কলেজের বন্ধুরা

তীব্র ব্যাস্ততার মাঝে মাঝে যখন একটু সময় পাই প্রায়ই পিছনে ফিরে পুরনো স্মৃতি হাতড়ে বেড়াই । আপনা আপনি একটা লম্বা দীর্ঘশ্বাস বের হয়ে আসে আবার মুহুর্তেই বাতাসে মিলিয়ে যায় । সেই দিনগুলোর কথা কি করে ভুলি ?

সালেহীনের নাটকে প্রাপ্তবয়স্কদের পত্রিকা কেনার অভিনয় করে বিশেষ ( !! ) পুরস্কার পাওয়া । আরিফের হঠাৎ হঠাৎ হুজুর হয়ে যাওয়া আবার দুই দিন পরেই রসময় দা’র উপন্যাসের খোঁজে পোলাপাইনের নিকট ধর্না দেওয়া । কিংবা ক্লাসের সবচেয়ে চুপচাপ ছেলে জহিরের কলেজ পালিয়ে ভ্যারাইটি শো দেখার কথা । কখনো বা সাইফুল্লার একদিন আর্মিতে জয়েন করে বি এস ইউ ও হবার স্বপ্নে ভো দৌড় ( বেচারা কোনোমতে বি এম এ পার করছে ) অথবা ধরা ইমরানের দিনে ১০০ বার ধরা খাওয়া উপলক্ষে জোরপুর্বক পার্টি ধরাইয়া দিয়া ১০১ বার পুর্ন করাইয়া দেয়া । সৌরভের টয়লেট এ বসেও চিত্রাংকন করা । শাকুরের জন্য পোলাপাইনের বদনজর । বুইড়া হাসানের সৌখিন জিনিস পত্রের লিষ্টি নিয়া ঘোরাঘুরি । রায়হানের ছোট ছোট ছবি!!!ওয়ালা ক্যালেনডার নিয়ে টয়লেট এর আশে পাশে সন্দেহ জনক আসা যাওয়া । খুতা সাজ্জাদ বাবুর হেলতে দুলতে স্টেজ এ গান গাওয়ার দৃশ্য । আমাদের জাহিদ বাবুর পেট্রল এর জ্বলুনি । হ্যান্ডু আশরাফের অসম্ভব সব কবিতা । আমাদের প্রিয় বদনা আমিনের জিন এর অভিনয় (বদনার দৈত্য) । কখনও বা নাজমুলের সেই উদঘাটিত বাথরুম রহস্য (যা আমাদেরি কেউ একজন বহু কষ্ট করে উকি প্রচেস্টা চালিয়ে বের করেছিল) । আবার লুলু কবিরের প্রেপ টাইমে ঘুমাবার সেই পরিচিত দৃশ্য ।

কত স্ম্বতি যে আজ মনের অতল গভীরে হারিয়ে গেছে তার ইয়াত্তা নেই । তারপরও যখন দুই একজনের সাথে দেখা হয়ে যায় হঠাৎ করে আবার বসে যাই সেই পুরনো স্ম্বতির জগতে কিছুক্ষন ঘুরে আসার জন্য । কিংবা যখন কাজ করতে করতে বিরক্ত হয়ে বলি ‘ ধুর ছাই, আর ভাল্লাগে না’ তখন আমার এডজুটেন্টকে নিজে থেকেই বলে উঠি ‘ ধ্যাত মোর্শেদ ভাই, ভাইগা যাইতে ইচ্ছা করতেছে । কত ভালই না ছিলাম কলেজে ।’ মোর্শেদ ভাইও কেমন যেন স্ম্বতি কাতর হয়ে পরে । কিভাবে ভুলি সেই দিন গুলোর কথা…

