অভিশপ্ত ২৮ শে জুন – জীবনের ডায়েরীতে একটি চিরস্থায়ী ক্ষত

বিঃদ্রঃ এখানে কোন অভিযোগ নেই, কেউ ভুল বুঝবেন না, নিতান্তই কারিগরি ত্রুটির কারনে এই দুর্ঘটনা ঘটে। কাউকে দোষারোপ করা হয় নি , বা কারও প্রতি ক্ষোভও নেই। শুধু আপনাদের সাথে শেয়ার করে মনটাকে একটু হালকা করা। আর এখানে যেহেতু ক্যাডেট কলেজের অনেকেই ছিল তাই আপনাদের দোয়া চাওয়া……ব্যাস, আর কিছু না।
——————————————————————————————————-

সেই কবে যে সেভিং প্রাইভেট রায়ান মুভিটা দেখেছিলাম খেয়াল নেই। ছবিটার একটা দৃশ্য মাথায় গেঁথে গিয়েছিল, হতবিহ্বল এক সৈনিক মাথা নিচু করে কি যেন খুঁজছে, চারিদিকে প্রচন্ড গোলাগুলি কিন্তু তার কোন বিকার নেই, হঠাৎ কি একটা দেখে ঝুঁকে পড়ল, আর তারপর মাটি থেকে তুলে আনল তার নিজের ছিঁড়ে যাওয়া হাত। তারপর বিকারগ্রস্থ মানুষের মত হেঁটে চলে গেল।

যুদ্ধের কথা মাথায় আসলেই প্রথম এই ছবিটা তাই সবসময় মাথায় আসত। সেদিন নিজ চোখে এরকম দৃশ্যটা না দেখলে সারা জীবন হয়ত ভেবেই যেতাম, “এটা শুধু সিনেমাতেই হয়, বাস্তবে কখনও সম্ভব নয়।”

ইনফেন্ট্রি অফিসার বেসিক কোর্সের জন্য গত ২৯ মে সিলেট এসে পৌছেছি। যথারীতি ৩১ তারিখ থেকে কোর্সও শুরু হয়েছিল। আমরা ৮৬ জন অফিসার, যাদের মধ্যে ৪ জন শ্রীলংকার। বেশ ভাল ভাবেই কোন রকম ক্ষয়ক্ষতি ছাড়া আমরা প্রথম পর্ব এম.জি অর্থাৎ মেশিনগান শেষ করলাম, ফায়ারিং এর সব কাজও সুন্দর ভাবে শেষ হল। এরপর শুরু হল আর আর অর্থাৎ রিকয়েললেস রাইফেল পর্ব। ২ সপ্তাহের ক্লাস চলল ছোটখাট কিছু ইঞ্জুরি নিয়ে, ২৪৫ কেজি ওজনের অস্ত্র, গাড়ি থেকে ওঠা নামা করাতে গিয়ে দু একজন হাতের বা আঙ্গুলের বারটা বাজিয়ে ফেলল। তারপরও বলা যায় ভালভাবেই শেষ হয়েছিল। আর তারপর সব পরীক্ষা শেষ করে গত ২৮ জুন থেকে শুরু হয়েছিল আমাদের ফায়ারিং।

যখন আর.আর এর প্র্যাক্টিকাল ক্লাস হত তখন স্টাফরা সবসময় বলত, স্যার সাবধানে, ২২ কেজি গোলা স্যার, একটু এদিক সেদিক হলে কেউ থাকবে না স্যার, আমিও না আপনিও না, কাজেই ভালমত প্র্যাকটিস করেন স্যার, ড্রিলে কোন ভুল করবেন না প্লীজ। অনেকে হয়ত মাঝে মাঝে বলত, স্যার আপনি তো ৪ গোলা ফায়ার করে চলে আসবেন, আমাকে তো ৮৬ জনের জন্যই থাকতে হবে। ক্লাসগুলোতে কেউ অমনোযোগী থাকত বলে আমার মনে হয় না, ড্রিল গুলো রপ্ত করতে ঘামে শরীর ভিজিয়ে ফেলত মোটামুটি সবাই। ২৮ শে জুনের ফায়ারিং উপলক্ষ্যে আমাদের প্রস্তুতির কোন কমতি ছিল না।

