বি এম এ…প্রথম রাত…আর কিছু কথা…

আমি বি এম এ তে জয়েন করি ২০০৭ এর ১০ জানুয়ারি। যদিও বাবা আর্মি তে ছিল তবু আমার আর্মি তে আসার তেমন ইচ্ছা ছিল না।ক্যাডেট কলেজে ৬ বছর থাকার পর খুব ইচ্ছা ছিল বাইরের জীবন টা দেখব(উল্লেখ্য ক্যাডেট কলেজের ১ টা দিন নিও আমার ১ বিন্দু আফসোস নাই…আমার জীবনের বেস্ট সময় কলেজের প্রতিটি দিন)। কিন্তু রিযিক নাকি আল্লাহ আগেই ঠিক করে রাখেন। যা হোক আমার জান্নাতবাসী মা এর খুব ইছা ছিল ছেলে ক্যাডেট কলেজে পরে আর্মি তে যাবে…অবশেষে ২০০৭ এর ১০ জানুয়ারি বিকেল ৩ টার সময় চট্টগ্রাম রেল স্টেশনে আমার বাবা আমাকে রেখে গেলেন…সবাই হও তো ভাবছেন বার বার আমি ২০০৭ এর ১০ তারিখের কথা আলাদা করে বলছি কেন? আসলেই তেমন কোন কারন নেই…বাংলাদেশের আর্মি…এমন কিছু না…তারপর ও আমি সহ আমার কোর্সমেট ১১৩ জন কোনও দিন ২০০৭ এর ১০ জানুয়ারি ভুলবে না…কারন???? কারন টা একটু ভিন্ন… 😉 আমরা সাধারণত সেই সব দিনের কথা মনে রাখি যা কখোন ভুলবার নয়। কিন্তু আমাদের কারন টা একটু ভিন্ন। আমি ওই দিন টার কথা কখনো ভুলবো না………।

কারন…

কারন আমি হাজার চেষ্টা করলেও ঠিক ভাবে মনে করতে পারিনা ওই দিন এর কথা।

আমার এই লেখা এতুটূকু যারা পরেছেন তারা বোঁধ করি ভাবছেন এই পাগল এই সব কি লিখে……?
খুব খারাপ না লাগলে বাকি টা যদি পরেন তাহলে বুঝবেন কারন টা কি…কিন্তু উপলব্ধি…উহু…করতে পারবেন না…এবার ভেঙ্গে বলি।

রেলস্টেশনে নামার পর দেখি আমার কলেজের মিরাজ,সাদিক,জামান আগেই চলে এসেছে। আরও ছিল fcc এর উদ্ভাস,জুনাইয়েদ,আমিন, ccc এর ইব্রাহিম,মীর, scc এর রেজাউর, শাহাদাত, হোসাইন,আব্দুল্লাহ pcc এর সাকিব, আল মামুন, rcc এর আশিক,তাওহিদ্‌…ccr এর নিহাব,রিফাত,নুরুজ্জামান,খাদেম..mcc এর সালাউদ্দিন…সহ আনেকেই…যেন ছোটো মতন ক্যাডেট কলেজ গেট টুগেদার। সবাই কে দেখেই মন টা ভাল হয়ে গেল…একটু পরে যে জাহান্নাম নামবে কিসের কি…মনে হচ্ছে যেন সবাই মিলে পিকনিক করতে যাচ্ছি।

তখন বিকাল ৪ টা বাজে।আমাদের রিসিভ করতে বে এম এ থেকে বাস নিয়ে ১ জন স্টাফ আসলেন। এসেই সবাই কে বললেন গম্ভির কন্ঠে……”জলদি গাড়িতে উঠেন”। ক্যাডেট কলেজের পোলাপান নাকি স্টাফের কথা শুনবে…। হি হি হি… :)) স্টাফের ঘাম ঝরতেসে…আর আমরা নিজের মত বাবা মা এর কাছ থেকে বিদায় নিয়া আসতেছি আর কি…ও দিকে যারা সিভিল পোলাপান থুক্কু…সিভিল বালকেরা (Not from cadet college) বাসে উঠে সুন্দর করে স্টাফ কে সালাম দিয়া বলে স্টাফ কোথায় বসবো ? বুঝতেই পারতেছেন আমাদের দেখে স্টাফ কি করতেসে। অবশেষে যখন বাসে উঠলাম……ঠিক যেন কলেজ পিকনিক!! ইচ্ছা মত চিৎকার চেঁচামেচি…কে শুনে কার কথা। স্টাফ একটু পরপর হুংকার দিচ্ছে। “সাহেব… ডিসিপ্লিন সহকারে বসেন…” ডিসিপ্লিন!!!!!!!!! এইডা আবার কি?? 😮 এক ফাকে খেয়াল করলাম স্টাফের চোখে মুখে একটা হায়েনার হাসি। বলতেছেন ” চলেন বি এম এ তে…তারপর আপনাদের দেখতেছি।” ততক্ষনে বি এম এর খুব কাছে চলে এসেছি…এই বার সবাই আস্তে আস্তে চুপ হয়ে গেল।

