আমরা যারা বাসা থেকে দূরে থাকি

বাসা থেকে দূরে থাকি বলেই হয়তো ঘুমের সময় মায়ের গামছা দুই হাতে ধরে বুকে জড়িয়ে রাখি। নিজের নতুন টি-শার্ট না ধুঁয়ে বহুদিন ফেলে রাখি আর বড়ভাইয়ের ফেলে যাওয়া গেঞ্জি বারবার ধুঁয়ে গায়ে চড়াই প্রতিদিন। বড়বোনের দেয়া আমের আচার ফুরিয়ে যাবার পরও মাঝে মাঝেই বয়ামের মুখ খুলে ঘ্রাণ নিই। বুক ভেঙে আসা হতাশায় নুয়ে পড়ার মুহূর্তেও মুঠোফোনের অপরপাশে বাবার গলা শুনে হাসিমুখে দুঃখ চেপে যাই কত সহজে!

মেস কিংবা হলের খাবার ভালো লাগেনা আমাদের। বাবার কাছে অনুযোগ করি। মায়ের সাথে অভিমান করি। তোমরা তো বাসায় দিব্যি পছন্দমত রান্না করে খাচ্ছো! রাগ করে গাল ফুলিয়ে থাকি, ফোনে কাটা কাটা কথা বলি মায়ের সাথে। কিন্তু সপ্তাহশেষে বন্ধুরা মিলে বাইরে খেতে গিয়ে বাবার মুখটা মনে পড়ে। ইচ্ছে হয় বড় দেখে একটা হটপট কেনার। পরেরবার বাসায় যাবার সময় বাবার জন্য নান্নার বিরিয়ানি নিয়ে যেতে ইচ্ছে হয়। বাবাকে ঢাকায় এনে টিনের চালের নিচে একসাথে বসে মোস্তাকিমের চাপ খেতে ইচ্ছে হয়। কচুখেত বাজারে বাবার সাথে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বিশ টাকার চিকেন ফ্রাই খেতে ইচ্ছে হয়।

বাসা থেকে দূরে থাকি বলেই হয়তো বন্ধুর প্রয়োজনে আড়ং- এ গিয়েও বাবার জন্য ফতুয়া খুঁজি। বাণিজ্য মেলায় সব বাদ দিয়ে মায়ের জন্য শাল খুঁজি। ভালো লাগার মত একধরণের অস্থিরতা নিয়ে অপেক্ষা করি কবে এগুলো নিয়ে বাসায় যাবো। তারপর যখন বাসায় যাই কিন্তু সেই শাল মায়ের পছন্দ হয়না, তখন রেগে যাই। মায়ের মুখের দিকে ছল ছল চোখে তাকিয়ে থাকি। অভিমান করে বলি, আর কিচ্ছু কিনে দিবো না!

সুযোগ নেই বলেই হয়তো মাঝরাতে হঠাৎ ধোঁয়া ওঠা গরম ভাতের সাথে মায়ের রান্না করা ছোট মাছের চচ্চড়ি খেতে ইচ্ছে হয়। অলস দুপুরে ঝোলের পানি মিশিয়ে দেয়ার আগেই কষানো মুরগির মাংসের একটা ছোট টুকরো টিভি দেখতে দেখতে চাবাতে ইচ্ছে হয়। আদুরে ভঙ্গিতে মায়ের বালিশে মাথা রেখে তাকে জড়িয়ে ধরে দু ফোঁটা চোখের জল ফেলতে ইচ্ছে হয়। মায়ের পক্ষ নিয়ে অফিসের কাজে অতিরিক্ত ব্যস্ততার দোষ কাঁধে চাপিয়ে বাবাকে মৃদু বকুনি দিতে ইচ্ছে হয়।

বাসা থেকে দূরে থাকি বলেই হয়তো দেয়ালে বড় একটা ক্যালেন্ডার ঝুলিয়ে রাখি। তিনদিনের ছুটিগুলো দাগিয়ে রাখি। যখন সেই দিনগুলোর ওপর চোখ পড়ে তখন মনে মনে পাটিগণিতের হিসেব মেলাই। জোর করে হলেও উত্তর ঠিকঠাক মিলিয়ে ফেলি। তারপর দিন গুণতে থাকি। হয়তো শেষ পর্যন্ত বাসায় যাওয়া হয়না। হয়তো বাবা-মা নিজেরাই নিষেধ করে দেয়। তখন আমরা ক্যালেন্ডারের পরের মাসের পাতা উল্টাই। হয়তো তার পরের মাস। হয়তো তারও পরের মাস। আমাদের পাটিগণিতের উত্তর মেলানো যে খুব প্রয়োজন। কারণ আমরা বাসা থেকে দূরে থাকি।

 

১,২৪৪ বার দেখা হয়েছে

১৩ টি মন্তব্য : “আমরা যারা বাসা থেকে দূরে থাকি”

  1. সাকেব (মকক) (৯৩-৯৯)

    রিফাত,
    অসম্ভব সুন্দর একটা লেখা।
    কি সহজ ভাবে আমাদের কষ্টগুলাকে তুলে ধরসো!
    Keep it up! :boss:


    "আমার মাঝে এক মানবীর ধবল বসবাস
    আমার সাথেই সেই মানবীর তুমুল সহবাস"

    জবাব দিন
    • ফেরদৌস জামান রিফাত (ঝকক/২০০৪-২০১০)

      অনেক ধন্যবাদ, ফয়েজ ভাই।
      আমি ফেরদৌস জামান রিফাত, জেসিসি ২০১০ ব্যাচ, থাকি ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে। ক্যাডেট নাম রিফাত, তবে এখন ফেরদৌস নামেই চালাচ্ছি। আর্মড ফোর্সেস মেডিক্যাল কলেজে আছি। থার্ড ইয়ার। গ্রামের বাড়ি নড়াইল। খুলনায় বাসা। বাসায় আব্বু-আম্মু থাকেন। বড়ভাই হাসনাত ফেরদৌস, জেসিসি ২০০৬ ব্যাচ। আর কী লিখবো বুঝতে পারতেসিনা। জানাবেন, ভাই 🙂


      যে জীবন ফড়িঙের দোয়েলের- মানুষের সাথে তার হয় নাকো দেখা

      জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।