স্মৃতি তুমি বেদনা

ক্লাস এইট থেকে নাইনে উঠবো…তখন ভূগোল বলে মহা বিরক্তিকর একটা সাবজেক্ট ছিলো এবং সবচেয়ে মেজাজী এবং মুডি এবং ভয়ংকর ম্যাডাম-রাও ছিলেন ভূগোলের টিচার। যাই হোক , তখন নিয়ম ছিল টার্ম এন্ড এর ছুটিতে যাবার আগে ফর্মলিডাররা সব টিচারদের কাছে যেয়ে যেয়ে ছুটির বাড়ির কাজ যোগাড় করবে এবং ছুটির মধ্যে সেইগুলা শেষ করে আনতে হবে। এমনেই ছুটি মাত্র কয়েকদিনের তারপরে আবার কবে বাসায় রেজাল্ট যায় তার চিন্তা, এর মধ্যে আবার গোদের ওপর বিষফোঁড়া বা বোঝার ওপর শাকের আঁটির মত এইসব বাড়ির কাজ…অসহ্য! দুর্ভাগ্যক্রমে যদি আঁতেল টাইপের কোনো ফর্মলিডার কপালে থাকে তাহলে তো কথাই নাই…

যাই হোক, তো ঠিক ছুটির আগে আগে আমাদের ফর্মলিডার ৬৮৯ সিক হয়ে সিএমএইচ-এ ভর্তি হয়ে গেলো, তো যেহেতু ও নাই তাই এসিস্ট্যান্ট
ফর্মলিডার ৬৯১ মহানন্দে কোনো ছুটির কাজ না নিয়েই চলে গেলো। ওমা, পরের টার্মে এসে শুনি A ফর্মের লিডার মাতাব্বরি করে বিশাল ভূগোল বাড়ির কাজ নিয়ে গেছিলো…ছয় মহাদেশের ছয়টা রাজনৈতির আর ছয়টা প্রাকৃতিক ম্যাপ এঁকে আনতে হবে। আমাদের তো সবার মাথায় বাজ মোটামুটি।

আগের দিন A ফর্মের ওপর দিয়ে ঝড়/সাইক্লোন/ঘূর্নিঝড়/টর্নেডো/সুনামি সব বয়ে গেলো। পরের দিন আমাদের ক্লাসে সবাই আতংকে কাঠ হয়ে বসে আছি…কি হয় কি হয়। ভূগোল ম্যাডাম আবার নিত্য-নতুন শাস্তি’র আবিষ্কারক হিসাবে বিশেষভাবে পরিচিত। তো ক্লাসে ম্যাডাম আসলেন ও যথারীতি জিজ্ঞাসাবাদ শুরু হলোঃ

ম্যাডামঃ ফর্মলিডার, তোমাদের বাড়ির কাজ কই?
ফর্মলিডারঃ (মাথা নিচু করে), কেউ আনে নাই ম্যাডাম
ম্যাডামঃ কেনো?
ফর্মলিডারঃ আমরা জানতাম না
ম্যাডামঃ কেনো?
ফর্মলিডারঃ আমি তো ম্যাডাম তখন ফর্মলিডার ছিলাম না।
ম্যাডামঃ কে ছিলো?
ফর্মলিডারঃ ও তো সিক ম্যাডাম হাস্পাতালে ভর্তি।
ম্যাডামঃ তো তুমি কেনো তোমার দায়িত্ব পালন করনি? তুমি তোমার সব ক্লাসমেটদের সাথে অন্যায় করেছ, তাদের ছুটিতে না পড়ার কারন তোমার দায়িত্বহীনতা। যাও, ব্ল্যাক বোর্ডের সামনে গিয়ে কানে ধরে উঠ-বস করো আর বলতে থাকো, ‘আমি তোমাদের প্রতি ভুল করেছি। আমি অন্যায় করেছি।

