টুকরো স্মৃতি: অস্তিত্বের স্বীকৃতি


দুই বছর আগে যখন প্রথম এই কার্ডিফ শহরে এসেছিলাম, খুব মুগ্ধ হয়েছিলাম এই শহরের ল্যান্ডস্কেপ দেখে। পুরো ইংল্যান্ডে অনেক বাঙালি থাকলেও, কার্ডিফে বাঙালি খুবই কম। তখন কারো সাথে পরিচয় হলেই জিজ্ঞাসা করত, ‘হোয়্যার ইউ ফ্রম, আর ইউ ফ্রম ইন্ডিয়া?’ কেন জানি খুব গায়ে লাগতো আমার ইন্ডিয়ান পরিচয়টা, সবারই মনে হয় লাগে প্রথম প্রথম। জোর গলায় বলতাম, ‘নো, আই এম ফ্রম বাংলাদেশ’। নিশ্চিতভাবেই পরের প্রশ্ন, ‘হোয়্যার ইজ বা্ংলাদেশ?’ দু’একজন হয়তো চিনত এইভাবে, ‘ও, ল্যান্ড অফ ফ্লাড’। এখানে ক্রিকেট নিয়ে তেমন কোনো উন্মাদনা নেই, তবু দু’একজন হয়তো মনে রেখেছিল কার্ডিফে অষ্ট্রেলিয়াকে বা্ংলাদেশের হারানোর কথা। ওরা হয়তো বলতো, ‘ও্হ, ইউ মাস্ট বি লাইকি্ং ক্রিকেট।’ একদিন কার্ডিফ থেকে ট্রিফরেস্ট এর ট্রেন আসতে এক ভদ্রলোকের সাথে কথা হচ্ছিল। সে কার্ডিফে, বাংলাদেশের অষ্ট্রেলিয়াকে হারানোর ম্যাচে দর্শক ছিল। ভদ্রলোক ওই সময় ড্রাঙ্ক ছিল, তবু তার সাথে গল্প করতে ভালো লাগছিল। সে অযথাই চিৎকার করছিল, ‘ইয়া, টু লিটল ম্যান মেইড ইট পসিবল ফর বাংলাদেশ’ বুঝলাম আশরাফুল আর আফতাব এর কথাই বলছেন, নাম বলতে আশরাফুল কে চিনতেও পারলেন। খুব ভালো লাগছিল ট্রেনের বাকি পথটুকু, আর সে চিৎকার করেই যাচ্ছিল, ‘ইয়া, আশরাফুল, লিটল চ্যাপ, হি.**** অষ্ট্রেলিয়া বেডলি দেট ডে’


এখানে এসেই স্টুডেন্টদের প্রথম মাথা-ব্যথা থাকে একটা পার্টটাইম জবের ব্যবস্থা করা। ভাগ্য সুপ্রসন্ন থাকায় আমিও একটা জব পেয়ে গেলাম। আমি যে শপে কাজ করতাম, সেখানে আমার সাথে মরিশাস এর একটা ছেলে কাজ করত। ওর সাথে আমার খুব ভালো বন্ধুত্ব হয়েছিল। তার সাথে প্রথম যেদিন পরিচয় হয়েছিল, তাকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, ‘মরিশাস কোথায়?’ ‘ও অনেক চেষ্টা করেও আমাকে বোঝাতে না পেরে, ওর মোবাইলে গুগল ম্যাপ বের করে দেখালো যে মরিশাস কোথায়’ আমাকে তখন জিজ্ঞাসা করলো, ‘হোয়্যার উই ফ্রম?’ আমি বললাম, ‘বা্ংলাদেশ’, বলেই আমার মোবাইলটা বের করে গুগল ম্যাপে বা্ংলাদেশ খোঁজা শুরু করলাম, কিন্তু ও আমাকে অবাক করে দিয়ে বলল, ‘আই নো বাংলাদেশ, ইজ নট দ্য প্লেস ওয়ার ডক্টর ইউনুস ইজ ফ্রম?’ আমি একটা হাসি দিয়ে বললাম, ‘ইউ গট ইট এক্সাক্টলি’ এরপর আমাকে অসংখ্য প্রশ্ন করতে থাকলো ইউনুস সম্বন্ধে, তার সাথে যে আরেকটা মহিলা ছিল নোবেল পুরষ্কার নেয়ার সময়, সেই মহিলা সম্বন্ধে, গ্রামীন ব্যাংক সম্বন্ধে। বেশিরভাগ প্রশ্নেরই উত্তর দিতে পারিনি, তবু সেদিন কাজের বাকি সময়টুকুও খুব ভালো লাগছিল।

এই দু’বছরে কার্ডিফে বা্ংলাদেশি স্টুডেন্টডের স্ংখ্যা আগের চেয়ে বেড়েছে। ক্রিকেট খেলুড়ে দেশ হিসেবে, হয়তো কার্ডিফের মানুষেরা বা্ংলাদেশকে আগের চেয়ে আরেকটু ভালো করে চিনে, কি্ংবা আমাকে ইন্ডিয়ান বললেও এখন হয়তো আর আগের মত প্রতিবাদ করি না। তবু মাঝে মাঝে যখন এসব ক্ষুদ্র হারিয়ে যাওয়া আনন্দের স্মৃতিগুলো ভাবি, তখন এতো প্রবল আনন্দের কারণগুলো খুঁজে পাইনা। ভাবি, হয়তো ওগুলো ছিল, ‘নিজের অস্তিত্বের স্বীকৃতি পাবার আনন্দ’।

১,০৬০ বার দেখা হয়েছে

১৯ টি মন্তব্য : “টুকরো স্মৃতি: অস্তিত্বের স্বীকৃতি”

  1. নাজমুল (০২-০৮)

    এই সমস্যা সবখানে। এটা আসলে ওদের সমস্যা না, আমরা যেমন চাইনিজ,জাপানিজ,কোরিয়ান আলাদা করতে পারিনা সেরকম আরকি।
    তবে আমি এক আপুর কাছে এমন কথা শুনসি, যেটা শুনে খুব খারাপ হয়ে গেসিল মেজাজটা।
    আপু LSE তে মাষ্টার্স করতে আসছিল। ওদের টিউটন ফী'স তো অনেক। আপু অবশ্য বুয়েট এর টিচার হওয়ার কারণে স্কলারশীপ এ আসছে। তো যারা স্কোলারশীপ এ আসেনাই তারা তো বিশাল বড়লোক, কারণ বছরে ২২/২৩ হাজার পাউন্ড কম কথা না। এখানে যেসব বাঙ্গালীরা পড়তো, বেশ কয়েকজন এ নাকি, নিজেদের ইন্ডিয়ান হিসেবে পরিচয় দিত। x-(

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।