আমার বন্ধু হিমেল -১

ওর আসল নাম জানার আগে আমি ওর টিজ নাম টা আগে জেনেছিলাম। ক্লাস সিক্সের কথা। শাহীন কোচিংয়ে ক্যাডেট কোচিং করি তখন। আমি ছিলাম আবাসিক সেকশনে। আর ও অনাবাসিক এ। এডমিশন টেস্টের কয়েক দিন যখন বাকি তখন থেকে আবাসিক অনাবাসিক মিলে একটা ব্যাচ করা হয়েছিল। “বান্দর” এর সাথে পরিচয় হয় তখনই। কেউ আদর করে ডাকতো। আর কেউ ওর সাথে মারামারিতে না পেরে। আমি অবশ্য কোনটা ভেবেই কিছু ডাকতাম না। গোবেচারা, নিরীহ শ্রেণীর মানুষ বলে সবরকম ঝুটঝামেলা থেকে সামলে চলতাম। তবে একদিন আমার সাথেও কথা নেই বার্তা নেই ছোট একটা বিষয় নিয়ে ঝামেলা লেগে গেল। সেদিন থেকে আমিও ওকে বান্দর ডাকা শুরু করলাম। আর হ্যা, তখন থেকে আমিও ওকে দুই চোখে দেখতে পারতাম না।

নিরানব্বই সালের জুন মাসের তিন তারিখের কথা। মাত্রই নতুন পাওয়া রুমে এসে একটু ভয় আর একটু শংকা নিয়ে চারপাশ দেখছি। কাউকেই চিনিনা সেভাবে। একমাত্র চাচা ছাড়া। আমার সারিতে লাস্ট বেডের দিকে চোখ পড়তেই আমি কিছুটা ভিমড়ি খেলাম। জানতাম ওও চান্স পেয়েছে। কিন্তু একই হাউসে একই রুমে পড়বো সেটা আশা করিনি। ওর সাথে চোখাচোখি হতেই আমি চোখ ফিরিয়ে নিলাম। শত্রুর সাথে এত তাড়াতাড়ি সন্ধি?মোটেও না। রুমের বেশিরভাগেরই এটাই বাসা ছেড়ে থাকার প্রথম অভিজ্ঞতা। বারো তের বছরের চেহারাগুলোর দিকে তাকিয়ে সেটা বুঝে নিতে কষ্ট হয়না। আমি নিজে প্রায় পাঁচমাসের মত টাংগাইলে থেকে কোচিং করেছি। তারপরও খারাপ লাগছিল অনেক অনেক বেশি। সবাই যার যার বেডে বসে আছে রোবটের মত। আর মুখ ভার করে মাত্রই ঝেড়ে ফেলে আসা বাসার জীবনের কথা ভাবছে বোধহয়। কিন্তু দেখা গেল কেবল মাত্র একজনেরই চোখ দুটো শুধু অন্য কথা বলছে। সেখানে মন খারাপের অনুভূতিগুলোকে ঝেটিয়ে বিদায় করে ওর স্বভাবসুলভ দুষ্টামিপনা অনেক আগেই জায়গা দখল করে নিয়েছে। সেটা দেখে আমার আরও বেশি মেজাজ খারাপ হল।

কলেজে কয়েকদিন যেতে না যেতেই বুঝে গেলাম এখানে কেউ একা টিকে থাকতে পারেনা। বাঁচতে হলে আমার চারপাশের এই জড়োসড়ো, নিজের মধ্যে গুটিয়ে থাকা মানুষগুলোর পাশাপাশি থেকেই পথ চলতে হবে।সোজা বাংলায় বলতে গেলে ঐ বান্দরটার সাথেও আমাকে মানিয়ে চলতে হবে।ভাবনাটা বিরক্তিকর কিন্তু একসময় সেটাই মেনে চলার চেষ্টা করলাম।সেভেনে থাকতে রুমে ক্রস টকিং পুরোপুরি নিষিদ্ধ। কাজেই মাঝে মাঝে ওর জায়গায় গিয়ে চেয়ারে বসে কথা বলি টুকটাক।ওও আমার জায়গায় বেড়াতে আসে। এইভাবে কয়েকদিন চলার পরেই আমাদের মধ্যে অনেক অমিলের পাশাপাশি বেশ কিছু মিলও বেড়িয়ে পড়লো। আমরা দুজনেই গল্পের বই পড়তে অনেক অনেক বেশি পছন্দ করি। স্বাভাবিক ভাবেই তখন কেমন আছি, ভাল আছি-র পর্ব শেষ করে আমরা বই নিয়ে কথা বলা শুরু করলাম। দুজনেরই ততদিনে মোটামুটি তিন গোয়েন্দার সব ভলিউমই পড়া শেষ। কাজেই আমাদের কথা বার্তার বেশির ভাগ সময় ঘুরেফিরে শুধু তিনগোয়েন্দা আর সেবা প্রকাশনীর বইগুলোই ঘোরাফেরা করতো। হুমায়ুন আহমেদ, জাফর ইকবালও ছিল। পাশাপাশি কিশোর ক্লাসিক আর ওয়েস্টার্ণ বইগুলো। আমরা কমিকস নিয়েও মাঝেসাঝে কথা বলতাম, তবে বেশি না। আমরা ততদিনে বুঝে গেছি আমরা বেশ বড় হয়ে গেছি। কমিকস নিয়ে বেশি কথা বলা এখন ঠিক না।