অন্যান্য ছুটির দিন গুলো থেকে এই শুক্র আর শনিবার টা ছিল একটু ভিন্ন। কারন গত ১ মাসে এত্ত চাপ ছিল যে কেউ বাইরে ঘুরতে যেতে পারে নি তেমন একটা। কিন্তু এবার একটু ফ্রি থাকায় সবাই মিলে ভালই ঘোরা ঘুরি চলল। জাফলং, ভোলাগঞ্জ ঘুরে পুরো রিফ্রেশ হয়ে গিয়েছিলাম। সবাই খুব ফুরফুরে মেজাজ নিয়েই রবিবার ভোর ০৬৩০ টায় ফায়ারিং রেঞ্জে পৌছালাম। তারপর শুরু হল বিভিন্ন তরফ থেকে ব্রিফিং, সব রকমের নিরাপত্তা মুলক কার্যক্রম শেষ করে সকাল ৮ টার দিকে ফায়ারিং শুরু হল। ৮৬ জন ছাত্র অফিসারকে ৫ টি ভাগে ভাগ করে দেয়া হল। ৪ টা অস্ত্রে ৪ জন করে ১৬ জন একবারে যাবে। প্রতিটা অস্ত্রে ৪ জন করে থাকবে। একজনের পর একজন এভাবে সবাই শেষ করবে। ১ম ডিটেলেই একজন একটা বড় রকমের দূর্ঘটনা থেকে বেঁচে গেল, অস্ত্রে গোলা লোড করার সাথে সাথেই সেটা নিজে থেকেই ফায়ার হয়ে গেল। এই অস্ত্রগুলো যখন ফায়ার করা হয় তখন তার পিছনে ১০০ মিটার জায়গা ফাকা থাকে, কারন ফায়ারের সাথে সাথে পিছন দিয়ে প্রচুর পরিমানে গ্যাস আর আগুন বের হয়, ৩০ মিটারের মধ্যে কেউ থাকলে সে ওখানেই পুরো ফ্রাই হয়ে যাবে। যাই হোক, ভাগ্য ভাল ছিল যে ড্রিল অনুযায়ী সেই স্টুডেন্ট লোড করার সাথে সাথেই হাত সামনে নিয়ে আসতে পেরেছিল। তখনই গান টা চেঞ্জ করা হয়। এরপর ২য় গ্রুপ যখন ফায়ার শেষ করে তখন ৪র্থ গানটাও পরিবর্তন করা হয় কিছুটা যান্ত্রিক ত্রুটি থাকায়। এরপর ৪র্থ গ্রুপও চলে গেল বেলা ১২ টার দিকে। আমরা যারা পাহাড়ের পাশে রেস্ট এরিয়াতে ছিলাম একটু পর পর বিকট শব্দে কেঁপে কেঁপে উঠছিলাম, অনেকেরই পুর্ববর্তী কোন অভিজ্ঞতা ছিল না, তাই সবাই শুধু ৬০০ মিটার দূরে টার্গেট গুলো দেখছিল। একটা গোলা যখন ফায়ার করা হয় তখন ২ টা আলাদা শব্দ হয়। প্রথমবার যখন গোলাটা অস্ত্র থেকে বের হয় আর দ্বিতীয়বার যখন পাহাড়ের গায়ে লাগানো টার্গেট এ গিয়ে পরে। এভাবেই ৪র্থ গ্রুপের ফায়ার প্রায় শেষ পর্যায়ে চলে এসেছে, আমি আমার গ্রুপের সাথে প্রস্তুতি নিচ্ছি যাবার জন্য, এমন সময় বিকট শব্দে একটা গোলা ফাটল। যারা বসে বা শুয়ে ছিল সবাই উঠে দাঁড়াল কারন আওয়াজটাই একটু অন্যরকম ছিল। বাতাসে কি যেন একটা কেটে বের হয়ে এল। আমরা দেখলাম আমাদের সামনের পুকুরে কি যেন একটা এসে পড়ল। তখনও অনেকে তাকিয়ে ছিল পাহাড়ের গায়ে, গোলা কোথায় পড়েছে তা দেখার জন্য, কিন্তু কোন টার্গেটেই কিছু হল না, কয়েকজন ভাবল গোলাটা বোধহয় ব্লাইন্ড হয়েছে, ফাটে নি। কিন্তু তাও কয়েকজন দাঁড়িয়ে তাকিয়ে রইল যেই পাহাড়ের আড়ালে ফায়ার করা হচ্ছিল তার দিকে।

