পয়েন্ট ফাইভ ডেজার্ট ঈগল কিংবা প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার

১।

কিছু কিছু দিন থাকে আপাতদৃষ্টিতে গুরুত্বহীনভাবে শুরু হয় এবং খুব বেশি গুরুত্ব ছাড়াই শেষ হয়। কিন্তু জীবনের বৃহত্তর ছবিতে স্থায়ী দাগ রেখে যায়। ১৯৯৮ এর সেই বিকেলটা অনেকটা সেরকম একটা দিনের বিকেল। ব্রাজিল ফুটবল দলের কট্টর সমর্থক হিসাবে মনটা সেদিন বিশেষ উদাস। আগের রাতেই স্বাগতিক ফ্রান্সের কাছে বিশ্বকাপ খুইয়েছে দলটা। আমার বাজির ট্রাম্পকার্ড রোনালদো নামক তরুন টেকো ছেলেটা ফাইনালে বাচ্চাদের মত বমি করে ভাসিয়েছে। গোল্ডেন বুটটাও উঠেছে ডেভর সুকার নামক বালকান (ক্রোয়েশিয়ান) ভদ্রলোকের হাতে। হঠাৎ করেই একটা বিশেষ দলের সমর্থকরা চেহারায় “হে হে আমি ফ্রান্সের সমর্থক” লেখা অদৃশ্য প্ল্যাকার্ড ঝুলিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। সমস্যা সেটা না। সমস্যা হলো বন্ধু নামক শ্যালকপুত্র প্রতীকের কাছে বাঁজিতে হেরে দুই লিটার বাইকের জ্বালানি খরচ মিটিয়ে বজলুর দোকানে বসে অল্প চিনি কড়া লিকারের চা খাচ্ছি। অদ্ভূত দৃশ্যটা দেখলাম সেরকম এক সময়ে।

মোমরঙ্গা চামড়ার ছোটখাট গড়নের এক নীলবসনা, স্প্রিন্টার বেন জনসনের রেকর্ড গতি অল্প ব্যবধানে ভেঙ্গে একটা দৌড় লাগিয়েও বাস ধরতে পারল না। হাততালি দেবার মত দৃশ্য। মোমমূর্তি বাস মিস করে পুতুলের মত রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে। একবার ডানে দেখছে, একবার বামে দেখছে, অতঃপর আকাশের দিকে তাকিয়ে হতাশ দৃষ্টি নিক্ষেপ করছে। উপভোগ্য দৃশ্য। কিন্তু এই দৃশ্য আসলে একা উপভোগ করা সম্ভব না। দলবল লাগবে। আজকে দলবল নাই কোন। তাই নিজেও খানিকটা হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়লাম। হতাশার মনোমুগ্ধকর এই ম্যাচে স্কোর যখন বখাটে ছেলে ১- নীলবসনা ১ তখন হুট করে নীলবসনা কেঁদে দিয়ে ধারাভাষ্যে পরিবর্তন এনে ফেলল। কান্নাকাটির কারন অবশ্য যথেষ্ট যৌক্তিক। কারন রাস্তার অপর প্রান্ত হতে রামদা, চাপাতি, রিভলবারে সুসজ্জিত হরতাল সমর্থনকারী দল ব্যাপক উৎসাহ উদ্দীপনার সাথে এগিয়ে আসছে বানের জলের মত। আমজনতা যে যেভাবে পারে চিপাগলিতে ঢুকে পড়ছে। মোমমূর্তি আক্ষরিক অর্থে মূর্তি হয়ে গিয়ে বর্নালীর চার রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে। আমার নালায়েক বিবেক এই অসাবধান মুহূর্তে “নারীকে সর্বদা যে কোন ধরনের সাহায্য সহযোগিতা থেকে বিরত থাকিবে” এই মূলমন্ত্র ভুলে গেল। বাইকটা তিন কিকে চালু করে নীলবসনার পাশে গিয়ে বললাম-

-আপু, কই যাবেন?
-কেন, আপনি জেনে কি করবেন?-শংকিতার জবাব।
-শুনেন আপু। নষ্ট করার মত সময় নাই। এখানে এখন ঐতিহাসিক ক্যাচাল হবে। ২০৯৮ সালে বাচ্চারা সমাজ বইতে “বর্নালীর ক্যাচাল” নামে চ্যাপ্টার পড়বে। কোথায় যাবেন বলেন। বাইকে পৌঁছে দিচ্ছি।
-আশ্চর্য, আমি আপনাকে চিনি না। আপনার বাইকে কেন উঠব ?
-ভাল কথা, রামদা-চাপাতি হাতে লোকগুলাকে চিনেন? এখানে দাঁড়িয়ে থাকলে বৃহত্তর রাজশাহীর চল্লিশ কোনায় আপনার চল্লিশ টুকরা পাওয়া যাবে।

নীলবসনা এতে বেশ ভড়কে গেল। কাঁদো কাঁদো কন্ঠে বলল,

– এই লোক, আপনার কথাবার্তায় তো আপনাকে সন্ত্রাসী লাগে। এভাবে কথা বলেন কেন আমার সাথে?

নীলবসনা আরো কিছু বলতে চাচ্ছিল কিন্তু তার আগেই খুব কাছে বিকট শব্দে একটা ককটেল ফুটল। ব্যাপারটা বেশ ভাল হলো। নীলবসনা তড়াক করে বাইকে উঠে বসল। উঠে বলল-

-এই লোক, চলেন তাড়াতাড়ি। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

আমি অবাক হয়ে পিছনে তাকালাম।

-আরে তাকিয়ে আছেন কেন? তাড়াতাড়ি চালান।

ছোট একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আমি বাইক ঘুরিয়ে হেতেম খাঁ মোড়ের দিকে রওনা হলাম। রাস্তায় বিশেষ কথা হলো না। আশা করছিলাম নায়কোচিত এই মুহূর্তটা অন্তত কোন বন্ধু দেখে ফেলুক। বন্ধুমহলে দাম হালকা পাতলা বাড়ে তাহলে। কেউ দেখল না। পথে শুধু একজোড়া বাক্য বিনিময় হলো।

-এই হরতালের দিনে মেয়ে মানুষ বাইরে বের হয়েছেন কেন?
– টিউশনি করাই তো।

নিজ ক্যাম্পাসের সীমানায় ঢুকে নীলবসনা বিড়ালবেশ ছেড়ে বাঘিনীবেশ ধরলেন। আদেশের সুরে হলের দিক নির্দেশনা দিতে লাগলেন। এসে পড়লাম হলের সামনে। নীলবসনা নেমে ধন্যবাদ জ্ঞাপনপূর্বক প্রস্থান করার আগেই প্রশ্ন করলাম-
– আপনি কোন ডিপার্টমেন্টে পড়েন ?
– চারুকলা, প্রথম বর্ষ।
– ও, আপনার নামটা ?
-অন্তু। আচ্ছা আপনি কোথায় পড়েন ?
– আমি…আমি ইন্টার দিলাম।

নীলবসনা গম্ভীর মূর্তি ছেড়ে হঠাৎ ফিক করে হেসে দিল। হাসি শুরু হলো, শেষ হলো না। “কি ভয়টাই না পেয়েছিলেন তিনি” এই মর্মে বক্তৃতা দিতে থাকলেন। হাসির উজ্জ্বলতা বাড়তে থাকে। একসময় আমাকে হতভম্ব রেখে নীলবসনা প্রস্থান করে। চারপাশে রেখে যায় অদ্ভূত নীল এক উজ্জ্বলতা। সালোক-সংশ্লেষন প্রক্রিয়ায় সেই নীল আলো আস্বাদন করতে গিয়ে নীলবসনাকে অদ্ভূত একটা তথ্য দেয়া হলো না। আমার নামও অন্তু।

 