কেন জানি জীবনে প্রথম বার মনে এক অজানা ভয় চেপে বসল। একদিকে স্টাফ এর হায়না হাসি…নিশ্চুপ আমরা…সবাই সবার দিকে কেন জানি তাকাচ্ছি। হঠাৎ দেখি বাস বি এম এর গেট এর ভিতরে।তখন বাজে ৫ টার মত। বাসে তখন পিনপতন নীরবতা। নিজের বুকের শব্দ শুনা যায়…কথাটা বই এ পরেছি…জীবনে প্রথম টের পেলাম।
বাস থেকে নেমেই সজাগ চাহনি…যদি কোন কলেজ ভাই এর দেখা মিলে…কয়েক জন কে দেখলাম…..কিন্তু হঠাৎ দেখি আমাদের রিসিভ করতে আসা সিনিওর স্যার দের SHOUT….GET DOWN IDIOT…GET ON THE LINE…I SAID DOOOOOO IT….WHY ARE YOU LOOKING AT MY EYES….WHYYYYYYYYYY????…..LOOK DOWN….LOOOOOK DOWN I SAY…..YES YOU COME HERE…..BUMPS BECAME HAVIOUR IDIOT…MOVE FAST..FASTERRRR..FASTERRRRR…..সিনিওর রা সবার প্রথম আদেশ দিল “whenever you see even a shadow of any senior musttttt shout and say assalamualyqum sir..now shout it for thousand times….more loudly moreeeeeeeeee moreeeeeeeeeeeeeeee…” কেন দিব ?………… কাকে দিব ?……………….. কিছুই জানি না…..সালাম দিলে আল্লাহ এর শান্তি বর্ষন হওয়ার কথা।
কিন্তু আমরা যেভাবে পাগলের মত চিৎকার করে সালাম দিচ্ছিলাম, আল্লাহই জানে কি বর্ষন হচ্ছিল। খেলা তো কেবল শুরু। এরপর আসলেন স্টাফরা তাদের অদ্ভুত ভাষা নিয়ে, যা কেবল বি এম এর স্টাফরাই বলতে পারে।

“সাহেব….বি এম এর মাটিতে হাটতেছেন…সাহেব!!!! টানটা মাইরা কলিজা বাইর কইরা ফালাবো…গলা দিয়া আওয়াজ বাইর হয় না!!!!!!!!!!!!!!!! সাহেব!!!!!!!!! ছিঁরা ফালাব…খাইয়া ফালাব…”

আরেক জন স্টাফ বলে…”সাহেব!!!!!!!!!! নতুন ক্যাডেটের কচি কলিজা আমার খুব পচ্ছন্দের।লবন ছাড়া কাঁচা খাইয়া ফালাব…..জোরে চিল্লান…আরও জোরে…”

পাঠক এরপর আমার আর কিচ্ছু মনে নাই……সব ভাসা ভাসা…কারন তখন শুরু হল… :tuski: :tuski: :gulli2: :gulli2: ……আর আমরা =(( আল্লাহ এ কই আইলাম!!!!!!!!!!! এ কোন দুনিয়া…???? ~x(

