আমার দেখা ‘৭১ এর মুক্তি যুদ্ধ।(এগার)

“তেলেপোকা” নিয়ে একটা বিজ্ঞান সাময়িকীতে একবার পড়েছিলাম, এই আজব  প্রাণীটির বিচরণ অন্ধকার জগতে।এরা সর্বভুক।স্বজাতীয় দের নিয়েও মাথা ব্যথা নেই। নিজে বাঁচতে পারলেই হল।সমীক্ষায় প্রমানিত হয়েছে, ‘আনবিক বোমায়’ পৃথিবীর সমস্ত প্রাণীকুল মৃত্যু বরন করলেও, কোন আজব উপায়ে খোলস পরিবর্তনের মাধ্যমে “তেলেপোকা” বেঁচে থাকবে।বর্তমানের প্রেক্ষাপটে অপ্রাসঙ্গিক ভাবে কথাগুলি মনে আসলো, তাই লিখে ফেললাম। ভাবছিলাম এই অধ্যায়ে আমি এই প্রজন্মের পাঠকদের যুদ্ধের খল নায়ক ” দালালদের” ব্যপারে কিণচিৎ আলোকপাত করবো।

মুক্তি যুদ্ধের ঘটনা লিখবো আর ‘দালাল’ দের কথা কিছুই লিখবোনা তাহলে এ লিখাতো অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। “দালাল” শব্দে আসলে কি বুঝায় ? শাব্দিক অর্থে দালাল হল ‘একটি মধ্য স্বত্তাভোগী শ্রেণী ‘ যারা ক্রেতা-বিক্রেতা বা যে কোন দুই পক্ষের মাঝখানে অবস্তান করে এবং সুবিধা ভোগ করে ।

ঐতিহাসিক ভাবে মীর জাফর আলী খাঁর রক্তের ধারায় সৃষ্ট  নাজিমুদ্দিন,ফজলুল কাদের চৌধুরী (বর্তমান সাকা চৌধুরীর বাবা ) , মোনায়েম খাঁ দের দৌড়ত্ত পেরিয়ে একাত্তরে উদয় হয় সেই ‘পুরানো মুখ’ নতুন  মোড়কে!  মোনায়েম খাঁরা  পশ্ছিম পাকিস্তানী নেতাদের তোষামুদি এত শিল্পের পর্যায়ে পৌছে দিয়েছিল যে, বর্তমানের চামচারা “রেফারেন্স” হিসাবে আজ অধ্যায়ন করতে পারবেন। চামচামির হাজার মজার ঘটনার মাঝে সব চেয়ে জনপ্রিয়টা হল ঃ পাকিস্তান প্রেসিডেন্ট ফিল্ড মার্শাল আয়ুব খান পশ্ছিম পাকিস্তান থেকে ‘লং ডিসট্যান্ট’ ফোন করেছেন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর কে। গভর্নর ঃ  Sir sir, just hold on a second sir!  ‘জিন্না টুপিটা’ মাথায় দিয়ে নিই স্যার, তারপর কথা বলি sir!!!

ঘটনার সত্য- মিথ্যা আমার জানা নেই, কিন্তু মানসিকতা এমনটাই ছিল, এব্যপারে গ্যারান্টি দেয়া যায় শতভাগ।

এখানে একটা ব্যাপার উল্ল্যেখযোগ্য যে ‘ পাকিস্তান ও মুসলিম লীগ মতাদর্শে ‘ বিশ্বাসী অনেক বাঙালিই তখন ছিলেন, যারা রাজনৈতিক কারনেই হোক আর ধর্মীয় কারনেই হোক , পাকিস্তানের অখণ্ডতায় বিশ্বাসী ছিলেন। তাদের সবাইকে ঢালাও ভাবে দালাল বললে আমার মতে ‘গণতন্ত্র বা মত প্রকাশের স্বাধীনতায়’ হস্তক্ষেপ করা হবে। ‘দালাল’ শুধু তাদেরই বলা যায়, যারা অবরুদ্ধ নয় মাসে বাঙ্গালীদের জান-মাল ক্ষতি সহ স্বাধীন ঘোষিত একটি দেশে হানাদার একটা মিলিটারি বাহিনীকে সাহায্য সহায়তা প্রদান করেছে ।

যাহোক আমাদের ‘ তেলেপোকা ‘ ভাইদের কথা লিখবো ভাব ছিলাম । বয়সে অনেক ছোট থাকার কারনে ব্যক্তিগত ভাবে এমন বেশি দালালদের সাথে পরিচয় আমার ছিল না।

শুধু দুইজন নিকট আত্মিয় ছাড়া । একজন তার মধ্যে একদম ‘পাতি দালাল’। সম্পর্কে আমার ফুফা। বেচারা কিচ্ছু করেনাই, শুধু ঘোর পাকিস্তান পন্থি ছিল। ওর দোষ ছিল, বাজারে চা এর দোকানে বসে ‘ উজির নাজির’ উদ্ধার করা। মুক্তি বাহিনী কতৃক গ্রামের ব্যাংক-থানা লুট হওয়ায় আবার আর্মি আসা অবশ্যাম্ভাবি ছিল। কিন্তু ওর লম্ফ জম্ফ ‘ এইত আর্মিরে খবর দিছি, এসে পুলাপানের পাছায় বেতের বারি দিয়ে সব ঠিক করে দিবে ‘ এই ধরনের  ফাঁকা উক্তি হর হামেশাই করতেন । কিন্তু ‘পাক আর্মি’ পর্যন্ত  দৌড় তার কখনোই ছিলনা। কিন্তু বেচারা স্বাধীনতার পর ভিটা মাটি সব খুইয়েছে এই অসগলগ্ন কথা বলার অপরাধে ।

