টাপুর-টুপুর কারিনা কাপুর চেষ্টা

এই সময়ের বলিউডের সবচেয়ে জনপ্রিয় কিংবা এক নম্বর নায়িকার নাম বলতে গেলে কারিনা কাপুরের নামটা চলে আসবে। চার খান সাহেবের সাথে কোন রকম বঝঘট না পাকিয়ে সমান তালে সবার সাথে অভিনয় করে যাচ্ছেন। স্বয়ং শাহরুখ খান নাকি কারিনার ব্যস্ত সময় থেকে তার জন্য সময় বের করতে পারছেন না। ত আমার এই ব্লগের লেখার বিষয় কারিনা কাপুরও নয় অথবা হালের “বডিগার্ড/ রা ডট ওয়ান” হিন্দি ছবির ডিসেকশন করাও নয়। আমাদের দেশের হালের জামানায় অলিতে গলিতে গজানো বিউটি পার্লার নিয়ে।

সভ্যতার শুরু থেকে মানুষ সুন্দরের পূজারী। সুন্দরের প্রতি দুর্নিবার এই আকর্ষণ মানুষকে সৌন্দর্য চর্চার প্রতি আগ্রহী করে তুলেছে। মানবীদের মধ্যে সবাই ত আর হেলেন অফ ট্রয়, অড্রে হেপবার্ন কিংবা হালের ঐশ্বর্য রায় নয় যে বিধাতার অকৃপণ প্রদত্ত সৌন্দর্য নিয়ে দুনিয়াতে এসেছে। সখিনা, জরিনা, নসিমনও আছে যাদের এত সৌন্দর্য হয়ত নেই কিংবা নিজেদেরকে সুন্দর করার আপ্রাণ ইচ্ছা রয়েছে। আবার মানবের মধ্যে ত সবাই যে টম ক্রুজ, সালমান খান অথবা আমাদের দেশের নম্বর ওয়ান শাকিব খানের মত রূপ আর গুণ নিয়ে দুনিয়ায় চড়ে-খেয়ে বেড়াচ্ছে তাও নয়, আমার মত আব্দুল, আব্বাস, হাসমতও আছে। বরঞ্চ তাদের সংখ্যাটাই বেশী। এই আব্দুল, আব্বাস, হাসমতও কিন্তু জীবনের একটা বয়সে টম ক্রুজ, সালমান খানের পোস্টার ঘরের দেয়ালে লাগিয়ে স্বপ্ন দেখত, “একদিন আমিও”।

মানুষের এই সৌন্দর্য চর্চার ব্যাপারে অদমনীয় আগ্রহ সভ্যতার ঊষা লগ্ন থেকে। তখন সৌন্দর্য চর্চার ব্যাপারটা রাজা-রাণী কিংবা রাজ পরিবারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল হয়ত। অন্তত ইতিহাস তাই বলে। অবশ্য সেইসব ইতিহাসে রাজ পরিবারের কাহিনীই বেশী, তাদের জীবন যাত্রার গল্পই বেশী ছিল। সাধারণ মানুষ কি করত না করত, খেত না গল্প করত তার কাহিনী তেমন ছিল না। তাই আমাদের পক্ষে জানা সম্ভব নয় যে আদি কালে সাধারণ মানুষজন সৌন্দর্য চর্চা করত নাকি? হালের আমলে পশ্চিমা সভ্যতার কল্যাণে এই সৌন্দর্য চর্চার ব্যাপারটা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়, জনপ্রিয়তা পায় মধ্যবিত্ত সমাজেও। গড়ে উঠে আদম–হাওয়াদের সুন্দর করার বিউটি পার্লার। এক শ্রেণীর সুচতুর মানব-মানবী আমার মত হাসমত – বিলকিসদের, টম ক্রুজ আর ক্লিওপের্টা বানানোর জন্য দিতে থাকে এই ধরনের বিউটি পার্লার । সাধারণ মানুষ হুমরী খেয়ে পড়তে থাকে সেই সব বিউটি পার্লারে। পানির মত ঢালতে থাকে তাদের টাকা-কড়ি।

