট করতে হয় নি আমার। ম্যাথিস, সুইজারল্যান্ডে জার্গন ব্লিন, টোকিওতে ম্যাক ফস্টার, কানাডায় জর্জ চুভালো, আয়ারল্যান্ডে বব ফস্টার- সবই ছিলো সহজ জয়। একনাগাড়ে অনেকগুলো লড়াই জিততে থাকলে জয়ের পেছনের গল্প গুলো হারিয়ে যায়। ‘শুধু নামের জোরেই জেতা সম্ভব’ এই ভাবনাটা মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে। বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে যায় জয়ের জন্য বিসর্জনের গল্প, যা শেষ পর্যন্ত জয় পরাজয়ের মধ্যে ব্যবধান গড়ে দেয়। এখন আমি পরাজিত, বিধ্বস্ত কিন্তু আত্মবিশ্বাসী। ওরা বলছে আমি নাকি শেষ হয়ে গেছি। কিন্তু আমি দুনিয়াকে দেখিয়ে দিতে চাই আলী এখনো শেষ হয়ে যায়নি। বেলিন্ডা কিছু বললো না, শুধু শক্ত করে জড়িয়ে রিলো আমাকে, পরম নির্ভরতায় ।
আমরা লুইভিলে ফিরে যাচ্ছি বললাম বেলিন্ডাকে। আমি বাড়ি ফিরতে চাই, বেশ কিছু দিনের জন্য। ফিরে পেতে চাই আমার আমিকে, কোথায় যাচ্ছি, কোথা থেকে এলাম সবকিছু। আমি আবার সবকিছু শুরু করতে চাই, সোনার মেডেল জেতার পর থেকে। আমি ফিরে আসবো আর সবাইকে হারিয়ে দেবো।
অবশেষে শেষ বারের মতো ডাক্তাররা আমাকে দেখতে এলো, এ রে রিপোর্ট দেখে এক ইন্টার্ন জিজ্ঞেস করলো, এখন কেমন লাগছে?
আমার চোয়াল, এটা কি সবসময়েই এমন অসার থাকবে?
স্নায়ু গুলো যখম মারাত্মক, হাঁড়ের খোঁচার ত সারতে সময় লাগবে, ততদিন,। না শুকানো পর্যন্ত একটু তো এমন হবেই। আর কতদিন আমি এভাবে স্ট্র দিয়ে খাবো, আবারো প্রশ্ন আমার। হয়তো তিন সপ্তা, বলা কঠিন। ফিলাডেলফিয়া গেলে ডাক্তার ক্রেমারকে একবার দেখিও, এরপর থেকে তিনিই ইতোমাকে পরামর্শ দেবেন। সেরে উঠলেই দেখবে সব ঠিকঠাক, বলে আমার দিকে একটা এক্সরে প্লেট বাড়িয়ে দিলেন, অটোগ্রাফ প্লিজ! বিস্ময়ে আমার চোখ বেড়িয়ে আসছিলো! লন্ডনে আমার বাচ্চারা বিশ্বাসই করবে না যে আলীর ও চোয়াল ভাঙ্গতে পারে।এটা একটা প্রমাণ যে তুমিও মানুষ।
***