তার প্রায় ৮/১০ সেকেন্ড পরই প্রচন্ড জোরে প্রথমে দৌড়ে বের হল এক শ্রীলংকান অফিসার, দু হাত মাথার উপর তুলে এম্বুলেন্স এম্বুলেন্স বলে চিৎকার করছিল সে, মুহুর্তেই ৪০/৫০ জন আমরা যারা পাহাড়ের এ পাশে ছিলাম তারা ঢাল বেয়ে দৌড় দিলাম, কেউ গেল এম্বুলেন্সকে ডাকতে। চোখের পলকেই ঘটনাগুলো সব ঘটে গেল, আমরা পাহাড়ের ঢালের ওপাশে পৌছানোর আগেই বের হয়ে এল একজন এন.সি.ও স্টাফ, তাকে ২/৩ জন পাশে থেকে ধরে রেখেছে, আর স্টাফ নিজের পায়ে হেটেই আসছে,তার বাম হাত দিয়ে ডান হাতের কাঁধের কাছে ধরা, আর ডান হাতটা কাঁধের ইঞ্চি ছয়েক নিচে থেকে নেই, শুধু হাড় আর মাংস বের হয়ে আছে, স্টাফ কেমন বিকারগ্রস্থের মত হেঁটে যাচ্ছেন, আর তার পিছনে আর একজন দৌড়ে আসছে, তার হাতে ধরা একটা কাটা হাত। ততক্ষনে ওই দৃশ্য দেখে অনেকেই হাউ মাউ করে কেঁদে মাটিতে পরে গেছে। এরপরই বের হয়ে আসল আরও ৩/৪ জন, আমার কোর্সমেট জুলকারনাইন কে পাঁজকোলা করে ধরে নিয়ে যাচ্ছিল, ইতিমধ্যেই আমরা ওখানে পৌছে গেছি, কয়েকজন ধরাধরি করে নিয়ে আসল একজনকে, তার মাথা দেখা যাচ্ছিল না, তবে একটা হাত যে কব্জির একটু উপর থেকে নেই সেটা দেখতে পারছিলাম, আর রক্তের কারনে মাথাটা দেখা যাচ্ছিল না, ঢাকা পরে গিয়েছিল রক্ত আর জামা টেনে ধরায় তার মধ্যে। আমি দৌড়ে চলে গেলাম যেখান থেকে ফায়ারিং করা হচ্ছিল সেখানে। ওখানে যাবার পর দেখি সবচেয়ে ডানের যে আর.আর সেটার ব্যারেল সামনে থেকে প্রায় দেড় ফুট নেই আর সামনের মাটি উড়ে গেছে, চারদিকে শুধু চাপ চাপ রক্ত। হঠাৎ কে যেন বলে উঠল তৌহিদ কই, পাশে থেকে বলল যে ওকে এম্বুলেন্সে তোলা হচ্ছে। মাথাটা একটা চক্কর দিয়ে উঠল, তৌহিদ(রহমান,ঝ.ক.ক ৯৯-০৫) আমার পাশে শুয়ে ছিল কিছুক্ষন আগেও, তাহলে কি যাকে ধরাধরি করে নিয়ে গেল…আর ভাবতে পারলাম না, আবার দৌড় দিলাম এম্বুলেন্সের দিকে, আকাশে বাতাসে শুধু বারুদ আর রক্তের গন্ধ, সেই সাথে মানুষের আর্তনাদ মিলে মিশে একাকার। এম্বুলেন্সে ধরাধরি করে তোলা হচ্ছিল আহতদের, আমি তৌহিদ তৌহিদ বলে চিৎকার করতে করতে গিয়ে দেখি এম্বুলেন্সের পাশেই মাটিতে বসে আছে তৌহিদ, তাকে ঘিরে রেখেছে ৪/৫ জন। ওর বাম হাতটায় রক্ত আর মাংস লেগে আছে, আর ও ফুপিয়ে ফুপিয়ে উঠছে, আমরা কয়েকজন মিলে ওর জামা টেনে ছিড়ে ফেললাম। দেখি যে ওরও বাম হাতে ইঞ্চিখানেক জায়গা গভীর হয়ে কেটে গেছে। এরপর ওকেও ধরাধরি করে তোলা হল একটা পিকআপে। ততক্ষনে ৫/৬ টা গাড়ি রওনা হয়ে গেছে সিএমএইচ এ। ৫/৭ মিনিটের মধ্যেই আরও গাড়ি আসা শুরু হল, অনেকেই রওয়ানা হয়ে গেল সিএমএইচ এর দিকে, কেউ কেউ হতবিহ্বল হয়ে মাটিতে বসে কাদছিল, কেউ কেউ চিৎকার করে আকাশ বাতাস কাপিয়ে দিচ্ছিল। আধা ঘন্টার মধ্যেই সবাই চলে এল হাসপাতালে। কয়েকশ মানুষের ভীড় হয়ে গেল ছোট্ট হাসপাতালটিতে, কিন্তু ভীতরের খবর কেউ জানতে পারছিল না, আমাদের কেউ কেউ ভীতরে ছিল, যারা এম্বুলেন্সের সাথে ছিল, তারাও একটু পর বের হয়ে আসল, সবাই বুঝে গেলেও কেউ মানতে পারছিল না, কেউ চিৎকার করে কাদতে কাদতে গালাগালি দিচ্ছিল, হেলিকপ্টার কেন আসছে না এখনও, সিনিয়র অফিসাররাও স্বান্তনা কি দেবেন, ভাষা হারিয়ে ফেলেছিলেন কথা বলার।

