আমার বড়চাচার চোখে ১৯৭১

ক’দিন আগেই বিজয় দিবস চলে গেল। দেশের এই পরিস্হিতিতে ঠিকভাবে বিজয় দিবসটা পালনও করতে পারলাম না। হরতাল-অবরোধের মাঝের এই ছুটির দিনটায় প্রয়োজনীয় ব্যক্তিগত কাজগুলোই প্রাধান্য পেল। যাইহোক এবার মূল বিষয়ে আসি। এর আগে আমি একটা লেখা দিয়েছিলাম আমার বাবার চোখে ১৯৭১। যারা লেখাটা পড়েছেন তারা সবাই এই লেখাটা আসা করেছিলেন। কিন্তু বরাবরের মতোই মকরা খ্যাতি পাওয়া আমি সময়ের অভাবে ও পেটের তাড়নায় নিজের সুনাম রাখতে সফল হয়েছি।

আমার চাচা এখন গ্রামে থাকেন। পেশায় একজন কৃষক। জমি-জিরাত করেন, ছেলে-পুলে, নাতি-নাতনি নিয়ে শান্তিতে সংসার করেন। গ্রামের বাইরে খুব কমই যান। এই মাসের শুরুতে ঢাকায় এসেছিলেন। আর আমি এই সু্যোগেটা কাজে লাগিয়ে নিলাম। চাচাকে জিজ্ঞাসা করলাম ১৯৭১ এর স্বাধীনতার কথা কতটুকু মনে পড়ে? আমার প্রশ্ন শুনে চাচা বললেন শুনে আর কি করবি, সে কথা আর ক’জন মনে করে। সবাই তো যে যার স্বার্থ নিয়ে ব্যস্ত, দেশের স্বাধীনতার কথা এখন আর কেউ মনে করে না। আর যারা করে ওরা তো লোক দেখানো, নিজেদের স্বার্থ উদ্ধারের জন্য করে। যাইহোক চাচা যা বলেছেন যতটা পেরেছি নিচে লিখছি।

জুন মাসের মাঝামাঝি সময়। আমি আর জাগলার (আমাদের গ্রাম খলিশাখালির পাশের গ্রাম) লিয়াকত বাজারের পাশে স্কুল মাঠে বসে সবসময় যুদ্ধের কথাই আলোচনা করতাম। একদিন আলমগীর (আমার বড়চাচার ৩ বছরের ছোট ভাই) এসে বলল যে উত্তরপাড়ার সাবু ভাই যুদ্ধে চলে গেসে। আমাদের মনের মধ্যেও ইচ্ছা জাগত যুদ্ধে যাওয়ার। কিন্তু তাতে সবচেয়ে বড় বাধা ছিলেন আব্বা। তার কড়া নিষেধ ছিল যে গ্রামের বাইরে যাওয়া যাবে না। কিন্তু মার এই ব্যাপারে কোন আপত্তি আছে বলে মনে হতো না। মা সবসময়ই বলতেন এই বাংলার বুক থেকে পাকিস্তানিদের যারা শেষ করে দিবে তাদেরকে তিনি দাওয়াত দিয়ে কুড়োর (মুরগী) গোশত খাওয়াবেন।

