সিক্সটি নাইন

প্রথম কয়েক মিনিট শুধু মেজাজ খারাপ হচ্ছিল।এখন মনে হচ্ছে উঠে গিয়ে শরীরের সব শক্তি দিয়ে একটা চড় মেরে আসি। ব্যাটা ন্যাকার বাদশা কোথাকার!! পাশের মেয়েটার দিকে তাকিয়ে চড় মারার ইচ্ছেটা সমানুপাতিক হারে আরো বেড়ে যাচ্ছে। বুঝতে পারছিনা সত্যি সত্যিই উঠে গিয়ে চড় মেরে আসবো কীনা। জোর করে চিন্তাটা ডাইভার্ট করার চেষ্টা করি। টেবিলে রাখা গ্লাসের বাকি অর্ধেক পানিটুকুও এক নিঃশ্বাসে শেষ করে ফেললাম।

আমি রকিব এর কথা বলছি। আমার থেকে কয়েক টেবিল দূরে বসে আছে ।কয়েকদিন আগেও আমরা জিগরি দোস্ত ছিলাম। হ্যা,ছিলামই বলতে হয়। টয়লেট আর এক্সাম হল ছাড়া আমাদের কেউ কখনো আলাদা দেখেনি। কালার করা বিশ্রি চুলের যে মেয়েটা রকিবের পাশে বসে আছে আর ওর যে কোন কথা শুনে হাসতে হাসতে গায়ের ওপর গড়িয়ে পড়ছে, ও আসার আগ পর্যন্ত আমরা ভালো বন্ধু ছিলাম।এখন আর বন্ধুদের জন্য ওর সময় নেই। কারণ ব্যাটা প্রেমে পড়েছে। লালচুলো মেয়েটার চুলের মেকি সুবাস নিতেই ও এখন বেশি ব্যস্ত।
ওদের টুকরো টুকরো কিছু কথা আমার টেবিল পর্যন্তও ভেসে আসছে…
-উফ রকিব, তুমি যা মজা করে কথা বলতে পারো না!!
পরের কথাগুলো ঠিকমত বোঝা যায়না…বদলে মেয়েটার চিকন সুরের বিশ্রি হাসিটা আবার ভেসে আসে। আমি বেকুবের মত বসে থাকি। ফ্লপার খেতাব পাওয়া রকিব হঠাৎ কবে থেকে এতো মজার কথা শিখলো কিছুতেই মাথায় ঢুকেনা।
-আল্লাহ রকিব…প্লিজ আর বলোনা… এত বেশি হাসলে তো মরে যাবো। আমি মরে গেলে তোমার কথা শুনে কে এত হাসবে বলো?
এটুকু বলার পর গতবারের চেয়েও বিশ্রি হাসিতে গড়াগড়ি খায় মেয়েটা। গাধার বাচ্চা রকিবটাও বেকুবের মত সুর মিলিয়ে হে হে করতে থাকে।
আমার আর সহ্য হয়না। প্রেমের মত ন্যাকামি মানুষ ক্যামনে করে? রাগে গজগজ করতে থাকি। কদিন পরেই বুঝবি ব্যাটা কতধানে কত চাল।…আরো কিছুক্ষণ এসব দেখলে উঠে গিয়ে নির্ঘাত চড় মেরে বসবো। তার আগেই ভার্সিটি ক্যাফেটেরিয়া থেকে বেরিয়ে আসি।

*****

লাইব্রেরীতে বসে আছি। সামনে তিনটা বই হাট করে খোলা। কালকে এসাইনমেন্ট জমা দেবার লাস্ট ডেট। ক্যামনে কি?? এখন কেউ আমার মনের কথা পড়তে পারলে দেখতো দুনিয়ার ৯০% বিরক্তি সেখানে জমে আছে। কপাল কুঁচকে বইয়ের দুর্বোধ্য লেখাগুলো বোঝার চেষ্টা করছি। পেছনে হঠাৎ চুড়ির রিনিঝিনি। উফ,এইসব মেয়ে মানুষের জ্বালায় পড়াশুনাও কিচ্ছু হবেনা। এরা কি পড়তে আসে নাকি চুড়ির আওয়াজ শোনাতে আসে। ভাবতে ভাবতে আরেকবার কান খাড়া করি। চুড়ির আওয়াজ শোনা যায় কিনা। কি আশ্চর্য! এবার আমার ঠিক পাশেই কাঁচ ঘষা টুং টাং।একটু ভড়কে গেলাম। ঘাড়টা বেঁকিয়ে পাশে তাকাতেই দেখি আস্ত একটা মেয়ে মানুষ আমার দিকে চেয়ে হাসছে। মুখের হাসিটা আরো বিস্তৃত করে চুড়িওয়ালী আমাকে জিজ্ঞেস করলো…
-জাহিদ ভাই কেমন আছেন??
এবার আমি পুরোপুরি ভড়কে গেলাম…

