হযবরল

আমি মানুষ। অন্যান্য মানুষদের মতই আমারও দুইখান হাত, দুইখান পা ইত্যাদি ইত্যদি অঙ্গপ্রত্যঙ্গের পাশাপাশি স্বাভাবিক নিয়মে একখান মাথাও আছে। আর সেই মাথার উপর বর্তমানে একখানা বড়সড় আকৃতির পাহাড় উঠে বসে আছে। পাহাড়খানা কাজ দ্বারা নির্মিত । বড়ই নাছোড়বান্দা সেই পাহাড়। তবে আমিও কি কম যাই। পাহাড়টারে ঘাড় ধরে মাথা থেকে নামায়ে ব্লগ লিখতে বসলাম। কারণ হঠাৎ মনে হইলো আমার একখান ব্লগ লিখতে হবে। কেন লিখতে হবে সেই ব্যাপারে আমার একমাত্র মাথাকে জিজ্ঞেস করেও তেমন কোন সদুত্তর পাওয়া গেলোনা। তাই আমি ভাবলাম, উত্তর দিয়ে আর কী হবে, যাই বরং একখান ব্লগ লিখি।

পরসমাচার এই যে, এতটুকু লিখার পর আমার মনে হইতেসে, থাক, ব্লগ লিখার দরকার নাই। কিন্তু আসল কথা হইতেসে আমি চাইলেও কিছু লিখতে পারতেসিনা। একটা সময় ছিলো যখন কীবোর্ডখানা চিন্তা করার আগে আগে কতসব শব্দ টাইপ করে ফেলতো। এখন ঠেলেঠুলেও বাটনগুলারে দিয়ে কোন নতুন অক্ষর লিখানো যায়না। আমি যেমন অলস, আমার কীবোর্ডও তেমন কুড়ে। যেমন মালিক, তেমন ভৃত্য। যেমন কুকুর, তেমন মুগুর। নাহ, শেষ প্রবাদটা মনে হয় ঠিক হইলোনা। ঠিক হইলেই বা কী, বেঠিক হইলেই বা কী। তারচে বরং ব্লগ লিখায় মন দেই।

আচ্ছা, আবারো রিফ্রেশ মেরে শুরু করি। পরসমাচার এই যে, আমি ভালো আছি। ওহ ওয়েট, না, আমি আসলে ভালো নাই। কিংবা হয়তো সত্যিই ভালো আছি কিন্তু ব্যাপারটা ঠিকঠাক বুঝে উঠতে পারতেসিনা। কিংবা ভালো-মন্দ দুই মিলিয়েই আছি। আমি বরাবরই কনফিউজড মানুষ। পাখি পাকা পেপে খায়। পেঁপে পাকা পাখি খায়। আমি ভালো আছি, কিংবা আমি ভালো নাই। হোয়াটএভার। সবচে বড় ব্যাপার আমি বেঁচে আছি। আজকাল বেঁচে থাকাটাই বোধহয় ভালো থাকা।