প্রায় ঘন্টাখানেক পর কয়েকজ়ন ডাক্তার বের হয়ে আসলেন। এরমধ্যে হেলিকপ্টার এসে পড়ল, এম্বুলেন্স গুলোকে লাইন আপ করানো হল। আমি ভিতরে ঢুকে গেলাম, আর তারপর ও.টি থেকে বের করে আনল সাদা কাপরে মোড়া একটা দেহ….সামনের অপেক্ষমান মানুষগুলোর যে আর্তচিৎকার তা এখনও কান থেকে যায় নি, চোখ বন্ধ করলেও দেখতে পারি ষ্পস্ট। আগে বের করা হল মাইনুলের দেহটা, এম্বুলেন্সে তোলার সময় কয়েকজন চেষ্টা করল একনজর দেখার, কিন্তু তাদেরকে দেখতে দেয়া হল না, কারন দেখার মত পরিস্থিতি মাইনুলের মুখের ছিল না। আমরা কয়েকজন আগে মাইনুলের নিথর দেহ নিয়ে চললাম হেলিপ্যাডে। তারপর ধরাধরি করে তোলা হল ভিতরে। এরপর এল স্টাফকে নিয়ে, ততক্ষনে তাকে অজ্ঞান করে রাখা হয়েছে, এরপর এল জুলকারনাইন, সে তখনও শক্ত ছিল, শুধু চোখ দিয়ে পানি বের হচ্ছিল। বেচারা বুঝেই উঠতে পারে নি যে তার উরুর মাংস অনেকখানি নেই হয়ে গিয়েছে, আর তার বা পায়ের গোড়ালির কাছে কেটে গিয়ে হাড় পর্যন্ত বের হয়ে গেছে। অথচ তাকে যখন এম্বুলেন্সে তোলা হচ্ছিল তখন সে পা দিয়ে ঠেক দিয়ে রেখেছিল, সে যাবে না, শুধু বলছিল “তৌহিদকে দেখ, ও কই?” এরপর তাকেও তুলে দেয়া হল, কে যেন এসে আমাকে একটা সাদা প্যাকেট দিল, বোধহয় আল শাফী হবে,অনেকটা জুতার বক্সের মত। জিজ্ঞাসা করলাম কি এটা, বলল মেডিকেল এসিস্টেন্টকে বুঝিয়ে দে, এটা মাইনুল আর স্টাফের হাত, আমি…..শীতল প্যাকেটটা নিয়ে আস্তে করে মেডিকেল এসিস্টেন্ট এর হাতে দিয়ে দিলাম, আর তারপর জুলকারনাইনের সাথে একবার চোখ মিলিয়ে নেমে এলাম কপ্টার থেকে। তারপর তাদের নিয়ে ০৩ টার দিকে চলে গেল হেলিকপ্টার।

