ফেলে আসা দিনগুলো

কলেজে জুনিয়র আসার দিন সবার মন কমবেশি খুশি খুশি থাকে।ক্লাস এইটদের বলে দেয়া হয় সেভেনদের সেদিন কোনোরকম টেবিল রুলস না শিখাইতে।ডিনারে ক্লাস সেভেনদের নিয়ে আচ্ছামত মজা করা হয়।
আমি প্রথমদিন টেবিলে গিয়া দেখি আমাকে দেখে আমার টেবিলমেটরা ব্যাপক মজা পাচ্ছে।আমি যাই করি তাতেই তারা হাসে।তার উপর খাইতে দিসে আলুভর্তা।এইসব দেখে আমি ক্যাডেট কলেজের উপর মহা বিরক্ত হয়ে গেলাম।টেবিলমেট একজন(ক্লাস ইলেভেন) জিজ্ঞেস করল কলেজ কেমন লাগতেসে?আমি বললাম disgusting.সঙ্গে সঙ্গে হাসির মাত্রা আরো বেড়ে গেল।কোনমতে হাসি চেপে উনি আবার বলল খাচ্ছ না কেন?আমি বললাম আলুভর্তা খাই না।উনি বলল খাও খাও, তুমি না আমাদের গেস্ট,একটু হলেও খাও।তো আমি দুই চামচ খেয়ে বললাম, খাইতে বললেন, খাইলাম। আর খাব না।আবার প্রশ্ন… কেন তুমি কি ডায়েট কন্ট্রোল কর?রাগের চোটে বললাম, হ্যাঁ করি।এইবার হাসাহাসি একদম মাত্রা ছাড়ায় গেল।আমি দেখলাম আমার মান ইজ্জত রক্ষা করতে কিছু একটা করতে হয়।পাশের জনকে(ক্লাস নাইন)আচ্ছামতো ঝাড়ি দিলাম।এ্যাঁ হাসতেছো কেন?এত হাসির কি হইছে?তুমি জান আমি insulted feel করতেসি?
সেই রাত থেকেই মার্কড হয়ে গেলাম।

আমার পাশের ডর্মে থাকতো বিনি আর সেঁজুতি।ওদের রুমমেট এইটের আপারা বেশিরভাগ সময় রুমে থাকতো না।প্রিফেক্টরা রাউন্ড দিয়ে গেলে আমাদের ডর্মে চলে আসতো।ওদের ডর্মের অন্য রুমটায় ক্লাস নাইনের আপারা থাকতো। বিনি এমনিতেই ভীতু মার্কা।সেঁজুতি ঘুমায় পড়লে রুমে একা একা খুব ভয় পাইতো।একদিন রাত বারটার দিকে দৌড়াইতে দৌড়াইতে আমাদের ডর্মে হাজির।কিছুতেই রুমে যাবে না।সেঁজুতিকে নাকি জ্বীন ধরছে।শেষ পর্যন্ত জানা গেল বেচারা সেঁজুতি ঘুমের মধ্যে একটু কথা বলতেছিল আগুন বালতি।তাতেই বিনি কাইত।

সেভেনে natually ঘুমের আদর্শ জায়গা ছিল ফর্ম।তিন হাউসের তিনজন ছিল ঘুমের আইডল,ফারিহা,নিতু আর শান্তা।এরা ফর্মে কয় ঘন্টা জেগে থাকছে হাতে গুনা যাবে।এদের মধ্যে ফারিহা সবচেয়ে মারাত্মক।ঘুমাইতে ঘুমাইতে চেয়ার থেকে পইড়া গেলেও কখনো স্বীকার করবে না যে ঘুমাচ্ছিল।একবার প্রেপ টাইমে ঘুমাচ্ছে।সেদিন মনে হয় একটু বেশি আরাম করে ঘুমাচ্ছিল,নাক ডাকা শুরু করে দিল।পুরা ফর্মে পিনড্রপ সাইলেন্স,তার মধ্যে নাক ডাকার শব্দ।প্রেপগার্ড আপা আমাদেরকে বলল ওকে ডেকে দিতে।তারপর আপা জিজ্ঞেস করল কি ফারিহা ঘুমাচ্ছিলা?আমরা ভাবলাম at least এইবার স্বীকার করবে,কিন্তু নাহ।ও সুন্দর মাথা নেড়ে বলল জ়্বী না আপা।

একবার আমাদের কয়েকজন ক্লাসমেট বিলওয়াল জারদারিকে নিয়ে ডিসকাস করতেছিল।তখন ঘটনাস্থলে আমার এক বুদ্ধিমান ক্লাসমেট এর প্রবেশ।সে কিছুক্ষন শুনে টুনে বললো বিলওয়াল?কোনটা রে?কোন ক্যাডেট কলেজ?

