আমার ছোট বেলা

ছোট বেলার কথা মনে হলেই যে ঘটনা গুলি মনে সব চেয়ে বেশি নাড়া দেয়, এবং পরবর্তী জীবনে যার প্রভাব সব চেয়ে বেশি, সেটাই আজ লিখবো ।

বাবা ছিলেন প্রচণ্ড রাশ ভারী মানুষ । আনন্দ-উচ্ছ্বাস , হাসি-কান্না কোন কিছুর বাহুল্যই তাঁর অপছন্দ ছিল। পাঁচ বোন এর একটি মাত্র ভাই হিসাবে কখনো কোন বিশেষ ছাড় পেতাম না বাবার কাছে।

খুব যে বেশি মারতেন , তা নয় । দুষ্টামির সীমা ছাড়িয়ে গেলে হঠাৎ একদিন পেটাতেন। তখন পুরানো সব দোষের ফাইল গুলি তলব পড়ত এবং Judgment ও Punishment একই সাথে পেতাম। এতে আমার কচি মনে একটা বদ্ধ মূল ধারণা জন্মে ছিল যে, বাবা আমাকে মোটেও পছন্দ করেন না ।

এই ভাবেই চলছিলো দিন গুলি । কিন্তু স্বাধীনতা যুদ্ধ সব উলট-পালট করে দিল। দেশ স্বাধীন হোল , সাথে আমরাও ! বাবা মার ডাক দোহাই কে তোয়াক্কা না করে মুক্তি বাহিনীর বড় ভাই দের সাথে রাত দিন গ্রামের বনে বাদাড়ে ঘুরে বেরানো, ওদের অশ্র থেকে গুলির খৈ ফুটানো কতোই না আনন্দের, উত্তজনাকর হয়ে উঠলো !!

তাই শেষ রক্ষা বুঝি আর হলনা। শুরু হল প্রচণ্ড জ্বর সাথে হাত-পা এর গাঁট ফুলে ব্যথা (Rheumatic Fever)। ডাক্তার হীন গ্রামে ,নাই ওষুধ পত্র, মৃত্যুর দাড় প্রান্তে যখন প্রায় পৌঁছে গেছি , তখন কোথা থেকে বাবা Indian Army’র এক ডাক্তার Captain কালী পদ পোদ্দার কে নিয়ে আসলেন । ডাক্তার সাহেব গম্ভীর মুখে বললেন ঃ it’s already too late,যদি “Over Dose Penicillin” এ response করে ভাল, না হলে আর কিছুই করার নেই।I’m sorry!মৃত্যু অনেকই তো দেখলাম এই ছোট্ট জীবনে, তাই নিজ মৃত্যু নিয়ে এমন কোন বিকারই ছিল না ।

সেই সময়ে, এক গভীর রাতে ঘুম ভাঙলে হারিকেন এর মৃদু আলোয় হঠাৎ চোখ মেলে দেখি বাবা বসে আছেন ধ্যান মঘ্ন বৌদ্ধ মূর্তির মত, তাকিয়ে আছেন আমার দিকে এক দৃষ্টিতে , দু চোখে নীরব জলের ধারা ।

আমার ছোট পৃথিবীটা দুলে উঠলো, এ দৃশ্য দেখে ধ্বসে গেলো পুরানো সব ধ্যান ধারণা । বাবার জন্যে এক্ টা কষ্ট বুকে চেপে বসলো। মানুষ টার ব্যাথা-বেদনা আনন্দ অনুভুতি প্রকাশে এত কষ্ট?

