নিঝুম দ্বীপ

বুয়েটে আসার পর ছুটি পেলেই কোথাও ঘুরতে যাওয়া মোটামুটি অভ্যাসে দাড়িয়ে গিয়েছে। কিছুদিন আগে কুরবানির ঈদ আর মিডটার্মের ছুটি ছিল ২ সপ্তাহ। হটাৎ সিদ্ধান্ত হল নিঝুম দ্বীপ যাব । নিঝুম দ্বীপ কোথায় তা সম্পর্কে আমাদের প্রায় কারোরই কোন আইডিয়া ছিল না। কিন্তু যেতে তো হবেই।

সদরঘাট। জীবনে লঞ্চে চড়েছি মাত্র কয়েকবার তাও আরিচা – গোয়ালন্দ রুটে । সদরঘাটে লঞ্চের আকৃতি দেখে তো আমি অবাক । ঢাকা – হাতিয়া লঞ্চে উঠলাম । আনুমানিক ১২ ঘন্টার পথ হাতিয়া। এই পথের বন্ধুরা ব্যাকআপ হিসেবে কাথা-কম্বল নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছিল। অনেকেই নেয় নি যার জন্য মেঘনার বুকে ভোরবেলায় ঠান্ডায় প্রায় জমে যাওয়ার অবস্থা হয়েছিল । রাতের অনেকটা সময় ছিল লঞ্চের ছাদে বসে গান গাওয়া এবং জাগতিক/মহাজাগতিক বিষয় নিয়ে আড্ডা মারা । মাঝখানে ডুবোচরে আটকে জোয়ারের পানির জন্য অপেক্ষায় প্রায় ২ ঘন্টা লেট। ভোলার কাছাকাছি পৌছে আমাদের লঞ্চ পুরাই লোকাল হয়ে গেল। এমন কয়েকটি ঘাট আছে যেখানে এই লঞ্চ যোগাযোগ ও পন্য পরিবহনের একমাত্র মাধ্যম । ১৫ ঘন্টার ভ্রমন শেষে দুপুর ১২টায় হাতিয়া পৌছালাম।

হাতিয়া ঘাটে নেমে ট্যাক্সিতে ছড়ে হাতিয়া সদর। খাওয়া শেষে ইউ.এন.ও. সাহেবের অফিসে গেলাম । উনি ব্যপক মাইডিয়ার লোক। উনি চা খাওয়ালেন এবং ফোন করে আমাদের জন্য নিঝুম দ্বীপে আমাদের সীট বুকিং দিলেন । আবার পেইনফুল জার্নি । সদর থেকে আরো ১.৫ ঘন্টার পথ একটি বাজার ।গাড়ি থেকে নেমে আবার প্রায় ১ ঘন্টার হাটা । তারপর ট্রলারে করে ছোট্ট একটা চ্যানেল পাড়ি । রওনা দেওয়ার প্রায় ২৩ঘন্টা পর নিঝুম দ্বীপ পৌছালাম।

নিঝুম দ্বীপ । নোয়াখালী জেলার হাতিয়া উপজেলার অন্তর্গত মেঘনা নদীর মোহনায় অবস্থিত একটি দ্বীপ । আপাতদর্শনে তেমন বিশেষ কিছুই না। আশেপাশে মহিষের পাল চরছে। ঘাটে নেমে একজন কে জিজ্ঞেস করলাম “এই দ্বীপে হরিনের সংখ্য কত?”। নির্বিকারভাবে তিনি উত্তর দিলেন ” পঞ্চাশ হাজার” । মেঘনায় গোসল শেষে রেস্ট হাউসে যাওয়ার পথে বয়োজেষ্ঠ্য একজন কে একই প্রশ্ন জিজ্ঞেস করায় অনেক ভেবেচিন্তে তিনি উত্তর দিলেন ” … তা, এক লক্ষ তো হবেই …” । এইবার আমরা ভয় পেয়ে গেলাম । আমরা ঢাকায় বসে বিশ হাজার (২০০০০) শুনে এসেছি । সমগ্র পৃথীবিতে এক লক্ষ চিত্রা হরিণ আছে কিনা সন্দেহ । স্থানীয় লোকজনের সাধারন জ্ঞানের পরিচয় পূর্বেও পেয়েছিলাম । তাজিংডং – কেওকারাডং যেবার ঘুরতে গিয়েছিলাম সেবার এক পাহাড়ি বলেছিল “মামা, এরপর অনেক সময় নিয়ে আসবেন । আপনাদের বর্ডারের ঐপারে নিয়ে যাব । কেওকারাডং এরও ২০গুন উচু পাহাড় আছে ঐপাশে ।” বোঝেন অবস্থা । এর এক-তৃতীয়াংশ ধরলেও পৃথীবির সর্বোচ্চ শৃংঘ মিয়ানমারে পড়ে।