আমাদের মনে সবসময় শুধু যুদ্ধে যাওয়ার চিন্তা। আমি আর লিয়াকত দু’জনে মিলে টাকা জমানো শুরু করেছিলাম। যাইহোক তখন জুলাই মাসের শেষের দিক। রাতে লিয়াকতকে নিয়ে আমাদের বাড়িতে খাবার-দাবার সেরে স্কুল মাঠে আড্ডা দিচ্ছি। হঠাত করে আমি লিয়াকতকে বললাম চল আজ রাতেই চলে যাই। আমরা গুনে দেখলাম আমাদের কাছে ৩ টাকার (আনুমানিক) কিছু বেশি আছে। তখন বেশ রাত। আমরা আর কথা না বলে যে যার বাড়ির দিকে রওনা দিলাম মাকে জানাতে আর একটা ব্যাগে কিছু কাপড়-চোপড় নিতে।
বাড়িতে পৌছে দেখি সবাই ঘুমিয়ে ঘেছে। নিজের ঘরে ঢুকে ব্যাগটা তাড়াতাড়ি গুছিয়ে নিলাম। মার ঘরের কাছে এসে খুব সন্তর্পণে মাকে ডাকতে লাগলাম যাতে বাবা জেগে না যায়। তখন ভয়ে ও উত্তেজনায় আমার কাহিল অবস্থা। মা দরজা খুলতেই মাকে টেনে দূরে নিয়ে এলাম। মাকে জানালাম আমি আর লিয়াকত আজই যুদ্ধে যাব। এ কথা শুনে মা মৃদু আর্তনাদ করে উঠল। মাকে অনেক করে বোঝালাম যে, তোমার হাতের কুড়োর গোশত খাওয়ার লোভে যাব। মা কাদতে লাগলেন, আর আমার হাতে ৫ টাকা গুজে দিয়ে বললেন, “টিকমত খাবি, শরীরের খেয়াল রাখবি।” বলেই মা চলে গেলেন। আমি ব্যথিত মনে ধানক্ষেতে মধ্যে দিয়ে স্কুল মাঠের দিকে যাচ্ছি। হঠাত দেখি আমার পাশে ব্যাগ নিয়ে আলমগীরও হাটছে। আমি কিছে বলার আগেই ও বলল ওকে না নিলে এক্ষুনি গিয়ে আব্বাকে বলে দেবে। আমি কোন প্রতিবাদ না করে ওকে নিয়ে স্কুলমাঠে চলে আসলাম।

এসে দেখি লিয়াকত তখনও আসেনি। আমি একটু চিন্তিত হয়ে পড়লাম। আমরা প্রায় ২ ঘন্টা মত ওর জন্য অপেক্ষা করলাম। একবার চিন্তা করলাম ওর বাড়ির দিকে যাব নাকি। বুঝতে পারলাম ও আর আসবে না। আমি আলমগীরকে বললাম যে লিয়াকত আসেনি, যাওয়া হবে না, চল ফিরে যাই। ও চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকল। দু’জনেই যে যুদ্ধে যাবার ব্যাপারে অটল এটা বুঝেই অবশেষে আমরা রওনা দিলাম।

আমরা যখন গ্রামের শেষ প্রান্তে তখন ফজরের আযান দিচ্ছে। আমাদের নৌকায় করে খাল পার হতে হবে। নৌকা তখন খালের মাঝে, যখন পাড় থেকে লিয়াকত আমাকে ডাকতে লাগল। নৌকা ঘুরিয়ে ওকে নিয়ে আসলাম। ও জানাল ওর আব্বা ওকে ধরে ফেলেছিল। তার সাথে ঝগড়া-ঝাটি করে আসতে দেরি হয়ে যায়। আমরাও বললাম যে আমরা ভেবেছিলাম তুই ভয় পেয়েছিস, তাই আসবি না। এটা নিয়ে বেশ কিছুক্ষণ হাসাহাসি করলাম। এরমধ্যে নৌকা ঘাটে পৌছে যায়। এরপর সেখান থেকে হেটে আমরা ন’হাটা এসে সকালের নাস্তা সারি। এরপর নবগঙ্গা নদী পার হলাম। পার হয়ে বাটাজোড় বাসস্ট্যান্ড। আমরা তিনজন তাতে চড়ে বসলাম। ঘন্টা দু’য়েকের মাঝে আমরা মাগুরা পৌছে গেলাম।

আমাদের প্রথম গন্তব্য ছিল ঝিনাইদহ। কিন্তু মাগুরা থেকে কোন বাসই ছিল না সেখানে যাবার। বাসস্ট্যান্ডে বসে ভাবছিলাম যে হেটেই যাব নাকি। হটাত আমাদের থেকে বছর দু’য়েকর বড় একজন এসে আমাদের পাশে এসে বসল আর আমার থেকে একটা বিড়ি চেয়ে নিল। তার সাথে আমরা তিনজন কথা বলতে বলতে বুঝতে পারলাম যে সেও আমাদের মত যুদ্ধে যাবার জন্য এসেছে। আমরাও তাকে সবকিছু খুলে বললাম। তখন রেজাভাই(ঐ ব্যক্তির নাম) জানালেন ১১টার দিকে আখের ট্রাক আসে যেটা কুষ্টিয়া পর্যন্ত যাবে। ট্রাক আসলে ড্রাইভারের সাথে ১২ আনা (৭৫ পয়সা) ভাড়া ঠিক করে আমরা চারজন তাতে চড়ে বসলাম।

