২৬.৬.২০১৩

ভার্সিটি বাস থেকে নেমে দাড়ায় আছি সাফওয়ানের জন্য। সাফওয়ান আমার রুমমেট। সে বড়লোক। তার একটা হোন্ডা আছে। অফিস থেকে সে হোন্ডাতে ফিরতেসে। আর আমি দাঁড়ায় আছি তার জন্য। তারপর আমরা বৈকালিক নাশতা খেয়ে বাসার পথে হোন্ডাযোগে রওনা দিবো। কয়েকবার ফোন দিলাম। কিন্তু হারামি ফোন ধরেনা। মেজাজ পুরা বিলা। আজকের আবহাওয়া বেশ ভালো ছিলো, তাই চান্দি একটু কম গরম। কিন্তু গরম। এই যখন সর্বশেষ অবস্থা হঠাৎ কাঁধে কে যেন হাত রাখলো। কপাল কুঁচকে পিছন ফিরে তাকালাম। দেখলাম বয়স্ক এক মহিলা। ভাবলাম ভিক্ষুক। বলতে চাইতেসি মাফ করেন। কিন্তু তার আগেই শীর্ণ হাতটা বাড়ায় দিলেন আমার দিকে। তাতে একটা কাগজ। আমি হাতে নিলাম। সেটা আসলে কাগজ না। একটা প্রেসক্রিপশন। মনে হয় সাহায্যই চাবেন। আবারও রেডি হইলাম। বলবো – মাফ করেন। কিন্তু না। বৃদ্ধা বললেন – বাবা রক্ত টেশ করবো। কোথায় করবো একটু বলে দিবা? আমি আর মাফ করেন বলতে পারলাম না। বরং তার পিছনের দিকে একটা লম্বা বিল্ডিংয়ের দিকে আঙুল তুলে বললাম, ঐখানে যান। চাচী ফ্যালফ্যাল করে তাকায় থাকলেন। বুঝলাম কিছুই বুঝেননাই। উনারে চাচীই বললাম। যদিও উনি আমার নানীর বয়সী হবেন। যাইহোক। শেষমেষ বললাম – চলেন আপনারে নিয়া যাই। ডায়গনস্টিক সেন্টারটা দোতলায়। উনারে দোতলায় দরজার সামনে ছেড়ে দিয়ে ফিরে আসবো ভাবতেসি মনে মনে। শেষমেষ ভাবলাম, না। ভেতরে ঢুকায়েই দিয়ে আসি। ভেতরে ঢুকায়ে মনে হইলো উনি বিল্ডিং চিনেননাই, রিসেপশনিষ্ট চিনবেন ক্যামনে? আমি প্রেসক্রিপশনটা হাতে আর চাচীরে পিছনে নিয়া রিসেপশন ডেস্কের সামনে গিয়া দাঁড়াইলাম। রিসেপশনে একজন মহিলা। ঠিক মহিলাও না আবার। মহিলার চে একটু কম বয়েসী। উনাকে প্রেসক্রিপশন দিয়ে বললাম দেখেন তো কী অবস্থা। উনি দেখে টেখে বললেন এক হাজার টাকা লাগবে। আমি প্রেসক্রিপশনটা দেখলাম এইবার। একটা ব্লাড টেস্ট, আর একটা ইউরিন টেস্ট। দুই টেস্টে একহাজার টাকা। কঠিন অবস্থা। আমি আবার ভাবলাম। ভাবলাম যে রিসেপশনিস্ট চিনেনা তার কাছে একহাজার টাকা থাকবে ক্যামনে? আমার নিজের পকেটেই একহাজার টাকা নাই। তবু চাচীরে জিজ্ঞেস করলাম। কারণ জিজ্ঞেস করা ছাড়া কোন উপায়ও নাই। বললাম – চাচী এক হাজার টেকা লাগবে। চাচী এইবার হাউমাউ করে কিছু বললেন। পুরাটা বুঝলাম না। খালি বুঝলাম উনার কাছে একহাজার টাকা নাই। আমি রিসেপশনিস্টকে বললাম – একটু কমানো যায়? রিসেপশনিস্ট তার লাস্যময়ী হাসিটা এবার আগেরবারের চে আরেকটু বাড়ায় দিলেন, কিন্তু