অস্তিত্ব

হটাত মনে হলো টিকটিকির ডাক শুনলাম। টিকটিক… টিকটিক… টিকটিক…। স্পষ্ট শুনেছি কিনা বলতে পারবো না। হয়তো শুনেছি, অথবা মাথার ভেতরই শব্দটি বেজেছে। আমার কাছে সত্যি মনে হয়েছে।

কতক্ষণ ঘুমিয়ে আছি বলতে পারবো না। আবার ঘুম ভেঙ্গেছে কিনা বলতে পারবো না। আধো ঘুম, আধো জাগরণ অবস্থা। চোখ, মুখ, ভুরু কুঁচকিয়ে বাস্তবে আসতে চাচ্ছি। অনেকটা জোর করে চোখ মেললাম। হটাত চোখে আলো পড়ায় চোখ সংকোচিত হলো। আলো অতোটা তীব্র নয়। ধীরে ধীরে চোখ মেলে তাকালাম।

চোখ মেলে আশপাশ কি আছে দেখার ইচ্ছায় চোখ বুলালাম। খুব সম্ভব একটি বিছানায় শুয়ে আছি। বেশি নরমও না, আবার শক্তও নয়। মাথার দিকটা কোন বিচিত্র কারণে একটু নিচের দিকে। সেজন্যে আমি আমার পা শুয়ে দেখতে পাচ্ছি না। বুকের উপর থেকে একটি সাদা চাদরে সব ঢেকে আছে। হাত ও শরীরের অন্যান্য অঙ্গ দেখা যাচ্ছে না। সর্বশক্তি দিয়ে হাত আর বুক পিঠ মিলিয়ে বসার চেষ্টা করলাম। হচ্ছে না। শরীর আগের জায়গায়ই আছে। কোন কাজ হচ্ছে না। সন্দেহ হলো আমি কি বিছানার সাথে স্ট্রাপ দিয়ে আটকানো কিনা, সাদা চাদরের জন্য যাচাই করা যাচ্ছে না।

নিজেকে যখন তোলা গেলো না, তখন চোখের দৃষ্টি দিয়ে চারপাশে চোখ বুলালাম। চারপাশ যাচাই করে নেয়া দরকার কিনা। মাথার দুইপাশে বিভিন্ন যন্ত্রপাতি। কিছু যন্ত্রপাতি থেকে মৃদু শব্দ আসছে। কোনগুলো সংখ্যা দেখাচ্ছে, আবার কোনটি নদীর স্রোতের মত, খালি উঠা-নামা করছে। আশে-পাশে নজর বুলালাম। ডানে- বামে আমার মত অনেকগুলো মানুষ শুয়ে আছে। সবারই শরীর সাদা কাপড়ে ঢাকা। কারো কারো মুখের উপরে বিভিন্ন তার, নল একেবেকে পেঁচিয়ে আছে। তারা পুরুষ না মহিলা বোঝা যাচ্ছে না। কতজন সেটাও আন্দাজ করতে পারছি না। দশ, বিশ, পঞ্চাশ কি একশোও হতে পারে। প্রত্যেকের মাথার কাছে আমার মত স্ট্যান্ডে কি জানি ঝুলছে। গোলাপি আর হাল্কা সবুজ রঙের। অনেকটা স্যালাইনের মত।

হটাত করে মাথার উপরের ছাদে টিকটিকিটাকে দেখতে পেলাম। চার-পাঁচ ইঞ্চি লম্বা। লেজটা ধীরে ধীরে নাড়াচ্ছে। সাদা আর ফ্যাকাসে টিকটিকিটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। চার পা ছড়িয়ে ছাদ আঁকড়ে ধরে আছে। কেন জানি না মনে হলো টিকটিকিটা আমার খুব কাছে এসে পড়েছে। মনে হচ্ছে ছাদ আর আমার শোয়া অবস্থার মধ্যে দূরত্ব তিন-চার ফুট, এতো কাছে। আমি দুচোখ দিয়ে তাকে দেখছি, সেও আমাকে তার কালো চোখ দিয়ে আমায় পর্যবেক্ষণ করছে। তার পেটের নিচের দিকের কালো থলে, পায়ের আঙ্গুল, গায়ের ক্ষুদ্র ফোস্কা, অমসৃণ চামড়া আমার চোখে স্পষ্টভাবে ধরা পড়লো। হটাতই তার লেজটি কেন জানি নড়ে উঠলো। আর তিরতির করে কাঁপতে লাগলো। আমার ভয় হচ্ছিল কখনজানি লেজটা আমার উপর খসে পড়ে। ইস! শক্তি থাকলে কখন বাড়ি মেরে বা হাত দিয়ে টিকটিকিটাকে সরিয়ে ফেলতাম। গা টা ঘেন্নায় রি রি করতে লাগলো।