বেচারা ৬৯১ , সে যথারীতি তাই করতে লাগলো। এদিকে আমার পেলো বেদম হাসি, কিছুতেই হাসি আটকাতে পারি না। এদিকে আমি জানি যে যদি হাসিটা লিক হয়ে যায় , আজকে আমার কেয়ামত। এমনিতেই ফাঁকিবাজ/চঞ্চল/দুষ্ট/প্রেপে ঘুমানো ইত্যাদি কারনে ম্যাডাম আমাকে দুই চোখে দেখতে পারেন না। কিন্তু কি করবো, ভাগ্য আমার আজকে বিপক্ষে। হাসি চাপার চেষ্টা যতই করি , হাসি ততই আসে। এবং এক পর্যায়ে বিদঘুটে এক আওয়াজ করে হেসে ফেললাম। ম্যাডাম তো ‘কে হাসে? কে হাসে?’ বলতে বলতে আমার সামনে এসে , ‘রহিমা, দাঁড়াও, তুমি হাসলে কেনো? খুব মজা লাগচে, না? দাঁড়াও তোমাকে মজা টের পাওয়াচ্চি। যাও , সামনে যাও। ৬৯১ এর পাশে দাঁড়াও , কান ধরে ওঠ-বস করো আর বলতে থাকো, “আমি হেসে ভুল করেছি, আমি অন্যায় করেছি”
তো আমি তাই করতে লাগলাম, ঘন্টা পড়ার পরেও ম্যাডাম থামতে বলেন না। নেক্সট ক্লাসের স্যার এসে দেখলেন, আমরা অপমানের চুড়ান্ত
হলাম…তারপরে শেষ হলো আমাদের অভিনব শাস্তি। জীবনেও ভুলবোনা বাব্ববাহ!

আমাদের সম সাময়িক যুগে যারা ছিলেন কলেজে, সবারি জীবনের উল্লেখযোগ্য স্মৃতি’র সাথে কোন না কোনভাবে ভুগোল ম্যাডাম-রা ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে আছেন। ssc’র ভুগোল পরীক্ষা শেষে ভুগোলের একটা গাইড বই কুচিকুচি করে ছিঁড়ে ফেলেছিলাম, পাঠ্যবইটা টাচ করিনাই কারন ওইগুলা তো গুনে গুনে জমা দিতে হবে। জীবনে আর কোনদিন এই সাবজেক্টের ধারে কাছেও যাই নাই।

৩,৩৯৯ বার দেখা হয়েছে

৪২ টি মন্তব্য : “স্মৃতি তুমি বেদনা”

  1. আহমদ (৮৮-৯৪)
    পাঠ্যবইটা টাচ করিনাই কারন ওইগুলা তো গুনে গুনে জমা দিতে হবে

    বাস্তবতা বড়ই নির্মম, কি বল?

    ভূগোলের ম্যাডামরা কি সবাই একই রকম নাকি? আমাদের সময় যিনি ছিলেন, তিনি ছিলেন আমাদেরই একজনের ফুপু, তারপরেও রক্ষা ছিল না। আমরা উনাকে যথেষ্ট ভয় পেতাম।


    চ্যারিটি বিগিনস এট হোম

    জবাব দিন
  2. সাবিহা জিতু (১৯৯৩-১৯৯৯)

    আপা, রকি পর্বত মালা আপনাকে কিন্তু বিশেষ ভাবে ভালোবাসতেন। জানেন কি ম্যাডাম এখন ক্যান্সারে আক্রান্ত? এখন অবশ্য ভাল আছেন। আপনার লেখাটি পরে "রকি" আর "ভসু" 'র কাহিনীগুলো মনে পরে গেল (ভসু = ভয়ংকর সুন্দরি নিক দিয়েছিলাম, কিন্তু এই নামের পেছনে শানে নজুলটা এখন আর মনে নাই)। ভসু'র নামের আগে ডঃ না লাগালে সে খুবি ক্ষেপে জেতেন...যদিও পরে জেনেছি উনি নাকি ইংরেজী তে ডক্টরেত করেছিলেন ;))


    You cannot hangout with negative people and expect a positive life.