টেকা কমালেন না। চাচীরে আবার জিগাই। চাচী, টেকা তো মেলা লাগে। কী করবেন? চাচী আবার হাউমাউ করে করে কিছু একটা বলেন। সবকথা বুঝতে পারিনা। শুধু বুঝলাম তার কাছে তিনশো টেকা আছে। কিন্তু একহাজার টাকা নাই। আমি এইবার রিসেপশনের আরেক ভদ্রলোকের কাছে যাই। বললাম ভাই দেখেন না একটু। চাচীর তো টেকাটুকা নাই। শুনে তিনিও হাসেন। সে হাসিতে মধু ঝরে পড়ে। ঠিক তার সহকর্মীনীর মত। কিন্তু একহাজার টাকা একহাজার টাকাই থাকে। আমি চাচীর দিকে তাকাই। চাচীও আমার দিকে তাকায়। কী করবো বুঝতে পারিনা। আমিই যেইখানে বুঝতে পারিনা সেইখানে চাচী বুঝবে ক্যামনে? তারপরও শেষবারের মত হাসিখুশি রিসেপশনিস্টকে আরেকবার অনুরোধ করি ডাক্তার সাবকে একটু বলতে। যদি একটু কমানো যায়। নিতান্ত অনিচ্ছাতেও তিনি ডাক্তার সাবকে গিয়া জিগান। কী জিগাইলেন কিছু শুনতে পাইনা। দূর থেকে শুধু দেখি তার মুখ থেকে আবার মধু ঝরে পড়তেসে। ডাক্তার সাবও সবশুনে হাসেন। সে হাসিও মধুমাখা। কিছু একটা বললেন। বলে আবার তিনি রোগী দেখার মহান কাজে ব্যস্ত হয়ে গেলেন। রিসেপশনিস্ট ভদ্রলোক ফিরে এসে বললেন – কমসে। আমি খুশি হয়ে উঠি। জিজ্ঞেস করলাম – কত? উনি টাকার অংক বললেন। ডাক্তার সাহেব অতি মহানুভব ব্যক্তি। একহাজার টাকা থেকে নয়শো টাকা করে দিয়েছেন তিনি। ডাক্তার সাহেবের এহেন মহানুভবতায় মুগ্ধ হয়ে গেলাম। খালি মুখটা কেমন তিতা তিতা হয়ে গেল। রিসেপশনিস্টও বোধহয় ব্যপারটা বুঝতে পারলেন। সে জন্যেই বোধহয় হাসিতে আরো একটু মধু ঢেলে দিলেন। আমি তাকায় তাকায় তা’ দেখলাম। দেখে মনে হইলো গালে দুইখান চটকানা মেরে মধুর সাপ্লাই বন্ধ কইরা দেই। কিন্তু মুখে বললাম – ঠিকাছে। প্রেসক্রিপশন রাখেন। চাচীরে বললাম – চাচী আপনে বসেন আমি আসতেসি। নিচে ডিবিবিএল বুথ থেকে টেকা তুলে আবার এসে রিসেপশনিস্টকে দিলাম। টেকা দেখে কে না খুশি হয়। আমি হই, সাফওয়ান হয়। দুনিয়ার সবাইই হয়। কিন্তু রিসেপশনিস্ট কেন জানি খুশি হইলেননা। জিগাইলেন – আপনার কে হয়? আমি বললাম – কেউ হয়না। আপনি টাকা রাখেন। শুনে রিসেপশনিস্টের মুখও কেমন কেমন তিতা তিতা হয়ে গেল বলে মনে হয়। মধু ঢালার দায়িত্ব এইবার আমি গ্রহণ করলাম। দিনের সবচে সুন্দর হাসিটা হেসে বললাম- ঠিকাছে না? রিসেপশনিস্ট এইবার কিছু বললেন না। শুধু মাথা নাড়লেন উপর নিচ। আমি মনে মনে বললাম আলহামদুলিল্লাহ। মধুর সাপ্লাই পুরোপুরি বন্ধ হয়েছে। আমি উল্টা ঘুরে চাচীকে বললাম – চাচী চলেন। ঝামেলা শেষ। এইবার আপনার টেশ করার পালা।