লাস্ট কাহিনিটা রশনীদের ডর্মের।ওদের ডর্মের সামনে দাঁড়ায় এক আপা একজনকে বের হইতে বলছিলো।তখন আমরা ক্লাস নাইনে মাত্র উঠছি।সচরাচর যা হয় তুই যা তুই যা করতে করতে কেউই শেষ পর্যন্ত বের হয়নি।আপা তো খুব চেতে গেল ।তারপর যে বকাটা দিলো সেইটা ইন্টারন্যাশনাল.
“ঘোড়ার ডিমের সিনিয়র হইছ সেই ডিমের আবার পাখা গজাইছে সেই পাখা দিয়ে উড়ে উড়ে বেড়াচ্ছ ”

কলেজটা আসলেই খুব মিস করি।আমার আব্বুর বদলির চাকুরি হওয়ায় ক্যাডেট কলেজে যাওয়ার আগে কোন স্কুলেই এক বছরের বেশি পড়া হয়নি।ক্লাসের মানুষদের ভালোমতো চিনতে না চিনতেই আবার নতুন স্কুল,নতুন মানুষজন।একটু আনসোশাল টাইপ আমি তাই প্রথম ফ্রেন্ডের দেখা পাই ক্যাডেট কলেজে গিয়েই।কলেজ থেকে বের হয়েও একই অবস্থা।বাসায় ক্যাডেট কলেজ নিয়ে গল্প অনেক করি।এমন অবস্থা যে আমার ছোট বোন একদিন স্বপ্নে দেখে সে ইডি খাচ্ছে।
আমাদের কলেজ ডাইনিং হলের সামনে লেখা “We Love MGCC”.সেভেনে ডাইনিং এর সামনে ফল-ইন করতাম আর মনে মনে ভাবতাম “We Hate MGCC”.কিন্তু এখন আমি জানি “We Really Love MGCC ”.

১৬০ টি মন্তব্য : “ফেলে আসা দিনগুলো”

  1. তানভীর (৯৪-০০)

    ক্লাস সেভেনের প্রথম দিনেই নাইনের সিনিয়রকে ঝাড়ি দিছ!! 😮 পাংগা খাইতে খাইতে তোমার ক্যাডেট লাইফ তো তামা-তামা হয়ে যাওয়ার কথা!

    ঘোড়ার ডিমের সিনিয়র হইছ…সেই ডিমের আবার পাখা গজাইছে…সেই পাখা দিয়ে উড়ে উড়ে বেড়াচ্ছ

    এই ঝাড়িটা খুব মজার হইছে!

    ১ম পোস্টের জন্য অভিনন্দন। এখানে থেমে গেলেই চলবে না কিন্ত........ 😀

    জবাব দিন
  2. সামিয়া (৯৯-০৫)

    :)) :)) দারুণ! নাইনের কাকে ঝাড়ি দিসিলা?? আর ওই ইন্টারন্যাশনাল বকাটাই বা কে দিসিলো?
    ইয়ে বিলওয়াল জারদারীটা কে? আসিফের পোলা নাকি? 😐

    মজার ব্যাপার ক্লাস সেভেনে ওই কথাটা দেখে আমরাও ঠিক একই কথা চিন্তা করতাম, বার হয়ে এসে আমরাও কথাটাকে উলটে দিতাম 🙂

    জবাব দিন
  3. জিহাদ (৯৯-০৫)
    বিলওয়াল?কোনটা রে?কোন ক্যাডেট কলেজ?

    :khekz: :khekz:

    তুমি মিয়া এতদিন কুথায় ছিলা। আগে লিখোনাই কেন :grr:
    আর আগের প্রোফাইল পিকটাই তো সুন্দর ছিলো 😀


    সাতেও নাই, পাঁচেও নাই

    জবাব দিন
  4. মামুন (২০০২-২০০৮)

    "এ্যাঁ হাসতেছো কেন?এত হাসির কি হইছে?তুমি জান আমি insulted feel করতেসি?" :khekz: :khekz:
    সুন্দর লেখা.......আমাদের কয়েকজন এর বিখ্যাত ঘুমের কথা মনে পড়ে গেলো।
    :clap: :clap: :clap:

    জবাব দিন
  5. ফারহানা (২০০১-২০০৭)

