পাঁচ মিনিট বিরহের গল্প/ ২

আনিকা মেয়েটার ভেতর ন্যাকামি ভাব প্রবল। তার চেয়েও সাংঘাতিক রকমের প্রবল হল আদুরে আর ছিঁচকাঁদুনে স্বভাব। ভার্সিটিতে ভর্তি হতে এসে সেইরকম এক তুলকালাম বাঁধিয়ে দিয়েছিল অফিস রুমে। পেটমোটা রেজিস্ট্রি খাতা খুলে বসা রোগা কেরানি আনিকার নাম লিখেছিল আনিকা ফারহানা। ফাজলামি নাকি! সামাদ সাহেব রীতিমত ডাবল খাসি জবাই করে মেয়ের নাম রেখেছিলেন আনিকা ফারজানা, আর এই কেরানি সার্টিফিকেট দেখে দেখে লিখতে গিয়েও কীভাবে ‘বর্গীয় জ’ খেয়াল করলো না! লিখল গিয়ে ‘হ’! লোকটার রুচি এতো খারাপ। ‘হ’ একটা অক্ষর হল! হ তে হলুদ, হ তে হাফিজ। হলুদ রঙ আনিকা দুই চোখে সহ্য করতে পারেনা। কারণ হলুদ হচ্ছে নাফিসের পছন্দের রঙ।

আর হাফিজ হল আনিকাদের ড্রাইভার। ফাজিল নাম্বার ওয়ান। সকালবেলা আনিকাকে ক্লাসে নামিয়ে দিয়ে সে পঙ্খিরাজের মতন টান মেরে চলে যায় কমলাপুর। তার প্রেমিকার নাম বিলকিস। হাফিজ আর বিলকিস, দুই প্রেমিক-প্রেমিকা এসির বাতাস খায় আর শহরের চিপা রাস্তায় ঘুরে বেড়ায়। কাঁটাবন মোড়ে খরগোশ কিনতে গিয়ে একদিন নিজের চোখে দেখেছে আনিকা। ড্রাইভারের পাশের সিটে বসা মেয়েটার কাঁধে হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ছিল হাফিজ। মেয়ের গায়ের রঙ পরিস্কার। তবে মাথায় চুল কম।

– বুঝলা আনিকা, আল্লাহ্‌র দেয়া সবচেয়ে বড় গিফট হল বড়বোন।
নাফিসের এটা ট্রেডমার্ক স্টাইল। রিকশায় বসে ভ্যাবদা মেরে থাকবে। আকাশ দেখবে। গাছপালা দেখবে। রাস্তার পাশে ডাস্টবিনে উঁকি দেবে। স্পিড ব্রেকার পার হবার সময় “আঁউচ!” করে শব্দ করবে। কিন্তু ভুলেও আনিকার দিকে একবার তাকাবে না। তারপর হঠাৎ আকাশ থেকে একটা কথা পেড়ে আনবে। ছুঁড়ে দেবে খোলা বাতাসে।
– বাবা-মা কি তাহলে মিনি গিফট?
আনিকার পাল্টা প্রশ্ন। জবাব হিসেবে যেন এই প্রশ্নটার অপেক্ষাই করছিল নাফিস। নড়েচড়ে বসল সে। আনিকার দিকে আরও একটু সরে এলো। আনিকার ভালোই লাগলো ব্যাপারটা।
– বাবা-মা কোনো গিফট নয়। বাবা-মা হল তোমার অধিকার। কিংবা বলতে পারো তোমার প্রাপ্য। ধরো, আমার জন্মদিনে একটা হলুদ টি-শার্ট তুমি গিফট করতে পারো, কিন্তু তোমার গালের টোল গিফট করতে পারবে না।
– কেন? গালের টোল গিফট করা যাবেনা কেন?
আনিকার ট্রেডমার্ক ন্যাকামি শুরু হয়ে গেল। নাফিস বুঝতে পারছে পরিস্থিতি খুব দ্রুতই তার নাগালের বাইরে চলে যাবে।
– কারণ দিনে তিনবার তোমার টোল ছুঁয়ে দেয়া আমার অধিকারের ভেতর পড়ে। দায়িত্বও বলা যায়। বলতে পারো গ্যাস্ট্রিক রোগীদের তিনবেলা ভাত খাওয়ার আধঘণ্টা আগে অ্যানটাসিড খাওয়ার মত আর কি।
– তুমি কি গ্যাস্ট্রিকের রোগী?
– না মানে, কথার কথা বললাম আর কি।
– আমি অ্যান্টাসিড?
– আরে এই কথা কখন বললাম! জাস্ট একটা এক্সামপল দিচ্ছিলাম আর কি।
– মামা, রিকশা থামাও তো
– কেন? রিকশা থামবে কেন?
– ফার্মেসিতে যাবো। তোমার জন্য অ্যান্টাসিড কিনবো। সিরাপ হলে চলবে?
– অ্যাঁই আনিকা, কী শুরু করলা?
ততক্ষণে রিকশা থেমে গেছে। আশা ফার্মেসি। আনিকা সত্যি সত্যিই নেমে গেল।