    জবাব দিন
    • মাসরুফ (১৯৯৭-২০০৩)

      আপু রকিমুন্নেসা ম্যাডামকে আমার একজন অসাধারণ মানুষ বলে মনে হয়।উনার ক্যান্সার জয়ের খবর পাবার পর কথা হয়েছিল উনার সাথে-আমাকে শেষ দেখেছিলেন সেই ১৯৯৯ সালে,তার পরেও চিনে ফেলতে এক মুহূর্ত সময় লাগেনি।আমাদের আগের ব্যাচে সমাজবিজ্ঞানে খারাপ করায় অথর্ব অথরিটি যখন নাকে তেল দিয়ে ঘুমুচ্ছে,এই মহীয়সী নারী নিজ উদ্যেগে খুঁজে বের করেছিলেন যে পরীক্ষক ভদ্রলোক নিজে খাতা না দেখে স্ত্রী-কে দিয়ে দেখিয়েছিলেন।এটা নিয়ে যশোর বোর্ডে তোলপাড় হয়েছিল সেবার-যার ফলে পরবর্তী ব্যাচ অর্থাৎ আমাদের খাতা পড়েছিল যোগ্য শিক্ষকের হাতে।"আমার ছাত্র খারাপ করবে কেন?ওদেরকে কি আমি কম শিখিয়েছি নাকি"-এই অহংকার এবং তীব্র বিশ্বাসের ফলেই ম্যাডাম একক প্রচেষ্টায় এ কাজটি করেছিলেন।সামনাসামনি আমাদের সাথে অত্যন্ত কড়া হলেও ওনার ভেতরে যে আশ্চর্য কোমল একটা মাতৃসুলভ মন রয়েছে(যা গোপন করতে চেষ্টার কোন ত্রুটি তিনি রাখতেন না!) এটা পরে আর আমাদের কাছে গোপন থাকেনি।

      আপু মায়ের কাছে মাসীর গল্প করে ফেললাম,নিজ গুণে ক্ষমা করে দেবেন।

      জবাব দিন
      • রহিমা আফরোজা নূপুর (৯১-৯৭)

        নারে ভাইয়া, মা'র কাছে মাসীর গল্প আবার কি? ম্যাডাম তো আমাদের অনেক আদর করতেন। আমাদের হাউসের স্পোর্টস এর দায়িত্বে ছিলেন ম্যাডাম। কি যে দায়িত্ববোধ নিয়ে কাজটা করতেন তিনি! কিন্তু আদরগুলা সব ছিল 'ফল্গুধারা' টাইপের।ছোট বেলায় তো সেটা বুঝতাম না, একটু বড় হবার পরে সেটা বুঝতে সময় লাগেনি।

        জবাব দিন
  3. নাজমুল (০২-০৮)

    আমরা ভুগোলে প্রথমে পেয়েছিলাম শামীম স্যার কে(খুব রাগী 🙁 ) এবং রাশেদ স্যার 😀 ।
    পরে ওনারা দুজনে চলে যান এস সি সি তে এবং আসে এফ সি সি থেকে অখিল কুন্ডু স্যার আর ছোট দেলোয়ার স্যার। ছোট দেলোয়ার স্যার চলে যাওয়ার পর আসে বড় দেলোয়ার স্যার 😀 ((খুব ই ভালো মানুষ, আমার পাওয়া শ্রেষ্ঠ হাউজ মাষ্টার) তার পর দেলোয়ার স্যার চলে গেল কিন্তু আর ভুগোলের কেউ আসলোনা 🙂

    আপু লেখাটা পড়ে মজা পেলাম 🙂

    জবাব দিন
  4. ইফতেখার (৯৫-০১)

    অবশ্যই ভুগোল ম্যডাম আমাদের জীবনে ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে আছে 😉 😉 আমাদের সময়ে মির্জাপুর আর তার পরে কুমিল্লায় পোস্টিং ভূগোলের ম্যাডামকে কে ভুলতে পারে? 😉

    জবাব দিন
  5. আমীন (০১-০৭)

    আমাদের ভুগোল স্যার খুব ভাল ছিলেন।মা্নচিত্র ঠিক তো পুরো নম্বর,বাকি কিছু না লিখলেও।আর হাজার জিনিস লিখে যদি মা্নচিত্র খারাপ হত তাইলে ভুগলে গোল একটা শূন্য ছাড়া কিছু কপালে ছিল না।তাই সবাই আমরা 12B পেন্সিল দিয়ে মানচিত্র আকতাম যাতে করে স্যারের নজরে পড়ে। =)) =))
    শোনা কথা,উনি নাকি কোন এক ক্যাডেটের কান টেনে ছিড়ে ফেলেছিলেন। x-( x-(