আরেকজন বেশ হাই প্রোফাইলের। জানিনা তাকে সংজ্ঞামতে দালাল বলা যাবে কিনা! আমার বড় বোনের শ্বশুর।মুসলিম লীগ – খান এ সবুরের ডান হাত। ‘৭০ এর নির্বাচনের আগ পর্যন্ত পাকিস্তান ন্যাশনাল এ্যসেম্বলির সদস্য ছিলেন সীমান্ত জেলা সাতক্ষিরার। তখন দুই ধরনের MP ছিল ।MNA মেম্বার অব ন্যাশনাল এ্যসেম্বলি এবং  MPA  মেম্বার অব প্রভিঞ্চিয়াল এ্যসেম্বলি  তবে  MNA রা সব থেকে পাওয়ার ফুল ছিলেন, কারন President, Minister দের সাথে তাদের উঠা বসা ছিল।

যুদ্ধের নয় মাসে MNA সাহেবের কা্র্য কলাপ কি ছিল আমার জানা নেই, তবে তার  ছেলেদের নানা মত ও পথের  হদিশ পাওয়া ছিল দুষ্কর। আমার ভগ্নিপতি ওদের বিশাল ব্যবসার ”কনট্রাকটারী ‘ দিকটা দেখতেন , সেই সুবাদে রাজশাহী বিশ্ব বিদ্যালয়ের নির্মাণ দেখা শুনা করতেন এবং ছাত্র জনতার সাথে থাকায়, একই কাতারে স্বাধীনতার স্বপক্ষেই থেকে গেছেন।

কিন্তু ওর বড় ভাই ক্ষমতার আস্বাদন করতে পছন্দ করতেন, ফলশ্রুতিতে পাক আর্মি মেজরের সাথে একই জীপে ভ্রমনের সময় মুক্তি বাহিনীর পেতে রাখা মাইনের আঘাতে ছিন্ন ভিন্ন মেজর সাহেবের এর সাথে শুধু মাত্র একটি বিচ্ছিন্ন পা নিয়ে বহাল তবিয়তে বেঁচে রইলেন তিনি।

শুরুতেই বলছিলাম না ” তেলাপোকাদের বেঁচে থাকার আজব রীতি নীতি “……

(চলবে)

 

 

৮১৭ বার দেখা হয়েছে

৫ টি মন্তব্য : “আমার দেখা ‘৭১ এর মুক্তি যুদ্ধ।(এগার)”

  1. নূপুর কান্তি দাশ (৮৪-৯০)

    আজিজ ভাই,
    আপনার এই স্মৃতিকথা এক্কেবারে ভিন্নস্বাদের। একটু একটু করে পড়ে যাচ্ছি। শুরু করতেই শেষ হয়ে যায় - না বলা কথাগুলোর মধ্যেও কত কথা লুকিয়ে রয়!

    জবাব দিন
    • আজিজুল (১৯৭২-১৯৭৮)

      নুপুর,
      Those are actually 'Tip of an Iceberg' আমার ভালবাসার প্রকাশ ও যেমন সীমিত, ঘৃণা করার সীমাবদ্ধতাও তেমনি।এজন্যে ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে লিখাগুলি মুল্যায়ন করলে বাধিত হবো ।
      মাইনের আঘাতে পা উড়া বেহাই সাহেব কে দেখতে জিবনের প্রথম বার বনানি/গুলশান যাই। স্বাধীনতার মাস দেড়েক আগে। কামাল আতাতু্র্ক রোডের শেষের দিকে কোন এক যায়গায় সরকারি দুইটা হলুদ রঙের কলোনি ছিল (এখন আছে কিনা জানিনা) ওর একটাতে। ওকে লন্ডন পাঠিয়ে দেয়া হচ্ছিল চিকিৎসার জন্যে।
      আমার মনে বনানি/গুলশানের যে স্মৃতি উজ্জ্বল হয়ে আছে, সে হোলঃ মাইল কে মাইল ধু ধু মাঠ।সাদা কাশ বনে সাগরের ঢেউ ! আজকের রত্নগর্ভা বনানি/গুলশান আবাসিক এবং বানিজ্যিক এলাকা। (সম্পাদিত)


      Smile n live, help let others do!

      জবাব দিন
  2. আহসান আকাশ (৯৬-০২)

    মাঝে কিছুদিন নেটে ছিলাম না, ফিরে এসে আপনার নতুন দুটো লেখা পড়লাম। এই তেলাপোকাদেরকেই আমাদের আরো ভাবে চিনে রাখা প্রয়োজন ছিল।


    আমি বাংলায় মাতি উল্লাসে, করি বাংলায় হাহাকার
    আমি সব দেখে শুনে, ক্ষেপে গিয়ে করি বাংলায় চিৎকার ৷

    জবাব দিন
    • আজিজুল (১৯৭২-১৯৭৮)

      এদের এত দিন পরে আর চিনেই বা কি লাভ? আজ যে বিশাল মহীরুহ আমাদের সমাজে দৃঢ় প্রতিষ্ঠিত দেখছি, আমরাই তো এদের কে সে সুযোগ করে দিয়েছি।
      বিশ্বাস করো, উপরে উল্লেখিত মহান নেতা MNA সাহেবকে আমি নিজে "বোরখা" পড়া অবস্তায় পালানো বৌ এর মত চলা ফেরা করতে দেখেছি।'সাধারণ ক্ষমার' সুযোগে আবার সব তেলাপোকারা অন্ধকার জগত থেকে বেড়িয়ে আস্তে আস্তে সামাজে মিশে যায় খোলস পাল্টিয়ে।।


      Smile n live, help let others do!

      জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।