পরদিন সকাল সকাল বের হলাম দ্বীপ সৌন্দর্য দর্শনে। মুল লক্ষ হরিণ। ইউ.এন.ও বলেছিলেন দ্বীপের দক্ষিন পার্শ্ব ভাটার সময় বিরাট চর পড়ে । নাম আরেক বাঙলাদেশ। আদিগন্ত বিস্তৃত চর । দৃষ্টসীমায় নাগাল পাওয়া দুষ্কর। আরেক পাশে কৃত্রিম বন । তবে হরিণ এখোনো ২ ঘন্টার হাটা পথ । অতঃপর হাটা শেষে বনে পৌছালাম । মূল বনে পৌছাবার অনেক আগেই হরিণের চিহ্ন দেখে সবাই বেশ উত্তেজিত। আপনাআপনি বেশ কয়েকজন জুনিয়র গাইড ভিড়ে গিয়েছিল আমাদের দলে । তার মাঝে একজন তার পরিবারের ১২তম সন্তান । স্থানীয় মাদ্রাসায় পড়াশুনা করা পরিবারের একমাত্র অক্ষরজ্ঞান সম্পন্ন সদস্য । বাকিদের অবস্থাও কাছাকাছি । বনের একটু গভীরে গিয়ে আমরা অবাক হয়ে গেলাম । কোন নিদৃষ্ট দিকে হাটলেই হরিণের পাল চোখে পড়ে । হাটার শব্দ পেলেই দৌড়ে পালায় । অত্যন্ত ভীতু প্রানী এই হরিণ। দূর থেকে দেখেই ক্ষান্ত হতে হয়েছে। ছোট্ট একটা দ্বীপে এত হরিণ, আমরা নয়জন, চিতাবাঘ স্টাইলে লাফ দিয়ে হরিণ বধ করার ফ্যান্টাসী দুরদর্শনেই পূর্ন করতে হয়েছে।

হরিণ ভ্রমন আরো বাকী ছিল । স্থানীয় বাজারে ফিরে এসে দুপুরের খাওয়া সারলাম । সব পর্যটকই নৌকা নিয়ে ঘুরপথে বনের মানুষ্যবিবর্জিত একটি স্থানে যান যেখানের মাঠে সন্ধ্যার সময় হরিণ ঘাস খেতে আসে। একটি খাল দিয়ে দ্বীপের লোকালয়ের সম্পুর্ন বিপরীত পাশের বন। বনের ঢোকার পূর্বে অনেকখানি খোলা মাঠ। বরাবর সামনে গেলে হরিণদের পানি খাবার সুবিধার্থে বন বিভাগের কাটা সবচেয়ে বড় পুকুর রয়েছে। আশেপাশে হরিণের সংখ্যাও তাই বেশি । দিনের আলো যখন প্রায় মেঘনায় ডুব দিচ্ছে, আমরা নৌকায় কোন শব্দ না করে বসে আছি । শব্দ শুনলেই হরিণ পালাবে । একপাল হরিণ যখন তাদের ফ্রেশ ঘাস পার্টিতে আসলো তখন চারপাশ অন্ধকার । আকাশে চাদের আলো। দুর থেকে অদ্ভুত কিছু আওয়াজ আসছিল । অনেকটা কাশির মত । আমরা অল্পস্বরে হাসাহাসি করছিলাম যে হরিণদের বোধহয় ঠান্ডা লেগেছে। একটু পরে এই আওয়াজ আরো বাড়তে লাগলো । খালে আমরা ঘাপটি মেরে বসে আছি। দুইপাশের মাঠে হরিণসংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়তে লাগল ।

হরিণের ডাক – নিক্কন । একেবারেই মিল নেই । নিজের কানে না শুনলে কেউ বিশ্বাসই করবেন না হরিণের ডাক এত অদ্ভুত । মৃদুপায়ে হরিণগুলো সামনে এগিয়ে আমাদের নৌকা বরাবর দাড়িয়ে তারস্বরে চেচাতে লাগল । নৌকাযাত্রীদের অনাকাঙ্খিত উপস্থিতিতে তারা যেন বড়ই বিব্রত ।আলোআধারিতে সে এক অদ্ভুত ভাললাগার অনুভুতি । মাত্র ২০-২৫ মিটার দুরত্বে একপাল হরিণ ডাকছে। অনুভুতি প্রকাশ বর্ণনার অতীত । দীর্ঘ ভ্রমনের সকল ক্লান্তি এক নিমিষেই দুর হয়ে গেল । নৌকাযাত্রীদের কাছ থেকে সম্ভাব্য কোন বিপদ ঘটার আশংকা নেই বোধকরি এই নিশ্চয়তায় হরিণপাল আমাদের পার হয়ে আরো সামনে এগিয়ে গেল ।

নৌকা নিয়ে ফেরার সময় সবার মুখে একই কথা, দোস্তো; এইটা কি দেখলাম !!!