টেস্টের জন্য ডাক পড়ার অপেক্ষায় বসে থাকতে থাকতে চাচীরে জিগাই- বাড়ি কই আপনার? চাচী বলেন – ফুলবাড়িয়া ময়মনসিংহ। একটা মেয়ে। গার্মেন্টসে কাম করে । আর সে কাম করে বাসায় বাসায়। নিজে নিজেই গড়গড়িয়ে আরো বহু কথা বলতে থাকেন। আমি শুনি। চুপচাপ শুনি। শুনতে শুনতে আমি চাচীর দিকে আবারো তাকাই। তারে আমি চাচী চাচী বললেও সে আসলে আমার নানীর বয়েসি। আমার নানী যখন বেঁচে ছিলেন একটা একান্নবর্তী পরিবারের সর্বময় কর্ত্রী ছিলেন। তিনি যখন হাঁটতেন তখন আঁচলের গোছায় ঝুন ঝুন করে বাজতো আমাদের বিশাল পরিবারের কর্তৃত্বের প্রতীক, এক গোছা চাবি। নানী মারা গেছেন বহু বছর আগে। কিন্তু ঝুনঝুন করে চাবির গোছা বাজার শব্দ এখনো চোখ বন্ধ করলে আমি শুনতে পাই। অন্যদিকে কোমরের ব্যাথায় বার বার বাঁকা হয়ে যাওয়া এই চাচী ঢাকা শহরে একা একা রক্ত টেশ করতে আঁচলে তিনশো টেকা বেঁধে উদভ্রান্তের মত এদিক সেদিক ঘুরেন। আমরা খালি তা’ তাকায় তাকায় দেখি। দেখে দেখে রিসেপশনিস্টের হাসি আরো মধুমাখা হয়, ডাক্তার সাহেব একশো টাকার সমপরিমাণ মহানুভব হয়ে ওঠেন।

সবকিছু শেষ হয়ে গেলে স্লীপখানা চাচীর হাতে দিয়ে বলি চাচী বাড়ি যান। কালকে এসে রিপোর্ট নিয়ে গিয়ে ডাক্তার রে আবার দেখাইয়েন। চাচী হাউমাউ করে এবারও কিছু বলেন। কী বললেন সেটা এবারও পুরেপুরি বোঝা হয়না । শুধু বুঝলাম চাচী বলসেন – অনেক বড় হও বাপ। আমি মনে মনে বললাম – আমারে বড় হইতে বলে কী হবে চাচী। তার চে বরং ডাক্তার সাবের জন্যে আরো বড় হবার দোয়া করেন। ভবিষ্যতে যাতে আরো দশ বিশ টাকা কম নিতে পারে মানুষের কাছ থেকে। ভবিষ্যতে যেন একশো টাকা থেকে দুইশো টাকার মহানুভব হইতে পারেন।

আমার হঠাৎ খুব হতাশ লাগে। কেন লাগে বুঝতে পারিনা। কিংবা বুঝলেও আসলে নিজেকে বুঝতে দিতে চাইনা। এতক্ষণ ধরে চাচী চাচী করলেও আসলে আমার নানীর বয়সী মানুষটার কথা ভেবে হতাশ লাগে। আজকে তিনশো টেকা বেঁচে গেসে তার। কিন্তু কালকে বাঁচার গ্যারান্টি নাই। ডাক্তার সাব হয়তো আবারও মহানুভব হবেন। কিংবা হবেন না। হয়তো পাঁচশো টাকা থেকে একশো টাকা কালও মহানুভবতার খাতায় যাবে। বাকি থাকবে চারশো টাকা। কিন্তু আরেকশো টেকা আসবে কোত্থিকা? বুঝে পাইনা। এত লেখাপড়া কইরা আমিই যেইটা বুঝতে পাইনা, সেইটা আমার মত মহানুভব মানুষদের বাসায় বাসায় কাজ করা চাচী বুঝবে ক্যামনে?