পশ্চিমা বিশ্বের সেই সৌন্দর্য চর্চার বাতাস বাংলার বুকে লাগবেনা তা কি করে হয়। আমরা বাঙ্গালীরা “যা কিছু মহান (!) গ্রহণ করেছি বিনম্র শ্রদ্ধায়”। আমাদের দেশেও শুরু হয়ে যায় বিউটি পার্লারের ব্যবসা। আমার মনে আছে নব্বই এর দশকে ঢাকা শহরে হয়ত গুটি কয়েক বিউটি পার্লার ছিল। উচ্চবিত্ত পরিবারের মা-খালারাই ছিলেন তাদের প্রধান গ্রাহক। মধ্যবিত্ত পরিবারের খালারা যেত কেবল মাত্র তাদের বিয়ের সাজের সময়। ত কালের চাকা ঘুরতে ঘুরতে আমাদের নিম্নবিত্ত আর মধ্যবিত্তদের পকেটে টাকা ঢুকতে থাকে। ত এত টাকা রাখবে কোথায়? মা-খালা-বোনরা যেতে থাকে পার্লার গুলোতে। ছেলেরাও যোগ হয় এই পার্লার গ্রাহকদের কাতারে। এই আদম এবং হাওয়াদের সুন্দর করার জন্য পাড়ায় পাড়ায় কিন্ডার গার্টেনের মত গজাতে থাকে বিউটি পার্লার। ত পিরামিডের মত, উপরের কাতারে তৈরি হতে থাকে আরও উন্নত সুযোগ-সুবিধা সম্বলিত বিউটি পার্লার। সেরকমই একটা বিউটি পার্লারের নাম “পারসোনা”। তারা শুধু মানবীদের জন্য এই সুযোগের ব্যবস্থা রাখেনি। মানবদের সেবা দেবার জন্য তাদের আছে ধানমণ্ডিতে “পারসোনা আদম”। যদিও এটা উচ্চারণে এ্যাডাম হওয়ার কথা। এই মুহুর্তের ঢাকা আর চট্রগ্রামের সৌন্দর্য সচেতন মানব-মানবীদের কাছে সবচেয়ে জনপ্রিয় আর অন্যতম ব্যয়বহুল সৌন্দর্য চর্চা কেন্দ্র হচ্ছে এই “পারসোনা”।

এই “পারসোনা” তেই নাকি মানবীদের সৌন্দর্য চর্চার জন্য ৪৯ ধরনের সেবা কর্মসূচি রয়েছে। সংখ্যাটা এদিক- ওদিক হতে পারে তবে সংখ্যাটা বড় কোন ইস্যু নয়। শাড়ি পড়ানো থেকে শুরু করে, হাত-পা’র নখ কাটা, চুল কাটা, শাখামৃগের মত চুল রং করা,চামড়ার হোয়াইট ওয়াশ, ডিস্টেম্পর থেকে হালের রকমারি স্পা নিয়ে এরা সেবা দিয়ে যাচ্ছে। সে আন্দাজে বলা যায় আদমদের সৌন্দর্য কেন্দ্র গুলোতে সুন্দর করে শার্ট-প্যান্ট পড়ানো থেকে শুরু করে টম ক্রুজ বানাতে যা যা দরকার হয় সব ধরনের সেবাই হয়ত দেয়া হয়ে থাকে। মা-বোনদের অনেকেই নাকি আজকাল চুল আঁচড়াতেও প্রতিদিন পার্লার গুলোতে যাচ্ছেন। তার উপর এরকম ব্যস্ত ও কর্মময় জীবনে শরীর যেভাবে ম্যাজম্যাজ করে তাতে সপ্তাহে একবার অথবা মাসে একবার হারবাল/কাদামাটি দিয়ে স্পা না করলে ত শরীর ঠিক রাখাই দায় হয়ে যায়। ত সৌন্দর্য চর্চা কেন্দ্র গুলো সেবা দিবে, যত ধরনের পারা যায়; মানুষও সে সেবা নিবে এত দোষের কিছু নেই। সমস্যা হল যখন সাধারণ মানুষ সেবা নিতে গিয়ে বিব্রত হয়, তাদের গোপনীয়তা বা সেবা গ্রহণকালীন সময়টা বিনা অনুমতিতে রেকর্ড করা হয় যা ভদ্র/অভদ্র কোন সমাজেই কোন ভাবেই গ্রহণ যোগ্য নয়।

