বোম্বাস্টিং

শৈশবের অপ্রতিদ্বন্দ্বী ফেবারিট খেলার নাম বোম্বাস্টিং। এই খেলার উৎপত্তি কোথায় তা জানা যায়না, তবে বুৎপত্তি হয়েছে বোম+বার্স্টিং শব্দ থেকে। এই খেলার সবচেয়ে ভালো দিক হচ্ছে, শুধুমাত্র একটা টেনিস বল থাকলেই অনেকে মিলে খেলা যায়। কাজ খুব সোজা, হাতে বল আসামাত্রই নিকটতম পাবলিকের শরীর টার্গেট করে সর্বশক্তিতে বল ছুঁড়ে মারা। গায়ে লেগে গেলে পৈশাচিক আনন্দ হয়, যার গায়ে লাগে সেও আনন্দ পায়, লজ্জাও পায়। “হায় হায়, আমারে এমনে ফুটাইল!!” প্রতিশোধের লেলিহান শিখা তার কলিজার মধ্যে দাউ দাউ করে জ্বলতে থাকে। বিশাল ক্লাইম্যাক্স খেলায় ঢুকে যায়। আসলে যত সোজা বলা হচ্ছে, খেলতে গেলে ততটা সোজা না। বিশ্লেষণে পরে আসছি।

অনেকজন মিলে এটা খেলা যায়। আবার দুই দলে ভাগ হয়েও খেলা যায়। একদল অন্য দলের প্লেয়ারদের গায়ে বল মারবে। যারা টার্গেটে বেশিবার হিট করতে পারবে, তারা জিতবে। আমি জীবনে কতবার খেলেছি তার কোনো লিমিট নাই। কলোনির মাঠে, শীতকালে ধানক্ষেতে, স্কুলের ফ্রেন্ডদের সাথে টিফিন পিরিয়ডে, বাসার সামনের রাস্তায় আশেপাশের পোলাপানের সাথে ইত্যাদি ইত্যাদি। মোটা ছেলেগুলা বেশিবার ফুটে, আর যারা জোরে দৌড়ায় তারা কম ফুটে। তবে সব সার্কেলেই দুই/একটা কপালপোঁড়া থাকে যাদেরকে অন্যরা ইচ্ছা করে বেশি ফুটায়। আমি তেমনই একজন!

বোম্বাস্টিং একটি শিক্ষামূলক খেলা। প্রথম কথাই হল, এই খেলা আমাদেরকে জোরে এবং নিখুঁত টার্গেটে বল ছুঁড়তে শেখায় যেটা ক্রিকেটের ফিল্ডিং এ দারুণ কাজে আসে। অন্য শিক্ষাগুলোকে আমরা দুই ক্যাটাগরিতে ভাগ করতে পারি, যথাক্রমে সামাজিক এবং রাজনৈতিক।

সামাজিক শিক্ষা অর্জনে আমার জীবনে বোম্বাস্টিং এর অবদান স্কাই হাই। ভালো ফ্রেন্ডকে ফুটানো যাবেনা, শক্তিশালি ছেলেটাকে ফুটানো যাবেনা, পাড়ার রাগী বড়ভাইটাকে নাগালের মধ্যে পেলেও ইশারায় তাকে পালিয়ে যাবার ইংগিত দিতে হবে, কাউকে ইচ্ছা করে জোরসে ফুটিয়ে এরপর খেলা শেষে বলতে হবে বেশি জোরে তো মারতে চাইনাই, ক্যামনে জানি লাইগা গেল!, আর খেলাশেষে সাত পাঁচ না ভেবেই নিজেকে ‘সেরা ফুঁটাইন্যা’ বলে দাবি করতে হবে ইত্যাদি ইত্যাদি। ভেবে দ্যাখেন, বাস্তব জীবনে এই শিক্ষাগুলা আমাদের জন্য কত জরুরী!