***

এক সপ্তাহ ধরে আমার যে কী হয়েছে। কোন কাজেই মন বসছেনা। সব কিছুই কেমন আউলা লাগে।দু ঘন্টা ধরে পড়ার টেবিলে বসে আছি। কিচ্ছু পড়া হচ্ছেনা। হঠাৎ কানের পাশে চুড়ির আওয়াজ শুনে চমকে তাকাই। কিছু নেই তো!! এই নিয়ে তিনবার এমন হলো। আমার কিছু একটা হয়েছে। অবশ্যই কিছু একটা হয়েছে। কিছুক্ষণ নিজের সাথে যুদ্ধ করতে করতে শেষ পর্যন্ত পকেট থেকে মোবাইলটা বের করেই ফেললাম। সদ্য চেনা একটা নাম্বারে ডায়াল করে দুরুদুরু বুকে অপেক্ষা করছি ওপাশের কন্ঠ শোনার আশায়।
-আরে জাহিদ ভাই যে,কেমন আছেন??
নিমিষেই আমার গলা আবেশে ধরে আসে। কোনমতে ঢোক গিলে বলি…
-এইতো ভালোই… তুমি??

***

দুদিন হলো রকিবের নাকি ব্রেকআপ হয়ে গেছে। ওর মুখেই শোনা। শালা একটু আগে আমার পাশে বসে গোল্ডলীফের ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে বলছিল…
-বুঝলি জাহিদ। মাইয়া মানুষরে কখনো বিশ্বাস করতে নাই। বড় খারাপ প্রজাতি।
-হুঁ
– তার চে বাজার থিকা একটা কালসাপ কিন্যা দুধ কলা দিয়া পুষবি। তাও ভাল।

এবার আর হু, হ্যা কিছু বলিনা। আমি তখন অন্য কিছু ভাবছি। আচ্ছা, রিয়া আজকে কোন কালারের শাড়িটা পড়ে আসবে??
***

এই মুহূর্তে আমি আমার পাশে বসা মেয়েটার দিকে দুনিয়ার সব মুগ্ধতা নিয়ে তাকিয়ে আছি। রিয়াকে আমি যতবার দেখি ততবারই মুগ্ধ হই। আর পূর্বজন্মে ঠিক কি এমন পূন্য করেছিলাম সেটা মনে করার চেষ্টা করি। মেয়েটা যা হাসতে পারে না!! আমি যা বলেই তাতেই ওর সে কি হাসি!!
-রিয়া,তোমাকে আজ অনেক সুন্দর লাগছে।
-আচ্ছা তাই নাকি?? আমাকে আর কেমন কেমন লাগে শুনি??
এটুকু ঠিকমত বলতে না বলতেই দু চোখ নাচিয়ে হাসতে হাসতে ও বিষম খায়।আর একহাতে কালার করা অবাধ্য চুলগুলো সামলাতে ব্যস্ত হয়ে ওঠে। হাত বাড়িয়ে ওর চুলগুলো হঠাৎ আমার ছুঁয়ে দিতে ইচ্ছে করে।
মেয়েটা এখনো হাসছে। আমি দুচোখ ভরে সেই হাসি কুড়িয়ে কুড়িয়ে দেখি। ওর বা পাশের ঝিকিয়ে ওঠা গজদাঁতের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে নিজেকে পৃথিবীর সবচেয়ে ভাগ্যবান মানুষ মনে হয়…

আমরা ক্যাফেটেরিয়াতে বসে আছি প্রায় দুঘন্টা হল। হঠাৎ কয়েকটেবিল দূরে চোখ পড়তেই দেখি রকিব একা বসে আছে। দু আংগুলের ফাঁকে প্রায় শেষ হয়ে যাওয়া গোল্ডলীফ । চোখে চোখ পড়তেই মনে হলো রকিব অনেক বিরক্তি আর রাগ নিয়ে আমাদের দুজনের দিকে তাকিয়ে আছে।

আমি তেমন একটা পাত্তা দেইনা।চোখ ফিরিয়ে আবার রিয়ার চুলের ঘ্রাণ নিতে ব্যস্ত হয়ে পড়ি।

[ গল্প লিখতে পারিনা। কিন্তু তারপরও ছোটবেলায় না বুঝে লেখার চেষ্টা করসিলাম। সেই আমলের লেখা। ]

৬৫ টি মন্তব্য : “সিক্সটি নাইন”

  1. কামরুল হাসান (৯৪-০০)

    এবার রিয়া ? তোর :just: ফ্রেন্ডের সংখ্যা দেখি ক্যাল্কুলেটর দিয়া গুনতে হবে 😉 😉


    ---------------------------------------------------------------------------
    বালক জানে না তো কতোটা হেঁটে এলে
    ফেরার পথ নেই, থাকে না কোনো কালে।।