এরপর আমরা চলে গেলাম ফায়ারিং রেঞ্জে। সবাই তখন কেমন দিশেহারা , বিকারগ্রস্থ মানুষের মত অবস্থা, সবাই মিলে জায়গাটা দেখতে গেলাম, জায়গায় জায়গায় রক্তের ছোপ, মাংস আর হাড় মিলে মিশে এক বিভৎস পরিস্থিতি। অনেক জায়গাই ততক্ষনে ঢেকে ফেলা হয়েছে। কারও কারও ইউনিফর্ম তখনও রক্তে ভিজে রয়েছে। আমরা কিছুক্ষন থেকে চলে এলাম আমাদের রুমে। কেউ কোন কথা বলছে না, অনেকের কান থেকে মোবাইল নামছে না, যার যার ইউনিটের সিনিয়র অফিসাররা ফোন করে খবর নিচ্ছে, কেউ কেউ বাবা মা’র কাছে দোয়া চাচ্ছে……..এক অশুভ অভিশাপের মত আমাদের জীবনের এক কঠিন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি করে দিয়ে সন্ধ্যার আধার ঘনিয়ে দিনটি শেষ হল।

এশার নামাজের পর বিশেষ দোয়া হল, এরপর চলে গেলাম তৌহিদের কাছে। ওকে সিএমএইচ এ ভর্তি করে রাখা হয়েছে, ঢাকা নেয়ার জন্য ওকেও চেষ্টা করা হয়েছিল কিন্তু ও যায় নি। ওর মুখ থেকে শুনলাম পুরো ঘটনা,
“জুলকারনাইন ছিল ফায়ারার। গানের বাম পাশে ছিল ও, আর ডান পাশের প্রথম ছিল মাইনুল, আর মাইনুলের গা ঘেঁষে ছিল তৌহিদ। তার পাশে ছিল ৫৬ লং কোর্সের সাইদ স্যার। মাইনুল সঠিক ভাবেই গোলা লোড করেছিল, আর তারপর হাটু গেড়ে বসেছিল তৌহিদের পাশে। তৌহিদ মাইনুলকে বলছিল দোস্ত লাগল না তো গোলাটা, মাইনুল তখন ওর হাটুতে চাপর দিয়ে বলেছিল, “আরে ব্যাপার না, দেখিস, সামথিং বেটার ইজ ওয়েটিং ফর ইউ” এরপরই ফায়ার, তৌহিদ দেখল প্রচন্ড ধুলায় ঢেকে গেছে চারপাশ, অদ্ভুত একটা শব্দ, পাশে তাকিয়ে দেখে মাইনুল পরে আছে মাটিতে, আর ওর একহাত সামনে মাটিতে পরে আছে একটা হাত!, কিছু বুঝতে পারার আগেই দেখল পাশের গানের সবাই দৌড়ে আসছে আর স্টাফ মাটিতে বসে বলছে, স্যার আমার হাত…….।”

মাইনুলের বুক ফুটো করে একটা টুকরো ঢুকে গিয়েছিল, একবারে হার্ট ফুটো করে ফেলেছিল। একটা হাত কব্জির উপর থেকে কেটে গিয়েছিল। আর, মুখের ডানপাশের অর্ধেক উড়িয়ে নিয়ে গিয়েছিল আরেকটি টুকরো। তারপরও প্রায় ২০ মিনিট ধরে যুদ্ধ করেছিল সে। কিন্তু…….।
নাইন আর মনির স্টাফ ঢাকা সিএমএইচ এ আছেন, আই সি ইউ তে। তৌহিদকে ছেড়ে দিয়েছে হাসপাতাল থেকে, এক দ্বিতীয় জীবন নিয়ে সে আবার আমাদের মাঝে ফিরে এসেছে, কিন্তু নেই শুধু মাইনুল।

বাবা মা’র একমাত্র ছেলে ছিল মাইনুল। গ্রামের থেকে উঠে আসা এক অতি সাধারন পরিবারের ছেলে, ৪ টি বোন আছে তার। এই বয়সেই পরিবারে অনেক ভূমিকা ছিল তার, যা আমরা অনেকেই করি না। তার বাবা মা’র কথা ভয়েও আমরা কল্পনা করতে পারি না।

নিজেদের বাবা মা এখন কি ভাবেন কে জানে, মা প্রতিদিনই ফোন করে কান্নাকাটি করে, কিন্তু কি করার। সেদিন ওদের পরের ডিটেইল এই আমাদের গ্রুপের যাবার কথা, কখন কার ভাগ্যে মহান আল্লাহপাক কি লিখে রেখেছেন তা কি আমরা কেউ বলতে পারি? সেদিন যদি সেখানে অন্য ধরনের আরেকটি গোলা যেটা পরে ফায়ার হবার কথা সেটা হত তাহলে ওখানের ২০ জনের কারও অস্তিত্বই খুজে পাওয়া যেত না। আর তাহলে হয়ত আমাদের মাসুদ(ব.ক.ক ৯৯-০৫) হিমেল(ম.ক.ক ৯৯-০৫) সহ আরও কতগুলো বন্ধুকে হারাতে হত কে জানে….