আব্বা মারা গেছেন একমাস দুইদিন হলো। আমার আব্বা, হ্যা আমার আব্বাইতো। এমন একজন মানুষ যাকে নিয়ে কখনো খুব গভীরভাবে দুইমিনিট সময় আলাদা করে কিছু ভাবিনাই। আব্বা কিংবা আম্মা – এই দুইজন আমার কাছে শ্বাস প্রশ্বাস নেয়ার মত। সারাক্ষণই নিচ্ছি, কিন্তু সচেতনভাবে সেটা কখনো ভেবে দেখিনা। দেখিনাই। অথচ গত একমাস দুইদিন ধরে ভেবে টেবেও তাকে আর শ্বাস প্রশ্বাসের মতন স্বাভাবিক বিষয় মনে হচ্ছেনা। আমি ঠিকই অবচেতন মনে নিয়ম মেনে অক্সিজেন নিচ্ছি, আর কার্বনডাইঅক্সাইড ছাড়ছি। কিন্তু আব্বা নিচ্ছেন না। আব্বা চলে গেছেন। সূর্য পূর্ব দিকে উঠে, পশ্চিম দিকে অস্ত যায়। আমি দুই বেলা ভাত খাই, এক বেলা রুটি। ঠিক আগের মত করেই। শুধু মোবাইলে আব্বার নম্বর ডায়াল করলে আব্বাকে আর পাওয়া যায়না। কী অদ্ভুত ব্যাপার। অথচ আব্বা যেদিন মারা গেল সেদিন সবাই কাঁধে হাত দিয়ে বললো – এটাই নাকি স্বাভাবিক। এটাই মেনে নিতে হবে। এখানে অদ্ভুতুড়ে কিছু নাই। আমি মেনে নিতে নিতেও মেনে নিতে পারিনা। আমার ছোটবেলার কথা মনে পড়ে আজকাল বড় বেশি। মনে পড়ে বিকেল বেলা আব্বার একটা অাঙুল ধরে কলেজ মাঠের দিকে ছোট ছোট পায়ে হেঁটে চলা সেই ছোট্ট ছেলেটার কথা। যে হঠাৎ করে না চাইতেও এখন বড় হয়ে গেছে। কিংবা হয়তো আরো আগেই বড় হয়ে গিয়েছিলো, টের পেলো মাত্র কিছুদিন হলো। কেননা, শেষ একটা বছর আব্বাই বরং আমার হাত ধরে চলাচল করতো বাইরে গেলে। আমি আব্বার হাত ধরে ধীর গতিতে তাল মিলিয়ে সামনে এগোতাম। হাঁটতে হাঁটতে ছোটবেলার সেই ছোট ছেলেটার কথা মনে পড়তো। বাবার একটা আঙুল ধরে হেঁটে চলা ছোট্ট ছেলেটা। যে ছেলেটা বড় হয়ে গিয়ে অনেকক্ষণ ধরে একটা ব্লগ লিখার চেষ্টা করতেসে। কিন্তু পারতেসেনা।

২,৩৭৬ বার দেখা হয়েছে

২৮ টি মন্তব্য : “হযবরল”

  1. আমিন (১৯৯৬-২০০২)

    সময়টা খুব কঠিন হবার কথা যখন মাথায় কোন কথা ঢুকে না বা আসে না। ফেবুতে আঙ্কেলের নিউজটা দেখেছিলাম। এইসব পরিস্থিতি এমন যখন সান্তনা দেয়াটা প্রহসনের মত শোনায়। হয়তো বলা যেত, টাইম ইজ দ্যা বেস্ট হিলার, সব ঠিক হয়ে যাবে ইত্যাদি। আসলে কোন কিছুই ঠিক হয় না।

    এই সব পোস্টে তাই আমিও কিছু লিখতে পারি না। কারণ হয়ত কী বলতে হয় জানি না।

    ........... ........ .....

    জবাব দিন
      • আমিন (১৯৯৬-২০০২)

        হুমম।
        কাছের লোকদের দুঃসংবাদ গুলো নিজের হয়েই লাগে।
        গতকালকে আমার মায়ের সপ্তম মৃত্যুবার্ষিকী ছিল। কালকেই চিন্তা করতেসিলাম আসলে কোন কিছুই ঠিক হয় না। ২০০৮ সালের এই সময় গুলোর (সিসিবির প্রথম দিকে) কথা আমি মনে করতে পারি। আমার জন্য সময়টা খুব কঠিন ছিল। অন্তত মাস দুয়েক সব কিছু ফাঁকা হয়ে ছিলো। ব্লগ লিখা দূরে থাকুক অনলাইনে লগিন করতাম না। তারপরেও অন্যান্য একটিভি হয়তো আসলে মাথার বোঝা একটু হলেও খানিকের জন্য হালকা করে।

        জবাব দিন
  2. কাজী সাদিক (৮৪-৯০)

    "আব্বা কিংবা আম্মা – এই দুইজন আমার কাছে শ্বাস প্রশ্বাস নেয়ার মত। সারাক্ষণই নিচ্ছি, কিন্তু সচেতনভাবে সেটা কখনো ভেবে দেখিনা।"--- একটা খুব দরকারী ধাক্কা দিলে ভাইয়া।

    জবাব দিন
  3. পারভেজ (৭৮-৮৪)

    নিরানব্বুই হলো হ য ব র ল দিয়ে।
    সেঞ্চুরিটাও করে ফেল এরকম আরেক হ য ব র ল দিয়েই।
    "কোন কিছুই ঠিক হয় না", সেটা যতটা সত্যি, "সব বেঠিকের মধ্য দিয়েই জীবন চালিয়ে নিয়ে যেতে হবে, চলেও যাবে", এটাও একই রকমের সত্যি। কারন আমার সবাই ফাইটার।
    কিছু না লিখে বসে থাকলে দেখবা, নিজেকে বেশি একা মনে হবে।
    এই যে লিখলা, দেখতে পাচ্ছো, দুনিয়ায়টা যত বেঠিকই হোক, তোমার জন্য সাতভাই চম্পা আর এক পারুল বোন চোখ খুলে (কী-বোর্ড মেলে) বসে আছে।
    তোমার হ য ব র ল ছুঁয়ে যাচ্ছে তাদেরকেও।
    অবাক করা ব্যাপার না?
    আমি সহ অনেকের সাথে আজো দেখা শোনা চেনা জানাও হয় নাই। তারপরেও......