আনুমানিক ৩টার দিকে ঝিনাইদহ ও চুয়াডাঙ্গা পার হয়ে আমরা দর্শনার কাছাকাছি আশ্রমপুর গ্রামে নামলাম। কারণ সামনে চেকপোস্ট ছিল। নেমে আমরা দুপুরের খাবার খেয়ে নিলাম। খাবারের হোটেলে রাজাভাই জিজ্ঞাসা করলেন পদ্মা পার হওয়া যাবে কিভাবে? ওরা জানালো রাতে এই গ্রামের পদ্মার পাড় থেকে ট্রলার ওপারে যায়, কিন্তু খুব সাবধান থাকতে বলল। আমরা তাদের ধন্যবাদ দিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। আমরা খুবই ক্লান্ত ছিলাম। হাটতে হাটতে নদীর পাড়ে এসে পড়লাম। সে এলাকাটা বেশ নির্জন ছিল। আমরা অদূরে একটি মাচান ঘর ( পানি থেকে উঁচু করে বাঁশের তৈরি একধরনের বিশেষ ঘর) দেখতে পাই। ওটাতে উঠে বিড়ি টানতে টানতে গা এলিয়ে দিয়ে ঘুমিয়ে পড়ি।

বেশ রাত হয়ে গেছে তখন। হঠাত চিৎকার- চেচামেচিতে ঘুম ভেঙ্গে যায় আমার। আমি বাকীদের ডেকে তুললাম। নিচে নেমে দেখি একদল লোক মশাল জ্বালিয়ে আমদের দিকে তেড়ে আসছে। আমরা ঝেড়ে দৌড় লাগালাম যে যার মত। নদীর পাড় ধরে দৌড়াতে দৌড়াতে একসময় বুঝতে পারলাম চেচামেচি কমে গেছে। পেছনে, আশেপাশে তাকিয়ে দেখি কেউ নেই, শুধু দূর থেকে কোলাহলের শব্দ আসছে। আমি তখন কি করব বুঝতে পারছিলাম না। হঠাত আমার খেয়াল হল আমার ছোট ভাইয়ের কথা, ও ঠিক আছে তো। আশেপাশে কোন লোকালয়, মানুষজন বা নদীতে কোন নৌকাও দেখতে পেলাম না। একবুক হতাশা আর চিন্তা নিয়ে নদীর ধার দিয়ে হাটতে লাগলাম।

কতক্ষণ ওভাবে হেটেছি বলতে পারব না। আচমকা কে যেন আমার নাম ধরে ডাকতে লাগল। আমিও ভয়ার্ত কন্ঠে জিজ্ঞাসা করলাম কে? খুব কাছেই রেজাভাই তার উপস্থিতি জানান দিলেন। রেজাভাই আমাকে সবকিছু খুলে বললেন। একদল রাজাকার খবর পেয়ে আমাদেরকে মারতে এসেছিল, পাকদের খবর দেয়া হয়েছে, তারাও আসছে। আমি ছোটভাই আলমগীর ও বন্ধু লিয়াকতের কথা জিজ্ঞাসা করতেই রেজাভাই চুপ হয়ে গেলেন। রেজাভাইয়ের কথা শুনে আমি কাদতেঁ লাগলাম। আমার ছোট ভাই নদীতে ঝাঁপ দিয়েছে আর আমার বন্ধুকে ওরা ধরে নিয়ে গেছে।

(***** আমার ছোটভাই আলমগীরের সাথে পরে গ্রামে এসে দেখা হয় যুদ্ধ শেষে। ও নদীতে কিছুটা সাঁতরে, কিছুটা ডুবে থেকে ওখান থেকে সরে বেঁচে যায়। আমাদের অনেক খুজে না পেয়ে অবশেষে ভারতে চলে যায় সেপ্টেম্বর মাসে। সেখানে ট্রেনিং শেষ করে দেশে আসার আগেই পাকিস্তানিরা আত্মসমর্পণ করে ফেলে।