‘কেউ কি আছে এখানে?’ আমি ডাকলাম। কিন্তু আমার গলা দিয়ে কোন শব্দ বেরুলো না। আবার ডাক দেয়ার চেষ্টা করলাম, তাও কোন লাভ হলো না। বার বার ডাকার চেষ্টা করতে লাগলাম। তবু গলা দিয়ে কোন আওয়াজ বেরুলো না। উলটো পানি তেষ্টা পেতে লাগলো।

উপয়ান্তর না দেখে চোখ বুজে টিকটিকি আর বর্তমান বাস্তবতাকে ভুলে যাওয়ায় মগ্ন হলাম। কিন্তু বললেই তো আর বাস্তবতাকে উপেক্ষা করা যায়না। শুয়ে শুয়ে চিন্তা করতে থাকলাম। হটাত মনে হলো, ‘আমার নামটা যেন কী?’ আরে! তাইতো, আমার নিজের নামটাই তো মনে করতে পারছি না। কি যেন নামটা? আমাকে আমার বন্ধুরা, আত্মীয়েরা, আমার প্রেয়সী আমাকে কি নামে যে ডাকতো! ইস! কিছুতেই মনে আসছে না। এই মনে পড়লো বলে আমি ভাবতে লাগলাম।

হটাত করে কারো কথার শব্দ আমাকে আবার চোখ মেলতে বাধ্য করলো। কে জানি আমার বিছানার ডান পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। একটি অবয়বের মতো। সে আমাকে কিছু বললো। কিন্তু কিছুই আমার বোধগম্য হলো না। ভাবলাম সে হয়তো আমার নাম ধরে ডাকবে, কিন্তু কই! সে রকম কিছু অর্থবোধক কিছু বলছে না। হয়তো সে অন্য ভাষায় কথা বলছে। তাকে বলতে চাইলাম, আমার তেষ্টা পেয়েছে। একটু পানির ব্যবস্থা করো। কিন্তু মুখ দিয়ে কোন শব্দ বেরুলো না। হাল্কা ঠোঁট দুটি যা নড়লো মনে হলো। কী মুস্কিল! কি করে বোঝাব আমি চরম পিপাসার্ত।

হটাত সে অবয়বটি আমার মুখ ও বুকের কাছে ঝুঁকে কি জানি দেখতে লাগলো। এইবারই তার মুখটা আমি দেখতে পারলাম। কি আশ্চর্য! টিকটিকিটা দেয়ালে যত স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিলাম আর আমি আমার মুখের সামনে মুখাবয়বটা স্পষ্ট দেখছিনা। কী রকম অস্পষ্ট লাগছে। অনেকটা পুকুরের পানিতে প্রতিবিম্ব দেখার মত! মুখটা একবার মনে হল চেনা কারোর, আরেকবার অচেনা। একবার মায়ের মত, আবার পরমুহূর্তে প্রেয়সীর মত। ঠিক ধরা যাচ্ছে না। আবার আমার মা কিংবা প্রেয়সীর কারো নামই মনে করতে পারছি না।

আচ্ছা সেকি আমার দিয়ে তাকিয়ে হাসলো? মনে হল। হাসি টা কী ক্রূর হাসি? নিষ্ঠুর? নাকি সব অবাস্তব কল্পনা? তার হাতে কি জানি ধরা মনে হচ্ছে? স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে না। অনেকটা সিরিঞ্জের মত। সেটা সে মাথার কাছে স্যালাইনের মত ব্যাগে ঢুকাতে গেলো। অজানা আশঙ্কায় আমার মনটা কেমন জানি করে উঠলো। মনে হলো ওর হাতে খারাপ কিছু আছে। আমি ‘না’ বলে চিৎকার দিলাম, কিন্তু কোন শব্দ বেরুলো না। আমি বিস্ফোরিত চোখ মেলে অস্পষ্ট অবয়বের দিকে তাকিয়ে রইলাম। কেন জানি মনে হলো সে বিষ জাতীয় কিছু দিয়েছে। ভাবার সঙ্গে সঙ্গে আবার টিকটিকি টা ডেকে উঠলো।