সম্প্রতি এমনি এক ঘটনা ঘটেছে বনানীর “পারসোনা হাওয়া” কেন্দ্রে। আপত্তিকর দৃশ্য ধারণের অভিযোগে সৌন্দর্য চর্চা কেন্দ্রের সিসি ক্যামেরা জব্দ করা হয় এক নারীর অভিযোগের প্রেক্ষিতে। ব্যাপারটা খুবই হতাশা ও দুঃখজনক। অভিযোগকারিনীর চোখে গোপন সিসি ক্যামেরা গোচরীভূত হওয়াতে এই ব্যাপারটা খবরের কাগজে এসেছে। হয়ত আরও কত সেবা গ্রহণকারীদের চোখের অন্তরালে এই সিসি ক্যামেরাতে তাদের সেবা গ্রহণ করার সময়ের ভিডিও ধারণ করা হয়েছে তা কেবল মাত্র সৃষ্টিকর্তা জানেন। কথা হচ্ছে “পারসোনা”র মত একটি স্বনামধন্য বিউটি স্যালুনে যদি এ ধরনের ঘটনা ঘটে যার স্বত্বাধিকারিণী হচ্ছেন দেশের একজন স্বনামধন্য বিউটিশিয়ান, তবে পাড়ার অলিতে-গলিতে অন্যান্য বিউটি পার্লারের কি হচ্ছে তা আমার জানা নেই। তবেও এটাও ঠিক নয় যে ঢালাও ভাবে সব বিউটি পার্লারে এরকম হচ্ছে। পাশ্চাত্য বিশ্বে এ ধরনের ঘটনা ঘটে থাকলে মানহানির মামলায় “পারসোনা”র ব্যবসায় লালবাতি জ্বলে যেত আর তার মালিককে কোর্ট-কাঁচারী করেই বাকি জীবন পার করতে হত। জাস্ট “সরি” কিংবা ইলেক্ট্রিশিয়ানের ভুলে এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে বলে পাস কাটানো যেত না। এমন একটা ভাব যেন আমরা আম জনতা ঘাস খাই আর তাদেরকে একটা কিছু বলে দিলেই তারা মেনে নিবে। বিধি বাম আমরা জন্মেছি জেলে পল্লীতে, ঐ পারের ভদ্র পল্লীর মানুষের মত আমাদের জীবন এত শান্তিময় নয়। পদে পদে হেনেস্থা হওয়াই আমাদের সাধারণ মানুষের নিয়তি।

তাই বলে কি আমাদের সাধারণ মানুষের কিছুই করার নেই। আমাদের মা-বোনদের সৌন্দর্য চর্চা বন্ধ হয়ে যাবে, তাদের টুকটাক করে কারিনা কাপুর, প্রীতি জীনতা হবার চেষ্টা থেমে যাবে। না কখনই নয়। বরং মা-বোন-খালাদের উচিত হবে এ ধরনের সৌন্দর্য চর্চা কেন্দ্র গুলো সেবা দেবার নাম করে অন্য কিছু করছে কিনা তা সেবা গ্রহণের পূর্বে ভাল ভাবে পরখ করে নেওয়া এবং কোন ধরনের সন্দেহজনক কিছু হলে তা অবশ্যই আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী কতৃপক্ষের দৃষ্টি গোচর করা, যাতে এ ধরনের অপরাধ মূলক কর্মকান্ড সমাজে কোন ভাবেই ঘটতে না পারে। আর যারা সেবা দেবার নাম করে এ ধরনের ঘৃণ্য অপরাধের সাথে জড়িত তাদের কে বয়কট করা। আমাদের মিডিয়ারও উচিৎ হবে বড় ব্ড় ব্র্যান্ডের নামে যাদের সেবাপ্রদান কারী প্রতিষ্ঠান এ ধরনের অপরাধ মূলক কর্মকান্ডের সাথে জড়িত তাদের বিরুদ্ধে সঠিক তথ্য মিডিয়াতে প্রচার করা। আমাদের কোন মিডিয়া কি এই খবরটা প্রচার করেছে, যাতে আমাদের মা-বোনরা সাবধান কিংবা সচেতন হতে পারে এ ধরনের সৌন্দর্য চর্চা কেন্দ্রে যাবার আগে? আফসোস আমাদের মিডিয়াগুলো এখনো সে ধরনের প্রফেশনালিসম দেখাতে পারেনি। তাদের খবর প্রচার আর কার বিরুদ্ধে খবর প্রচার করবে তার মাপকাঠি থাকে ব্যক্তিগত যোগাযোগ আর সম্পর্কের উপর। আর যারা কারিনা কাপুর আর নম্বর ওয়ান শাকিব খান বানানোর ওয়াদা করে সৌন্দর্য চর্চা কেন্দ্র খুলে বসেছেন তাদের সবার আগে মনে রাখা উচিৎ, ব্যবসা একবার দাঁড় করানোটাই বড় কথা নয়, প্রফেশনালিসম সহকারে ব্যবসা চালিয়ে যাওয়াটাই এগিয়ে যাবার এবং ব্যবসায়িক সাফল্যের মূলমন্ত্র।

২,০৪০ বার দেখা হয়েছে

১১ টি মন্তব্য : “টাপুর-টুপুর কারিনা কাপুর চেষ্টা”

  1. ওয়াহিদা নূর আফজা (৮৫-৯১)