    লেখা চরম হইসে অরপিআ :boss:
    কেউ তোমারে :frontroll: দিচ্ছে না তাই আমিই দিলাম। :))
    এক্ষুনি ৫ বার :frontroll: দাও।
    আমার মনে আছে তোমার এই কাহিনি সেদিন খুব হিট হইসিল (বিশেষ করে আমাদের হাউসে :)এবং আমি মাথা নেড়ে বলসিলাম

    আহারে তুলি বেচারার খবর আসে

    :khekz: :khekz:

    জবাব দিন
  6. কামরুল হাসান (৯৪-০০)

    আরে , এই মেয়েটা দেখি খুব মজা করে লিখতে পারে।
    ক্যাডেট কলেজের গল্প যত শুনি ততো ভালো লাগে। এটাও লাগলো।

    তুমি আরো লিখ।
    মাঝে মাঝে দুয়েকটা ইংরজি শব্দ লিখেছো, সেগুলি বাংলায় লিখলে দেখতে এবং পড়তে আরো ভালো লাগবে।


    ---------------------------------------------------------------------------
    বালক জানে না তো কতোটা হেঁটে এলে
    ফেরার পথ নেই, থাকে না কোনো কালে।।

    জবাব দিন
  7. রাশেদ (৯৯-০৫)

    আরে ব্লগ লেখা হইল তাইলে 🙂
    প্রায় সময় ভাবি কলেজ নিয়ে, কলেজের ঘটনাগুলো নিয়ে ব্লগটগ লিখি কিন্তু লেখতে গিয়ে আবিষ্কার করলাম কলেজে ঘটনা গুলো যতটা মজার ছিল তার বিন্দু মাত্রও আমার পক্ষে ফুটিয়ে তোলা সম্ভব না তাই এখন আর সেই চেষ্টা করি না তবে কেউ লিখলে মজা করে পড়ি। তোমার গল্প বলার স্টাইলটা সুন্দর তাই আর বেশী বেশী কলেজের গল্প টল্প লিখ :clap:


    মানুষ তার স্বপ্নের সমান বড়

    জবাব দিন
  8. নাজমুল (০২-০৮)

    সাবাস অর্পিয়া :clap: :clap:
    বইমেলায় নাকি তোর বই বের হবে 😛
    আমাদের প্রথ দিন প্রথম মিলে ডিম ছিল ডিম কাটতে গিয়ে জামা কাপড় সব ঝোলে ভরাই ফেললাম 🙁
    অর্পিয়া লিখতে থাক আমরা আছি B-)

    জবাব দিন
  9. মো. তারিক মাহমুদ (২০০১-০৭)

    ডেস্কে মাথা রেখে ঘুমাতে বড়ই মন টানছে ... ....

    কেউ আমাকে একটি ডেস্ক এনে দাও, আমি তোমাদের একটি শৈল্পিক ঘুম উপহার দেব ... ...

    কমেন্ট কৃতজ্ঞতা : নেপোলিয়ান

    জবাব দিন
  10. সাব্বির (৯৫-০১)

    প্রেপ টাইমে ডেস্কে ঘুমায় নাই এমন ক্যাডেট খুজেঁ পাওয়া যাবে না।
    একেক জনের ঘুমের যে বাহার ছিল =)) =))
    অরপিয়া সাবাস!!!!
    তোমার প্রথম লেখাই হিট করছে :thumbup:

    জবাব দিন
  11. রকিব (০১-০৭)

    আপু চ্রম লিখছো; বহুতক্ষন যাবৎ হেসেই যাচ্ছি; আর আমার ছোট ভাই আমার দিকে বিচিত্র দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। :boss:


    আমি তবু বলি:
    এখনো যে কটা দিন বেঁচে আছি সূর্যে সূর্যে চলি ..

    জবাব দিন
  12. কাইয়ূম (১৯৯২-১৯৯৮)

    লেখা মজার হইসে :clap:
    সেভেন এইটে থাকার সময় একটা ব্যাপারে তোমাদের সাথে বেশ মিল ছিলো আমাদের, এমজিসিসির আপুরা যখন এক্সকার্সানে এফসিসি'তে আসতেন তখন সিনিয়র ব্যাচের ভাইদের সাথে গলা মিলিয়ে বুইঝা না বুইঝা আমরাও বলতাম We Love MGCC 😀 😀

    নিয়মিত লিখতে থাকো আপু।


    সংসারে প্রবল বৈরাগ্য!