আলী ১১

প্রজাপতির ডানা ভাঙ্গা, হুল নেই মৌমাছির

হাসপাতাল ছেড়ে যাবার দিন নার্স এসে আমার হাতে একতাড়া চিঠি ধরিয়ে দিলো, এর মাঝে একটা অন্যরকম। বাদামী ব্যাগের পেছনে লেখা, ‘প্রজাপতির ডানা ভাঙ্গা, হুল নেই মৌমাছির। বড় বড় কথা বলা মুখটা বন্ধ। তুমি শেষ।’ প্রথমে খারাপ লাগলেও বেশ কবার পড়লাম, লাইন দুটোর মধ্যে কি যেন একটা আছে।
এরপর আমি কথাগুলো একটা কাগজে লিখে আমার জিমের দেয়ালে সেঁটে রেখেছিলাম। প্রজাপতিকে আবার ডানা মেলতে হবে, মৌমাছিকে ফিরে পেতে হবে বিষাক্ত হুল! কেয়ারমন্ট হাসপাতালে যত বার্তা পেয়েছিলাম তার মধ্যে এই কথাটাই মনে দাগ কাটার মতো। যে পাঠিয়েছিলো তার উদ্দেশ্য ছিলো আমাকে অপমান করা, কিন্তু আমি এটাকে নিয়েছিলাম অনুপ্রেরণা হিসেবে। মাঝে মাঝে প্রচন্ড ঘৃণা থেকেও সামনে এগিয়ে যাওয়ার শক্তি পাওয়া যায়।
বের হবার আগে বান্ডিনি এলো, হাতে মস্ত বড় একটা ব্যাগ। জানতে চাইলাম, ‘কি আছে এতে?’ ‘এগুলো বোতাম, তোমার নাম লেখা বোতাম’ উত্তর দিলো বান্ডিনি, তারপর ব্যাগটা উপুড় করে সব ঢেলে দিলো আমার পায়ের কাছে। নিচু হয়ে একটা বোতাম কুড়িয়ে নিলাম, তাতে লেখা ‘পিপলস চ্যাম্প’। ‘আমি এগুলো পেয়েছি জর্জ ফোরম্যানের ফটোগ্রাফার বিগ মো এর কাছে, সে গুলো বিক্রি করছিলো। আমাকে বললো সস্তায় কিনতে চাই কিনা, অর্ধেক দামেই সবগুলো দিয়ে দিলো। এখন নাকি এগুলো একদমই বিক্রি হচ্ছে না’ বলে হাসলো সে। কারণ সে জানে আমি আরো কঠিন পরিশ্রম করে ফিরবো আর তখন এগুলো কেনার লোকের অভাব হবে না!
আসলে নরটনের কাছে হারটা আমাকে মানসিক ভাবে বেশ বিপর্যস্ত করে ফেলেছিলো।
হেভিওয়েট টাইটেল ম্যাচে ফ্রেজিয়ারের কাছে হারলেও আমি জানতাম আমার পয়েন্টই বেশি ছিলো। বিচারকদের সিদ্ধান্ত আমার বিপে যাওয়াটা ছিলো দুঃখজনক। কিন্তু হারের পর কখনোই এভাবে ভাঙ্গা চোয়ালে বিছানায় পড়ে থাকতে হয়নি। এই পরাজয়টা আমাকে বুঝিয়ে দিয়েছিলো, বেশ কিছু সহজ লড়াই জিতলে যে মেকি আত্মবিশ্বাসটা তৈরী হয় তার ভিত খুবই নড়বড়ে।
‘লুইভিল, আর মাত্র ১০ মাইল’ মাইলফলকটা পার হলাম মাত্র, গাড়ি চলছে ফুল স্পিডে। সারা রাত মাইলের পর মাইল চলেছে গাড়ি ,আর আমার মাথায় লড়াই হেরে যাবার পরের সব ছবি। ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে, আর আমরা লুইভিলে ঢোকার সেতুটার কাছাকাছি চলে এসেছি। সবাই যখন ঘুমে মগ্ন, তখন ব্রিজের ওপর গাড়িটা থামালাম। ভোরবেলায় বুক ভরে একটু নিঃশ্বাস নিতে চাই।