***** আমার বন্ধু লিয়াকতকে রাজাকাররা পাক বাহিনীর হাতে তুলে দেয়। তারপর থেকে এখন পর্যন্ত ওর কোন খবর নেই। মাঝে মাঝে মনে হয় সেদিন নৌকা ঘুরিয়ে ওকে সাথে না আনলে হয়ত ও আজও বেঁচে থাকত।)

রেজাভাই আমাকে অনেক বোঝালেন। আসলে রেজাভাই না থাকলে তখন আমার অনেক সমস্যাই হত। তো আমরা তখন আশ্রমপুর পার হয়ে দুই গ্রাম পর তাড়াশি এক বাড়িতে আশ্রয় নিলাম একটাকার বিনিময়ে। বাড়ির মালিককে সবকিছু খুলে জানালাম। সদাশয় মতিন কাকা আমাদের নির্ভয়ে থাকতে বললেন। আমরা সারাদিন ঘরে কাটাতাম, সারারাত নদীর পাড়ে। এরকম প্রায় এক সপ্তাহ হয়ে গেছে। আমাদের ভেতর কেমন একটা হতাশা কাজ করছিল। এক সন্ধ্যায় রাতের খাবার খেয়ে আমরা দু’জন নদীর পাড় দিয়ে হাটছিলাম আর বিড়ি টানছিলাম। বেশ দূরে কয়েকটি ছায়ার নড়াচড়া লক্ষ্য করে কৌতুহল বশত আমরা সেদিকে এগিয়ে গেলাম।

একটু সামনে এগোতেই দেখি পাড়ে একটা ট্রলার দাঁড়িয়ে আছে। আমরা বড় বড় ঘাসের মাঝে লুকিয়ে লুকিয়ে সেদিকে এগোতে লাগলাম। বেশ খানিকটা দূরে শুয়ে শুয়ে যা শুনলাম তার সারমর্ম হল দু’জন মুক্তিবাহিনী ক’জন ছেলেকে কিছু বলছিল। একটুপরে নৌকার মাঝি বস্তায় করে ভারি কিছু নিয়ে নৌকা থেকে নেমে এল। আমরা কৌতুহল বশত বস্তায় কি আছে দেখার জন্য আরও একটু এগিয়ে যেতেই দলটি আমাদের দেখে ফেলে। আমাদের দেখার সাথে সাথেই মাঝিটি এক ঝটকায় বস্তা থেকে একটা রাইফেল বের করে আমাদের দিকে তাক করল। আমরা ভয় পেয়ে দুই হাত উঁচু করে দাঁড়িয়ে রইলাম।

দলনেতা (হাফিজ ভাই) গোছের একজন আমাদের দিকে এগিয়ে এসে জিজ্ঞাসা করতে লাগলেন আমরা কারা, কাদের চর, মিথ্যা বললে মেরে ফেলার হুমকিও দিলেন। আমি ভয়ে হড়হড় করে সব বলে দিলাম। জানালাম আমাদের কথা বিশ্বাস না হলে আমরা যে বাড়িতে আছি সেই মতিন কাকাকে আমাদের কথা জিজ্ঞাসা করতে পারেন। এরমধ্যে দলের থেকে একজন (ইউসুফ) জানাল যে সে আমাদের চেনে, আমরা এ গাঁয়ে ৭-৮ দিন ধরে আছি। শুনে হাফিজ ভাই মাঝিকে (করিম) রাইফেল নামাতে বললেন। আমি হাফিজ ভাইয়ের হাত ধরে কাঁদতে কাঁদতে বললাম আশ্রমপুর গ্রামে আমার ছোটভাই রাজাকারদের তাড়া খেয়ে নদীতে ঝাঁপ দিয়েছে। আমার বন্ধু লিয়াকতকে রাজাকারেরা পাকবাহিনীর হাতে তুলে দিয়াছে। আমি এর প্রতিশোধ নিতে চাই, আমি যুদ্ধ করতে চাই, আমাদেরকে দলে নেয়ার জন্য অনুরোধ করতে লাগলাম। উনি ঠিক আছে বলে আমাদের সবার সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন। দলের বাকি সদস্যরা হলেন আমান(বিকাশ), মোজাম্মেল ও সাইদুল্লাহ। এদের মধ্যে হাফিজ ভাই আর করিম ইতিমধ্যে সরাসরি যুদ্ধ করেছেন। তারা একটা মিশন নিয়ে এখানে এসেছেন। যেকোন মূল্যে হাফিজ ভাইয়ের গ্রামসহ (আশ্রমপুর) আশেপাশের গ্রামগুলোকে মুক্ত করা। সেই মূহুর্তে তাদের সম্বল দু’টো রাইফেল আর ৪টা গ্রেনেড। হাফিজ ভাইয়ের লোকবল দরকার এবং তাদের ট্রেনিং করানো প্রয়োজন। তখন আমাদের দলে সদস্য সংখ্যা হয়ে গেছে ৭। আরও ৪ জনের আমাদের সাথে যোগ দেবার কথা। এরপর আমাদের আর্মস ট্রেনিং দেয়া হবে। আর ফাইনাল অপারেশনের আগে হাফিজ ভাইয়ের আরো ২-৩ জন সহযোগী যোদ্ধা আমাদের সাথে যোগ দেবে। তখন আমরা আরও কিছু অস্ত্রসস্ত্র পাব।