অবস্থাটা বুঝেন…একদিকে একসাথে সিনিওর আর স্টাফ এর shout!!!!!!! অন্যদিকে স্টাফদের পাগলামি। যেখানে কলেজে ৩০০ ক্যাডেটের জন্য ৪ জন স্টাফ…আর বি এম এ তে দেখি চারিদিকে খালি স্টাফ আর স্টাফ…এক দিকে কোনো কিছু না বুঝে কাকে সালাম দিচ্ছি না দেখে আল্লাহ এর নামে চিৎকার করে যাচ্ছি…অন্যদিকে সিনিওর দের পাঙ্গা touch that tree….touch that building….frontroll..sideroll..ok you will not make it fast….sit down sit downnnnn…now jumpp jumpppp idiot….yes why you are not shouting….shoutttttt…more loudly….এক জন সিভিল ছেলে স্টাফ কে বললো স্টাফ পায়ে ব্যাথা…আর স্টাফ বলে…” আরেকটা পা নিয়া আসেন নাই কেন বাসা থেকে…কেন??????????…জানেন না বি এম এ তে extra পা লাগে…।”

পাঠক আমি কেবল ভাসা ভাসা স্মৃতি থেকে লিখে যাচ্ছি… কিন্তু মোটেও এতো সাজানো ছিল না…মনে হচ্ছিল যেন একটা roller coaster ride….সব কিছু খালি ঘটে যাচ্ছিল…কেমনে?????????? কখন?????? কে????????? কারা????????? কিছুই মনে পরে না……আসলে মাথা কে তো এতটুকু হলেও সময় দিতে হবে যাতে স্মৃতি তে রাখা যায়……brain সেই সময় পাচ্ছে কোথায়????????? একে তো অদ্ভুত সব অভিজ্ঞতা…আর সেই সাথে গলা ভাঙ্গা চিৎকার…আর একের পর এক পাঙ্গা…সেই সাথে কাঁদার মধ্যে গড়াগড়ি..নতুন জামা চেনা যাচ্ছেনা।এসব চলতে চলতে এক ফাঁকে আমাদের official document পূরন আর ছবি তোলা হল। তারপর মনে পরে রাত হয়ে এসেছে। আমরা চুল কাটতে গেলাম…মানে punishment দিতে দিতে নিয়া গেল আর কি… সেই সাথে শিখলাম…1st term cadet never run…they flyyyyy….and always shout assalamualyqum sir…alwaysssssssss….চুল কাটার পর আল্লাহ এর কসম নিজে কে নিজে চিনি না…ঠিক যেন সোমালিয়ান নিগ্রো।মাথায় চুল বলতে কিছুই নাই…দেখে মনে হয়…বেল মাথা তে নতুন চুল উঠসে।এরপর…………………………………হ্যা … এরপর রুমে নিয়া গেল আর সিনিওর বোল্লেন 5 min time….take bath..change your dress..those who will make late….they will not take dinner…..আল্লাহ!!!!!!!!!!!! এ কি বলে!!!!!!!!!…সারা গায় কাঁদা…এর মাঝে চুল কাটলাম…আর কিনা ৫ মিনিট…কিন্তু খিদা কাকে বলে কত প্রকার আর কি কি…সেদিন আমার শিখা হয়ে গেসে। সবারি এক অবস্থা…তাই ৫ মিনিট এ সবাই হাজির…অবশেষে খেতে পাব…আলহামদুল্লিলাহ!!!!!!!!!!!…নিয়তি কিন্তু তখন মনে মনে হাসছে…কারন????????? খেতে বসা মাত্র সিনিওর বল্লেন never make sound, never look out side of your table…..take rice….stop!!!! only 1 spoon….okkkkkkk take curry…take pulse….ok now don’t dare to make any sound…..time starts nowwwwww!!!! আমরা তো চামুচ দিয়া খেতে পারি কিন্তু সিভিল পোলাপানরা শুরু করল নাটক….কেবল ২ চামুচ মুখে দিলাম…..গিলতেও পারি নাই…হঠাৎ শুনি…stopp!!! drop your spoon…yes………why did you make sound????????? why???????????????? everybody get up….getttttttttttt……. upppppppppp….time for you 5 min…put on games dress…..and make fall in on the ground…. আর্মি এর আরেক নিয়ম ১ জন এর জন্য সবাই পাঙ্গা খায়…উফফফফফফফফ!!!!!!!! =(( ২ মিনিট সময়…তাও যদি খেতে পারতাম আল্লাহ।