দুই বছর একসাথে থাকার পরও নাফিস এই মেয়েটার ন্যাকামি পুরোপুরি ধরতে পারেনি। এমনিতে অসম্ভব মায়াবতী। কিন্তু হঠাৎ হঠাৎ কী যে হয়! মেসের রুমমেট বাবুল ভাই বলেন মাইক্রোবায়োলজি ডিপার্টমেন্টের মেয়েরা এরকমই। বাবুল ভাই অভিজ্ঞ মানুষ। ম্যাথের জুনিয়র ম্যাডামের সাথেও প্রেম করেছিলেন মাস তিনেক। তার কথা ফেলে দেয়া যায় না। অণুজীববিজ্ঞানের এই মেয়ের খামখেয়ালি হৃদয়ের নাম না জানা অনুজীবের চরিত্র ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপ চোখে লাগিয়ে উদ্ধার করা নাফিসের সাধ্য নয়। কারণ তার চোখে সমস্যা। চশমা লাগিয়েও ঝাপসা পৃথিবী।

– সরে বসো, নাফিস
– তুমি সত্যিই সিরাপ কিনলা?
– ট্যাবলেটও আনবো?
– না না, ঠিক আছে

রিকশা এগোতে থাকে। আবার নীরবতা নেমে আসে দুই সিটের চারপাশে। কাগজের প্যাকেটে মোড়া সিরাপের বোতলটা ব্যাগে ভরে নেয় আনিকা। চেইন টেনে ব্যাগ বন্ধ করতে গিয়ে আচমকা একদলা কান্না উঠে আসে তার গলায়। মুখ ফুটে কিছুই বলতে পারেনা সে। ঝড় বয়ে যেতে থাকে তার অন্তরের উঠোনজুড়ে। তরুণের কলার চেপে ধরে তার বলতে ইচ্ছে করে অনেক কথা। অনেক কথা।

নাফিস! তুমি খেয়াল করে দেখেছো আমি কতটা শুকিয়ে গেছি? জানো কেন আমি কিছু খেতে পারিনা? দেখেছো আমার রাতজাগা চোখের নিচের কালি আমি ঢেকে দিয়েছি গাঢ় কাজলের আবরণে? অযত্নে চুল পড়ে যাচ্ছে বলে আমি এখন আর খোঁপা করতে পারিনা, সেটা দেখেছো? শেষ কবে তুমি আমার কপালে টিপ দেখেছো? হাতে সবুজ রঙের কাচের চুঁড়ি দেখেছো? রিকশায় পাশাপাশি বসে তোমার আঙুল ছুঁয়ে থাকি, হাত জড়িয়ে ধরি, ঝাঁকুনি হলে হাতের মুঠো হঠাৎ শক্ত হয় বলে তুমি কী ভেবেছ, নাফিস? তুমি কবিতার বনলতাকে কণ্ঠে জীবন্ত করে তোল, আমার অন্তরের সোনার কাঠি রুপোর কাঠির খোঁজে চষে ফেলো রবীন্দ্রনাথ, গার্সিয়া মার্কেজ, রুমী, হুমায়ূন আজাদ কিংবা হেলাল হাফিজ। কিন্তু আমার দিকে তুমি একবার খেয়াল করে চেয়ে দ্যাখো না! তুমি কবে আমাকে আমার মত ভালবাসবে? কবে আমার কাঁধে হাসতে হাসতে ঢলে পড়বে হাফিজের মত? আমার যে বড্ড বিলকিস হতে ইচ্ছে করে, নাফিস।

খেয়ালি তরুণ ভেতরে ভেতরে ছটফট করতে থাকে। চক্ষে তাহার তৃষ্ণা। বক্ষে তাহার তৃষ্ণা। তার খুব ইচ্ছে করছে পাশে বসা তরুণীর গালের টোলে ঠোঁট ডুবিয়ে দিতে। খামখেয়ালিপনা করতে করতে সে এখন ক্লান্ত। ইচ্ছে করছে তরুণীর চোখে চোখ রেখে একটানা দশমিনিট পিটপিট করে তাকিয়ে থাকতে। কানের কাছে ফিসফিস করে বলতে ইচ্ছে করছে, বাঙালি তরুণ যা করতে চায়, অদৃশ্য বাধা তাকে কখনোই তা করতে দেয় না।