প্রায় মাস দেড়েক আমাদের ট্রেনিং চলল। এরমধ্যে আমাদের সাথে নায়েব, টিটু আর ছাকেন এসে আমাদের যোগ দিয়েছে। দিনের বেলা যে যার মত গা ঢাকা দিয়ে থাকতাম, স্বন্ধ্যা হলেই সবাই চুপিচুপি নদীর পাড়ে চলে আসতাম। হাফিজ ভাই আর করিম প্রতিরাতে নৌকায় করে আসত, ট্রেনিং শেষ হলে আবার চলে যেত। অনেক জিজ্ঞাসা করলেও হাফিজ ভাইয়েরা তাদের ক্যাম্পের কথা গোপন রাখতেন গুপ্তচর এড়াতে। তিনি বলতেন এটাও নাকি যুদ্ধের একটা অংশ। আমরা সবাই গ্রেনেড ছোড়া, রাইফেল চালানো শিখে ফেলেছিলাম। এক একদিন রাতে ট্রলারে করে মাঝনদীতে নিয়ে গিয়ে আমাদের রাইফেল চালানোর ট্রেনিং দেওয়া হত। এরমধ্যে টাকা-পয়সা শেষ হয়ে যায়। কোনদিন একবেলা, কোনদিন মানুষের বাড়ি চেয়ে খিদা মেটাতাম। যেদিন কোন ব্যবস্থা হত না সেদিন করিমের নৌকায় রাখা চিড়া নদীর পানিতে ধুয়ে গুড় দিয়ে খেয়ে নিতাম।

অক্টোবর মাসের ৪ তারিখ, সোমবার। বিকালের দিকে ইউসুফ খবর দিল আজ রাতে
একটা অপারেশন আসে, রাতে তাড়াতাড়ি নদীর পাড়ে যেতে হবে। সেইমতে চলে এলাম। হাফিজ ভাই আমাদের পুরো পরিকল্পনা খহুলে বললেন। চারজনের একটা দলে ছিলাম আমি, হাফিজ ভাই, ছাকেন আর নায়েব। অন্য দলটিতে ছিল আমান, রেজাভাই, সাইদুল্লাহ আর ইউসুফ। করিম থাকল নৌকার পাহারায়। মোজাম্মেল আর টিটুকে পাঠানো হল তাড়াশি গ্রামের দুই প্রান্তে পাহারায়। যদি কোন বিপদ হয় তাহলে এসে করিমকে খবর দিলে সে মুক্তিক্যাম্পে তা জানিয়ে দেবে। সেরাতে আমাদের কাজ ছিল তথ্য জোগাড় করা। অস্ত্র বলতে হাফিজ ভাইয়ের পিস্তল, ছাকেনের হাতে রাইফেল, নায়েব আর আমার কাছে ছিল একটা করে গ্রেনেড। অন্য দলে আমানের কাছে একটা রাইফেল, আর বাকিদের কাছে দুটি গ্রেনেড। হাফিজ ভাই আমাদের বলেছিলেন কোনভাবেই ধরা পড়া যাবে না। আর ধরা পড়লে কারও নাম বলা যাবে না।

