আমার দেখা ‘৭১ এর মুক্তি যুদ্ধ!(তিন)

‘৭১ সালের স্বাধীনতা সংগ্রামের ঘটনা এত ব্যাপক, এতো বিশাল যে চাক্ষুষ সাক্ষী প্রতিটি বাঙ্গালী নিজের অভিজ্ঞতা থেকে লিখলে দশ বিশ খণ্ডের বই হয়ে যাবে। তাই ভাবছি, শুধু সেই সব ঘটনা লিখবো, যেগুলি কিশোর মনে সবচেয়ে বেশী ছাপ ফেলছিল।

কালুরঘাট শাহ সাহেবের বাড়ীতে বেশ আছি। শহরের বাইরে, এদিকের মানুষের ভাবখানা , আমরাতো জিতেই গেছি। ওদের এখন এদেশ থেকে লেজ তূলে পালাতে যতক্ষণ বাকি! কিন্তু এর মধ্যে শুরু হলো ” বিনা মেঘে বজ্রপাত” নয় একেবারে “বোমাপাত”।

কালুরঘাট রেডিও স্টেশনের একতলা ছোট্ট হলুদ বাড়ীটার চার পার্শে মাইলকে মাইল ধু ধু মাঠ, এদিক সেদিক ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে রেডিও এন্টেনার জাল ও মাস্ট। গ্রামের শিশু কিশোরদের ঘুড়ি ওড়ানোর উত্তম জায়গা ।

সেদিন ও আকাশে নানান রঙের ঘুড়ি উড়ছিল । শিশু কিশোর হল্লা করছিল মাঠে । হঠাৎ করে কোথা থেকে উড়ে এলো পাকিস্তান বিমান বাহিনীর দুই তিনটা   F-4  সবোর জেট! কোন রকম ওয়ার্নিং ছাড়াই আচমকা রেডিও স্টেশনের দিকে তাক করে গোঁত্তা দিয়ে বোমা বর্ষণ করতে লাগলো । হিতাহিত জ্ঞান শূন্য হয়ে যে যেদিকে পারলো ছুটে প্রাণ রক্ষা করলো । শুধু রক্ষা পেলোনা সম্পূর্ণ প্রতিরক্ষাহীন  রেডিও স্টেশনটি ! স্তব্ধ হয়ে গেল আমাদের শেষ অনুপ্রেরণার স্থলটি।

শুনেছি পরাস্ত শহর প্রতিরোধের সদস্য ও অন্যান্য দের নিয়ে মেজর জিয়া হাট হাজারী, ফটিকছড়ি হয়ে গহিন বনবাদাড় পেরিয়ে ভারতের সীমানার ওপারে আশ্রয় নিয়েছেন ।

রেডিও স্টেশন আমাদের আশ্রয় স্থল  ‘শাহ সাহেব বাড়ীর’ এক মাইলের মধ্যেই  ছিল, তাই আবার পালাবার সিদ্ধান্ত নিলেন বাবা।

এবারের গন্তব্য লোকালয় ছেড়ে আরো দূর গ্রামের গভীরে ।  হালদা নদীর মদুনাঘাট ব্রিজ পেড়িয়ে, পার্বত্য এলাকা শুরুর অল্প আগে ‘ উড়কির চর ‘ নামক একটি প্রত্যন্ত গ্রামে।

পাক সেনাদের শহর পুনরুদ্ধার যুদ্ধের পুরো উত্তপ্ত সময়টা, এপ্রিল-মের ভয়াবহ দিনগুলি এই গ্রামে নিরাপদেই কেটে গেল। দু বেলা ভাত, সাথে পানির মতো ঝোলে ‘দেখা যায় কি যায় না’ সাইজের এক/আধ টুকরো গরুর মাংস, অমৃতের মতো লাগতো।সাথে জেব্রার মত দাগকাটা একরকম সবজি।পরে নাম জেনেছিলাম চিচিংগা

মাঝে মাঝে ‘ আর্মি আসছে গ্রামে’…এলার্ম আসতো, হয়তো রাঙামাটি মেইন রোড ধরে আর্মি কনভয় যেতো, সেই খবর আসতো ! এতে আমরা কিশোর দল বেশ আনন্দিতই হতাম। কারণ বেশ মজার অভিজ্ঞতা ! গ্রামের মা বোনরা আমাদের সহ সাথে সাথে ‘পাটিপাতা গাছ’, ‘কচুরি পানা’ ভর্তি পচা পুকুরে নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পানিতে দাড়িয়ে থাকতেন । পরে ফলস এলার্ম বুঝে বিরক্ত হয়ে ওরা যে যার কাজে চলে যেতেন । এর পরই শুরু হতো আমাদের পচা কাঁদায় কই- মাগুর মাছ ধরার কসরত।

শহরের আবহাওয়া সম্ভবত কিছুটা স্বাভাবিক হয়ে আসছিল । মে-জুন মাসের গোঁড়ার দিকে পাকিস্তান রেডিও বার বার প্রচার করছিল ” দুষ্কৃতি কারিদের হটিয়ে পূর্ব পাকিস্তানে আবার ‘ হুকুমত’ এর শাসন কায়েম করা গেছে”। জেনারেল টিক্কা খান, রাও ফরমান আলিরা ষাট/ সত্তর ভাগ উর্দু মেশানো বাংলায় একের পর এক ফরমান জারি করছে। সাঁচ্চা মুসলমান ও পাকিস্তানিদের সমন্বয়ে দল গঠন করে, দেশ প্রেমিক নাগরিকবৃন্দদের হিন্দুস্তানি চরদের ধরিয়ে দেবার মদদ দিতে উৎসাহিত করছে।

এই সময় ফিরে এলাম আবার শহরে। এ সেই দেড়- দু মাস আগের পুরানো শহর নয়, যেন নিষ্প্রাণ অপরিচিত কোন শহর। দু চার জন রাজ পথে দেখা গেলেও বিকাল হলেই ভুতুড়ে নগরী । সূর্যাস্ত থেকে সূর্যোদয় পর্যন্ত কার্ফ্যু !