    পারসোনার খবরটা পড়ার পর থেকে এই বিষয়ে লেখার জন্য হাত নিশপিশ করছিল। সময় ম্যানেজের অভাবে হয়ে উঠে নাই ।
    লেখা খুবই ভাল হয়েছে। আমি অপেক্ষা করছি জানার জন্য আসলেই এর পেছনে মালিকিনের হাত ছিল কিনা। কারণ মহিলাকে বেশ ্মিডিয়া ব্যাক্তিত্ব হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছিল। সেটা কি মহিলার কানেকশনের জোরে নাকি কোয়ালিটির জোরে? আসল সত্যিটা খুব জানতে ইচ্ছা করছে। যাইহোক দেশে অনেক মহিলা আছে যাদের টাকার অভাব নাই কিন্তু খুব কাজের অভাব। এদের জন্য দেশে বিউটি পার্লারগুলো যেই রাজকীয় চালে চলে যেটা আমি আমেরিকায় দেখি না।


    “Happiness is when what you think, what you say, and what you do are in harmony.”
    ― Mahatma Gandhi

    জবাব দিন
    • সাইফুল (৯২-৯৮)

      ধন্যবাদ আপু ব্লগটা পড়ার জন্য।

      আসলে কি হয়েছিল এটা জানা আমাদের পক্ষে খুব কঠিন ব্যাপার। "পারসোনা"র মালিক "মানবজমিন" এর একটা প্রতিবেদনে বলেছে আমাদের বিদেশ মন্ত্রী তাঁর প্রতি সপ্তাহের গ্রাহক। এটা বলে কি বুঝাতে চেয়েছেন তিনি। তাঁর দৌড় কত দূর নাকি অন্য কিছু? আর এভাবে ত উনি বলতে পারেনা কে তার গ্রাহক আর কে তার গ্রাহক নয়। আজকের "প্রথম আলো"তে দেখলাম সেবাগ্রহীতার স্বামী আর আমাদের বিখ্যাত বিউটিশিয়ান মিলে এক যৌথ বিবৃতি দিতে যে আসলে কিছু হয় নাই। আমার মনে প্রশ্ন আসে, চাপের মুখে কি জোর করে সেবাগ্রহীতার স্বামী থেকে সই নেয়া হয়েছে কিনা? তিনি ত একজন ডাক্তার মানুষ। তারও ত চাকুরী যাবার বা সামাজিক ভাবে হেনেস্থা হবার ভয় আছে তাই না। আবার আরেক প্রতিবেদনে দেখলাম বনানী থানার পুলিশের উপ-পরিদর্শক কে সাময়িক ভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে। কিছু যদি হয়ে না থাকে তাহলে পুলিশকে বরখাস্ত করা হল কেন? ঐ পুলিশের কি দোষ? অনেক প্রশ্ন থেকে যায়...

      আবার ব্লগে এইসব নিয়ে লেখা-লিখি হচ্ছে দেখে তাদের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশও দেখলাম।

      আসলেই আপু, আমেরিকাতে বিউটি পার্লার গুলোর এরকম রাজকীয় কাণ্ডকারখানা নেই...

      জবাব দিন
  2. রাব্বী (৯২-৯৮)

    প্রাইভেট এবং পাবলিক স্পিয়ার বিবেচনা করে সিকিউরি ক্যামেরা ব্যবহারের কিছু প্রচলিত প্রথা আছে। যেমন লিখে দিতে হয় যে এই জায়গায় ক্যামেরা সারভেলিয়েন্স আছে এবং সবকিছু মনিটর করা হচ্ছে। চুরি বন্ধের জন্য সিসি ক্যামেরার চেয়ে লকার বেশি কার্যকরি। আমি বিডি নিউজ২৪ এবং কালের কণ্ঠ অনলাইন থেকে জেনেছিলাম। সেখানে ফেসবুক এবং ব্লগ ছিল নিউজ রেফারেন্স তারপর পুলিশ এবং পারসোনার সত্ত্বাধিকারী।

    মনের কথা: কারিনা এবং প্রিতি জিনতারে আমো ভালু পাই 😀 শাকিব খানের মতো লিপিস্টিক দিয়া একদিন রমনাপার্ক কিংবা কার্জন হলে ডিএইচ লরেন্সের পদ্য বা গদ্য বই হাতে নিয়া বেড়াইতে যাইতে চাই। আর একদিন স্পা করতে চাই। হাবিবস'সেও কি সিসি ক্যামেরা আছে? থাকলেও আমার কোন সমিস্যা নাই 😛


    আমার বন্ধুয়া বিহনে

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।