আমরা দুইদল তাড়াশি গ্রামের দুই প্রান্ত ধরে এগোতে লাগলাম। একে একে
তাড়াশি, ঝামার বাজার আর ডাঙ্গাপাড়া পেরিয়ে আশ্রমপুরে ঢোকার আগে আমরা
থমকে দাঁড়ালাম। সেখানে দেখি চেকপোস্ট বসিয়েছে। আমরা অতি সাবধানে রাস্তা
ছেড়ে কোন শব্দ না করে বেশ কয়েকটি বাড়ির ভেতর দিয়ে বাজারের কাছে চলে
এলাম। বাজারের খুব কাছেই একটি বাড়িতে পাক বাহিনী তাবু গেড়েছিল। হাফিজ
ভাই মোটামুটি অনুমান করে নিলেন ৩৫-৪০ জন পাকি, একটি জীপ, একটি থ্রি-
টন আছে সেখানে। চেকপোস্ট গুলোতে আছে বাকি প্রায় ১০-১৫ সেনা। পাহারা
বেশ মজবুত। চারজনকে অস্ত্র হাতে টহলরত পাওয়া গেল। সবকিছু দেখেটেখে
আমরা আবারও অতি সাবধানে যে পথে এসেছিলাম সে পথে ফিরে এলাম। আসার
সময় টিটুকে নিয়ে সবাই নৌকার কাছে করিমের কাছে শুনলাম অন্যদলটি তখনও
ফেরেনি। প্রায় একঘন্টা পরে মোজাম্মেলসহ বাকি দলটি দৌড়াতে দৌড়াতে ফিরে
এসেই আগে জানালো পালাও। আমরা সবাই তড়িঘড়ি করে ট্রলারে উঠে বসলাম।
হাফিজ ভাই বললেন ইঞ্জিন ছাড়ার দরকার নেই, ২টা বৈঠা দিয়ে দ্রুত সেখান থেকে
চলে ব্যবস্থা করতে।

ভোরের দিকে করিম একটা জায়গায় নৌকাটা ভিড়িয়ে নিচে নেমে হাফিজ ভাইয়ের সাথে নিচু গলায় কি কি জানি কথাবার্তা বলে উনি চলে গেলেন। অন্য দলটি ভালভাবেই আশ্রমপুরের বাজারের কাছাকাছি পৌঁছে যায়, সবকিছু দেখে ফিরে আসার সময় দেখে ফেরার পথে দু’জন পাক সেনা টহল দিচ্ছে। ওরা অনেক ভেবেও কি করবে বুঝে উঠতে পারছিল না। আমান জানাল যে ওর কাছে ছুরি আছে, ঠিকমত জাপটে ধরতে পারলে কোন সমস্যা হবে না। রেজাভাই , সাইদুল্লাহ ও ইউসুফ চেপে ধরার সঙ্গে সঙ্গে আমান একটার গলায় ছুরি চালিয়ে দিল, অন্যটির মুখ চেপে ধরায় কোন শব্দ করতে পারল না। ওটাকেও শেষ করে রাইফেল দুটো নিয়ে ওরা চলে আসে। সব শুনে হাফিজ ভাই খুব খুশি হলেন। ওদের ৪ জনকে তক্ষণি নদীতে নামে গোসল করিয়ে নিলেন যাতে কোন রক্তের দাগ না থাকে। করিম তখন আমাদের সবাইকে নিয়ে চলে এল শত্রুজিৎপুর নামে একটি গ্রামে। সেখানে একটা বাড়িতে আমাদের থাকার ব্যবস্থা করা হল। দিনের বেলা সেখান থেকে বের হওয়া যাবে না, হাফিজ ভাইয়ের কড়া নিষেধ। সে বাড়ির লোকজন আমাদের ভালই আপ্যায়ন করেছিল। প্রতিদিন দু’বেলা ডালভাত খেতে দিত।