চাচীর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আমি বাসার দিকে রওনা দেই। হঠাৎ আমার খেয়াল হয় সাফওয়ান হারামিটা এখনো আসেনাই। যার সাথে হোন্ডায় চড়ে আমাদের একসাথে বাসায় ফেরার কথা ছিলো।

২,১৬২ বার দেখা হয়েছে

২৩ টি মন্তব্য : “২৬.৬.২০১৩”

  1. আহসান আকাশ (৯৬-০২)

    কতদিন পর!!!

    এই লেখায় করার মত উপযুক্ত কমেন্ট খুঁজে পাচ্ছি না। আমাদের সকলের ভিতর থেকে মানুষগুলো কেমন যেন হারিয়ে যাচ্ছে, আমরা পরিনত হচ্ছি আজব এক চিড়িয়ায়।


    আমি বাংলায় মাতি উল্লাসে, করি বাংলায় হাহাকার
    আমি সব দেখে শুনে, ক্ষেপে গিয়ে করি বাংলায় চিৎকার ৷

    জবাব দিন
  2. রেজা শাওন (০১-০৭)

    জিহাদ ভাই শ্রদ্ধা জানবেন। আর লেখা নিয়ে কি বলবো, আপনি তো আর আজকের কাবিল না, পুরান কাবিল। মেলাদিন পর লিখলেন, এটা কইরেন না। আলসেমি বাদ দেন। লাইনে আসেন।

    জবাব দিন
  3. মোকাব্বির (৯৮-০৪)

    ফার্মগেটে সন্ধ্যা ছয়টার সময় একবার দাড়ায় ছিলাম ক্যান্টনমেন্টের ৪ নম্বর বাসের জন্য। চোখের সামনে দিয়ে দুইটা মৌমাছির চাকের মত ৪ নম্বর যাওয়ার পর দেখি দাদার বয়সী মোটা লেন্সের চশমা পড়া লোক টঙ্গী ব্রীজ যাইব। আমারে জিগায় এইটা কোথায়? উনারে ডাবল ডেকারে বসায় দিয়া আইসিলাম। বাস থেইকা নামার পরে কিছু কৌতুক হইসিলো যেটারে কাকতালীয় বলতে ক্ষ্ট করা লাগে। 😕


    \\\তুমি আসবে বলে, হে স্বাধীনতা
    অবুঝ শিশু হামাগুড়ি দিল পিতামাতার লাশের ওপর।\\\

    জবাব দিন
  4. আমিন (১৯৯৬-২০০২)

    এমন লেখা পড়বার জন্যই মনে হয় ব্লগে আসি। দিনলিপি জাতীয় লেখা ব্লগের মাঝে আমার সবচেয়ে প্রিয়। আর তোর দেখার চোখ লেখার হাতে কত সুন্দর করে কষ্টকর কিছু সত্য বেরিয়ে গেলো।
    আরো রেগুলার লিখতে থাক। তাইলে পড়তে পারি 🙂

    জবাব দিন
  5. সামিউল(২০০৪-১০)

    জিহাদ ভাই বরাবরের মতই অসাধারণ হইসে।
    আসলেই আমাদের মধ্যের 'মানুষ' গুলা হারিয়ে যাচ্ছে। মানুষ খোঁজার দায়িত্ব নিবে কে?


    ... কে হায় হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগাতে ভালবাসে!

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।