পরদিন ঢাকা। নিঝুম দ্বীপ থেকে হাতিয়া । লঞ্চ জার্নি করার ইচ্ছা করোরই নাই। ঢাকা ফিরে অনেককেই আবার বাড়ী যাওয়ার বাস ধরতে হবে। হাতিয়ে থেকে সী-ট্রাকে করে বিখ্যাত জেলা নোয়াখালী। সেখান থেকে বাসে করে ঢাকা।

উইকিপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী নিঝুম দ্বীপে ৫ হাজারের ও অধিক হরিণ রয়েছে, আর রয়েছে ১০০+ প্রজাতির পাখি । দ্বীপের বেশিরভাগ জায়গা জুড়েই রয়েছে বনাঞ্চল । সৌন্দর্য নয়নাভিরাম । পোলাপাইনের ঘুরতে যাওয়ার জায়গা হিসেবে অসাধারন । পুর্বশর্ত প্রচুর হাটার মানসিকতা এবং শারীরিক সক্ষমতা থাকতে হবে। রাস্তাঘাটের অবস্থা বেশ খারাপ । থাকার অবস্থাও খুব একটা সুবিধার না। যত সুন্দর ই হোক না কেন, ইহা বিখ্যাত জেলা নোয়াখালীর অন্তর্গত । আপনি ঘুরতে গিয়েছেন বোঝামাত্র সকল রিক্সাভাড়া দ্বীগুন হয়ে যাবে এবং বারগেইন করে একেবারেই সুবিধা করতে পারবেন না। ট্যুরিস্টদের কাছ থেকে বেশি ভাড়া/দাম আদায় করতে এলকার লোক অস্বাভাবিকভাবে ঐক্যবদ্ধ । যদি একটু ব্যস্ততা প্রকাশ করেন সেক্ষেত্রে ভাড়া আরো বেশি গুনতে হবে ।

সবশেষে কিছু ফটুক

৩,৯৬৯ বার দেখা হয়েছে

৩৮ টি মন্তব্য : “নিঝুম দ্বীপ”

    • রাজীউর রহমান (১৯৯৯ - ২০০৫)

      হরিণের ছবি তোলার সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হয়েছে। বনে প্রায় ২ ঘন্টার অনেকখানি এই কাজেই ব্যায় হয়েছিল। বিভিন্ন পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছিল। সবগুলোই ব্যর্থ হয়। পুরোটাসময় একটা SLR ক্যামেরার অভাব বোধ করেছি। ভালো লেন্সওয়ালা একটা SLR ক্যামেরা থাকলে হরিণেরই কয়েকশ ছবি তোলা যেত । সামান্য আওয়াজ পেলেই হরিণ পালায় । সাধারন ডিজিটাল ক্যামেরায় জুম করে ছবি তোলা সম্ভব হয় নি। 🙁 🙁

      জবাব দিন
  1. তাহমিনুল (২০০২-২০০৮)
    “এই দ্বীপে হরিনের সংখ্য কত?”। নির্বিকারভাবে তিনি উত্তর দিলেন ” পঞ্চাশ হাজার” । মেঘনায় গোসল শেষে রেস্ট হাউসে যাওয়ার পথে বয়োজেষ্ঠ্য একজন কে একই প্রশ্ন জিজ্ঞেস করায় অনেক ভেবেচিন্তে তিনি উত্তর দিলেন ” … তা, এক লক্ষ তো হবেই

    :frontroll: :frontroll: :frontroll: :frontroll: :frontroll:
    ভাল ছিল :just:

    জবাব দিন
  2. যত সুন্দর ই হোক না কেন, ইহা বিখ্যাত জেলা নোয়াখালীর অন্তর্গত

    প্রকৃত অর্থে এটা যে কোন tourist spot এর জন্য ই সত্য।ভাল্লাগসে ভাই লেখাটা পড়ে।আপ্নাদের সাথে ত যাইতে পারলাম না...দেখি এইবার এই মানুয়াল ফোলো করে যাওয়া যায় কিনা?

    জবাব দিন
  3. আশহাব (২০০২-০৮)

    ফেব্রুয়ারীতে সুন্দরবন যাচ্ছি 😀
    আমার টার্গেট রয়েল বেঙ্গল 😀
    রাজী ভাই দোয়া রাইখেন 😛
    অ.ট. :পইড়া দারুন মজা পাইলাম, ছবিগুলা বড় হইলে ভাল হইতো| 🙂


    "Never think that you’re not supposed to be there. Cause you wouldn’t be there if you wasn’t supposed to be there."
    - A Concerto Is a Conversation

    জবাব দিন
    • রাজীউর রহমান (১৯৯৯ - ২০০৫)

      ছবি প্রথমে বড় করেই দিসিলাম, লোড হইতে অনেক টাইম লাগে দেখে পরে গ্যালারি বানায়ে দিছে একজন।

      সুন্দরবন আমরা ক্লাসের পোলাপাইন সব একসাথে যাওয়ার চেষ্টায় আছি। কতটুকু সম্ভব হবে জানিনা, আতেল পোলাপান সব।
      :just: একটা রয়েল বেঙল টাইগার বাইন্ধা নিয়ে আইসো আমার জন্য। পুষব ঠিক কর্ছি।

      জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।