২।

কাহিনীর এ পর্যায়ে এসে আমার সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ন কিছু তথ্য দেয়া দরকার। বলা হয়ে থাকে এ দেশে মন্ত্রী-এমপি কিংবা রাজনীতিবিদদের চেয়ে গুরুত্বপূর্ন ব্যক্তি তাদের ভাতিজা-ভাগিনা কিংবা শ্যালক। সেদিক দিয়ে ভাবলে আমি রাজশাহী নগরীর বেশ গুরুত্বপূর্ন ব্যক্তিত্ব। তৎকালীন মেয়রের একমাত্র ভাগ্নে। মামা ঝানু রাজনীতিবিদ। বড় শহরগুলোকে রাজনৈতিক মুখ খুব তাড়াতাড়ি পরিবর্তন হয়, নতুন মুখ আসে। আমার মামার তৎপরতার কারনে তার বিপুল জনপ্রিয়তা ডিঙ্গিয়ে রাজশাহী কখনো নতুন নেতার মুখ দেখে না।

মামার হাতের দৈর্ঘ্য জানলেন পাঠক। এরপর উচ্চ মাধ্যমিক ফেল করতে করতে বেঁচে যাওয়া এই আমি কিভাবে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার সুযোগ পেয়ে গেলাম সেটা বিজ্ঞ পাঠককে আশা করি বলে না দিলেও চলবে। যে বিষয়ে ভর্তি হলাম সেটা হলো চারুকলা।

আমাদের ব্যাচ অর্থ্যাৎ চারুকলা ’৯৮ এর ছেলেমেয়েগুলো একেকজন একেক কিসিমের ছিল। সবার বিশেষ বিশেষ অদ্ভূত চারিত্রিক গুনাবলী রয়েছে। কিন্তু এদের মধ্যে যে চরিত্রটা আমাকে সবসময় টানত সেটা হলো অন্তু। অন্তু মেয়েটা প্রথম বর্ষে অকৃতকার্য হয়ে আমাদের সাথে পড়ে। আমাদের বিভাগে অকৃতকার্য হওয়া বেশ কঠিন। জানিনা কিভাবে মেয়েটা এই সুকঠিন কার্য সম্পন্ন করতে সমর্থ হয়েছিল। কিন্তু এই কাজ সম্পাদনের লজ্জায় সে সারাদিন কুঁকড়ে থাকত। চারুকলা এই বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে প্রানোচ্ছ্বল বিভাগগুলোর একটা। অথচ এই বিভাগে পড়ে মেয়েটা সারাদিন মনমরা হয়ে থাকত। প্রচন্ড দৃষ্টিকটু লাগত ব্যাপারটা। আমার রাগ লাগত ক্লাসের ভদ্রজনতার উপর। আমি সক্রিয় রাজনীতির সাথে জড়িত, পারতপক্ষে সবাই আমাকে এড়িয়ে চলে। কিন্তু “নোংরা” রাজনীতি এড়িয়ে চলাদের চোখে কি বিষন্ন মেয়েটাকে পড়ে না? তাদের কি বিবেক বলে না মেয়েটাকে নিজেদের সাথে মিশিয়ে নিতে?

কেউ সাহায্য করল না, আমিও না। মেয়েটা নিজের দেয়াল নিজেই একদিন ভাংলো। চৈত্রের শেষ বিকালে ডিপার্টমেন্টের সামনে আলপনা আঁকছিলাম। কোন এক মুহূর্তে জায়গাটা নির্জন হয়ে গিয়ে এমন অবস্থা দাঁড়াল যে শুধু আমরা দু’জন আছি। আমি আড়চোখে বারবার অন্তুকে দেখছি। মাঝে মাঝে ধরা পড়ে চোখ নামিয়ে নিচ্ছি। অপরাধবোধ কাটতে আমার দু সেকেন্ড লাগে। আবার দেখছি। মেয়েটা গভীর মনযোগ দিয়ে আল্পনা আঁকছে। ওর পূর্ব অভিজ্ঞতা আছে। আমার এটা প্রথম। চৈত্রতাপে ওর মুখমন্ডল ঘেমে ঘাম নাকের ডগায় এসে জমা হচ্ছে। নিয়মিত বিরতিতে ঝরে পড়ে আল্পনার রঙ বারবার লঘু করে দিচ্ছে। মেয়েটা বিরক্ত হচ্ছে না। বারবার নতুন করে করছে। প্রতিবারই আগের থেকে বেশি যত্ন নিয়ে। একটা অস্বস্তিকর নিরবতা কাজ করছিল। সেটা ও ভাঙল আমি চোরা দৃষ্টি দিতে গিয়ে নবমবার ধরা খাবার পর।

-এই ছেলে, তুমি এরকম লুইস প্রজাতির কেন? অসভ্যের মত তাকিয়ে আছো। তুমি জানো না আমি তোমার থেকে বড়?
– লুইস প্রজাতিটা কি?
– লুইস বুঝো না? সোজা বাংলায় “লুইচ্চা”। আল্লাহর ওয়াস্তে তো টং এর সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় কোন মেয়েকে রেহাই দাও না দেখি। তোমরা যারা পলিটিক্স করো তারা এমন বখাটে হয়ে যাও কেন?
– শুনো, সবকিছুর ভিতর পলিটিক্স আনবা না। আমি ছোটবেলা থেকেই এরকম।
-হ্যাঁ, সেটা চেহারা দেখলেই বোঝা যায়।
-আমার চেহারা নিয়ে কিছু বললা নাকি?

মেয়েটা কিছুক্ষন বিরক্তির সহিত তাকিয়ে থেকে “ এর সাথে কথা বাড়িয়ে লাভ নেই” টাইপ একটা দৃষ্টিক্ষেপন করে নিজের কাজে মন দিল। আমি একবার অন্তুর আল্পনার দিকে তাকালাম, একবার নিজেরটা দেখলাম। ওর আল্পনা দেখার পর আমারটা দেখলে মনে হচ্ছে তেলাপোকার পায়ে রঙ মাখিয়ে ছেড়ে দেয়া হয়েছে। বৃথা কষ্ট না করে তুলি রেখে চুপচাপ বসে ছিলাম। এতে সে ভাবল আমি মন খারাপ করেছি।

– শোন, তাকাবা ভাল কথা, ছেলে হয়ে নিশ্চয় ছেলের দিকে তাকাবা না। কিন্তু ইভটিজিং কেন করো? যখন করো তখন মেয়েটার মনের অবস্থা কি হয় জানা আছে? ইভটিজিং করার আগে মেয়েটাকে একবার নিজের বোন ভাবা যায় না?
– নাহ। ; আমি ভেবেচিন্তে জবাব দিলাম।

মুহূর্তে তরুনীর করুনার ঝুলি ছিদ্র হয়ে গেল। সশব্দে “হ্যাঠ” জাতীয় একটা ধ্বনি ছুটিয়ে দৃশ্যপট থেকে প্রস্থান করলেন।

 

৩।

 

কঠিন বজ্জাত লোকেরাও মাঝে মাঝে কিছু কাজ করে অনুতাপে জিহবা কামড়ায়। অন্তুর সাথে আমার পরেরবার যেদিন কনফ্রন্টেশন হলো সেবার সেরকম একটা পরিস্থিতি তৈরী হলো। অন্তু সেদিন নতুন একটা ড্রেস পরে আমার আড্ডাখানা টং এর পাশ দিয়ে হলে ফিরছিল। নতুন কাপড়ের কারনে পিছন থেকে চিনতে না পেরে নবাগতা ভেবে ইভটিজিং করে দিলাম। বিদ্রোহী রমনী আমার কন্ঠ চিনতে পেরেই কিনা কে জানে, তড়াক করে উলটো ঘুরে সাঁই সাঁই করে আমার সামনে চলে এল। আমার আত্মার পানি শুকিয়ে সাহারা-কালাহারি মরুভূমি হয়ে গেল।