এই বার আরেকটু চিন্তা করেন…জানুয়ারি এর ঠান্ডার মাঝে শুধু হাফ প্যান্ট আর হাফ শার্ট পরে আমরা……রাত মনে হয়ে তখন ১১ টা………
তারপর………………………… :no:

কনকনে ঠান্ডা…এর মাঝে শিশির এর উপর sideroll,frontroll…..touch and back…..কাঁধের উপর ৭০ কেজি ওজনের লগ…মাঠের কাঁদার মাঝে গড়াগড়ি..তারপর? বলবো?? ওই অবস্থায় ড্রেনে নামা……উফফফফ!!!!…এরপর আর জানি না…মাঝে মনে পরে কলেজের পরিচিত সিনিয়র দেখা করে গেলেন …..সান্ত্বনা দিয়া গেলেন…

এরকম ভাবে কাটলো প্রায় সারা রাত …এরপর কোন অনুভূতি আর কাজ করতেছিল না। সবাই তখন মাঠের মাঝে গায়ে গা লাগায়ে শুয়ে আসি…শুয়ে আসি…একটা দৃশ্য খুব মনে পরে…উপরে কাল আকাশ…নিচে আমরা কজন…তারপর?????????????????????

তারপর……….মনে পড়ে না……সারা শরীর ব্যথা…গলা দিয়া কোন শব্দ বের হয় না…আর আর কি যেন????

ও হ্যা………………হঠাৎ দেখি আলো………..

বুঝলাম সকাল হল……

৩,৭৩৭ বার দেখা হয়েছে

৫৫ টি মন্তব্য : “বি এম এ…প্রথম রাত…আর কিছু কথা…”

  1. সৌমিত্র (৯৮-০৪)

    কিছুই মনে পরে না……আসলে মাথা কে তো এতটুকু হলেও সময় দিতে হবে যাতে স্মৃতি তে রাখা যায়……brain সেই সময় পাচ্ছে কোথায়?????????

    কেন যেন এই লাইনটা বেশ পছন্দ হয়ে গেল... কষ্টের তীব্রতার পুরো বর্ণনা এক বাক্যে ধরা দিয়েছে।

    জবাব দিন
  2. রেজওয়ান (৯৯-০৫)

    একখান কথা কইয়া যাই :grr:
    ১০ জানুয়ারি ২০০৭ এর রিসিপশন এ আমিও ছিলাম :grr:
    ৫৭ এর রগড়া সহজে ভুলার কথা না আবার ওই রাতে কি হইছে তা ঠিকমত মনেও থাকার কথা না............... :grr:

    জবাব দিন
  3. রুম্মান (১৯৯৩-৯৯)

    ভাল লিখছোস বেটা।আমার ও লিখতে মঞ্চায়।


    আমার কি সমস্ত কিছুই হলো ভুল
    ভুল কথা, ভুল সম্মোধন
    ভুল পথ, ভুল বাড়ি, ভুল ঘোরাফেরা
    সারাটা জীবন ভুল চিঠি লেখা হলো শুধু,
    ভুল দরজায় হলো ব্যর্থ করাঘাত
    আমার কেবল হলো সমস্ত জীবন শুধু ভুল বই পড়া ।

    জবাব দিন
  4. মেহেদী হাসান (১৯৯৬-২০০২)

    আমরা ১০ জন একসাথে রাত ১২ টার পর জয়েন করেছিলাম, আমাদের উপর যে গজব নেমেছিল তা পুরা একমাস ধরে চলেছে। এইদিনই আমাদের বলে দেওয়া হয় যে, আমাদেরকে বহিষ্কার করা হচ্ছে। ক্যাম্নে ক্যাম্নে জানি টিকে গেলাম... 😀

    জবাব দিন
  5. শোভন (২০০১-২০০৭)

    জামান ভাই আপনার রেযিমেন্টেশন দিছিল রেজওয়ান ভাই আর আমারটা দিছিলেন আপ্নি.......প্লাটুন জে-১..৬১লং কোস'.......
    স্টাফদের একটা কথা আজ ও মনে পরে...

    সাহেব এমন পাঙ্গা দিবো খালি পাইছেন পাইছেন করবেন

    :frontroll: :frontroll: :frontroll: :frontroll:

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।