এই দূর পরবাসে ……

খুব মন খারাপ। বিছানায় পড়ে থাকা আমার মত নিঃসঙ্গ সেল ফোন টায় সেই প্রিয় নাম্বার টা ডায়াল করলাম। হয়তো শুনতে পাব প্রিয় একটি কন্ঠস্বর। রিং হচ্ছে কিন্তু কেউ ফোন ধরছে না। অনেকক্ষন রিং হল। একবার মনে হল ফোন না ধরলেই ভাল। হয়তো কোন খারাপ খবর শুনে মনটা আরও খারাপ হবে। কারন আজকাল দেশ থেকে শুধু খারাপ খবর আসে। তেলের দাম আরও বাড়ছে, এখন প্রতিদিন ৮ ঘন্টা লোডশেডীং হয়, বাসের ভাড়া বাড়েছই, কেউ আবার হাসপাতালে, মায়ের অসুখটা আবার বাড়ছে। সব সময় একটা আতঙ্কের মধ্যে থাকতে হয় আমাদের।
আসলে আমাদের এই পরবাস জীবনে আমরা সবাই আস্তে আস্তে পাথর হয়ে যাচ্ছি । নানারকম ঝামেলায় মনের অনেক আবেগ আস্তে আস্তে মরে যাচ্ছে, আমারা না চাইলেও। এক একটা দিন মনে হয় একটা বছরের মত বড়। সবাই ভাবে আমরা হয়ত সবাই কে ভুলে যাচ্ছি, দেশ কে ভুলে যাচ্ছি। কিন্তু আসলে কি তাই? ঝকঝকে তকতকে এই শহরের ফিটফাট রাস্তায় বসে আজও ঢাকা্কে খুব মিস করি । এই বিলাস বহুল ‘রাপিড – কেএল’ বাসের চেয়ে অনেক বেশি আপন মনে হয় ঢাকার ৬ নম্বর লোকাল বাস।
সেদিন বাসে করে ইউনিভাসিটিতে যাচ্ছি, আমার পাশের সিট একটা ছেলে বসে কাঁদছে। দেশি মানুষ মনে হয়াতে জানতে চাইলাম কি সমস্যা।ছেলেটা লজ্জা পেল। সে বলে আমি ভেবেছিলাম আপনি এই দেশি। আমি হাসলাম । গ্রামের ছেলে, অনেক স্বপ্ন নিয়ে আসছে পড়াশুনা করতে, জমি জমা বিক্রি করে। কিন্তু পড়াশুনা আর হয়নি। একটা ভিসা কলেজে সপ্তাহে ২ দিন করে যায়, আর দুপুর ২ টা থেকে সকাল ৭ টা, ১৬ ঘন্টা একটা ডিস্কোতে কাজ করে। সারারাত কাজ করে এখন কলেজে যাচ্ছে। যা বেতন পায়, তাতে কলেজের টিউশন ফি আর থাকা খাওয়াতে সব শেষ। ওর এখন একটাই স্বপ্ন টিকেটের টাকা জমলেই দেশে চলে যাবে। টাকাটা জমবে তো?
আমার রুম মেট এর বাবা খুব অসুস্থ। অনেক দিন দরে বারডেমে আছেন। দুই দুই টা হাটএটাক আর ডায়বেটিস এ খুব খারাপ অবস্থা । বাবা কে একবার দেখতেও যেতে পারছে না। প্রতিদিন রাতে ছেলেটা বিছানায় ছটফট করে। এর মাঝে একদিন গালফ্রেন্ড এর এসএমএস ‘আমাকে ভুলে যাও, আমার বিয়ে ঠিক হয়েছে”। ৮ বছরের ভালবাসা এক এসএমএস এ শেষ। ওর এই কষ্ট দেখে মনটা আরও খারাপ হয়। এই কষ্ট কি শেষ হবার নয়?
আমার আরেক বন্ধু, এখানে আসছেন বেশ কিছু দিন। একটা সুপারমলে কাজ করেন। যা বেতন তাতে মাসে ১০,০০০ টাকা দেশে পাঠানোই দায়। দুটো ছেলে স্কুলে পড়ে, বাড়িতে মা আছেন, বউ আছে। এই টাকায় তো সংসার চলে না। দেশেও যেতে পারছেন না। সবাই বড় আসা করে আছে। তার মা সব সময় বলেন, আমার ছেলে বিদেশে, এখন অনেক টাকা পাঠাবে, আমার কোনো কষ্ট থাকবে না। মা এখনও অপেক্ষায় আছেন দিন বদলের। ছেলে বেশি বেশি টাকা পাঠাবে। কবে শেষ হবে এই অপেক্ষার?
আমি নিজেও খুব একটা ভাল নাই। পরাশুনা করছি। কিন্তু সব সময় মিস করি দেশকে, বন্ধু দের, বাবা মাকে । অনেক সময় ভাবি আমার বাবা মা অসুস্থ হলে কি আমি দেখতে জেতে পারব? কলেজ থেকে জেতে দিবে না, টিকেট, ভিসা অনেক সমস্যা । মা সব সময় জানতে চায়, তুই কবে দেশে আসবি। আমি সবসময় বলি নেক্সট সেমিস্টার ব্রেকে। আমার সেমিস্টার কবে শেষ হবে?
সব সময় ভয়ে থাকি কবে শুনব বাবা বা মা মারা গেছেন, কিম্বা খুব অসুস্থ। দেশ থেকে ফোন আসলেই আমার ভয় লাগে। মাঝে মাঝে মনে পরে এয়ার পোর্ট এ বাবার কান্নার কথা। মনে পরে মা সব সময় ফোন করে কাদে। আজকাল আমার প্রিয় মানুষটার সব সময় মন খারাপ থাকে। আমি ফোন করে কথা খুজে পাই না । মন ভাল করার মত কিছু বলতে পারি না। কেমন জানি মনে হয়, আমি কেন এমন হয়ে যাচ্ছি। আগে তো পারতাম তার মন ভাল করতে। এখন সে ফোন করলেই, আমি কেমন উদাস হয়ে যাই। হয়ত ভয় লাগে কবে সে বলবে , ‘আমি দুখিঃত, আমাকে ভুলে যাও’। সেই ভয়ে আমি এখন ফোন করি না।
মন খারাপ ছিল খুব, মন ভাল করবার জন্যে লিখতে বসেছিলাম, জানি না ভাল হ্ল কিনা।অনেক দিন অনেক মিস করি একটু ভালবাসার স্পশ। কিম্বা প্রিয় কোন কন্ঠ্স্বর। আমাকে বলবে ভয় নেই। আবার ফোনটা তুলে নিলাম, আবার রিং হচ্ছে…