ভেবেছিলাম মেয়েটা থাপ্পড় দিবে। দিল না। কিন্তু যে ঘৃনার দৃষ্টি নিক্ষেপ করে গেল তা থাপ্পড়ের থেকেও অপমানের। পরবর্তী দু’ঘন্টা মেয়ের পিছু ঘুরঘুর করলাম। নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে। দুইঘন্টা পর তাকে একা পেলাম। চেহারায় মাছ খেতে গিয়ে ধরা পড়া বিড়ালের দৃষ্টি এনে এগিয়ে গিয়ে মিনমিন করে বললাম

-আসলে আমি বুঝি নাই এটা তুমি।
সাথে সাথে বিদ্রোহিনী বাঁজখাই কন্ঠে চিৎকার করে উঠলেন,
– “তুমি” কি? ঐ ছ্যামড়া, সেদিনকার ছোকরা। “তুমি” কি? আমি ক্যাম্পাসে তোর কতদিন আগে থেকে আছি জানিস? সেদিনকার ছোকরা……
– ইয়ে মানে, শোন…
– চোপ ! এখন থেকে আপনি করে ডাকবি। বলবি “বড় আপু”। বল কি বলবি?
– জ্বী, বড় আপু।
– মনে থাকে যেন। আর ভবিষ্যতে কাউকে ইভটিজিং করতে দেখলে এক থাপ্পড়ে বত্রিশটা দাঁত ফেলে দিব। বেয়াদব কোথাকার!

আরো কি কি তিরস্কার করে যেন বিদ্রোহিনী বিদায় নিলেন। আমি পরের কথাগুলো ঠিক ধরতে পারলাম না। এক থাপ্পড়ে বত্রিশ দাঁত ফেলে দেয়া শীর্ষক বক্তব্যে আটকে গিয়ে আপনমনে জিহবা দিয়ে দাঁত গুনতে লাগলাম। সর্বসাকুল্যে আটাশটা দাঁত আবিষ্কার করে বাকি চারটা দাঁতের শোকে মুহ্যমান হয়ে পড়লাম।

যা হোক, এরপর মেয়েটার সাথে বহুদিন আর কোন কথা হয়নি। এমন না যে আমি ইভটিজিং ছেড়ে দিয়েছিলাম। বরং একবার ইভটিজিং করে মামলায় ফেঁসে যাওয়ার উপক্রম হই। অভিভাবকদের হস্তক্ষেপে রেহাই পাই সেবার। এই ঘটনার পর থেকে অন্তুর চোখের দিকে তাকাতে লজ্জা লাগত। আর এই পুরো ব্যাপারটায় সে ভীষন মজা পেত। আমাকে দেখলেই তাচ্ছিল্যের হাসি দিত। আর আমারও এই বিষয়গুলো নিয়ে ভাবার সময়ের সংকট হতে লাগল। জাতীয় নির্বাচন এগিয়ে আসছিল। দলকে সময় দেয়া লাগত। দ্বিতীয় বর্ষে হলের গুরুত্বপূর্ন একটা রাজনৈতিক পদেও ছিলাম। সব মিলিয়ে সময় অল্প।

মেয়েটার সাথে আমার দীর্ঘ কথাবিরতির ছেদ যেদিন হলো সেদিন মহাকালের হিসাবে বিশেষ একটা দিন ছিল। দ্বিতীয় সহস্রাব্দের শেষ দিন। ৩১ ডিসেম্বর, ১৯৯৯। ঘটনাটা বেশ নাটকীয়। কক্সবাজার শিক্ষাসফর শেষে আমাদের চারুকলা’৯৮ ব্যাচ সকলে রাজশাহী ফিরে যাবার সময় ভুল করে অন্তুকে ফেলে রেখে যায়। আমি একদিন আগেই ফিরে এসে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে বন্ধুর হলে অবস্থান করছিলাম। বন্ধু গুরুস্থানীয় লোক। কথা দিয়েছে বার্মিজ এলকোহল এর স্বাদ এবং অনুভূতির সাথে পার্থিব কোঙ্কিছুর তুলনা নাই। যা হোক, আমার ভার্সিটি বন্ধু আসাদ টেলিফোন মারফত জানাল অন্তু নামক মেয়েটা অসহায়ের মত চিটাগাং শহরের এমাথা-ওমাথা ঘুরে বেড়াচ্ছে আর কান্নাকাটি করছে।

অন্তু এবং ভাগ্য উভয়কে কঠিন কিছু গালাগালি করে মস্তিষ্কের ভিতর বার্মিজ পানীয়ের আগুনে ছাইচাপা দিয়ে রওনা হলাম। চিটাগাং স্টেশনে যখন অন্তুকে আবিষ্কার করলাম, তাকে দেখে মনে হলো একবেলায় সে শুকিয়ে অর্ধেক হয়েছে। আমাকে দেখে অন্তু মেয়েটা যে চাহনি দিল সেটা ভোলার নয়। দিকহারা নাবিক দিগন্তে চরের রেখা দেখলে হয়ত এরকম চাহনি দেয়। চিটাগং টু ঢাকা জার্নিটা খুব গম্ভীরভাবে কাটল। বার্মিজ এলকোহল পান না করতে পারার আগুন নিভছে না। খুব প্রয়োজন ছাড়া কথাবার্তা বললাম না। টুকটাক ফরমায়েশ খাটা লেগেছে অবশ্য। মেয়েটা শারিরীকভাবে কাব্যিক মানের দূর্বল। নতুন বোতলের মুখ খোলা, চিপস বা চকোলেট প্যাকেটের মুখ খোলা ইত্যাদি নিরীহদর্শন কাজ করতে তার ছুরি কাঁচি-নেইলকাটার বিভিন্ন মারনাস্ত্রের দরকার পড়ে। আপাতত যেহেতু সেগুলা নাই, আমিই পার্টটাইম মারনাস্ত্র হিসাবে কাজ করছিলাম। ইচ্ছা ছিল ঢাকা পৌছেই মেয়েটাকে কোনমতে বাড়ি পৌছে দিয়ে হালকা হবো। ফুসফুসটা অনেক্ষন নিকোটিন পায়নি। অদ্ভূত ব্যাপার হলো মেয়েটা বাড়ি গেল না। সরাসরি আমার সাথে রাজশাহীগামী সিল্কসিটি এক্সপ্রেসে উঠে পড়ল।

ট্রেনে পাশাপাশি বসাও এক জ্বালা। যে মেয়েটার জন্য বিগত আটঘন্টা ফুসফুস নিকোটিনের ছোয়া পায়নি সে যখন বলে, “ তোমার পাশে বসব না, তোমার গায়ে রিকশাওয়ালাদের মত সিগারেটের গন্ধ” তখন ইচ্ছা করে তেনজিং শেরপার সাহায্য নিয়ে মাউন্ট এভারেস্ট জয় করে উপর থেকে লাফিয়ে পড়তে। যা হোক, আমি মেয়েটাকে পরামর্শ দিলাম দাঁড়িয়ে থাকতে। এতে করে সুন্দর একটা ব্যাপার হলো। মেয়েটা কথা বলা বন্ধ করে জানালার পানে মুখ ফিরিয়ে বসে রইল।