যখন আহসানকে ট্যাং ট্যাং করে কিছুক্ষন না জালাইলে পেটের ভাতটা ঠিকমত হজম হত না । মনোয়ার এর মনো রে গান টা না শুনলে স্টাডি পিরিয়ডে আর্টস পার্টির আসরটা ঠিক মত জমে উঠত না । আবার ক্যাজা আদিবের ঘুমবাবা মার্কা চেহারা কিংবা অতি ভদ্র রিয়াজের ডাইনিং হলে ঢুকলেই আচরনের আমোঘ পরিবর্তন (বিশেষ করে যখন মোল্লাহ স্যার ডিউটি মাস্টার থাকতেন ) । নদু নাহিদের মাথা দুলিয়ে দুলিয়ে ‘ আজ সৃস্টি সুখের উল্লাসে ‘ কবিতা শুনে হেসে গড়াগড়ি খাওয়া । লেডি রাম্বো আসাদ হঠাত করে গোমেজ এ রুপান্তরিত হওয়া । কিংবা লালী মামুন এর ‘ আল্লাগু তুই এক দেখাবি না…? বল খুদার কসম এইটা ঠিক দাগাইছিস !!!! ‘ । বেচারা আহাদ…বন্ধুত্বের ডিমান্ড তার এতই বেশি যে ক্যাজা বাবা আদীব আর কথাই বলল না । আর আমাদের **** তৌহিদ যাকে কিনা অনেকেই মিস্টার নামে চেনে যে কিনা ঘুমাতে গেলেই বিছানাতে ইউরোপ কিংবা আমেরিকার মানচিত্র আঁকা হয়ে যেত । আর যখন গায়ে শ্যাম্পু দিত তার ঘিলু নাকি ছিটকে ছিটকে বের হয়ে আসত !!! আমদের কুইচা মুরগী মেহেদি যে ক্লাশ নাইনে থাকতে চড়ুই পাখি খেয়ে কি একটার দৈর্ঘ্য বাড়ানোর জন্য কত প্রচেষ্টা চালাল , বেচারা সবজান্তা এন্টাসিড ওরফে এন্টি এসিড । ভাই দর্পণ তোকে যে কি মিস করি তা তোকে কিভাবে বলি ? আছো তো বিদেশ বিভুঁইয়ে বেশ মৌজে । শালা আর কখনো কি তোর সেই মাত্থায় মাল উঠানো হাসির অভিনয় দেখা হবে ? আলাফাত তুমি ত আমাদের সাথেই আছ । কি ? এখনো কি তোমাকে পোলাপাইন রাস্তায় মাইয়া মানুষ রে একলা পাইলে যা করে তোমার সাথেও তাই করে ? সুফিয়ান হালার পুত ঘাড়ডা একটু সোজা কর । বহুত হারাম খাইসো আর না । ছাগ্লা হামিদ তো এখন অনেক ব্যাস্ত মানুষ , এই তুই কি এখনো সে রকম মারদাঙ্গা ফুটবল খেলিস ? আহারে জয় … যারে লইয়া ক্লাস টেন পর্যন্ত আমারে টিজ করছস শেষ পর্যন্ত তারে তুই বিয়াই কইরা ফালাইলি ? এখন আর কে দেবদাসে চন্দ্রমুখীর অভিনয় করবে রে ?

জীবনের বাঁকে বাঁকে কত স্ম্বতি যে ফেলে এসেছি তার কোনো হিসাব নাই । আর যেটুকুর আছে তার বেশির ভাগটাই তো তোদের মত বন্ধুদের নিয়ে । ৬ বছরের সময়ের ঝুলিতে তোরা ছাড়া তো আর বিশেষ কিছু জোটে নি । যত কথা যত মজা সবই তো তোদের নিয়েই ঘেরা । যাই লিখিনা কেন সবি তো একটা জায়গায় গিয়েই শেষ হয় । বল কিভাবে ভুলি তোদের ?

 আমার মাইটি রুমমেট আদনান যাকে মাঝে মাঝেই ঘুম ভেঙ্গে গেলে দেখতাম রাত ২ টা ৩ টার দিকে বসে বসে চিঠি লিখছে তার সিনিয়ার প্রেমিকার কাছে ( যা বের হয়ে যাবার আগে ১৭৪ পাতায় গিয়ে ঠেকেছিল ) । কিরে পারলি ৫০০ শেষ করতে ? এমরান কেমু গোয়ার্তুমি করতে গিয়ে এখন আর মামুনের মত পোলাপাইনের কাছে আবার মাইর খাস না তো ? চাতুর মাইনের কথা শুনে ( ব্যাল খাইছে কিডা ? ) এখন কি আর কেউ হাসে ? বোধহয় না । ও তো আবার অফিসার মানুষ কিনা !!!! পিচ্চি হাসান/রোবো হাসান যার সাথে পাঠামিতে কেউ পারতনা দেখে একদিন ৬ জন মিলে চড়াও হয়েছিলাম এবং সকলেই আহত কিংবা অর্ধ আহত হয়ে …আহ উহ ইহ !!!! মুমিন তুই তো খুব চলে গেলি নাইনে থাকতেই , একবার ভেবেছিলি লকার এর চাবি হারালে পোলাপাইন আর কাকে ডাকবে ? সকালে ড্রিলের আগে ক্যাপ খুজে না পেলে কার কাছে যাবে ? অংকে কম নম্বর পেলে কাকে বলবে ‘ দোস্ত খাতাটা একটু আইনা দে না, এক লিটার কোক খাওয়ামু ‘ । ফার্স্ট বয় তানভির , ভাই তুই না থাকলে আমাদের কি গতি হইত রে ???? ক্বতজ্ঞ সারা জীবন । খবির ম্যাগীর ভাই ( আমার বক্সিং বাডি ) শালার ভাই গত আট বছরে জ্বালাইয়া রাখলি না , এখন একটু খেমা দে । হাবিব বন্ধু তুমি কোথায় আছ এখন ? কুমড়া সুমন কে আর কুমড়া বল্বা ? মনে নাই ঘুসি মাইরা চোখ কালা কইরা দিল !!!! ইসসস তোরে তখন ঠিক বাংলা ছবির ভিলেন এর মত লাগত । রাকিব দোস্ত কয়টা ডিম পারলি রে ? সবই কি তানিয়ারে খাওয়াবি নাকি কিছু রাখছিস আমাদের জন্য ? রহমান তোরে তো আর পাওয়াই যায় না আজকাল । কই থাকিস রে ? সানরিয়া দোস্ত ‘ ও মেরে পাম্পসে পাম্পসে বারি দে বারি দে ‘ হি হি হি আব্বাছ স্যার দাকে তোরে যা আগে তোর ডার্লিং এর চিঠিটা ফ্লাস করে আয় । নাইলে রব স্যার কিন্তু বিয়া পড়াইয়া দিব । গন্ধরাজ ফরহাদ বাবা তুমি কি নিয়মিত বডি স্প্রে মাখ তো ? হস্তী শাবক সাইফ তুমি এখন কেন আর মুড়ি পার্টির সময় আইসা উদয় হইয়া অর্ধেক একাই গলধ:করন কর না ক্যান ? বিচি মাহমুদ তুই কি এখনও মানুষরে জোরদার টিজ করার অভ্যাস বজায় রাখছিস ? কুমড়া পটাস সুমন কেউ এখন আর আমাদের ছুটি থেকে এসে গরম গরম বাংলা ছবির গল্প শোনায় না রে । বিল্লু মামা বেলায়েত তুমি ভাল আছ তো ‘ আমি তু বাই কাটা খাই , মিয়াউ মিয়াউ ‘