আর আমরা? আমরা আছি, দেশরক্ষার মহান ব্রত নিয়ে সেনাবাহিনীতে এসেছি, এধরনের বিপদের আশঙ্কা তো সব সময় মাথার উপর ঘুরবে, এটাই স্বাভাবিক। তাই যথারীতি একদিনের বিরতি দিয়ে আবার আমাদের প্রশিক্ষন শুরু হয়েছে, শুধু আর.আর ফায়ারিং বন্ধ রাখা হয়েছে। আমরা একএক জন পাথরের মানুষ হয়ে গিয়েছি। আমাদের অনুভুতি সাধারন মানুষের মত হলে তো চলবে না…..

মহান আল্লাহ, তুমি মাইনুলকে শহীদের মর্যাদা দিয়ে গ্রহন করে নাও। মাইনুল, বন্ধু,সৃষ্টিকর্তা যেন তোমাকে সবসময় তার অপার অনুগ্রহ দিয়ে ভরিয়ে রাখে এই প্রার্থণা রইল । আমাদের দোয়া সবসময় তোমার সাথে থাকবে।

২,৮৫৩ বার দেখা হয়েছে

৩৩ টি মন্তব্য : “অভিশপ্ত ২৮ শে জুন – জীবনের ডায়েরীতে একটি চিরস্থায়ী ক্ষত”

  1. রেজওয়ান (৯৯-০৫)

    আমি খুবই দুঃখিত, কিন্তু এই ঘটনার পর আপনাদের সাথে শেয়ার না করে আর পারলাম না, কোর্সের কারনে গত দেড় মাস ধরে যোগাযোগ নেই ব্লগের সাথে......এখন আবার হয়ত ডুব দেব। দোয়া করবেন সবাই, এখানে অনেক ক্যাডেট আছে যার অধিকাংশই ৯৯-০৫ ব্যাচের.....সবার পক্ষ থেকে আমি আপনাদের কাছে দোয়া চাই....

    জবাব দিন
  2. মাসরুফ (১৯৯৭-২০০৩)

    আমি যখন ক্লাস নাইনে রহমান তখন সেভেনের পিচ্চি।আমি ডর্ম টুয়েল্ভে ছিলাম আর ও ডর্ম ১১ এ।সোর্ড পাওয়া এই চৌকস ক্যাডেট আমার খুব প্রিয় জুনিয়র।লেখাটায় ওর নাম শুনে আঁতকে ঊঠেছিলাম-ওর বড় কিছু না হলেও ওর মতই আরেকজন মাইনুল আমাদের মধ্যে আর নেই-এ অনুভূতি লিখে বোঝানোর মত নয়।রেজওয়ান,রহমানের মোবাইল নম্বরটা আমাকে পারলে একটু দিস।

    জবাব দিন
  3. মুসতাকীম (২০০২-২০০৮)
    আল্লাহ মইনুল ভাইকে জান্নাতবাসী করুন।


    "আমি খুব ভাল করে জানি, ব্যক্তিগত জীবনে আমার অহংকার করার মত কিছু নেই। কিন্তু আমার ভাষাটা নিয়ে তো আমি অহংকার করতেই পারি।"

    জবাব দিন
  4. মইনুল (১৯৯২-১৯৯৮)

    ফেসবুক আর্মিতে কর্মরত বন্ধুদের স্ট্যাটাসে দেখেছিলাম খারাপ কিছু একটা ঘটেছে, কিন্তু বিস্তারিত পাচ্ছিলাম না।
    খবরটা বিস্তারিত দেখে মনটা খারাপ হয়ে গেলো।
    আল্লাহ মাইনুলকে ভালো রাখুন ......

    জবাব দিন
  5. কাইয়ূম (১৯৯২-১৯৯৮)

    আমাদের ওয়াসিমের স্ট্যাটাস মেসেজ দেখেই চমকে উঠেছিলাম। এরপর প্রথম আলোর অনলাইনে খুজে বের করে মনটা খুব খারাপ হয়ে গিয়েছিলো। আর এখন রেজওয়ানের লেখাটা পড়ে একদম স্তব্ধ হয়ে গেলাম। কি কষ্টটাই না পেলো মানুষগুলো।
    আল্লাহর কাছে ছোট্ট মাইনুলের জন্য দোয়া করছি। ওর পরিবার কিভাবে এই শোক কাটিয়ে উঠবে জানিনা...... যারা গুরুতর আহত হয়েছেন তাদের দ্রুত আরোগ্য কামনা করছি।
    রেজওয়ান, সাবধানে থাকিস বাডি 🙁


    সংসারে প্রবল বৈরাগ্য!