সারাটাদিন প্রচন্ড ধকল গিয়েছিল। মান অভিমানের এই ক্লান্ত মুহূর্তে একটু ঘুমিয়ে পড়েছিলাম । ঘুম ভাঙল কাঁধে স্পর্শ পেয়ে। চোখ খুলে দেখি অন্তু মেয়েটা কাঁধে মাথা রেখেছে। ঘুমিয়ে আছে হয়ত। তখন মধ্যরাত। মধ্যরাতে অদ্ভূত সব ঘটনা ঘটে। মানুষের মন মানুষকে অদ্ভূত সব স্বপ্ন দেখায়। ভেবে পেলাম না মেয়েটার মাথা খারাপ হয়েছে নাকি আমার। শেষ যে মুহূর্ত মনে করতে পারি তখন পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধ চলছিল। বিস্ময়জনিত ঘোর কাটার পর বুঝলাম মেয়েটা আমার কাঁধে মাথা রেখে কাঁপছে। কিছুক্ষন ইতস্তত করে অন্তুর কপালে হাত রাখলাম। যা ভেবেছি তাই। জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছে। মেয়েটা চেতনা-অবচেতনার মাঝামাঝি পর্যায়ে আছে। বহুকাল পর হঠাৎ সেই গভীর রাতে ডিসেম্বরের সর্পিল শীতল বাতাস কেটে ছুটে চলা রাতের ট্রেনে আমি হঠাৎ প্রচন্ড অসহায় বোধ করলাম। ব্যাকপ্যাক থেকে একটা ব্ল্যাঙ্কেট বের করে অন্তুকে জড়িয়ে দিলাম।

জানালা দিয়ে বাইরের আবছা আলো আঁধারির আকাশ দেখা যায়। পাশের কোন বগিতে একদল তরুন সশব্দে তৃতীয় সহস্রাব্দকে বরন করে নিচ্ছে। মহাকালের বিশেষ এই ক্ষনে ট্রেনের ভিতর জ্বলতে থাকা আবছা আলোয় ধবধবে সাদা কম্বল মোড়ানো আমার কাঁধে মাথা রাখা তরুনীকে আমার গ্রীক দেবী বলে ভ্রম হয়।

 

৪।

 

একবিংশ শতাব্দীর সূচনালগ্নে, জীববিজ্ঞানীরা যখন প্রথম ক্লোন মানবশিশু জন্মদানের দ্বারপ্রান্তে, আমেরিকা যখন ইরাক আক্রমনের দ্বারপ্রান্তে, সিডনি যখন মাতছে ১২,৬০০ ক্রীড়াবিদের ক্রীড়ানৈপূন্যে, ঠিক সেরকম একটা সময়ে আমার জগত খুব সুনির্দিষ্ট দুই ভাগে ভাগ হয়ে গেল। তার একটা ভাগের নাম অন্তু। জীবনে প্রথম প্রথম তখন নারীকে ইভটিজিং এর বস্তু বাদে অন্য কোন একটা ব্যাপার মনে হতে শুরু করেছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের আপাতদৃষ্টিতে বিরক্তিকর দিনগুলোতে হঠাৎ ভাল লাগার হাওয়া লাগল। কোনদিন ক্লাস শেষে, কোনদিন ক্লাস বাঙ্ক করে অন্তুকে বাইকের পিছনে চড়িয়ে চলে যাওয়া হতো অদ্ভূত অদ্ভূত জায়গায়। তারপর হিসাবহীন সময় কাটত। আমাদের একটা নিয়ম ছিল। সাথে কোন ঘড়ি থাকবে না, ফেরার কোন তাড়া থাকবে না। কোন কোন দিন নাওয়া খাওয়া বাদ দিয়ে সন্ন্যাসী হয়ে যেতাম দুজন সন্ধ্যা পর্যন্ত। সন্ধ্যায় ফিরতাম। আমাদের প্রিয় জায়গা ছিল পদ্মাপাড়। জনবহুলটা নয়, সুনশান নীরব সিমলা পাড়। মহিলা অন্তুর মধ্যে একজন মহিলা এরিস্টটল বসবাস করত। সেই মহিলা এরিস্টটল কিছুক্ষন গল্প করত, কিছুক্ষন জ্ঞান দিত। বেশিরভাগ সময়ই নীরব থাকত। নীরবতা ভাঙলে অদ্ভূত অদ্ভূত সব তত্ত্ব দিত। কিছু তত্ত্ব নিম্নরুপঃ

(১) এমিবা তত্ত্বঃ মাধ্যমিকে সাধারন বিজ্ঞান বইতে জেনেছিলাম পৃথিবীর প্রাচীনতম জীব এমিবা। সেই এককোষী পেটুক এমিবা আজ খেতে খেতে পদ্মা নদী বানিয়ে ফেলেছে। পদ্মা আসলে বিরাট আকৃতির এক এমিবা। যে ঢেউগুলো আমরা দেখি সেগুলো আসলে তার ক্ষনপদ। বিশাল এমিবার মাঝে মাঝে ক্ষুধা লাগলে সে পিনোসাইটোসিস প্রক্রিয়ায় দু’একটা মাছ ধরা ট্রলার খেয়ে ফেলে।

এখানে আমার একটা প্রশ্ন ছিল। বিশাল এই পদ্মা জাতীয় এমিবা নির্বাচনে কোন এমিবা কেন্দ্র থেকে মূল্যবান ভোট দেয়? রাজশাহী, নাটোর, পাবনা নাকি কুষ্টিয়া? প্রশ্ন শেষ হবার আগেই এরিস্টটল পরবর্তী তত্ত্ব আবিস্কারে উদাস হয়ে যাওয়ায় জানা হয়নি।

(২) লেডিস ফার্স্ট তত্ত্বঃ প্রাচীনকালে কোন এক রাজ্যে এক প্রজা রাজকন্যাকে ভালবেসে ফেলেছিল। রাজকন্যাও বাঁধভাঙ্গা প্রেমের টান উপেক্ষা না করতে পেরে প্রজাকে যুগপৎ ভালবেসে ফেলে। তাদের ভালবাসা চলতে লাগল। অনেক সুখের মুহূর্ত কাটাবার পর মহাজাগতিক নিয়মে দুঃখ এল। রাজপরিবারে জানাজানি হয়ে গেল। অতঃপর প্রেমিক-প্রেমিকা সিদ্ধান্ত নিল একসাথে বাঁচতে না পারলেও একসাথে মরা সম্ভব। তারা সুউচ্চ পাহাড়চূড়ায় উঠল আত্মহুতি দিতে। রাজকন্যা প্রথমে আত্মহুতি দিতে গেলে প্রেমিক তাকে থামিয়ে দেয় সহ্য করতে না পেরে। কথা হয় প্রেমিক আগে লাফ দিবে। অতঃপর প্রেমিকা। কথা অনুযায়ী পাহাড় থেকে লম্ফ দিয়ে আত্মহুতি প্রেমিক তাদের প্রেমকে অমর করে ফেলল। রাজকন্যা এরপর ভাবল প্রেম তো অমর হয়েই গেছে, এখন শুধু শুধু একটা এক্সট্রা জীবন নষ্ট করা অপচয়। সে পরিবারে ফিরে গিয়ে বিবাহ করল। সুখে শান্তিতে বসবাস করতে লাগল। প্রেমিকের অতৃপ্ত আত্মা এসে এক সন্ন্যাসীকে গুরুত্বপূর্ন তত্ত্ব দিয়ে গেল। “ নারীকে প্রথমে সুযোগ দাও।“

 

(৩) বাঘ তত্ত্বঃ এটা এক লাইনের তত্ত্ব। মশা আসলে একটা বাঘ। ছোট সাইজের বাঘ। হালুম না করে পিন পিন করে। মশা যে বাঘ তার বড় প্রমান হলো মশাও বাঘের মত মানুষের রক্ত খায়। রয়েল বেঙ্গল টাইগারের গায়ে হলুদ-কালো স্ট্রাইপ থাকে আর রয়েল বেঙ্গল মশার গায়ে সাদা-কালো স্ট্রাইপ থাকে। আমি প্রশ্ন করেছিলাম সাদা কালো স্ট্রাইপ তো জেব্রার থাকে। তাহলে মশা জেব্রা নয় কেন অথবা মশা ভ্যাম্পায়ার নয় কেন? সে উড়িয়ে দিয়ে জানাল ভ্যাম্পায়ার বলে কিছু নাই। সব গুজব।