পাঁচ লাইশ আবাসিক এলাকার বাড়িতে আর থাকা সম্ভব হলোনা । গোঁড়া থেকেই পশ্চিম পাকিস্তানিদের অধ্যুষিত এলাকা ।আমরা হাতে গোনা কয়েক ঘড় বাঙ্গালী ছিলাম।এখন ওরা যা খুশি করতে লেগেছে।আসে পাশে বাড়িতে অন্য এলাকা থেকে ধরে আনা বাঙালি মহিলাদের আর্তনাদ, আমাদের বাধ্য করলো এ বাড়ী ছেড়ে   কর্ম ব্যস্ত ব্যবসা কেন্দ্র কোরবানি গঞ্জের দাদার আমলের ‘ জলিল-হাকিম ম্যানশন ‘এর চার তলায় উঠে যেতে। বাবার ওষুধের কারখানার একাংশে ।চারিদিকে ব্যস্ততা, পাঁচলাইশের মত সুন সান নীরবতা নেই। অবাঙ্গালি “বোম্বাইয়া” অধ্যুষিত। পরোপকারী হাসি খুশি ভালই মানুষ এরা।

উল্লেখ যোগ্য ঘটনা বিহীন ভাবে কাটছিল দিন। তবে একটা উল্লেখ না করলেই নয়!

দিনটি কি বার মনে নেই, নষ্ট পানির পাম্পটা ঠিক করাচ্ছিল বাবা। মিস্ত্রির পার্শে বাবা আর আমি দাড়িয়ে । আমাদের তিন তলার এক ভাড়াটিয়ার এক বাবুর্চি এসে বাবাকে একটু দূরে ডেকে কানে কানে কি যেন বললো এবং লুঙ্গীর কোঁচড়ে থাকা  কিছু দেখাল ।আমি ও উকি দিয়ে দেখলাম। কোঁচড়ে  ফুটবলাকৃতির ওই সাইজের একটি দলা,  চুড়ি, আংটি, জড়োয়া গহনায় পাকানো। আমাকে কেউ বলে দিতে হলোনা যে জিনিস গুলি স্বর্ণের !

বাবুর্চিটা বাবার কানে কানে কি একটা বলতেই বাবা রেগে উঠলেন । ফর্সা মানুষ রেগে লাল! পরে লৌহ কঠিন মুখ নিয়ে গজরাতে লাগলেন। বাবাকে এত রাগ হতে সম্ভবত আড় কখনো আমি দেখিনি।

ঐ দিন “হিন্দুস্তানি দোসর” হিন্দুদের হাজারী গলির সমস্ত স্বর্ণের দোকান গুলি পাক সেনারা দাড়িয়ে থেকে ” সাচ্চা পাকিস্তানী ” দের দিয়ে লুট করিয়েছিল। আর ঐ স্বর্ণের কিয়দংশ  ” মাল এ গনিমত” বিক্রির জন্যে বাবুর্চি সাহেব বাবাকে “অফার” করেছিল। এই জন্যেই বাবার এই সিংহ-মূর্তি !!

দশ রুপি প্রতি ঠেলা ঐ হাজারী গলির ঔষধ পরিচিত জনদের কিনে গুদাম ভরতি করতে দেখেছি। সেই বাবুর্চি সাহেবও পরবর্তীতে বেশ বড় মানুষ, বেঁচে আছে কিনা জানা নেই, আবাসিক এলাকায় বাড়ী গাড়ী সবই করেছেন, শুনেছি।

পরবর্তী মাস গুলিতে স্বাধীনতার পরবর্তী বছরগুলিতে চেনা মানুষ গুলোর কতো ভিন্ন রূপ দেখেছি ! (চলবে )

৭২৪ বার দেখা হয়েছে

৪ টি মন্তব্য : “আমার দেখা ‘৭১ এর মুক্তি যুদ্ধ!(তিন)”

  1. ফরিদ (৯৫-০১)
    স্বাধীনতার পরবর্তী বছরগুলিতে চেনা মানুষ গুলোর কতো ভিন্ন রূপ দেখেছি

    এই রূপগুলো দেখার প্রত্যাশা রইল ভাইয়া। ভালো লাগছে এই স্মৃতি চারণাটি। :clap: :clap:

    জবাব দিন
    • আজিজুল (১৯৭২-১৯৭৮)

      সব সত্যি কি লিখা সম্ভব ? খুন হয়ে যাবার সম্ভবনা আছে না?? হেহেহে! অনেক মানুষ, যারা এখন দেশের অর্থন্নৈতিক চালিকা শক্তি, আকাশ ছোঁয়া ধনী, তারা নিশ্চয়ই তাদের 'ব্রোকার থেকে বিত্তবান' হওঁয়ার চমকপ্রদ কাহিনী পড়তে পছন্দ করবেনা ?? আর আমি গরিবের কি দরকার, তাদের ওই কাহিনী লিখে??


      Smile n live, help let others do!

      জবাব দিন
  2. রাব্বী (৯২-৯৮)

    আজিজুল ভাই, পরের দুটি পর্ব আজ একসাথে পড়লাম। লেখাটি সত্যি ভাল হচ্ছে। একাত্তরের এধরণের অভিজ্ঞতার কথা ভাল লাগে যে একটি যুদ্ধের ভিতর দিয়ে যাওয়া দিনগুলো কেমন ছিল।


    আমার বন্ধুয়া বিহনে

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।