আমি এরকমটা কখনো হবোনা,…। আমি কাঁদবো,হাসবো , দুঃখ-আনন্দ অনুভূতি গুলি প্রকাশ করবো সবার সথে মিলে মিশে।। মনে মনে তখনই প্রতিজ্ঞা করলাম, যদি বেচে উঠি , বাকি জীবন নিজে ও চারি পার্শের মানুষ দের সাথে হেসে, হাসিয়ে পার করে দিব।

সেই থেকে ৪০ টা বছর পার করেছি একই অবস্থানে থেকে।

১৯৭২ এর ১৬ই ডিসেম্বর ,আমাদের প্রথম বিজয় দিবসে FCC’র অনুষ্ঠানে আমার করা Comic টা এখনো মনে আছে। খান সেনা দরজায় লাথি দিয়েঃ কৌন হ্যাঁয়, কেয়া করতা ??, আমিঃ হুজুর হাম দর্জি হ্যাঁয় , পাঞ্জাবী কাটতা হ্যাঁয়। খান সেনাঃ ক্যেয়া পাঞ্জাবি কাটতা ?? খান সেনা ভয়ে অজ্ঞান……

পুনশ্চঃ ক্যাডেট কলেজ ব্লগ এ এলাম তোমাদের অনুরোধে। যত দিন বেচে আছি, বেঁচে থাকতে চাই তোমাদের ভালবাসা নিয়ে, ভালবাসায় অভিষিক্ত হয়ে। আজিজ/এফসিসি/৭২~৭৮

১,৪৩৭ বার দেখা হয়েছে

১৫ টি মন্তব্য : “আমার ছোট বেলা”

  1. রুম্মান (১৯৯৩-৯৯)

    স্বাগতম আজিজ ভাই । আপনাদের লেখাই তো চাই- "স্বাধীনতার লেখা" । অপেক্ষায় থাকলাম .....................


    আমার কি সমস্ত কিছুই হলো ভুল
    ভুল কথা, ভুল সম্মোধন
    ভুল পথ, ভুল বাড়ি, ভুল ঘোরাফেরা
    সারাটা জীবন ভুল চিঠি লেখা হলো শুধু,
    ভুল দরজায় হলো ব্যর্থ করাঘাত
    আমার কেবল হলো সমস্ত জীবন শুধু ভুল বই পড়া ।

    জবাব দিন
  2. সাইফুল (৯২-৯৮)

    ব্লগে স্বাগতম ভাই,

    আপনার এই লেখাটা এক্স ক্যাডেট ফোরামেও পড়েছি, আবার পড়লাম। খুবই ভাল লেগেছে। আপনার লেখার স্টাইলের কারণে আপনার বাবার প্রতি একটা অন্য রকম শ্রদ্ধাবোধ চলে এসেছে মনে। সব বাবারাই হয়ত সন্তানদের এরকম করে ভালবাসে, কিন্তু তা প্রকাশ করেনা, কেন করেনা আমার জানা নেই।

    ভাই, আরও লেখার অপেক্ষায় থাকলাম।

    (ভাই, কিছু যদি মনে না করেন, আপনার লেখার বিভাগে গল্পের সাথে ফৌজদারহাট টাও একটু যোগ করলে মনে হয় ফৌজিয়ানদের ভাল লাগত। আমি ব্লগে ঢুকে আগে ফৌজদারহাটের অংশে খোঁজ নিই, কোন নতুন লেখা আসলো কিনা? একটু কলেজ স্পিরিট দেখালাম...)

    ভাল থাকবেন। ::salute::

    জবাব দিন
  3. রাজীব (১৯৯০-১৯৯৬)

    আজিজ ভাই,
    ভাবছিলাম আপনি কলেজে পড়েছেন ৭২- ৭৮।
    আর আমার জন্মই ৭৮ এ।
    ভালো লাগলো লেখাটা পড়ে।
    কিন্তু এখন ভাইয়াকে ১০ টা :frontroll: দিতে বলবে কে?


    এখনো বিষের পেয়ালা ঠোঁটের সামনে তুলে ধরা হয় নি, তুমি কথা বলো। (১২০) - হুমায়ুন আজাদ

    জবাব দিন
  4. জুনায়েদ কবীর (৯৫-০১)

    ভালবাসা যারা প্রকাশ করতে যারা পারেন না, তাদের মতন অভাগা মনে হয় কেউ নাই... 🙁
    আজিজ ভাই, ব্লগে স্বাগতম... ::salute::
    আশা করি আপনার লেখা নিয়মিত পাব... :dreamy:


    ঐ দেখা যায় তালগাছ, তালগাছটি কিন্তু আমার...হুঁ

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।