 

ক্ষনজন্মা এই রমনী যখন ইতিহাস, ভূগোল কিংবা জীববিজ্ঞানের কালজয়ী তত্ত্বগুলো আমার কাছে উন্মোচন করত, ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের পাশ ঘেঁষা সিমলা পাড়ে জলজ বাতাসেরা তখন নিঃশব্দে সখ্যতা করত কাশফুলের সাথে। পদ্মার বুক চিরে সীমান্তরক্ষীদের  স্পিডবোট ছুটে যেত মাঝে মাঝে। রুক্ষ বাতাসের দল সীমান্তের তারকাটায় ধাতব শব্দ তুলত। সে ধাতব শব্দে মিশে আছে অনেক করুন আর্তনাদ। যেটা আমি শুনতে পেয়েছিলাম সে বিকাল থেকে অনেককাল পরে। অদৃশ্য ছিন্নভিন্ন ধর্ষিতা পতাকাটা দৃষ্টিগোচর হয়েছিল বহু পরে। সে ব্যাপার নিয়ে অন্য আরেকদিন বলা যাবে।

৫।

একবিংশ শতাব্দীর শুরুতে আমার হৃদয় যে দুভাগে ভাগ হয়ে গিয়েছিল তার একভাগে মহিলা এরিস্টটলের বিস্তৃতির কথা বলেছি। অন্য যে অর্ধাংশ, সেটা জুড়ে ছিল ছাত্র রাজনীতি। ২০০০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে বিশ্ববিদ্যালয় কমিটি ঘোষনা করা হয়। হল কমিটি থেকে পদোন্নতি পেয়ে কেন্দ্রীয় কমিটিতে স্থান পাই। তৃতীয় বর্ষের ছাত্রের কেন্দ্রীয় জেলা কমিটিতে অবস্থান অনেককে ঈর্ষান্বিত করে, অনেককে করে বিচলিত। আমার অবস্থার পরিবর্তন ঘটে। প্রস্তর যুগের অস্ত্রের জায়গা দখল করে দূরপাল্লার অস্ত্র।

ডিসেম্বর মাসে ছাত্রদের কথা বলার জন্য হলের বরাদ্দ হলের একমাত্র ল্যান্ডলাইন অলিখিত নিয়মে আমার হয়ে যায়। হলের বাকি ছাত্রজনতা টেলিফোনে বাসায় দু’মিনিট কথা বলার আশা আজীবনের মত ছেড়ে দেয়। ডিসেম্বর এবং জানুয়ারী মাস ছিল আমার এবং অন্তুর “টেলিযোগাযোগ মাস”। আমার প্রচন্ড রাজনৈতিক ব্যস্ততা, পরীক্ষা সব মিলিয়ে দিনে সময় কাটানো সম্ভব হতো না একসাথে। রাতে কথা হত অবিরাম। মহিলা এরিস্টটল সামনা সামনি চুপচাপ হলেও টেলিমাধ্যমে বেশ স্বতস্ফূর্ত। একদমে ঘন্টা দুয়েক কথা বলে ফেলতে পারেন। আমি সচরাচর আবহাওয়াগত কষ্টের ক্ষেত্রে কম সহনশীল। তবে মহিলা এরিস্টটলের সাথে কথা বলার জন্য ডিসেম্বরের কনকনে শীত আর হলের বারান্দার কমান্ডো ট্রেনিংপ্রাপ্ত মশার কামড় সহ্য করে নিতাম কিভাবে যেন। মাঝরাতে ঝিঁঝিঁপোকার ডাক, নিরবতা চেরা ট্রেনের হুইসেলের সাথে রিনঝিন কন্ঠ মস্তিষ্কে বিভিন্ন অচেনা অজানা হরমোনের নিঃসরন ঘটাতো।

মহিলা এরিস্টটলের দার্শনিক প্রতিভা সম্পর্কে জানতাম। এছাড়াও সে যে বিস্তর প্রতিভার অধিকারিনী এটা আমি না জানলেও পুরো ভার্সিটি জানত। সে বিশ্ববিদ্যালয় নাট্যগোষ্ঠীর সবচেয়ে পরিচিত এবং জনপ্রিয় অভিনেত্রী এটা জেনেছিলাম বিজয় দিবস নাট্যোৎসবে। এছাড়াও তার ছয় তারের সুরযন্ত্রে বিশেষ পারদর্শিতা এবং সঙ্গীতে জাতীয় পুরস্কার রয়েছে। তথ্যগুলো জানার পর বুঝলাম আমাদের সম্পর্কটা আসলে সুষম নয়। তার কাছে আমার সকল অর্জন শ’বার বলা হয়ে গেছে। অথচ তার কোন অর্জন সম্পর্কে আমার জানা নাই।

ফেব্রুয়ারী মাসটা ছিল সম্পর্ক সুষম করার মাস। তার সকল অর্জন সম্পর্কে জানতে গিয়ে নতুন তথ্য বের হলো। স্কুলে সে এথলেটিক্স করত। ২০০ মিটার স্প্রিন্টে চ্যাম্পিয়ন। অদ্ভূত ব্যাপার হলো আমি নিজেও স্কুলে ২০০ মিটার স্প্রিন্টে চ্যাম্পিয়ন ছিলাম। ১৪ই ফেব্রুয়ারী অনেকে মালা বদল করে, আমরা মেডেল বদল করলাম। সম্পর্কটা একসময় অতি সুষম হয়ে গেল। লেডি এরিস্টটল কাম লেডি লেনন কাম লেডি মারিয়ান জোন্সের ক্ষুদ্র বপুর প্রতিটা কোষ এতটা পরিচিত হয়ে গেল যে সকালে তার সাথে দেখা হলে, রাতে তাকে ঠিক কতগুলো মশা কামড়েছে বুঝে ফেলতে লাগলাম।

১৬ই ফেব্রুয়ারী অন্তুকে বাইকের পিছনে বসিয়ে আনন্দ ভ্রমনের সময় বাইক উলটে আমার ডানহাতের টারসাল-মেটাটারসাল কি যেন হেন তেন ভেঙ্গে ফেললাম। অন্তু অলৌকিকভাবে অক্ষত থাকে। মাস দেড়েক লাগে আমার ঠিক হতে। তিনদিন হাসপাতালে ছিলাম মাথায় চোট লেগেছে আশঙ্কায়। এই তিনদিন বেশিরভাগ সময়ই চেতনা ছিল না। যতবারই জেগেছি দেখেছি কপালে ছোট একটা হাত রেখে বিষন্ন বদনে একজন বসে আছে। আমি কবি হলে নিশ্চয় গোধুলী রঙ লাগা ঐ বিষন্ন ফোলা ফোলা গালটা নিয়ে লিখতাম। ইচ্ছে হত আরো দু-চারটা হাড় ভেঙ্গে যাক, মেয়েটা আরো বিষন্ন হয়ে যাক, গোধুলীটা আরো লালচে হয়ে যাক। আমার পরিবারের কঠিন তিরস্কারের পরও মেয়েটা তিনদিন আমার কেবিন ছেড়ে যায়নি। আমার মা মেয়েটা সম্পর্কে পরে আমার কাছে খোঁজ নেন। ঢাকায় বাড়ি শুনে খুশি হয়ে বলেন, “ভালই তো দেখতে”।