    এই হ য ব র ল না এলে কিভাবে বুঝাতাম তা?

    ফাটাফাটি একখানা শট খেলে (রীড ব্লগ নামিয়ে) সেঞ্চুরীটা হেকে ফেলো দেখি।
    আয়েশ করে কমেন্ট করি, আড্ডা দেই।
    অনেকদিন হলো, এই পারিবারিক আড্ডাটা চুটিয়ে দেয়া হচ্ছে না তেমন একটা......

    (পারুল বোনও অচীরেই আ-সি-তে-ছে...... আমি নিশ্চিত)


    Do not argue with an idiot they drag you down to their level and beat you with experience.

    জবাব দিন
  4. মোকাব্বির (৯৮-০৪)

    লিখতে গেলে শব্দ আসে না এই সমস্যাটা আমরেও ভোগাইতেসে। চারপাশে অনেক কিছুই ঘটে কিন্তু খেয়াল করা হয় না। লিখাতো দূরে থাক। পিতার চলে যাওয়া নিয়ে কোন অভিজ্ঞতা নাই। কারণ চলে যাওয়ার বেদনা বোঝার আগেই চলে গিয়েছিলেন।

    আপাতত মূল কথা, এডু স্যার বলসেন ডিসেম্বরে একটা পিকনিক করতে হবে। এখন সেটা নিয়া আসো বসি!


    \\\তুমি আসবে বলে, হে স্বাধীনতা
    অবুঝ শিশু হামাগুড়ি দিল পিতামাতার লাশের ওপর।\\\

    জবাব দিন
  5. আহসান আকাশ (৯৬-০২)

    এমনিতেই আমার কমিউনিকেশন স্কিল খুব দূর্বল, তার উপর এরকম বিয়োদাত্মক ঘটনায় কেন জানি কিছুই বলতে পারি না, যাই বলতে চাই তা অর্থহীন মনে হয়। ফেসবুকে, ব্লগে আঙ্কেলের খবরটা শুনেও বলার মত কিছু খুঁজে পাই নি, এখনো পাচ্ছি না। শুধু বলবো সামনে এগিয়ে যাওয়ার শক্তি পাও।

    অফটপিকঃ সিরিয়াস পোস্টে একটু অন্য লাইনে যাই, পোস্টের নামের কপিরাইটের ব্যাপারে তীব্র প্রতিবাদ জানালাম। সিসিবিতে 'হযবরল' আমার সম্পত্তি। একটা না দুই দুই টা পোস্ট আছে আমার এই নামে। সিসিবির এডু মডুদের কাছে বিচার চেয়ে গেলাম।


    আমি বাংলায় মাতি উল্লাসে, করি বাংলায় হাহাকার
    আমি সব দেখে শুনে, ক্ষেপে গিয়ে করি বাংলায় চিৎকার ৷

    জবাব দিন
  6. সাবিনা চৌধুরী (৮৩-৮৮)

    তিরিশ ছুঁই ছুঁই বয়েসে রতনকে হারালাম ক্যান্সারে। আমার তারাটির বয়েস তখন চার। এদেশে আর মন টিকছিল না; চারপাশের কোলাহল অসহ্য লাগছিল। আমি দেশে গেলাম বাবার কাছে চুপচাপ বসে থাকবো বলে। শোকাহত কন্যাটিকে নিয়ে বাবা কী করবেন বুঝে উঠতে পারেন না। বিকেলে ব্রম্মপুত্রের তীরে বাপ বেটি হাঁটাহাঁটি করি। বাবা ফুচকা কিনে দেন। ছেলেবেলার মত মাস্টারমশাইকে ধরে নিয়ে আসেন গানবাজনার আসর বসাতে। সন্ধ্যা হলেই আমরা মা মেয়ে হারমোনিয়াম নিয়ে বসে যাই। তারা বাংলা শেখে, সুর করে কবিতা পড়ে তার নানাভায়ের কাছে।