    জবাব দিন
  6. ২৮ তারিখ বিকালে আমি বাসে ছিলাম,তুহিন ফোন করে আমাকে শুধু বলল,SINT তে কি হইসে জানিস??আমি মনে করেছিলাম আমাদের পোলাপান বেসিক কোর্সে খুব উত্তেজক কোন কাহিনী ঘটিয়েছে,তারপর যখন এরকম একটা দুঃসংবাদ শুনলাম,খুব কষ্ট লাগল।কিছুদিন আগে ৫৭ এর পিসিসির ফাউজুল যখন বাইক দুর্ঘটনায় মৃত্যুবরন করল তখন থেকেই বাইক দেখলে আমার মনে ফাউজুলের চেহারা ভেসে আসে।চাকুরির প্রয়োজনে এই ধরনের বিপদজনক কাজগুলো চলবেই।দুর্ঘটনাও মাঝে মাঝে ঘটে যায়।আমি একজন মুসলিম হিসাবে অবশ্যই বিশ্বাস করি,আল্লাহ প্রত্যেক মানুষের মৃত্যুর নকশা করে রেখেছেন।সেটা ফাঁকি দেয়া আমাদের সম্ভব নয়।কিন্তু সতর্ক থাকলে অনেক ক্ষেত্রেই এই অনাকাঙ্খিত বিপদ এড়ানো যায়।

    ৫৭ এর পোলাপান,তোরা সাবধান থাকিস রে...জানি,তোদের আর্মি জীবনে কাজটা কঠিন।তবুও.........সাবধানের মাইর নাই।

    জবাব দিন
  7. রহমান (৯২-৯৮)

    কি লিখব? স্বান্তনার কোন ভাষা খুজে পাচ্ছিনা। এই বছরটাই আমাদের জন্য কেমন জানি! একটার পর একটা দুঃসংবাদ শুনে যাচ্ছি। আমাদের সময়ও (২০০৩ সালে) ঠিক একই ভাবে একই ধরনের একটা দূর্ঘটনা ঘটেছিল। সেবার অবশ্য এত বড় ক্ষতি হয়নি। ৪২ লং কোর্সের মুকিম স্যার কিছুটা আহত হয়েছিলেন এবং পাশে দাঁড়ানো ষ্টাফ বেশি ইনজুরড হয়েছিলেন। এখন সেই ষ্টাফ পঙ্গু অবস্থায় বেচে আছেন আর মুকিম স্যার সম্পূর্ণ সুস্থ্য।

    মহান আল্লাহ আমাদের ছোটভাই মাইনুলকে শহীদের মর্যাদা দিয়ে জান্নাতবাসী করুন - আমীন

    জবাব দিন
  8. শাওন (৯৫-০১)

    আমার এখনও মনে পড়ে কলেজে থাকতে এইরকম আরেকটা দূর্ঘটনা দেখেছিলাম। সেটা অবশ্য কারিগরি ত্রুটির কোন কারণে নয়। কতৃপক্ষের চরম গাফলতির কারণে। বিভৎস সে দৃশ্য। আমরা আমাদের আদরের দুই ছোট ভাইকে হারিয়েছিলাম। কেন যেন মনে হয় ঐ দুই হতভাগার ক্লাসমেটদের চেয়ে আমারা সিনিয়র বা জুনিয়র অদেরকে কম ভালোবাসিনা। তখন ব্লগ ও ছিলনা। প্রতিবাদ বা দুঃখ শেয়ার করার জায়গা ও ছিলনা। বরং প্রতিবাদ করতে গিয়ে আরও অনেক বিপদে পড়তে হয়েছিলো। সেসব কথা না হয় না ই বললাম। ব্লগে এস.আই.এন.টি এর এই ঘটনাটা পড়ে আজ কলেজের সে ঘটনাটা আবার মনে পড়ল। 🙁 🙁

    আল্লাহ যেন মাঈনুলকে জান্নাতবাসী করেন। আর যারা বেঁচে আছেন তাদেরকে যেন সহী সালামতে রাখেন।


    ধন্যবাদান্তে,
    মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান শাওন
    প্রাক্তন ক্যাডেট , সিলেট ক্যাডেট কলেজ, ১৯৯৫-২০০১

    ["যে আমারে দেখিবারে পায় অসীম ক্ষমায় ভালো মন্দ মিলায়ে সকলি"]

    জবাব দিন
  9. জাবীর রিজভী (৯৯-০৫)

    জানিনা কি বলতে হবে......
    জানিনা কি লিখতে হবে......
    আমি এখন নির্বাক, স্তব্ধ.....
    পাথর হয়ে যাওয়া আমাকেই মানায়.....