২০০১ সালে “সাম্প্রতিক ঘটনাবলী” বিষয়ে বেশ দূর্বল হয়ে গিয়েছিলাম। অনেকটা এখনকার গ্রামীনফোন ইন্টারনেট সংযোগ কিংবা ইন্টারনেট এক্সপ্লোরার ব্রাউজারের মত শ্লথ গতিতে দুনিয়ার যাবতীয় সংবাদ আমার কাছে আসত। আমাকে এবং অন্তুকে নিয়ে ক্যাম্পাসে বিভিন্ন কুৎসা রটে আছে। কয়েকটা হোটেলের নাম স্পেসিফিকভাবেও নাকি শোনা যেত। জানতে দেরি হয়ে গেল। জানলাম যেদিন অন্তু রাস্তায় বাজে মন্তব্য শুনে কাঁদতে কাঁদতে হলে ফিরল। বিছানার নীচ থেকে ফুটখানেক আকৃতির ধারালো অস্ত্র সে রাতে বের করে মন্তব্যকারীর কাঁধে ধরে বলেছিলাম, “আবার বল”। মন্তব্যকারীর হার্টের থেকেও দূর্বল ছিল তার ব্লাডার। জুনিয়র রুমমেটদের সামনে মন্তব্যকারী লজ্জাজনক পরিস্থিতির সৃষ্টি করল।

৬।

ঘন্টাখানেক হয়ে গেল সিমলা পাড়ে বসে আছি। অথচ নতুন কোন তত্ত্ব আসেনি। চিন্তার বিষয়। লক্ষনটা বিশেষ ভাল না। নীরবতা ভাঙলাম আমি। গলা খাঁকারি দিয়ে বললাম,

-কিরে, কিছু বলবি না?
– হ্যাঁ বলব।
– ওকে, শ্যুট।
– মাংসের কেজি কত করে?
– আশ্চর্য, আমি জানব কিভাবে !
– কসাই মাংসের নাম না জানলে ব্যবসা চলবে কিভাবে? দেশের আর্থ-সামাজিক খাতে প্রভাব পড়বে না?
-কসাই কে?
-রামদা চা-পাতি হাতে ঘুরো আর কসাই চিনো না। তাড়াতাড়ি মাংসের দাম বলে ফুটো এখান থেকে।
– শুকরের মাংস ফ্রি আফা। আমার দোকানে আমন্ত্রন রইল।

মহিলা দার্শনিক ঠোঁট উলটে গম্ভীর রুপ ধারন করে আবার উল্টোদিকে ফিরে বসে রইলেন।

– বারবার ঐদিকে ফিরে বসছিস কেন? অ্যাম আই ঠু হ্যান্ডসাম টু স্টেয়ার এট?
– নাহ, কালো মানুষের দিকে তাকাইলে আমার চোখে ব্যাথা হয়।
– আমার কালো হওয়ার পিছনে ইতিহাস তোকে বলেছি?
-নাহ।
– তাহলে শোন। সৃষ্টিকর্তা যখন আমাদের জেনারেশন তৈরী করছিলেন তখন বৃহত্তর রাজশাহী আর ঢাকা  পাশাপাশি লাইনে ছিল। খুলনা লাইনের সব মেয়েগুলো আমার পিছে লাইন মারলেও ঢাকা লাইনের অপ্সরীরা খুব ভাবে ছিল। তার মধ্যে দেখি কালো পেত্নির মত এক মেয়ে কাঁদছে। তখন আমি সৃষ্টিকর্তাকে রিকোয়েস্ট করলাম যে, “ রব, আমার ড্যাশিং লুকটা না হয় পুওর গার্লটাকেই দাও। আমার তো অন্তরাত্মাও ড্যাশিং। ছেলে তো, পুশিয়ে নিব। সৃষ্টিকতা বললেন, “হে বান্দা, তোমার উড বি প্যারেন্টস তো তোমার নাম ঠিক করে ফেলেছে। এখন রঙ পরিবর্তন করলে মেয়ের নামও পরিবর্তন হয়ে তোমার নাম হয়ে যাবে”। আমি বললাম, “ব্যাপার না রব। তোমার সৃষ্টি মেয়ে, তুমি তো চিনোই। চেহারার জন্য নামটা সয়ে নিবে।“

আমার ইতিহাসজ্ঞান তরুনীর বিশেষ পছন্দ হলো না। সে আরো কিছুক্ষন চুপ করে থেকে অবশেষে মুখ খুলল।

-আচ্ছা তুই ওকে মারতে গেলি কেন। ও আমাকে যা বলার বলেছে। তোকে তো কিছু বলে নাই?
– তোকে বলা মানেই আমাকে বলা।
– মানে কি? তোর সাথে আমার সম্পর্ক কি?
– আসলে সম্পর্ক ব্যাপারটা আপেক্ষিক। আমি মনে করি আমার তোর সম্পর্ক একটা বিশাল পরিকল্পনার অংশ। একসময় আদম-হাওয়া এই সম্পর্ক পালন করেছে, এরপর কালের বিবর্তনে হেলেন-প্যারিস,  গ্রীক সভ্যতায় সামারাস-এঞ্জেলা নামে কেউ, রোম সভ্যতায় মালদিনি-মনিকা, লংকান সভ্যতায় মুরালিধরন-চিত্রাঙ্গদা টাইপের নামের কেউ না কেউ পালন করে এসেছে। আমরা আসলে একটা বিশাল চেইনের ক্ষুদ্র অংশ মাত্র। অনেক দায়িত্ব আসলে তাই।
– জ্বী না, আমরা এ ধরনের কোন চেইনের অংশ না।

অতঃপর কিছুক্ষন চুপ করে থেকে তার বহু কষ্টে চেপে রাখা “প্রভাষক” প্রতিভা উগলে দিল।
– আচ্ছা তোরা যারা পলিটিক্স করিস, তারা ভায়োলেন্সে এমন কি হিরোইজম খুঁজে পাস? আজ তুই একজনের সাথে ভায়োলেন্স করবি, সে ঘাপটি মেরে পড়ে থেকে পাঁচ বছর পরে তোর পরিবারের সাথে ভায়োলেন্স করবে। এটা হলো চেইন, তোর মুরালিধরন-জয়সুরিয়া কোন চেইন না। কেন মহাত্মা গান্ধীর মত রাজনীতিবিদ হতে পারিস না? অহিংস?

– নাহ, মহাত্মা ডুড খুব ভেজিটেবল ছিল। তোকে বলা হয়নি মহাত্মার জন্মদিন আর আমার জন্মদিন একই দিনে, ২রা অক্টোবর। বিগ ডুড আমার থেকে বছর শয়েকের বড়, এই যা। অবশ্য আমার গুরু উনি নন। আমার গুরু ক্ষুদিরাম। বাঘের মত সাহস নিয়ে বোমা মারত। উফ, ক্ষুদিরাম, প্রীতিলতা, মাস্টারদার নাম শুনলে গায়ের রোম দাঁড়িয়ে যায়।

– তোর মত গর্ধভের মুখে এঁদের নাম মানায় না নালায়েক। প্রীতিলতার মত হতে হলে তোকে শিশুকাল থেকে সাধনা করতে হবে, কাউকে আদর্শ মানতে হবে। উনি যেমন মেনেছিলেন ঝাঁসির রানী লক্ষীবাঈকে। তোর মত গর্ধভ আর  কতলকে যারা জেহাদ ভাবে সেসব মুসলিমের মাঝে কোন পার্থক্য নাই।  দে, দু একটা টুইন টাওয়ার আরো ধ্বসিয়ে দে।

অবশেষে রনক্লান্ত দিয়ে লৌহমানবী মার্গারেট থেচারের কাছে প্রতিজ্ঞা করলাম, “আর নয় সশস্ত্র হানাহানি”।