তা হলে কি সত্যি বিষ? আগন্তুক কি আমাকে মেরে ফেলতে চায়? কেন? কি তার পরিচয়? আমিই বা কে? হটাত মাথার ভেতরে জ্বালা করতে লাগলো। অসহ্য যন্ত্রণা। আবার চোখের পাতা ভারী হয়ে আসছে। আমি জোর করে চোখ খুলে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। কিন্তু পারছি না। আস্তে আস্তে চোখের পাতা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। আগন্তুক অস্পষ্ট অবয়বটি এখনো আমার মুখের উপর ঝুঁকে আছে। আমার মনে হলো এই চোখ বন্ধ করলে আর আমি চোখ খুলতে পারবো না। মাথার উপর টিকটিকি টিক টিক করে মনের সত্যিটা জানান দিলো। দুত্তোর, এই নচ্ছার টিকটিকি টাও আমার চেয়ে বেশি সামর্থ্য রাখে।

আমার চোখ বুজে এলো। ঘুমে তলিয়ে যাচ্ছি আমি। গভীর কালো ঘুম। মাথার উপর টিকটিকি এখন মাথার ভেতরে বাসা বেঁধেছে। টিকটিক… টিকটিক… ঠিকঠিক… ঠিকঠিক…।

২,৯৫৩ বার দেখা হয়েছে

৬ টি মন্তব্য : “অস্তিত্ব”

  1. খায়রুল আহসান (৬৭-৭৩)

    চমৎকার গল্প।
    এ ধরণের গল্পের কি যেন একটা নাম আছে, মনে করতে পারছি না। আমাদের ফার্স্ট বয় নজরুল (পরবর্তীকালে ড. নজরুল, হার্ভার্ডের অধ্যাপক, বর্তমানে জাতিসংঘের সিনিয়র ইকনমিস্ট) সেই ১৯৭৩ সালে কলেজ ম্যাগাজিনে ঠিক এ ধরণের (এই স্টাইলের) একটা গল্প লিখেছিল, তখন এই স্টাইলটার নাম প্রথম শুনেছিলাম। এরপর আর এ বিষয়ে কোন চর্চা হয়নি।
    (উপরের মন্তব্যটা ভুলে শেষ করার আগেই পোস্ট হয়ে গিয়েছিল। এডিট করার কয়েকটা প্রচেষ্টা ব্যর্থ হবার পর নতুন মন্তব্য হিসেবে এটা পোস্ট করলাম।)

    জবাব দিন
    • রেজা (২০০২-২০০৮)

      আহসান ভাই, মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ। আমার সাহিত্য জ্ঞান কম, আমি নাম জানি না। আপনি ১৯৭৩ সালের স্মৃতি মনে করতে পারছেন জেনে একই সাথে আশ্চর্যিত ও ভালো লাগছে।


      বিবেক হচ্ছে অ্যানালগ ঘড়ি, খালি টিক টিক করে।

      জবাব দিন
    • রেজা (২০০২-২০০৮)

      প্রশ্নটা আরেকটু পরিস্কার করলে ভালো হয়। আমাদের সময় প্রত্যেকদিন ৭ টা পিরিয়ড ছিল। ৪০ মিনিট সময় প্রতিটার। ৪ টা শেষ হলে মিল্ক ব্রেক। তারপর বাকি ৩ টা। গড়ে পড়তায় ৩ টা প্রেপ, আফটার নুন, ইভিনিং, নাইট। সিজন বুঝে। শীতকালে ২ টা প্রেপ। ইভিনিং আর নাইট। গড়ে পড়তায় প্রত্যেক প্রেপ ১ ঘণ্টা। এর পরেও রুমে পড়া যায় লাইটস অফের আগে ও পরে।


      বিবেক হচ্ছে অ্যানালগ ঘড়ি, খালি টিক টিক করে।

      জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।