আমার মমতাময়ী মাটি

আমি কিছু অলৌকিক ব্যাপারে বিশ্বাস করি। তার মধ্যে সবচেয়ে বড়টি হল এই দেশের মাটি। আমার কেন যেন মনে হয় এই মাটি ব্যতিক্রম। পৃথিবীর অন্য যেকোনো জায়গার মাটির সাথে এর বড় রকমের পার্থক্য আছে। সেটা গঠনগত নয়, ঐশ্বরিক। এই মাটির মমতা আমাকে অলৌকিক কিছু ভাবতে বাধ্য করে। আমাকে বিশ্বাস করতে বলে যে, আমি বাংলার মাটি, আমি তোমার মা! আমি চোখ বন্ধ করে তার ছলছল দু’চোখের অশ্রু দেখতে পাই। শিশিরভেজা দূর্বাঘাসের বুকে পা রেখে হেঁটে যেতে যেতে আমি শুনতে পাই তার আদুরে ডাক। বৃষ্টিভেজা মাটিতে হাত বুলিয়ে দিলে আমার ভেতর অন্যরকম এক অনুভূতি জাগে যা আমি ঠিক ব্যখ্যা করতে পারিনা। হয়তো কোনোদিনই পারবোনা। অন্যরকম এক অনুভূতি! অন্যকিছু! ঐশ্বরিক! মাটির মমতা!

মাঝে মাঝে অনেকের মুখেই শুনি, সুযোগ পেলে স্থায়ীভাবে দেশের বাইরে চলে যাবো। আমার বুকের ভেতর মোচড় দিয়ে ওঠে। এই মাটির মায়া ছেড়ে দূরে থাকা কি সম্ভব? কিভাবে? আমার জন্ম, শৈশব, বেড়ে ওঠা চট্টগ্রামে। কৈশোরে পড়ালেখার জন্য দক্ষিনবঙ্গে থেকেছি। ছুটিতে ২/৩ মাস পরপর চট্টগ্রাম আসতাম। আসার পথে বাস যখন চট্টগ্রাম সিটি গেইট পার হত, আমার ইচ্ছে করতো বাস থেকে নেমে এই মাটি একটু ছুঁয়ে আসি, হাঁটু গেঁড়ে বসে কিছুক্ষণ কেঁদে আসি। আত্মার এই প্রবল আবেদন দাবিয়ে রেখে আমি কিভাবে ভিনদেশে পাড়ি দেবো? অসম্ভব! অসম্ভব!

আমার চেয়ে শতকোটিগুণ বেশি ভালোবাসা নিয়ে আমারই পূর্বপুরুষ হৃদপিণ্ডের রক্ত ঢেলে এই মাটির বুক ভিজিয়েছিল। আমার চিন্তার পরিধি সীমিত, তবু আমি দেশের মাটির হাহাকার অনুভব করতে চেষ্টা করি। দুশো ছেষট্টি দিন ধরে কত কত সন্তানের রক্তে জীবন ফিরে পেয়েছিল তাদের মা! আমার বাবার মা! আমার মায়ের মা! আমার ভাইয়ের মা! আমার বোনের মা! আমার মা! তাকে বাঁচাতে লাখো সন্তান নিজেকে উৎসর্গ করছে, এমন দুশো ছেষট্টি দিনে কী নিদারুণ বুকফাঁটা আর্তনাদ করেছে এই মাটি! এই কষ্ট কিছুটা অনুভব করতে চাইলে আমার নিজের জীবনের সব দুঃখ ম্লান হয়ে যায়।

পঁচিশে মার্চের গণহত্যা আমার মন বিষাদে ছেয়ে দেয়। কিন্তু সেই গণহত্যার মুহূর্তে বাংলার মাটির অন্তরে কী প্রবল বিষাদ ছেয়ে গিয়েছিল সেটা ভাবতে গেলে আমার বুক চাপড়ে কাঁদতে ইচ্ছে হয়। এতো দরদ, এতো মমতা, এতো ভালোবাসা, এতো হাসিমুখ এক রাতে হারিয়ে গেল?? আমার মাটি আমাকে উত্তর দেয়, না হারায়নি। বরং সেই দরদ, সেই মমতা, সেই ভালোবাসা লক্ষ-কোটিগুন বেড়েছে, এই মমতা আরও লক্ষ-কোটি বছর ধরে কোটি বাঙালির মাঝে সংক্রমিত হবে। হতেই থাকবে। বৃষ্টিভেজা মাটিতে হাত বুলিয়ে আজ থেকে হাজার বছর পরের তরুণটিও ঐশ্বরিক এক অনুভূতিতে কেঁপে উঠবে। ছলছল চোখে বিষাদভরা মন নিয়ে সেও আমার মতই কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে গেয়ে উঠবে………

কী শোভা, কী ছায়া গো, কী স্নেহ, কী মায়া গো-
কী আঁচল বিছায়েছ বটের মূলে, নদীর কূলে কূলে৷
মা, তোর মুখের বাণী আমার কানে লাগে সুধার মতো,
মরি হায়, হায় রে-
মা, তোর বদনখানি মলিন হলে, ও মা, আমি নয়নজলে ভাসি।।

৪০৩ বার দেখা হয়েছে

২ টি মন্তব্য : “আমার মমতাময়ী মাটি”

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।