    জবাব দিন
  2. মাহমুদ (১৯৯০-৯৬)

    আরে!
    এই পুলা ত দেহি আগে থেকেই সিরাম।
    তোমার ছুডুবেলার গল্পটা সিরাম হইছে।

    তুমি এখনো কি সিরাম? 😛


    There is no royal road to science, and only those who do not dread the fatiguing climb of its steep paths have a chance of gaining its luminous summits.- Karl Marx

    জবাব দিন
  3. মাহমুদ (১৯৯০-৯৬)

    আর ছন্দ ত পোলা।

    ছন্দা হইলে না হয় ছিল একটা কথা,
    আমি কি এতোই বোকা?
    ছন্দ যাক মলে,
    ছন্দা আসুক আমার **লে 😀

    এইবার মিলছে? :grr:


    There is no royal road to science, and only those who do not dread the fatiguing climb of its steep paths have a chance of gaining its luminous summits.- Karl Marx

    জবাব দিন
  4. মাহমুদ (১৯৯০-৯৬)

    নাহ!

    আমি এইবার ফুটি। এইসব ক্রিয়েটিভ পুলাপাইন আবার কি থেকে কি ক্রিয়েট কইরা বিয়ে-বাজারে আমার শেয়ারে পতন নিয়া আসে। আম্মা তাইলে কষ্ট পাবো। ;;;


    There is no royal road to science, and only those who do not dread the fatiguing climb of its steep paths have a chance of gaining its luminous summits.- Karl Marx

    জবাব দিন
  5. রকিব (০১-০৭)

    আমি কবে জিহাদ ভাইরে ডিস্টার্ব দিলাম, যে উনি আমার নামে দিয়া একটা চরিত্র বানাইয়া গল্পের মধ্যে ছাইড়া দিলো, বোনাস হিসাবে ছ্যাকাও খাওয়াইলো :(( :(( ।
    তয়

    আমি রকিব এর কথা বলছি। আমার থেকে কয়েক টেবিল দূরে বসে আছে ।কয়েকদিন আগেও আমরা জিগরি দোস্ত ছিলাম।

    - এই লাইনটা পইড়া সব দুসখ ভুইলা গেছি। আসেন জিহাদ ভাই আমরা কোলাকুলি করি। 😀


    আমি তবু বলি:
    এখনো যে কটা দিন বেঁচে আছি সূর্যে সূর্যে চলি ..

    জবাব দিন
  6. আদনান (১৯৯৪-২০০০)

    কমেন্ট পড়তে পড়তে ভুইলা গেসি ব্লগ কি নিয়ে ছিল । পুলাপান অশ্লীল হয়া গ্যাসে । জিহাদ এর এই লেখাটা কোথায় যেন আগেও পড়ছি । তবে ভাল ছিল অন্য আনেকবারের মতোই :clap: ।

    জবাব দিন
  7. হোসেন (৯৯-০৫)

    আমার লাইফের সবচেয়ে অপছন্দের ক্যারেক্টারগুলার মাঝে মিথিলার জামাই ঠাহষাণ একজন,তার গান থেকে কোট করিঃ

    বিন্দু আমি তোমায় ঘিরে বৃত্তের ভেতর শুধু তুমি আছ
    মাতাল আমি তোমার প্রেমে অর্থহীন সবই যে প্রেম লাগে

    এইবার আমার অসম্ভব প্রিয় কবি বিষ্ণু দে থেকে কোট করি

    অভ্যাস শুধু অভ্যাস লিলি তাই তো আসি
    তোমার উষ্ণ প্রেমের হাস্যচপল নীড়ে
    অভ্যাস শুধু অভ্যাস ভালো তাই তো বাসি

    শেষে অধমের একটা চেষ্টা

    জানি না হয়ত সীমাবদ্ধতার প্রাকৃতিক সুত্রই প্রত্যাদেশের মত আসন্ন ।
    যতটুকু আলো জন্মে ছিল, মনে হয় আদিগন্ত অসম্পূর্নতা আর বিস্তৃত
    বৃহৎসীমাবদ্ধতার ঝুলি নিয়ে সযত্নে পরিশীলিতভাবে করেছি অগ্নি নির্বাপন ।

    শীত লাগে উষ্ণতাহীনতার আর শীত কেবল ঠান্ডা মিয়ানো প্রতিবেশ
    ওম খোজে ফোলানো মুরগী আর পশমের বলের মত মুরগীর বাচ্চারা ।
    ওম খুজলে উষ্ণতা পাবোনা অনন্ত দহন পেতে পারি ।
    তুমি যদি আবার
    খুজে পেতে ভালোবাসার ওম আমার মাঝে,
    আমি কবিতার পোশাক পড়াতাম আকাশকে ।

    এই বার আমারে কও তুমি তরফদার ক্যাম্নে কী?


    ------------------------------------------------------------------
    কামলা খেটে যাই

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।