৪ দিন পর ৯ তারিখ, শনিবার রাতে হাফিজ ভাই আরও দুইজনের (আমজাদ, শরীফ) সাথে সে বাড়িতে এসে আমাদের নিয়ে চলে এলেন নদীর পাড়ে। এরপর সবাইকে ট্রলারে উঠিয়ে করিমকে বললেন বৈঠা বেয়ে নৌকা মাঝনদীতে নিয়ে যেতে। হাফিজ ভাই বললেন আজই ফাইনাল অপারেশন। সবাইকে দায়িত্ব বুঝিয়ে দিলেন। আমান আর শরীফকে একটি করে রাইফেল ও ছোরা দিয়ে বললেন চেকপোস্টগুলোর দায়িত্ব দিলেন। আমজাদ ভাইয়ের নেতৃত্বে করিম, সাইদুল্লাহ, টিটু ও নায়েব একটা করে রাইফেল এবং ৩টা গ্রেনেড নিয়ে বাজারের পেছন দিয়ে যাবে। আর হাফিজ ভাইয়ের সাথে আমি, রেজাভাই, ইউসুফ, ছাকেন ও মোজাম্মেল। হাফিজ ভাইয়ের কাছে তার পিস্তল, আমাদের সবার কাছে রাইফেল, আর ৪টা গ্রেনেড। আমরা যাব বাজারের সামনের দিক দিয়ে। আমজাদ ভাইরা গ্রেনেড মারার পর আমাদের দলটা এগোবে এবং গ্রেনেড চার্জ করবে। তারপর ওপেন ফায়ার শুরু হবে।

মধ্যরাতের কিছুক্ষণ পর। নৌকা থেকে নামার আগে হাফিজ ভাই সবাইকে উদ্দেশ্য করে বললেন কারও যদি ভয় করে সে যেন চলে যায়, কারণ এখন জীবন দিতে হতে পারে। কেউ চলে যায়নি। সবাই হাত-বুক মিলিয়ে নেমে পড়লাম। প্রথমে শরীফ ও আমান আমাদের থেকে আলাদা হয়ে চলে গেল। তার ১০ মিনিট পর আমজাদ ভাই তার দল নিয়ে চলে গেলেন। হাফিজ ভাইয়ের সাথে আমরা বাজারের সামনে গিয়ে পজিশন নিলাম। অপেক্ষার সময়টুকু প্রচন্ড ভয়ে কেটেছিল। শুধু মনে হচ্ছিল যদি যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগেই ধরা পড়ে যাই। আনুমানিক ২০ মিনিট পর দুম দুম করে দু’টি গ্রেনেড ফাটল। এপাশ থেকে সঙ্গে সঙ্গে আমি আর হাফিজ ভাই আরও দু’টি ফাটালাম। ওপাশ থেকে আমজাদ ভাইয়েরা বাকিটা ফাটালে, এপাশ থেকে রেজাভাই আর মোজাম্মেল শেষ দুটি গ্রেনেড মেরে দিল। হাফিজ ভাই আমাদের ছড়িয়ে গিয়ে আড়াল থেকে গুলি করতে বললেন। আমি বেশ খানিকটা দূরে এসে একটা উঁচু ঢিবি আড়া লে পজিশন নিয়ে শুতেই কাছেই একটা গ্রেনেড ফাটল, একজনের চিৎকার শুনলাম, আমার কানে তালা লেগে গেল। সে অবস্থায় পাক সেনাদের ছোটাছুটি চোখে পড়তেই গুলি চালালাম। সাথে সাথে আমার মাথার উপর দিয়ে সাঁই সাঁই করে মেশিনগানের গুলি উড়ে যেতে লাগল। একটু পরেই তা থেমে গেল (পরে শুনেছিলাম রেজাভাই মেশিনগানের পাকসেনাকে গুলি করে)। হাফিজ ভাই চিৎকার করে বলে উঠলেন ফরোয়ার্ড এন্ড ওপেন ফায়ার। এরপর আমাদের সবার রাইফেল একযোগে গর্জে ওঠে ও আমরা সবাই ক্যাম্পের কাছাকাছি এসে পড়ি। ছুটন্ত পাকসেনাদের গুলি করতে করতে একসময় থেমে যাই আমরা হাফিজ ভাইয়ের নির্দেশে। ৬ জন পাকসেনা আত্মসমর্পণ করে। আমি পাক ক্যাম্পের ভেতর হন্যে হয়ে আমার বন্ধু লিয়াকতকে আর আমার ছোটভাই আলমগীরকে। কিন্তু কোথাও ওদের খুঁজে পেলাম না। কিন্তু খুঁজে পেলাম ইউসুফের মৃতদেহ, যে আমার খুব কাছে গ্রেনেডের আগাতে মারা গিয়েছে; খুঁজে পেলাম আমজাদ ভাইয়ের মৃতদেহ। রেজাভাইয়ের কাঁধে মেশিনগানের গুলি লেগেছে।