    জবাব দিন
  13. আশহাব (২০০২-০৮)
    বিনি এমনিতেই ভীতু মার্কা।সেঁজুতি ঘুমায় পড়লে রুমে একা একা খুব ভয় পাইতো।একদিন রাত বারটার দিকে দৌড়াইতে দৌড়াইতে আমাদের ডর্মে হাজির।কিছুতেই রুমে যাবে না।সেঁজুতিকে নাকি জ্বীন ধরছে।শেষ পর্যন্ত জানা গেল বেচারা সেঁজুতি ঘুমের মধ্যে একটু কথা বলতেছিল আগুন বালতি।তাতেই বিনি কাইত।

    :khekz: :khekz: :khekz:

    একবার আমাদের কয়েকজন ক্লাসমেট বিলওয়াল জারদারিকে নিয়ে ডিসকাস করতেছিল।তখন ঘটনাস্থলে আমার এক বুদ্ধিমান ক্লাসমেট এর প্রবেশ।সে কিছুক্ষন শুনে টুনে বললো বিলওয়াল?কোনটা রে?কোন ক্যাডেট কলেজ

    :pira: :pira: :pira:

    আমাদের কলেজ ডাইনিং হলের সামনে লেখা “We Love MGCC”.সেভেনে ডাইনিং এর সামনে ফল-ইন করতাম আর মনে মনে ভাবতাম “We Hate MGCC”.কিন্তু এখন আমি জানি “We Really Love MGCC ”.

    :thumbup: :hatsoff: :hatsoff:

    জবাব দিন
  14. আমিন (১৯৯৬-২০০২)

    লেখা ভাল্লাগছে। অনেক দেরিতে আসছি দেখা যায়। অনেকেই দেখি অনেক কমেন্ট কইরা ফেলছে। আমার জন্য তো কওয়ার কিছু লাগলো না।
    আমার নিজের ভালো লাগে কলেজের স্মতিচারণ মূলক লেখা।
    চলতে থাকুক এমন লেখা।

    জবাব দিন
  15. অবশেষে একজন শক্তিশালী পাঠিকা এবং কমেন্টকারী তার ব্লগ লিখলো...
    খুব্বি সুন্দর হইছে... লেখাটা। স্টাইল দেখে বুঝার উপায় নাই যে এইটা প্রথম ব্লগ। স্বাগতম আমার পক্ষ থেকে 🙂

    এরকম সুন্দর সুন্দর লেখা দিয়ে আমাদের একটু একটু করে স্মৃতিকাতর করে দিবা, হুমম?

    জবাব দিন
  16. রাফি (২০০২-২০০৮)

    আরে সাহসে কুলায় না
    :(( :(( :((
    কমেন্ট ই ত করা শুরু করসি সেইদিন হইল
    লেখা দেইখা আমিও মানসিক কষ্টে আসি
    যাক পরীক্ষার পরে আমিও নামাইয়া দিব
    :bash: :bash: :bash: :bash:
    তবে ৫ বছর রাখাল স্যারের হাউজে থেকে তাকে নিয়া লেখা না দেয়াটা একটা crime


    R@fee

    জবাব দিন
  17. আছিব (২০০০-২০০৬)

    :-B আচ্ছা,আমি এবার একটা কাহিনী বলি,ঘুমের............
    আমাদের নাজমুল অত্যন্ত গেরিলা ঘুমবাজ ছিল, ;)) মানে হল সে যে ঘুমাচ্ছে না ঢুলে ঢুলে পড়ছে :-B ,সেটা বুঝা কস্টকর ছিল :ahem: ।দুই হাতের মাঝখানে ছোট্ট মাথাটা আটকে রেখে চরম শান্তিতে ঘুমাত সে,মাথাটা হাত থেকে স্লিপ খেতে খেতেও খেত না। :dreamy:
    তো একদিন একই প্রসিডিউর ফলো করছিল সে, 😕 প্রেপ গাইডের পাশের ডেস্কে বসে 🙁 ।ভাইও কিছুই টের পাননাই।হঠাৎ টাস করে নাজমুলের নারকেল টাইপ মাথাটা দুই হাতের স্থির ঘর্ষণ অতিক্রম করে গতি প্রাপ্ত হল এবং সজোরে অভিকর্ষের প্রভাবে বেঞ্চে বাড়ি খেল :khekz: ।নীরব ক্লাসরুমে এরকম শব্দে সবাই হতভম্ব হয়ে তাকাল এবং নাজমুলের কপালে একটা বড়োসড়ো আলু আবিস্কার করল :)) ।গাইড ভাই বলল,''নাজমুল,ঘুম হইছে?কপালে যে আলু চাষ করছ টের পাইছ?"" :grr:

    নাজমুল আর কখনোই ওই প্রসিডীউর ফলো করেনাই..... :guitar:

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।