    মাইনুল জান্নাতবাসী হোক.....এটুকু প্রার্থনা ছাড়া আর কী বা করতে পারি!

    ড়িফেন্সে যারা আছিস, প্লিজ, সাবধানে দোস্ত...................প্লিজ...........

    জবাব দিন
  10. মেহেদী হাসান (১৯৯৬-২০০২)

    আমরা কত নির্ভয়ে বিপদজনক প্রশিক্ষনের এই খেলা গুলো নিখুতভাবে শক্তিশালী মারনাস্ত্র নিয়ে খেলে চলেছি। কখনো চিন্তা করেও দেখিনি যে, একটু ভুল হলেই কত বিভৎস হতে পারে পরিনাম।

    আজ কিছু বলার ভাষা হারিয়ে ফেলেছি। শুধু বলব এবং প্রার্থনা করব, আল্লাহ মঈন কে বেহেস্ত নসিব করুক। আমিন।

    জবাব দিন
  11. আন্দালিব (৯৬-০২)

    এই বছরটা আসলেই একটা কুফা বছর। এত এত খারাপ খবর! মইনুলের খবর ফেসবুকে পেয়েছিলাম, বিস্তারিত জানতাম না। এখন জেনে মনে হচ্ছে না জানলেই ভাল হত। ... 🙁

    মন খুব খারাপ হয়ে গেল। খুবই খারাপ। দৃশ্যগুলো কল্পনা করতেই পারছি না। তোমরা যারা চোখের সামনে দেখেছ তাদের অবস্থা আন্দাজ করার শক্তিও আমার নাই।

    সাবধানে থেকো সবাই, এটুকুই কামনা...

    জবাব দিন
  12. আদনান (১৯৯৪-২০০০)

    তোরা সাবধানে থাকিসরে । এসব খবর দেখে আর ভাল লাগেনা । আমার ছোট ভাইটাও আর্মিতে, তাই তোদের পরিবারের আশংকা মানসিক চাপ সবই উপলব্ধি করতে পারি । মাইনুল জান্নাতবাসী হোক এই দোআ করি । আবারো বলি খুব সাবধানে থাকিস ।

    জবাব দিন
  13. সানাউল্লাহ (৭৪ - ৮০)

    রেজওয়ান : ব্যস্ততার কারণে গত দুদিন সিসিবিতে ঢোকার সময়ই পাইনি। ঘটনাটা পত্রিকা পড়ে জেনেছি, পরিচিত কারো নাম না দেখে স্বস্তি পেয়েছিলাম। কিন্তু তোমার লেখা পড়ে নিহত-আহত সবাইকে পরম আপন মনে হচ্ছে। মইনুলের জন্য ভালোবাসা।

    তুমি ভালো থেকো ভাই, সুস্থ থেকো। জানি পেশার সমস্যা, বিপদ-আপদ আছে। তবুও যতোদূর পারো সতর্ক থেকো। আমাদের সবার শুভকামনা তোমাদের সবাইকে ঘিরে থাকবে বর্মের মতো।


    "মানুষে বিশ্বাস হারানো পাপ"

    জবাব দিন
  14. গুলশান (১৯৯৯-২০০৫)

    মর্মান্তিক এই ঘটনার বিবরণ আগেই পড়েছিলাম। আজ আবার পড়লাম। তবে আজ নতুন একটা কথা মনে আসল- যখন যুদ্ধ হয়, এই সব গোলাগুলোই অন্যদেরকে উদ্দেশ্য করে নিক্ষেপ করা হবে। তারাও হবে আমাদেরই মত মানুষ। কেউ "অল কোয়ায়েট অন দ্যা ওয়েস্টার্ন ফ্রন্ট" পড়েছেন?

    আল্লাহ মইনুলকে জান্নাতবাসী করুন। ওর পরিবারের কী খবর এখন?

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।