এরপর হাফিজভাই আমাদের পাহারায় রেখে শরীফ, টিটু ও সাইদুল্লাহ নিয়ে গেল রাজাকারদের খোঁজে। বেশ কয়েকটা পালিয়ে যাবার পরেও ৫ জন রাজাকারকে ধরে নদীর পাড়ে আনা হয়। এরপর বাকি ৬ জন পাকসেনার সঙ্গে একসাথে দাঁড় করিয়ে গুলি করে মারা হয়। এরপরও জানা যায় গ্রামের লোকজনের হাতে গনপিটুনি খেয়ে আরও ৩ রাজাকারের মৃত্যু হয়। সেদিন সকালে আমরা আমাদের সহযোদ্ধাদের সৎকারকাজ করি। করিম ও শরীফ হাফিজ ভাইয়ের নির্দেশে অস্ত্রগুলো নিয়ে চলে গেল মুক্তিক্যাম্পে। আমরা সেখানে গ্রামের মানুষের বিশেষ আতিথিয়েতা পেলাম। হাফিজ ভাই আমাদের রেখে চলে গেলেন। আমাদের অপেক্ষা করতে বললেন। প্রয়োজন হলেই আমাদের ডাক নিবেন।

পরিশেষে, দীর্ঘ একমাস পরে নভেম্বরের শেষদিকে করিম এসে বলল যে যার বাড়ি দিকে চলে যেতে, দেশ দ্রুতই স্বাধীন হয়ে যাবে। করিমকে জিজ্ঞাসা করলাম হাফিজ ভাই কোথায়? সে জানাল দু’দিন আগে একটা অপারেশনে দেশের জন্য জীবনটা দিয়ে গেছেন। শুনে মনটা খারাপ করে বসে রইলাম। পরদিন নিজের বাড়ির উদ্দেশ্যে আমি ও রেজাভাই রওনা হই। হাটতে হাটতে কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা পার হয়ে ঝিনাইদহ এসে খবর পেলাম দেশ স্বাধীন হয়েছে ১৬ ডিসেম্বর। ১৮ তারিখে মাগুরা আসার পর রেজাভাই একরকম জোর করে তার বাড়িতে নিয়ে গেলেন। অবশেষে নিজ গ্রাম খলিশাখালিতে পৌছালাম ২০ তারিখে। বাড়িতে পৌঁছে মা-আব্বাসহ সবাই আমাকে একা দেখে কষ্ট বেশি পেয়েছিল আমার ছোটভাই আসেনি দেখে। ২৯ তারিখে ও এসে বাড়ি পৌছায়। লিয়াকতের বাড়ি গিয়ে ওর বাবা-মা, ভাই-বোনের সামনে গিয়ে আমার চোখের পানি ফেলানো ছাড়া আর কোন উত্তর ছিল না, আজও ওর কথা মনে পড়লে চোখের চেয়েও বেশি ভিজে ওঠে মনটা।

৫৫৯ বার দেখা হয়েছে

১টি মন্তব্য “আমার বড়চাচার চোখে ১৯৭১”

  1. হারুন (৮৫-৯১)

    কত প্রিয় নাম জল হয়ে জমে ঝাপসা চোখের পাতায়,
    স্বপ্ন আমার ধুয়ে মুছে যায় সাদা কাগজের খাতায়।

    প্রিয় মুখগুলো আঁকতে চেয়েছি আকাশের ফাঁকে ফাঁকে,
    ফাগুনের লাল ফুলের পাপড়ি ক্লান্তির স্বরে ডাকে।

    ঠান্ডা হাওয়ার ডানায় দুলেছে কালো বারুদের ঘ্রাণ,
    জোছনা কেড়েছে একাত্তরের কফিনে লুকোনো প্রাণ।


    শুধু যাওয়া আসা শুধু স্রোতে ভাসা..

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।