১,১৮৮ বার দেখা হয়েছে

১৪ টি মন্তব্য : “এই দূর পরবাসে ……”

  1. আলম (৯৭--০৩)

    ভাই, আমার মনে হয় অল্প কিছু টাকা-পয়সা কামাই করে তারপর জলদি জলদি দেশে ফিরে যাওয়াই ভালো। বাবা-মা আর 'প্রিয় মানুষটাক' নিয়ে নিজ দেশে একত্রে থাকার চেয়ে সুখের বোধহয় আর কিছুই নাই।

    জবাব দিন
  2. জিহাদ (৯৯-০৫)

    এই দূর পরবাসে - গানটা শুনলেই বুকের মধ্যে কেমন জানি ফাঁকা ফাঁকা লাগে।
    যারা থাকে তাদের কেমন লাগে সেটা বোঝার সাধ্য আমার নাই...

    লেখাটা ভাল্লাগছে।


    সাতেও নাই, পাঁচেও নাই

    জবাব দিন
  3. সাব্বির (৯৫-০১)

    বিদেশ আসলে এমনই এক রসগোল্লা যে সবাই খেতে চায়। এবং খাওয়ার পর না হয় হযম আর না হয় বদহযম।
    মেহেদী বেশী মন খারাপ হলে মেসেজ্‌ দিস, কল দিব।
    লেখাটা ভাল হইছে। পারফেক্ট ফর প্রবাসী লাইফ।

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।