স্বভাবের বিচারে আমি আর ও ছিলাম একেবারেই উল্টো। ঠিক যেভাবে আমার ক্যাডেট নং এর শেষের 6 টা উল্টে 9 করে দিলে ওর ক্যাডেট নং হয়ে যায়। কিন্তু সব উল্টোমিপনাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে কয়েকদিনের মধ্যেই আমরা ভাল বন্ধু হয়ে গেলাম।

এরপর থেকে আমরা যা কিছু করি সব একসাথে। একসাথে ফলইনে যাওয়া, পাশাপাশি দাঁড়ানো, একাডেমি ব্লকে যাবার সময় একসাথে। আবার প্রেপে, মিল্ক ব্রেকে কিংবা ক্লাস শেষে একসাথে ফেরা। মসজিদে যাওয়া আসার সময়ও একই কথা। কাতারেও দাঁড়াতাম দুইজন পাশাপাশি। দুইজন আলাদা ফর্মে থাকায় যে আগে বের হতো সে একাডেমী ব্লক কিংবা ক্লাসরুমের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতো। পরে দুইজন একসাথে হাঁটা দিতাম।

সেভেনের সেই শুরু থেকেই ওর আর্মিতে যাওয়ার শখ। ওর এত লাফালাফি দেখে সবাই ধরে বেধে ওর নাম দিয়ে দিল জিসি হিমেল। আরও ছিল খেলাধুলা, অ্যাথলেটিক্সের প্রতি দুর্দান্ত রকমের ঝোক।প্রথমদিকে খেলাধুলায় ও চোখে পড়ার মত ভালো ছিলনা। কিন্তু ওর প্রচন্ড রকমের উৎসাহের চোটে সে ঘাটতি কখনো বোঝা যেতনা। কিন্তু শেষমেষ কলেজ থেকে যখন ছয় বছর পর বেরিয়ে যাই তখন সেভেনের সেই শুধু উৎসাহী মানুষটা আমাদের ব্যাচের অন্যতম ভালো স্পোর্টসম্যান হিসেবে পরিচিতি পেয়ে গেছে।

অবশ্য শুধু খেলাধূলাতেই না। গাট্টি বোচকা বেঁধৈ কলেজ জীবন শেষে বেরিয়ে যাবার সময় সাথে যোগ হয়েছিল আরো অনেক কিছু…

(আজকে আর না। হাত ব্যাথা করতেসে 🙁 )

৩৭ টি মন্তব্য : “আমার বন্ধু হিমেল -১”

  1. সামিয়া (৯৯-০৫)

    এমুন আইলসা মানুষ হয়?? লাইনও শেষ করলা না??
    আমি প্রথমে ভাবসিলাম এইটা হাসের বাচ্চা
    ব্যাপার না, তুহিন হিমেল কাছাকাছিই আছে :-B
    অফটপিকঃ হাসের বাচ্চাকে দেখা যায় না ইদানিং?

    জবাব দিন
  2. রাশেদ (৯৯-০৫)

    দোস্ত হিমেলের গল্প শুনতে মন চায় 🙁
    আশা করি সিরিজ শেষ করবি 🙂 আবার আলসেমীর চোটে যদি না শেষ করস তাইলে :chup:
    লেখা ভাল লাগছে :thumbup: :thumbup:


    মানুষ তার স্বপ্নের সমান বড়

    জবাব দিন
  3. তৌফিক (৯৬-০২)

    বুঝলাম, তোরা বাটারবন ছিলি। :grr:

    তোদের জন্য একটা ডুয়েট গানঃ

    জিহাদঃ পৃথিবীর শুরুতে আমি বাটার ছিলাম
    হিমেলঃ পৃথিবীর শেষ বেলাতেও বন থাকবো
    জিহাদঃ আমি বাটার...
    হিমেলঃ আমি বন...
    জিহাদঃ তুমি বন...
    হিমেলঃ আমি বন, আমি বন, আমি বন...

    গানটা "আমি আশিক তুমি প্রিয়া" গানের সুরে গাইতে হবে।

    আমাদের ব্যাচে এইরকম জুটিগুলার নাম ছিল বাটারবন। 😀

    জবাব দিন
  4. তৌফিক (৯৬-০২)

    জিহাদের লেখা নিয়া নতুন করে বলার কিছু নাই। পরের পর্বের জন্য অপেক্ষায় রইলাম। আগের কমেন্ট করার পর মনে হইল সেন্টু খাইতে পারে। খাইলে আগে থেকেই দুঃখিত বইলা রাখি। 🙂

    একটু মজা করলাম আরকি। 😛

    জবাব দিন
  5. হোসেন (৯৯-০৫)

    VD তে(সেক্সুয়াল ট্রান্সমিটেট ডিজিজ নয় 😉 ভ্যালেন্টাইন্স ডে ) হিমেলের সাথে দেখা হইছে। সাকিফের সাথে টিএসসি তে আসছিলো।


    ------------------------------------------------------------------
    কামলা খেটে যাই

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।