তেরো বছর আগে আমার অলিম্পিক মেডেলটা নিয়ে এখানেই দাঁড়িয়ে ছিলাম আমি, সেদিন থেকেই বদলে গিয়েছিলো আমার জীবন।
উলটো দিক থেকে একটা ট্রাক আসছে। কাছে এসে থামিয়ে নেমে এলো ট্রাক ড্রাইভার, ‘কে ওখানে, ক্যাসিয়াস কে নাকি?” আওয়াজটা চেনা চেনা ঠেকছে, এ যে দেখি বুড়ো জন মেবেরি! এক পুলিশ এবং অবশ্যই ‘সাদা’। আমার ছোটবেলায় কালোদের এলাকায় টহল দিতো সে এবং আমাদের দলটাকে তাড়িয়ে বেড়ানোতেই বেশির ভাগ সময় কাটত তার। জনকে দেখে এতোটা খুশি বোধহয় কখনো হইনি! ওর পাশে ছোকরা মতন কেউ, পরে বুঝেছিলাম ও হচ্ছে জনের ছেলে। বললো, ‘আমি বলিনি, এটা ক্যাসিয়াস কেই তো।’ আমার ‘ক্রীতদাস’ নামটা আবারো শুনতে পেয়ে খুশি খুশি ভাবটা কেটে গেলো। ।
‘ক্যাসিয়াস কে, অবশেষে তোমার চোয়ালও ভাঙ্গলো তাহলে! আমি অবশ্য টিভিতে দেখেছি, তোমাকে কি বলিনি যে আমার খুব ইচ্ছা ছিলো লড়াইটা দেখতে যাবার’বুড়োর কণ্ঠে বিদ্রুপ। ছেলেটাকে অবশ্য এতোটা নিষ্ঠুর মনে হলো না, ‘কিভাবে হলো’ জানতে চাইলো সে। আমি তখন সেই পুরানো কৌতুকটা শোনালাম। মার্টি মার্শালের হাতে মার খেয়ে চোয়াল ভাঙ্গার পর সনি লিস্টন যেটা শুনিয়েছিলো, ‘এই ভাঁড়টাকে রিং এর ভেতর দেখে আমার খুব হাসি পাচ্ছিলো, তাই মুখ খুলেছিলাম।’ কৌতুক শুনে খুব একটা খুশি হলো না বুড়ো, ‘অনেক দিন পর এদিক এলে, বক্সিং কি ছেড়েই দিয়েছো।’ ‘নাহ, মাত্র শুরু করেছি’ বললাম আমি, ‘আসলে এখানে পুরোনো সবাইকে দেখতে এলাম।’
‘তা কতদিন থাকছো?’ পুলিশী জেরাই যেন শুরু করে দিলো জন। ‘এই দেখি যতদিন না আরেকটা খেতাব না জিতছি’, দায়সারা ভাবে জবাব দিলাম।
রাস্তা আটকে রেখেছে আমার গাড়ি আর জনের ট্রাক, পেছনে অন্যান্য গাড়ির হর্ন আমাদের আলাপটা আর বাড়তে দিলো না, আবার শুরু হলো পথচলা। পাশ কাটানোর সময় জনের ছেলেটা জানালা দিয়ে গলা বাড়িয়ে জোরে বললো ‘লুইভিলে স্বাগতম’। শুনে ভাল লাগলো কিন্তু বুড়ো জনের চাউনিতে অস্বস্তি স্পষ্ট। সে নিশ্চয়ই ভাবছে কোন একটা ঝামেলা পাকাতেই এসেছি আমি! (চলবে)

৭৫৪ বার দেখা হয়েছে

৫ টি মন্তব্য : “দ্যা গ্রেটেস্ট , মাই ওন স্টোরি”

  1. মশিউর (২০০২-২০০৮)

    অনুবাদ বেশ ভালো লাগসে কিন্তু কিছু জায়গায় কেমন কেমন লাগে । যেমন

    প্রজাপতির ডানা ভাঙ্গা, হুল নেই মৌমাছির
    এক পুলিশ এবং অবশ্যই ‘সাদা’

    :frontroll: :frontroll:
    লেখা পড়ে মনে হয় যেন মূল বই পড়ছি । ভাইয়া লেখার সাথে আলীর কিছু ছবি দেয়া যায় না ? 🙂

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।