    সবাই বলতো আমি হলাম বাবার মেয়ে। বাবার মত দেখতে আমি; কথাবার্তা চালচলন স্বভাবচরিত্রও তাঁর মতোই। আমি বাবার মত কথায় কথায় হাসি, মানুষকে ভালবাসি।

    ঠিক চার মাস পর আমার বাবা চলে যান আমাদের ছেড়ে।

    এক বছরের ব্যবধানে আমার জীবনের প্রিয়তম দুইজন মানুষকে হারানোর শোক আজো ভুলতে পারিনি। আমাদের জীবন কখনোই আর আগের মত হবেনা জগতে এর চাইতে সত্য আর কিছু নেই।

    কোন সান্ত্বনা নেই তোমার জন্য, ভাইয়া। লিখতে মন চাইলে লিখো যদিত্ত সেটি সহজ নয় মোটে। যা কিছুই করো না কেন দিনশেষের হাহাকারটি কত রূপে যে আসে সেটি তুমি তো জানো।

    আমার ভালবাসা জেনো, ভাইয়া। নিজের যত্ন নিও।

    জবাব দিন
  7. জুনায়েদ কবীর (৯৫-০১)

    ঢাকায় থাকলে সবাইকে খোঁচা-খুঁচি করে একটা জিটুজি'র জন্য হয়ত রাজি করিয়ে ফেলতাম।
    কিছুক্ষণের জন্য হলেও সব ভুলে অনেক আড্ডাবাজি করা যেত...
    যেহেতু আমি নাই, আমার গরজও নাই। 😛

    ভাল থাকিস। 😀


    ঐ দেখা যায় তালগাছ, তালগাছটি কিন্তু আমার...হুঁ

    জবাব দিন
  8. পারভেজ (৭৮-৮৪)

    জিটুজির জন্য পথিক কিন্তু দারুন ভেন্যু।
    ডিসেম্বরে ওটা ফুললি রেডি থাকবে। তবে আড্ডাবাজিটা বাইরের লোকজন মিস করবে।
    সিসিসিএল হলে উৎসাহিদেরকে ভার্চুয়ালি হাজির করা যায়।

    কি করলে ভাল হয়?


    Do not argue with an idiot they drag you down to their level and beat you with experience.

    জবাব দিন
  9. মুজিব (১৯৮৬-৯২)

    আসছে জানুয়ারিতে বাবার মৃত্যুর ছয় বছর হবে। একটি দিনের জন্যেও ভুলতে পারিনি। Time is not always a good healer. Or, do I don't wish it to be?...
    আশা করছি, তোমার বেলায় এমনটি না হোক।


    গৌড় দেশে জন্ম মোর – নিখাঁদ বাঙ্গাল, তত্ত্ব আর অর্থশাস্ত্রের আজন্ম কাঙ্গাল। জাত-বংশ নাহি মানি – অন্তরে-প্রকাশে, সদাই নিজেতে খুঁজি, না খুঁজি আকাশে।

    জবাব দিন
  10. সানাউল্লাহ (৭৪ - ৮০)

    এমন অবস্থায় আমার বলার কোনো ভাষা থাকে না। কাছে থাকলে তোমাকে বুকে চেপে রাখতাম। ভালো থেকো। মায়ের খেয়াল রেখো। মাঝে মধ্যে উনার কাছে চলে যেও।


    "মানুষে বিশ্বাস হারানো পাপ"

    জবাব দিন
  11. খায়রুল আহসান (৬৭-৭৩)

    লেখাটা পড়ে খুব ব্যথিত হ'লাম। সবাই সান্ত্বনা দিতে পারেনা, তবে এ ধরণের লেখা পড়ে সবার হৃদয়ই মোচড় দিয়ে ওঠে। যে আঙুলে শব্দেরা খেলাখেলি করে ছোটে কী বোর্ডের দিকে, সেই হাতের আঙুলগুলোই কেমন শোকে স্থবির হয়ে যায়, তা বেশ বোঝা যায়। আমার বাবার মৃত্যুর সময় বিদেশে কর্মরত ছিলাম। খবরও পাই দাফনের পর। করার কিছুই ছিলোনা। মানুষের এমন দুঃসময়ে অনেকেই সাহায্য সহমর্মিতার হাত বাড়িয়ে দিতে চায়, সান্ত্বনার বাণী শোনাতে চায়। কিন্তু দিনশেষে নিজের শোকটাকে নিজেকেই সামলে নিতে হয়। করার কিছুই থাকেনা।

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।