আমি তো এখন এক্স-ক্যাডেট

কলেজ থেকে বিদায় নিয়েছি তা ও ১ বছরের বেশি হয়ে গেল। যতটা শূন্যতার কথা ভেবেছিলাম কলেজ থেকে আসার সময়,আসলে ততটা বোধ করিনি বাস্তবে;সে শুধু বেশির ভাগ পোলাপানের ঢাকা কেন্দ্রিকতা আর ফেসবুকের কারনে। এইচ এস সি র পর আসলে সবার ই মোটামুটি দৌড়ের উপর থাকতে হয়। এই ৪০০ মিটারের গতিতে ৩০০০ মিটার দেয়ার সময় পুরনো স্মৃতি গুলো যে কষ্ট,হতাশা বা দীর্ঘঃশ্বাস জাগায় নি তা নয়। বিভিন্ন কাগজপত্র (সারটিফিকেট) আনতে ২ বার কলেজ এ যাওয়া লাগলে ও দুই বার ই ক্যাডেট দের ভ্যাকেশন ছিল। গত ১ নভেম্বর কিছু সারটিফিকেট আনতে কলেজ এ যাওয়ার প্রয়োজন ছিল। সকালে যখন কলেজ এর উদ্দেশ্যে বাস এ উঠলাম তখন ক্যাডেট থাকাকালিন সময়ের কিছু কথা মনেপড়ল। কলেজ এ কোন প্রাক্তন ক্যাডেট গেলে ১ম কথা ছিল “ভাই কেমন আছেন?” আর ২ নাম্বার কথা ছিল “ ভাই আমার কথা মনে আছে? আমার নাম কি বলেন ত?”(বাম হাত দিয়ে নেমপ্লেট ঢেকে)। অনেকে ই মনে করতে পারতেন না…কেউ কেউ পারতেন। আমি তাই বাস এ বসে ই মনে মনে এই প্রশ্নের উত্তর ঠিক করে রাখলাম, “… ভাই আসলে কলেজ থেকে বের হওয়ার পর  খুব কম সময়ে এত বেশি মানুষের সাথে দেখা হয় যে অনেক ক্যাডেটের নাম মনে করা কষ্টকর হয়ে জায়,আমরা অ আগে বুঝতাম না। তোমরা বের হওয়ার পর ব্যাপার টা বুঝতে পারবে………”।

কলেজ এ গিয়ে গেট দিয়ে ঢুকতে না ঢুকতে ই কলেজ এ অবস্থানরত জনৈক এক ক্যাডেট এর ফোন। “ভাই কেমন আছেন?”

“কে?”

“……”( নাম), ‘কলেজ এ ঢুকলেন মনে হল!’

“হুম”

“ওকে ভাই রাখি, একটু দেখা কইরেন”

……………………… বুঝলাম দিন বদলাইছে।

যা ই হোক অপিসের কাজ কম্ম মোটামুটি শেষ করে আর্টস ফ্যাকাল্টির ব্লক এর দিকে গেলাম। পথে অনেক ছোট ভাইএর সাথে দেখা হল। অবধারিত প্রশ্নটার উত্তর পূর্বনির্ধারিত থাকলে ও তা তাদের মন গলাতে পারে নি। এক ই কথা “এক্স-ক্যাডেট হওয়ার পর সবাই ই কলেজ এ এসে ভাব নেয়”। কিন্তু সবার আগে একটা কথা এ কানে আসলো “ ভাই চুল টুল রাইখ্যা তো পুরা ই অবস্থা খারাপ”। (আসলে কিন্তু আমার চুল খুব বেশি বড় ছিল না)

কেউ একজন বলল “ভাই আপনি তো মোটা হয়ে গেছেন”-

“ চেহারা পুরা এ চেঞ্জ  হয়ে গেছে”।

………………….. এমন অনেক বিশ্লেষণ হতে থাকল। চামে সেই জনৈক ক্যাডেট এসে বলে গেল ভাই ৫০ টাকা ফ্লেক্সি দিয়েন।

মাঝে কয়েক জন স্যার এর সাথে দেখা, কথা বলতে বলতে তাদের সাথে হাটতে হাটতে কিছু দূর যেতে হল। আবার ফিরে আসতে ই “ভাই এখন ও তেল মারা ভুলেন নাই?” আমি আর কি বলব, কিছু নিউট্রাল হাসি দিলাম। অন্য ব্লকএর ফর্ম থেকে কয়েক জন হাল্কা পাতলা সাউন্ড ও করে উঠল, হয়ত আমার উদ্দেশ্যে অথবা কোন কারনে। ভেবে খুব একটা খারাপ লাগল না। ভাবলাম আমরা ও মাঝে মাঝে এমন করতাম। সত্যি বলতে কি ওই সময়ে ই প্রথম বারের মত আমার ক্যাডেট থাকাকালিন সময়ের স্মৃতি মনে খুব কষ্ট জাগাল। ওদের ভেতর যেন নিজের কণ্ঠটা ও শুনতে পেলাম।

হঠাৎ দত্ত স্যার( সাত্যজিৎ দত্ত) এর সাথে দেখা। আমার সামনে ই ওদের কে অবশ্যম্ভাবী গুল মেরে দিলেন। স্যার এর প্রতি আমার এখন ও শ্রদ্ধা অটুট আছে কিন্তু মনে মনে না বলে পারলাম না “ ঢেঁকি ধান ভাঙ্গা কখনও ই থামায় না,সে স্বর্গে যাক কি মর্তে ই থাক”।

আসলে আমার তখনকার অনুভূতি লিখে বুঝানো আমার মত অপরিপক্ক লেখকের পক্ষে সম্ভব নয়। শুধু দুই টা কথা বলতে পারি এক. ছেলে গুলোর আন্তরিকতার কমতি ছিলো না, দুই. নিজেকে ওদের থেকে বেশ দুরের মনে হচ্ছিলো।

কলেজ এর কাজ সেরে এক সময় গেটের দিকে পা বাড়াতে হল। তখনকার অনুভূতি টা আমার কাছে অনেকটা ই অপরিচিত। কিছুটা মিল পাই সেই দিনটার সাথে যেদিন ৪৭ তা ‘ক্যাডেট’এর সাথে এক সাথে শেষ বারের মত কলেজ ত্যাগ করেছিলাম। মনে মনে বললাম “আমি তো এখন এক্স-ক্যাডেট”।

(বি.দ্র. গেট থেকে বের হয়ে একটা নম্বর এ ৫০ টাকা ফ্লেক্সি দিয়ে পা বাড়ালাম শহরের দিকে।)

১,৫৪৭ বার দেখা হয়েছে

২৫ টি মন্তব্য : “আমি তো এখন এক্স-ক্যাডেট”

  1. মো. তারিক মাহমুদ (২০০১-০৭)

    যদি ভুল না করি, তাহলে কিন্তু তোর নাম আমার মনে আছে ... কয়েকদিন আগেও দেখা হয়ছিল মনে হয় , তাই না ?
    বরিশাইল্ল্যা x-ক্যাডেট, সিসিবিতে স্বাগতম ... ...

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।