    জবাব দিন
  6. আহসান আকাশ (৯৬-০২)

    আমরা এক ভূগোল ম্যাডামকে পেয়েছিলাম... আমাদের সাথে ওনার আচরন বেশ বন্ধুত্ত পূর্ণ ছিল। এক ছুটি থেকে এসে দেখি ওনার পোস্টিং হয়ে গিয়েছে সিলেটে। ক্যাম্পাস পার্টির কাছ থেকে জানতে পারি ভালবাসায় ব্যর্থ হয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিলেন, যার কারনে জরুরি ভিত্তিতে তাকে বদলী করা হয়।


    আমি বাংলায় মাতি উল্লাসে, করি বাংলায় হাহাকার
    আমি সব দেখে শুনে, ক্ষেপে গিয়ে করি বাংলায় চিৎকার ৷

    জবাব দিন
  7. আহমেদ (২০০০-২০০৬)
    উনার সাথে-আমাকে শেষ দেখেছিলেন সেই ১৯৯৯ সালে,তার পরেও চিনে ফেলতে এক মুহূর্ত সময় লাগেনি।

    মাসরুফ ভাই
    ম্যাডাম তো ২০০১ এ কলেজ ছাড়লেন! আমাদের 'এ' ফর্ম এর ফর্ম মাস্টার ছিলেন। কিন্তু আসলেও, বাইরে কড়া হলেও উনি ভালো মানুষ ছিলেন ।
    আল্লাহর রহমতে উনার শরীর এখন কিছুটা ভালো, এটা শুনেছিলাম ১০ মাস আগে।
    আসুন সবাই উনার জন্য দোয়া করি। (সম্পাদিত)

    জবাব দিন
  8. মইনুল (১৯৯২-১৯৯৮)

    আমাদের একজন একবার কেয়ামত পর্যন্ত কান ধরে উঠবস করার শাস্তি পেয়ে ২ মিনিট পরে বসা থেকে উঠতে গিয়ে পড়ে গিয়ে খিচুনী শুরু করে দেয়। তারপরে স্যারের নির্দেশে আমরা কয়েক মিলে তাকে হাসপাতালের দিকে নিয়ে যাবার সময়, একাডেমি ব্লক চোখের আড়াল হবার সাথে সাথেই নিজে নিজে উঠে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করলো, -- দোস্ত, খিচুনীর কথা বললে কি মমতাজ ভাই সিভিট দিবে???

    জবাব দিন
  9. ফরিদ (৯৫-০১)

    আর্টস পার্টি হবার সুবাদে ৬ বছরই ভূগোল আমার পিছু ছাড়ে নি। যে সকল স্যার ও একমাত্র ম্যাডামকে পেয়েছি তারা হলেন -
    ১। নূরুল হোসেন স্যার
    ২। ওহিদুর রহমান স্যার
    ৩। মকবুল হোসেন স্যার
    ৪। রাশেদ স্যার
    ৫। ফারহানা পারভীন ম্যাডাম
    ৬। ইকবাল হাসান তালুকদার স্যার
    এই ছয়জন কে নিয়া বেশ বড়সড় একটা ব্লগ লিখে ফেলা যাবে বলে মনে হয়। আশা করছি অচিরেই ব্লগটা নামিয়ে দিব। 🙂

    জবাব দিন
  10. নূপুর কান্তি দাশ (৮৪-৯০)

    হ্যালো নূপুর!
    অনেক দিন পর লিখছি। ওহিও তে এসে অব্দি নানান ব্যস্ততায় সময় চলে গেলো অনেকটা। আমি এসেছি cleveland clinic এ postdoctoral fellow হিসেবে। আর তোমার কলেজের সিনিয়র যিনি টেক্সাসে রয়েছেন, উনার নাম হচ্ছে সুদীপা। ফোন: ২৮১২২২৭০৩১।
    আমি বলেছি তোমার কথা। আবার বলবো কথা হলে।
    আমার ফোন: ২১৬৯০৫২৮৭৫। সুযোগ পেলে ফোন কোরো।
    ভালো লাগবে।
    ভালো থেকো।

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।