একে একে সবার কথাই লিখে ফেললাম । কেমন যেন মন খারাপ লাগছে । কোথায় যে একটা সুর কেটে গেছে খুঁজে পাচ্ছি না । কষ্ট লাগে মাঝে মাঝে খুব । যারা ছিল এক সময় জীবনের সবচেয়ে কাছের মানুষ তারা যে আজ কে কোথায় আছে তা ঠিকমত জানাও নেই । যেখানেই আছিস ভালো আছিস তো সবাই …????????

২,৩৪৬ বার দেখা হয়েছে

২৭ টি মন্তব্য : “কলেজের বন্ধুরা”

  1. মাসরুফ (১৯৯৭-২০০৩)

    রেজওয়ান,অসাধারণ হইসে রে।আচ্ছা,ক্যাডেট কলেজের সব ব্যাচের সব ছেলেপেলেরই কি একেবারে হুবহু এক ঘটনা ঘটে!!তোর লিখা পড়ে তো মনে হইল আমার ব্যাচের ঘটনা...
    অফ টপিকঃআচ্ছা, শাকুর কেস টা কি রে?এইটা নিয়া আগেও আকারে ইংঙ্গিতে পোলাপানরে কমেন্ট কইরা গরাগরি দিয়া হাসতে দেখছি...জিগাইলে আরো বেশি কইরা হাসে তয় কয়না কিছু... 😕 নিজেরে কেমুন আবুল আবুল লাগে...

    জবাব দিন
  2. সায়েদ (১৯৯২-১৯৯৮)

    রেজওয়ান,
    তোমার লেখাটা অর্ধেক পড়ে আবার গোড়া থেকে শুরু করেছি। দ্বিতীয়বার সাথে কাগজ কলম ছিল। 'সালেহীন' দিয়ে শুরু আর 'বেলায়েত' দিয়ে শেষ - তোমার ক্লাসমেটদের সবার নাম লিখে তবে শেষ প্যারায় পৌঁছেছি।
    ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের কে-৫৯ ব্যাচের প্রকাশিত "সেরেনতুরাই"তে জনৈক এক্স ক্যাডেটের (দুঃখিত নামটা মনে নেই) স্মৃতিচারণমূলক লেখার শেষ প্যারার একটা লাইন অনেকটা এরকম, "...আমার মতোন ক্ষুদ্র মানুষের কি এরকম বিশাল স্মৃতিভান্ডার থাকা উচিত?" তোমার লেখাটা আবারও আমাকে সেই কথা মনে করিয়ে দিল।
    খুব ভালো লেগেছে :clap: ।


    Life is Mad.

    জবাব দিন
  3. জুবায়ের (১৯৯৯-২০০৫)

    জীবনের বাঁকে বাঁকে কত স্ম্বতি যে ফেলে এসেছি তার কোনো হিসাব নাই । আর যেটুকুর আছে তার বেশির ভাগটাই তো তোদের মত বন্ধুদের নিয়ে । ৬ বছরের সময়ের ঝুলিতে তোরা ছাড়া তো আর বিশেষ কিছু জোটে নি । যত কথা যত মজা সবই তো তোদের নিয়েই ঘেরা । যাই লিখিনা কেন সবি তো একটা জায়গায় গিয়েই শেষ হয় । বল কিভাবে ভুলি তোদের ?

    অসাধারণ

    জবাব দিন
  4. মুসতাকীম (২০০২-২০০৮)

    ভাইরে দিলেনতো মনটা খারাপ কইরা :(( :(( :((


    "আমি খুব ভাল করে জানি, ব্যক্তিগত জীবনে আমার অহংকার করার মত কিছু নেই। কিন্তু আমার ভাষাটা নিয়ে তো আমি অহংকার করতেই পারি।"

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।