মিসিং লিস্ট

আমার হারাবার তালিকা দীর্ঘ হতেই থাকে। কিন্ডারগার্টেনে ভর্তি হয়ে হারালাম সারা সকাল মায়ের আঁচল ধরে ঘরময় ঘুরঘুর করার স্বাধীনতা। হারালাম মধ্যাহ্নের কিছুক্ষণ আগে রান্না শেষ করে ফেরা ক্লান্ত মায়ের বুকের কাছে গুঁটিসুটি হয়ে শুয়ে থাকার অবিশ্বাস্য ভালো লাগা। ছেলেমানুষি খেয়ালিপনায় ক্লাসরুমে হারালাম হলুদ শরীরের গ্রেট ওয়াল পেন্সিল, গলায় ঝুলিয়ে রাখার ওয়াটার ফ্লাস্ক যার গায়ে আঁকা ছিল পছন্দের কার্টুন চরিত্র মিকি মাউস। বারোটি রঙের লুনা কালার পেন্সিলের নতুন বাক্স। বাবার কিনে দেয়া এরোপ্লেন টেনিস বল। মায়ের কুরুশ কাটায় বোনা ছোট্ট মাফলার। মলাটের ছবি দিয়ে পরিচিত হাতি মার্কা ড্রইং খাতা। হলুদ রঙা কাঠের স্কেল। দৈর্ঘ্য বারো ইঞ্চি। তিরিশ সেন্টিমিটার। মূল্য দশ টাকা।

নতুন স্কুলে এসে হারালাম টিফিন ব্রেকে দোলনা, স্লিপার, ঢেঁকির রাজ্যে হারিয়ে যাবার সুখ। হারালাম সন্ধ্যাবেলায় নিশ্চিন্তে টিভি দেখার নিশ্চয়তা। কারণ বেড়ে গেল পড়ালেখার ওজন। একে একে হারালাম পরীক্ষার খাতায় পেন্সিলে লেখার অধিকার। নেভি ব্লু হাফ প্যান্ট পরার অধিকার। স্কুলবাসের গাদাগাদিতে সকাল বেলায় ক্লাসে যাবার অধিকার। ক্লান্ত দুপুরে পেছনের সিটের জানালায় থুঁতনি রেখে ফিরে আসার অধিকার। কারণ ছেলেদের জন্য ক্লাস সিক্স থেকে স্কুল বাস ছিল না।

বড় হতে হতে আমি হারালাম বাবার শখের কম্পাস, ভাইয়ের টিনটিন কমিকস, বোনের টেবিল থেকে লুকিয়ে নেয়া দামি জেল পেন। হারালাম শৈশবের নিঃশর্ত আহ্লাদ। তারাবিহ নামাজ ফাঁকি দিয়ে গোল্লাছুট খেলা। বন্ধুর জন্য পছন্দের ঈদ কার্ড কিনতে গিয়ে অন্তহীন বাছাবাছি। হারালাম সরল অংক। ঐকিক নিয়মের চৌবাচ্চা। তৈলাক্ত বাঁশের বানর। পৌনঃপুনিকের আশ্চর্য নিয়ম।

হারিয়ে গেল কণ্ঠের চেনা আওয়াজ। হারালো গালের মাংস। গোলগাল মুখ বদলে হয়ে গেল লম্বাটে পাংশু চেহারা। একে একে হারালো টুনি-মন্তুর রাত জেগে মাছ ধরা, হারালো সামাজিক বিজ্ঞানের পৌরনীতি, ক্যালকুলাস, আইনস্টাইনের আপেক্ষিক সূত্রের ব্যখ্যা, শ্বেত ফসফরাস থেকে লোহিত ফসফরাসে রুপান্তরের শর্তসমূহ।

আর পারছিনা। লিখতে গিয়ে মন খারাপ হয়ে যায়। আঙুল থেমে যায়। কমেন্টবক্সে স্বাগতম।

আমাদের হারাবার তালিকা দীর্ঘ হতেই থাকুক।

৮৫৮ বার দেখা হয়েছে

৭ টি মন্তব্য : “মিসিং লিস্ট”

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।