জীবনের গল্প – ৪

জীবনের গল্প – [১] [২] [৩]

সজীব

আমার বন্ধু ভাগ্য মনে হয় খুব একটা খারাপ না । নইলে এমন কিছু মানুষের সাথে আমার দেখা কখনই হত না । এই যেমন আমাদের পাগলা সজীব । কলেজ থেকে বের হবার পর কোচিং বা বিভিন্ন কাজে প্রায়ই ঢাকা থাকতে হত । আর তারপর বিএমএ তে দীর্ঘদিন পর পর ছুটি পেতাম । কিন্তু এমনটা খুবই কম হয়েছে যে আমি বরিশালের জন্য রওনা হয়েছি আর বরিশাল পৌছে সবার আগে সজ়ীবের সাথে দেখা হয় নি । দেখা যেত যে আগেই ফোন করে দিতাম যে ‘দোস্ত আমি আসতেছি নাইট কোচে’, ও খালি জানতে চাইত কয়টায় পৌছাবি রে ? আমি বলে দিতাম যে ৪/৫ টা বাজবে, আমি সকালে ৮/৯ টার দিকে তোর বাসায় আইসা পরবনে । কিন্তু আমার আর যাওয়া লাগত না , সেই অন্ধকার লাগা সকালে বাস থেকে নেমেই দেখতাম কোন একটা চায়ের দোকানে বসে বিড়ি টানতেসে পাগলা । আর দেখা হওয়া মাত্রই ‘ অই ২ ঘন্টায় মাত্র ৬ কাপ চা খাইসি , এখন তাড়াতাড়ি বিলটা দিয়া উদ্ধার কর’ । আমি যারপরনাই খুশী হইয়া লাফালাফি শুরু করতাম । আমারে খালি রিসিপশন দেয়ার জন্য সেই রাত ৪ টা বাজে থাকতে এসে বসে আছে , এর চেয়ে বড় আর কি হতে পারে ? আর এতদিন পর আসার জন্যই হয়ত খুশীর পরিমানটা আরও বেড়ে যেত ।

এই ছেলেটা , যে তার বন্ধুদের জন্য নিজের জীবনের প্রায় পুরোটাই উৎসর্গ করেছে তার নিজের জীবনের ইতিহাস আমার ভয়ঙ্করতম দুঃস্বপ্নকেও হার মানায় । আমি বিশ্বাস করি নি এবং এখনও করি না কিন্তু বাস্তবতা এত কঠিন যে আমাকে নিজের চোখেই তার প্রমান দেখতে হয়েছে । আপনি কি কখনও ভাবতে পারেন যে ছোটবেলা থেকে যাকে নিজের বাবা মা বলে জেনে এসেছেন জীবনের ১৬ টি বসন্ত পার করার পর যদি জানতে পারেন যে তারা আসলে আপনার বাবা মা নয় ?
ঠিক এমনটাই হয়েছিল আমার এই বন্ধুর জীবনে , ওর জন্ম বাবা মার ৪র্থ সন্তান হিসেবে । বাবা মা’র আর্থিক অসচ্ছলতার কারনে ২ মাস বয়সেই ওকে পালন করা তাদের পক্ষে কষ্টসাধ্য হয়ে পরে । ওর খালা আর খালু ছিলেন নিঃসন্তান দম্পতি । তাই ওর বাবা মা ওকে ২ মাস বয়সে তুলে দেন ওর খালার হাতে, সেখানেই বড় হয় ও, তার খালা খালু তাকে নিজের ছেলের মতই বড় করতে থাকেন । ওর আসল বাবা মা ওকে খুব কমই দেখতে আসত, আর ওর খালাও ওকে সহজে গ্রামের বাড়ীতে যেতে দিতে চাইতেন না ।

সজ়ীব এসবের কিছু বুঝত না, ভাবত পারিবারিক কোন সমস্যা । নিজের আপন ভাই বোনকে সে জানত তার খালাত ভাই বোন হিসেবে । কিন্তু একদিন তার খালাত বোন তার সামনে এসে দাড়াল তার আপন বোন হিসেবে, খুলে বলল সব । আর তারপর ? তারপর আর কিইবা হতে পারে । প্রচন্ড একটা দুঃসময়ের ভিতরে বসবাস শুরু হল তার । অন্ধকার জগতের নতুন এক বাসিন্দা হিসেবে যোগ দিল সে, কোনটা সত্যি আর কোনটা মিথ্যা একসময় গুলিয়ে ফেলল এই বন্ধুটা ।