প্রতিজ্ঞাটা যেদিন ভাঙলাম সেদিন দুজন মানুষের জন্মদিন ছিল। একজন চট্টগ্রামের ধলাঘাটের মেয়ে প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার, অন্যজন পুরাতন ঢাকার সব্যসাচী নারী অন্তু। দিনটা ছিল ৫ই মে। গোপনে দ্বিতীয়জনের “সারপ্রাইজ বার্থডে পার্টি” পরিকল্পনা করছিলাম। প্রদীপের আগুন নিভে যাওয়ার আগে যেমন দপ করে শেষবারের মত জ্বলে ওঠে, তৎকালীন সরকার ক্ষমতা ছাড়ার আগে তেমন মহড়া দিচ্ছে। ক্যাম্পাসে বিরাট হাঙ্গামা হলো। আমি আমার দামি ডেজার্ট ঈগল গান নিয়ে শো ডাউন দেয়ার সুযোগ হাতছাড়া করলাম না।

সেদিন দুপুর আড়াইটায় ক্যাম্পাসে দুটো লাশ পড়ল। পুলিশের কাছে ধরা পড়ে আমার জায়গা হলো মতিহার থানায়। আমি মেয়র ভাগ্নে। থানায় বেশিক্ষন থাকার কথা না। বস্তুত থানায় নিয়ে যাওয়াই একটা ভুল ছিল। সে ভুল ভাঙ্গাতে গিয়ে বুঝলাম ভুল করে ফেলেছি। বেড়ধক মার খেয়ে জ্ঞান হারালাম। আসলে সময়টা খারাপ ছিল। সরকার পরিবর্তনের ট্রানজিশন পিরিয়ডে পুলিশের থেকে বড় বাপ যে আর কেউ নাই এটা ঠেকে শিখলাম।

ক্ষুধা-তৃষ্ণা এবং মাথায় আঘাতের ক্ষত নিয়ে যখন জ্ঞান ফিরল তখন আমার কাঁচভাঙ্গা হাতঘড়ির রেডিয়াম কাঁটাগুলো সময় জানান দিচ্ছে রাত পৌনে বারোটা। আর মাত্র ১৫ মিনিট পর ৬ই মে আসবে। মহিলা এরিস্টটলকে আমার জানানো হবে না আমাদের সম্পর্কটাকে কোন প্যারালাল ওয়ার্ল্ডের হেলেন-প্যারিসের সম্পর্কের সমতূল্য সম্পর্ক ভাবি না আমি। বিশেষ কিছু ভাবি। ক্ষতস্থানের ব্যথা, ক্ষুধা-তৃষ্ণায় পরাবাস্তব জগতে চলে গেলাম। সে জগতে ঝাঁসির রানী লক্ষীবাঈ সোনালী কেশরওয়ালা ঘোড়া ছুটিয়ে চলেছে শত্রুদূর্গ আক্রমন করতে। সুরক্ষিত দূর্গের দরজা ভাংতে যখন সে কোমরের বেল্ট থেকে বোমা উন্মুক্ত করছে তখন তার মুখটা হয়ে গেল কৃষ্ণকলি প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের মত। বোমা মেরে শত্রুদূর্গের ফটক উড়িয়ে দিতেই কিভাবে যেন আমার হাজতের কুঠুরীর দরজাটা উড়ে যায়। প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার শঙ্কিত নয়নে ছুটে এসে আমার হাত ধরে বলে, “মাস্টারদা, ক্যাপ্টেন ক্যামেরন ফিনিশড। এবার আমার স্ট্রবেরি ফ্লেভারের এমিবা আকৃতির কেক দিন”।

আমি একহাতে পয়েন্ট ফাইভ ডেজার্ট ঈগল, অপরহাতে বিদ্রোহিনী রমনীর ছোট হাত ধরে বোকার মত দাঁড়িয়ে থাকি। কেকটা যে অর্ডার করা হয়নি।

৭।

সেবার আমার ক্ষমতাধর মামাও আমাকে জেল হাজতে চালান হওয়া ঠেকাতে পারলেন না। একমাস হাজতবাস করে যখন আমি চৌদ্দশিকের বাইরে পা রাখলাম তখন পৃথিবীতে অনেক পরিবর্তন এসেছে। সিনেমার নায়ককে পার্শ্ব-অভিনেতা বানিয়ে দিয়ে দৃশ্যপটে নতুন নায়কের আবির্ভার ঘটেছে।

আমার একটা বিশাল সমস্যা হলো আমি বর্তমানে বাঁচি। অতীত বা ভবিষ্যত নিয়ে চিন্তা করা সময়ের অপচয় মনে হয়। বিশেষ কোন ব্যক্তিগত নীতি যে তা নয়। আসলে এই অতীত-ভবিষ্যতের জটিল ভাবনা আমার অলস মস্তিষ্কে খুব চাপ ফেলে। ধরাটা এবার খেলাম সেখানেই।

অন্তুর অতীতটা বেশ জটিল ছিল। সে প্রথম বর্ষ-সমাপনী পরীক্ষায় অংশ নেয়নি প্রেমঘটিত জটিলতার কারনে। বিগত একমাসে সে সকল জটিলতার বরফ কেটেছে। তার পূর্বপ্রেম তার জীবনে ফিরে এসেছে। আমার থেকে পাঁচ বছরের বড় একজন। বর্তমানে ছয় অংকের বেতনের চাকরি করছেন। সবচেয়ে অবাক হলাম এটা জেনে যে ভদ্রলোকের সাথে অন্তুর চার বছরের প্রেম ছিল। অন্তু আমাকে কখনো কিছু বলেনি ! ভদ্রলোক এতদিন বাদ রাজশাহী ফিরে এসেছেন একটা কোম্পানির রিজিওনাল ম্যানেজার হিসাবে। ভদ্রলোকের বিয়ের উত্তম সময় চলছে।

আমি এখনকার ফেসবুকের Lonely Insomniac Dreamboy আইডিধারী চাপা স্বভাবের ছেলেদের মত ছিলাম না। সরাসরি অন্তুর কাছে গিয়ে ব্যাখ্যা চাইলাম। অন্তু জানালো এখানে ব্যাখ্যা দেয়ার কিছু নাই। তার পুরাতন প্রেম সে কখন PAUSE থেকে PLAY করবে এটা নিতান্তই তার ব্যক্তিগত ব্যাপার। আর তাছাড়া আমি তার থেকে বয়সে ছোট। কিভাবে সম্ভব?

পরবর্তী তিনটা মাস আমি নরকসম যন্ত্রনায় কাটালাম। দূরত্ব বেড়ে গিয়েছিল। দিনে দুই প্যাকেট সিগারেট শেষ করে ফেললেও কেউ মানা করত না। শুক্রবার বাসায় ফোন দিয়ে কেউ জুম্মার নামাজে যাবার কথা মনে করিয়ে দিত না। সিমলা পাড়ের অবাধ্য বাতাসে কোন চেনা গন্ধ ছিল না। আমার হাত ভাঙ্গার সময়ে যে অন্তু তিনদিন আমার কপাল থেকে হাত সরায়নি সে আজ হঠাৎ আমাকে ছুঁতে ইতস্তত করে। যে হাতের প্রতিটা রেখা, শিরা-উপশিরার গতিপথ আমার মুখস্ত। আমি তাকে এবং তার ভদ্রলোক প্রেমিককে নিয়ে তার কাছে আপত্তিকর প্রশ্ন করা শুরু করলাম। নেশা শুরু করলাম। নিজে প্রচন্ড কষ্ট পেতাম, সর্বোচ্চ চেষ্টা করতাম সেও যেন কোনভাবেই সুখে না থাকতে পারে। অদ্ভূত ব্যাপার হলো সে এতকিছুর মাঝেও ভদ্রলোককে নিয়ে কিভাবে যেন সুখে থাকত। আমার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করেনি। বরং সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছে স্বাভাবিক করতে। কিন্তু “ অন্তু শুধু এবং শুধুই আমার জন্য নয়” এই সার্বিক ধারনাটা আমি মেনে নিতে পারি নি।