রাজনৈতিক শিক্ষা আরও ব্যাপক। যে প্লেয়ারটা কম ফুটসে তাকে কয়েকজন মিলে কৌশলে ফুটাইতে হবে কিন্তু গোপন আঁতাত ফাঁস করা যাবেনা, অপেক্ষাকৃত দুর্বল প্লেয়ারকে বেশি ফুটাইতে হবে, নাগালের মধ্যে থাকা সবগুলা টার্গেটের ভেতর যার সাথে ঝামেলা আছে তাকেই ফুটাইতে হবে আগে আর তার হাতে বল গেলে জানপ্রান হাতে নিয়ে খিইচ্যা দৌড় লাগাইতে হবে, সাথে আরও কত কী! ইদানিং মাঠে নামা রাজনীতিবিদদের নড়াচড়া দেখেই বুঝতে পারছি তারাও শৈশবে বোম্বাস্টিং খেলতে গিয়ে প্রচুর ফুটেছেন। পুলিশ ভাইয়েরা তাদের ছুঁতে গেলেই বাইন মাছের মত যেভাবে পিছলিয়ে যাচ্ছেন তা দেখে আমি পুলকিত।

পল্টনের ওই নেতাগো লগে বোম্বাস্টিং খেলতে মুঞ্চায়!

৬৯৪ বার দেখা হয়েছে

৪ টি মন্তব্য : “বোম্বাস্টিং”

  1. কামরুলতপু (৯৬-০২)

    তোমার লেখাটা পড়তে এসে শুরুর দুই প্যারা পড়তে পড়তেই ভাবছি কি সুন্দরভাবে এইটা আমাদের রাজনৈতিক জীবনের সাথে মিলিয়ে লেখা যেত, শেষে এসে তুমি সেটাই করেছ দেখে আমি খুবই আনন্দ পাইলাম।
    প্রথম দেখা মনে হয় তোমার সাথে। পরিচয় নাই। আমি পুরান নষ্ট হয়ে যাওয়া পুরান যারা এখন আর লেখে টেখে না তাদের দলে। ভাল থেকো।

    জবাব দিন
    • ফেরদৌস জামান রিফাত (ঝকক/২০০৪-২০১০)

      জি ভাই, প্রথম দেখা। আমি নতুন লিখছি। আপনার চিন্তা আমার সাথে মিলে যাওয়াতে আমারও খুব ভালো লাগলো। এখানে লেখার সাহস করতে আমার অনেকদিন লেগেছে। আপনাদের মত অনেক সিনিয়রের লেখা পড়তে পড়তেই সেটা হয়েছে। আরেকটু লিখেন না ভাই, প্লিজ! জানি ধীরে ধীরে নতুনরা জায়গা নিয়ে নিবে। কিন্তু তার আগে ম্যাচুরিটি তো আসা লাগবে। সেজন্যই আপনাদের লেখা আরও পড়তে চাচ্ছি। দল পাল্টে ফেলেন। মোস্ট ওয়েলকাম, ভাই :hug: :hug: :hug:


      যে জীবন ফড়িঙের দোয়েলের- মানুষের সাথে তার হয় নাকো দেখা

      জবাব দিন
    • ফেরদৌস জামান রিফাত (ঝকক/২০০৪-২০১০)

      ধন্যবাদ ভাই। এখন তো এটা খেলার মত জায়গাই নেই। আর গার্ডিয়ানরাও সম্ভবত পছন্দ করেন না এটা। এই প্রজন্ম মাঠে না খেলেই বেড়ে উঠছে। ক্যাডেট কলেজেও এর প্রভাব দেখে এসেছি। আগে প্রতি ব্যাচে দুই একটা ফার্মের মুরগী থাকতো। তারাও আস্তে আস্তে ঠিক হয়ে যেত। এখন প্রায় সবগুলাই ফার্মের মুরগী। অথোরিটিরও খুব বেশি মাথাব্যথা নেই এটা নিয়ে। 🙁 🙁 🙁
      আমরা ইলেভেন-টুয়েলভে অনেক চেষ্টা করেছি সেভেন-এইটকে আমাদের সাথে রেগুলার ফুটবল খেলাতে। আমরাও কিন্তু জুনিয়র লাইফে সিনিয়রদের সাথেই খেলতাম। কিন্তু ওদেরকে আনতে পারিনাই। তারা শুধু ভলিবল খেলত।


      যে জীবন ফড়িঙের দোয়েলের- মানুষের সাথে তার হয় নাকো দেখা

      জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।