কি করা উচিৎ তার ? বাবা মাকে মেনে নিবে ? কোন বাবা মাকে ? যাদের এতকাল ধরে বাবা মা ভেবে এসেছে তাদের নাকি তাদের যারা তার সত্যিকারের বাবা মা ? কাকে ঘৃনা করবে সে ? তার সত্যিকারের বাবা মাকে যারা তাকে দূরে ঠেলে দিয়েছেন নাকি তাদের যারা তাকে এতকাল ধরে এই অসীম সত্যকে জানতে দেয় নি তাদের ?
চরম একটা ঘোরের মধ্যে সে হারিয়ে ফেলেছিল তার স্বাভাবিক চিন্তাশক্তি, লোপ পেয়েছিল তার ব্যাক্তিস্বত্তা । এই সময়টাতে সে কাছে পায় নি কাউকে, হয়ত কাছে ভীড়তেও দেয় নি কাউকে, এরকম একটা সময় সে পার করেছে সম্পূর্ন একা । কিন্তু ভেবে বের করতে পারে নি তার কি করা উচিত । আমরাও তাকে বলতে পারি নি, কিংবা হয়ত বলাও উচিত না, কি বলব আর কিভাবেই বা স্বান্তনা দিব ? কোনভাবেই কি এটা বোঝা সম্ভব শুধু দূর থেকে দেখে ? নাহ আমার মত মানুষ কখনই বুঝতে পারবে না কি ব্যাথ্যা জমে আছে তার মনে ।

কিন্তু আজ ওকে দেখলে একটুও বোঝার উপায় নেই এই ছেলেটার মনে কি চাপা ক্ষোভ আর বেদনা লুকিয়ে আছে, সবচেয়ে হাসিখুশী প্রানবন্ত একটা ছেলে, যে সবাইকে আনন্দ দিয়ে ভরিয়ে রাখে, যাকে যেকোন বিপদে নির্দিধায় ডাকা যায়, যাকে দিয়ে ভরসা পাওয়া যায়, যাকে দিয়ে যে কোন বিপদে উদ্ধারের পথ বের করা যায়, হয়ত এতেই সে নিজের জন্য স্বান্তনা খুজে পায় ।

বাবা মা তাকে ফিরিয়ে নিতে চেয়েছিল নিজেদের কাছে, কিন্তু নিজের জেদের বশেই যায় নি সে । ‘যারা আমাকে দুধের শিশু থাকতে দূরে ঠেলে দিয়েছে ১৬ টি বসন্ত পার করে কেনই বা সে ফিরে যাব, দরকার হলে না খাইতে দিতে পেরে মেরেই ফেলত কিন্তু অন্যের হাতে কেন তুলে দিবে? আর আমার খালাও তো এই ১৬ বছরে আমাকে কখনও নিজের ছেলের চেয়ে কম করে দ্যাখেন নি ।’
আমিও কিছু বলি না, থাক না ওর মত করেই, ওরই তো জীবন, আর জীবনও তো একটাই, যেভাবে হতে দিতে চায় চাক, ও এরকমই থাকুক আমাদের কাছে, হাসিখুশী প্রানচঞ্চল আমাদের পাগলা সজীব ।

২,২১৭ বার দেখা হয়েছে

২৮ টি মন্তব্য : “জীবনের গল্প – ৪”

  1. রায়হান আবীর (৯৯-০৫)

    কালকে রাতে খোয়াবে দেখছিলাম- রেজয়ান অনেকদিন জীবনের গল্প লিখেনা। আজকেই এসে গেলো... :clap:

    সজীব পোলাডারে আমি খুবই ভালা পাই। তয় ব্যাটার সাথে অনেকদিন যোগাযোগ নাই।

    জবাব দিন
  2. ফয়েজ (৮৭-৯৩)

    বাবা-মা যারা দত্তক দিচ্ছেন, আর বাবা-মা যারা দত্তক নিচ্ছেন তারা কি ব্যাপারটা একটু সহজ করে দিতে পারত না, একটু একটু করে তাকে বুঝিয়ে দিত, তার নিজের বাবা-মা কারা এবং তারা কারা। পুরোপুরি সম্পর্ক বন্ধ করে দেয়াটা কি ঠিক হয়েছে?

    কোন কিছুই তো চাপিয়ে দেয়া যায় না। মেনে নিতে হয়।

    সজীবের জন্য ভালবাসা আর অনেক অনেক আদর, অনেক বড় মনের মানুষ হোক সে এই দোয়া করি।


    পালটে দেবার স্বপ্ন আমার এখনও গেল না

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।