তিনমাস মানবেতর জীবনযাপনের পর আমার জীবনযাত্রার কিছুটা পরিবর্তন আনল জাতীয় নির্বাচন। নির্বাচনী কাজে ব্যস্ত হয়ে সব ভুলে গেলাম। ২০০১ সালের ২রা অক্টোবর আমার দল নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্টতার সাথে সরকার গঠনের যোগ্যতা অর্জন করল। আমার মামা সাংসদ নির্বাচিত হলেন। সে রাতে বিজয়োল্লাস শেষে হলের রুমে ফিরে দেখি টেবিলের উপর একটা কেক রাখা। উপরে লেখা, “শুভ জন্মদিন ক্ষুদিরাম”। আমি স্থির হয়ে কেকটার দিকে কিছুক্ষন তাকিয়ে রইলাম। অতঃপর দুহাতে নিয়ে গিয়ে প্যাকেটসহ ডাস্টবিনে ছুড়ে মারলাম।

৮।

 

অন্তুর সাথে আমার পরবর্তী যেদিন কথা হয় তারিখটা ছিল ২৬ ডিসেম্বর, ২০০৩। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় চারুকলা ’৯৮ ব্যাচ স্মরনকালের সেরা “র‍্যাগ-ডে” আয়োজন করেছিলাম সেবার। রঙে রঙে কাউকে চেনার উপায় ছিল না। ডিপার্টমেন্টের সামনের রাস্তায় সুজন আর ইকবালকে রঙে চুবিয়ে দাঁড়িয়ে হাঁফাচ্ছিলাম। হঠাৎ করে দু’গালে নরম স্পর্শে কেউ রঙ মেখে দিল। সারা দুনিয়ায় আমি দুইজন নারীর ঘ্রান চিনতাম। আমার মা এবং অন্তু। এটা কোন বিশেষ সুনন্ধী কিনা জানিনা, কিন্তু চিনতাম এই ঘ্রান। চোখ বন্ধ করে ক্লান্ত বিকেলে যখন ছাদে পায়চারি করা বিষন্ন কোন তরুনীর কল্পনা করতাম, এই ঘ্রানটা পেতাম। চিন্তায় হারিয়েছিলাম। এর মাঝে হাতদুটো অজানা রঙে আমার দু’গাল রাঙ্গিয়ে দেয়। স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলাম। সেই গোধুলী বিকেলে হঠাৎ আমার সময় বিভ্রম হলো। ডিপার্টমেন্টের চত্ত্বর, টং এর চায়ের আড্ডা, সিমলা পাড়, কাজলার ধুলোভরা ফুচকা…হঠাৎ করে সময় থেমে গেল আমার কাছে। সত্যিই চলে যাব? নতুনেরা এসে সব নিয়ে নিবে?

হিসেব না রাখা নিরবতাকালের পর হঠাৎ একজোড়া দূর্বল মুঠিবদ্ধ হাত আমার বুকে আঘাত হেনে কান্নাজড়িত কন্ঠে বলে, “ ঐ কুত্তা, ঐ কুত্তা, তুই কি আজকেও কথা বলবি না?” । অদ্ভূত ব্যাপার অন্তুর মুখের দিকে তাকিয়ে আমার যে অনুভূতি হলো তার সাথে প্রেম ভালোবাসা, ঘৃনার কোন মিল নেই। জীবনে প্রথমবারের মত তাকে আমার পরম বন্ধু মনে হল। মনে হলো এরকম বন্ধু আমার জীবনে আসে নি আর।

পাঠক, আমার প্রচন্ড ইচ্ছা হয়েছিল অনেক কথা বলি। বিশুদ্ধ বন্ধুত্বের দাবি নিয়ে নিয়ে হলেও একবার শক্ত করে অন্তুকে জড়িয়ে ধরি। কোনটাই করা হয়নি। শুধু সে রাতে অন্তু রাজশাহী ছেড়ে যাবার সময় বাসে উঠার আগ মুহূর্তে হাতে বিশাল এক চিঠি ধরিয়ে দিলাম। চিঠির শেষ লাইন ছিল, “…দেখা হবে সে জন্মে কিংবা অন্য কোন ধরায়, যেখানে আমরা দুজনে ভালুক হবো।“

জীবন আসলে একটা বৃত্তের মতন। অনেকগুলো বিন্দু নিয়ে বৃত্তের পরিধি। আমি অন্তুর জীবনের হাজার বিন্দুর মধ্যে মাঝারি মানের এক গুরুত্বপূর্ন বিন্দু। আর আমার বৃত্তের কেন্দ্রটা  অন্তু। অন্তুর বৃত্তের কেন্দ্র ম্যানেজার সাহেব। আসলে ম্যানেজার সাহেবের সাথে অন্তুর কাহিনীও এক বিরাট মহাকাব্য। পুরোটা শুনেছি পরে। আইএমডিবি টপ রেটেড মুভিগুলোর মত টুইস্টে ভরপুর। সে প্রেমেরও সৌন্দর্য্য ছিল। সম্ভবত আমারটা থেকে বেশি। আমি অন্তুর প্রেমে অন্ধ থাকার কারনে সৌন্দর্য্যটা দেখতে পাইনি। আজো পাই না। চারবছর পর আমার ঠিকানায় অন্তুর বিবাহের ইনভাইটেশন কার্ড আসে। আমি যাই নি।

জানিনা ম্যানেজার সাহেব তাকে কেউকারাডাং এর চূড়ায় পিঠে করে তুলে একসাথে কখনো মেঘ ছুয়েছে কিনা, জানিনা তাদের আলাস্কায় গিয়ে শ্বেতভালুক দেখার কোন পরিকল্পনা আছে কিনা, অথবা সমুদ্র সৈকতে পায়ের ওপর পা রেখে স্রোত অনুভব করেছে কিনা। অনেককাল পরে অন্তুর দেখা পাই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। সে এখন বেশ জনপ্রিয় টিভি সেলিব্রেটি। সম্প্রতি সে তার তৃতীয় শিশুকন্যা প্রসব করেছে। তার ফেসবুক টাইমলাইন কাভারে কন্যার ছবি শোভা পাচ্ছে। ফুটফুটে বাচ্চা। চোখগুলো ঠিক মায়ের মতন। সেই চেনা চোখ।

(সম্পাদিত)

৮৩৮ বার দেখা হয়েছে

৫ টি মন্তব্য : “পয়েন্ট ফাইভ ডেজার্ট ঈগল কিংবা প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার”

  1. শাহরিয়ার (০৬-১২)

    প্রথম 😀
    সুন্দর লিখছেন ভাইয়া। রোজার দিনে এমন উত্তম গল্প ক্ষুধা আরো বাড়ায়ে দেয়।


    • জ্ঞান যেখানে সীমাবদ্ধ, বুদ্ধি সেখানে আড়ষ্ট, মুক্তি সেখানে অসম্ভব - শিখা (মুসলিম সাহিত্য সমাজ) •

    জবাব দিন
  2. নাফিস (২০০৪-১০)

    অসাধারণ লিখেছেন ভাই... :thumbup: প্রথম আট অনুচ্ছেদ পড়া শেষ করে থেমে গিয়েছিলাম। টাইম নিয়ে নবম অনুচ্ছেদ টা পড়লাম। কেন জানি মনে হলো নবম অনুচ্ছেদ টা না থাকলেই ভালো হতো..

    জবাব দিন
  3. নাজমুস সাকিব অনিক (০৩-০৯)

    পিসি দিয়ে ঢুকলে বাদ দিয়ে দিব। এই প্যারাটা ছিল না। কিন্তু বিরহ বেদনার লেখা ইদানিং বেশি হয়ে যাচ্ছে, দুজন ফিনিশিং চেঞ্জ করতে বলায় নতুন প্যারা।

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।