২,৫০০ বার দেখা হয়েছে

৩৬ টি মন্তব্য : “পাঁচ মিনিট বিরহের গল্প/ ২”

  1. ফেরদৌস জামান রিফাত (ঝকক/২০০৪-২০১০)

    আহমদ ভাই, গন্ধের ব্যাপারটা এখনও আনিনি। ভবিষ্যতে আসবে ইনশা আল্লাহ্‌ 🙂


    যে জীবন ফড়িঙের দোয়েলের- মানুষের সাথে তার হয় নাকো দেখা

    জবাব দিন
  2. রেজা শাওন (০১-০৭)
    নাফিস! তুমি খেয়াল করে দেখেছো আমি কতটা শুকিয়ে গেছি? জানো কেন আমি কিছু খেতে পারিনা?

    তোমার গল্পের নায়িকা তো টিপিকাল জান ভাত খাইছ রোগের রোগী? ভাত খাইছে কি'না জিজ্ঞেস না করলে রাগ করে।

    তিনবেলা "ইমশোন+" প্যারাসিটামলের উপর রাখতে হবে। খেয়াল রেখ।

    লেখা ভাল হচ্ছে। সিরিজ চলুক।

    জবাব দিন
  3. মোকাব্বির (৯৮-০৪)

    কি পেলাম কি পেলাম না
    চুমু খেলাম কি খেলাম না
    ওভাবেই দাঁড়িয়ে থাকো
    আর তোমার সাথে গেলাম না। :awesome:


    \\\তুমি আসবে বলে, হে স্বাধীনতা
    অবুঝ শিশু হামাগুড়ি দিল পিতামাতার লাশের ওপর।\\\

    জবাব দিন
  4. সামিউল(২০০৪-১০)
    বাঙালি তরুণ যা করতে চায়, অদৃশ্য বাধা তাকে কখনোই তা করতে দেয় না।

    রিফাত, লেখা চালায়া যা, ভাল হইতেছে। তয়, মাইয়া এডু বেশি ন্যাকা.........


    ... কে হায় হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগাতে ভালবাসে!

    জবাব দিন
  5. মহিউদ্দিন (২০০২-২০০৮)

    ছেলের মনে রোমান্সের অভাব নাই। এখনি এই অবস্থা হলে দেবদাসের লেভেলে যেতে সময় বেশি লাগবে না। কিন্তু তোমার লিখার হাত চমৎকার। ভালো লেগেছে। এই সময়টায় সবাই লিখে। কিন্তু সময়টা দীর্ঘ হয়না। লিখালিখি চালু রেখ। :clap: :clap: :clap:


    Prisoner of Own Mind

    জবাব দিন
  6. নাজমুস সাকিব অনিক (০৩-০৯)

    নায়িকার প্রয়োজন রাজশাহীতে অধ্যয়নরত বেবাক চতুর্থ বর্ষের ছাত্রদের চান্দি দেখানো। আশা করি তার শোক মন্দীভূত হবে। ~x(

    রিফাত লেখা সুন্দর হইছে। সিরিজ ফলো করুম। আর সিদ্দিক ভাইয়ের কথায় কষ্ট পাইস না, হ্যাতে ইউরোপের ব্রেড খাইয়া "জান ভাত খাইছ"র মর্ম উদ্ধার কর্তার্তাছে না।

    জবাব দিন
  7. দিবস (২০০২-২০০৮)

    লেখা ভাল ছিল। সময়ের অভাবে আগে কমেন্ট করতে পারি নাই। মেয়েরা একটু ন্যাকা না হইলে চলে না। এটা ওদের অধিকার।

    লেখালেখি চালু থাকুক।


    হেরে যাব বলে তো স্বপ্ন দেখি নি

    জবাব দিন
  8. সালেহ (০৩-০৯)

    রিফাত, সাকিব অনেক দিন ধরেই তোর কথা বলতেছিল, ফেসবুকে সময় দেবার কারণে ক্যাডেট কলেজ ব্লগে আইসা তোর লেখা পড়তে পারি নাই। এখন নিয়মিত পড়ার ইচ্ছা আছে। হ্যাপি ব্লগিং।


    Saleh

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।