মেজর ম্যাক্স : শুভকামনা

মেজর ম্যাক্স : নাম রহস্য

মেজর ম্যাক্স : অভ্যস্ততা ও অন্যান্য

মাকসুদ স্যারের সাথে আমাদের ইন্টার‌এ্যাকশনটা বেসিক্যালি হত সায়েন্স গ্যালারিতে। অন্যান্য কলেজে কিরকম জানিনা তবে আমাদের সায়েন্স গ্যালারি হল একটা বড় ক্লাসরুম যেখানে দুটো ফর্মই একত্রে বসে ক্লাস করতে পারে। এখানে স্যার আমাদের দুটো ফর্মকেই একসাথে নিয়ে বসিয়ে আংফাং নানান বিষয়ে বকবক করতেন। আমাদের আগ্রহটা বেশি ছিল সামনের আইএসএসবি নিয়ে। তখন মনে হত স্যার বুঝি আমাদের খুব ভালো কিছু গাইডলাইন দিয়ে দিতে পারবেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কোথায় কোথায় যে বিষয়বস্তু চলে যেত তা আর আমরা বুঝে পেতাম না।

স্যার আমাদের উপর মোটিভেশন চালাতেন। কলেজ এ্যাডমিনিস্ট্রেশন চালনা, ব্যক্তিগত শৃঙ্খলা, লেখাপড়া, ভবিষ্যত ক্যারিয়ার পরিকল্পনা, কাস্টম এন্ড এটিকেট ইত্যাদি সব বিষয়েই চলত স্যারের মোটিভেশন। ডাইনিং হলে বসে গ্লাস ধরার সঠিক পদ্ধতি কি, ছুরি-চামচ-কাঁটা চামচ ব্যবহার হবে কিভাবে (রীতিমত খেয়ে খেয়ে দেখাতেন), বিভিন্ন জায়গায় কনভারসেশন হবে কিভাবে, ড্রেস আপের স্মার্টনেস কি জিনিস ইত্যাদি টুকটাক লেসন হতো সেই গ্যালারিতে। ডিফেন্স সার্ভিসের ব্যাপারে স্যারের বকবকানির মাত্রাটা ছিল বেশি – অন্যথায় আমরা চাইতামও সেটা (স্যারের হাত ধরেই আমরা আইএসএসবি’র ফর্ম ফিল আপ করেছিলাম)। এসব করতে যেয়ে আমরা কথাবার্তায় অনেক ফ্রি হয়ে গিয়েছিলাম স্যারের সাথে। পুটপুট করে ন্যায্য অন্যায্য অনেক কথাই স্যারকে আমরা বলতাম। একদিন তো তানজিল ক্লাসের মধ্যেই স্যারকে ইমিটেট করে দেখাল “ও মাই গাড” বলে। শুনে স্যারের সে কি হাসি।

একদিন বৃহস্পতিবার রাত্রে ডিনারের পর আমাদের ইমিডিয়েট জুনিয়র ব্যাচের পোলাপানের রুমে সাডেন ইন্সপেকশন হয়ে গেল। সব হাউস মাস্টার, হাউস টিউটর, এ্যাডজুট্যান্ট সহকারে একেবারে কারেন্ট জাল অভিযান। পুরো ক্লাস বাইরে বাস্কেটবল গ্রাউন্ডে সিএসএম স্টাফের দায়িত্বে নিয়োজিত। সব রুমে তালা দিয়ে চাবিসহ হাউস বেয়ারা ক্লোজ। উপর থেকে শুরু করে ক্রমান্বয়ে নিচের দিকে স্যারেরা তছনছ করে রুম ইন্সপেকশন চালালেন। আমরা তখন অল মোস্ট আউট গোয়িং টুয়েলভ – একদিকে তাকিয়ে স্যারদের ইন্সপেকশন দেখি আর অন্যদিকে জানালা দিয়ে টেনশনে পড়া পোলাপানগুলারে দেখি। সব শেষ হতে হতে লাইটস আউট টাইম পার হয়ে আরও ঘন্টাখানেক চলে গেল। স্যাররা চলে গেলে মাকসুদ স্যার পড়লেন ওদের পুরা ক্লাসকে নিয়ে। এদিকে পুরো কলেজ ঘুমে কাদা হয়ে আছে – সকাল হলেই প্যারেন্টস ডে।

শেরে বাংলা হাউসে ক্লাস টুয়েলভের ব্লকে সবাই ঘুমালেও জেগে আছি আমি আর বেগ। আমরা এই গল্প সেই গল্প করি, পানি খাই, হাঁটাহাঁটি করি আর খানিক পরপর জানালার পাশে বসে খালি চোখ দুটো বাইরে রেখে উঁকি দিয়ে পুরো ক্লাসকে বসিয়ে রেখে এ্যাডজুট্যান্ট কি নসিহত করেন তাই শোনার চেষ্টা করি। বাতাসের তোড়ে মাঝে মাঝে দুই একটা কথা শোনাও যায়। মাথায় কি উঠেছিল কে জানে হঠাৎ করে বেগ নাতিদীর্ঘ মাপের একটা শীষ দিয়ে বসল! শীষ খেয়ে মাকসুদ স্যার পকেটে হাত রেখেই শরীরের উপরের অংশ ডাইনে মোচড়ালেন, আমাদের অবস্থান নির্ণয় করার চেষ্টা করলেন, আর স্টাফকে বললেন অভিযুক্তকে পাকড়াও করে নিয়ে আসতে। সিএসএম জলিল স্টাফ হাউসের সামনে এসে হুঙ্কার ছাড়লেন, “এই ক্লাস টুয়েলভ ঘুমাও ঘুমাও”। আমরা দুদ্দাড় করে যার যার রুমে চলে গেলাম।

তখনও বুঝিনি যে আমাদের সাথে আরও একজন নির্ঘুম ছিলেন সেই রাত্রে। তিনি হলেন স্বয়ং ‘ইবলিশ’। তা না হলে বেগ আবার কেন আমার রুমে এসে হাজির হবে আর কেনইবা দ্বিতীয়বার আরও লম্বা করে শীষ দেবে?? এবার আর আমরা মাফ পাইনা। আমাদের জুনিয়র পার্টি ছাড়া পায়। স্টাফ এসে আমাদের হাউসের সবাইকে ঘুম থেকে তুলে ফল ইন করান। স্টাফ আর এ্যাডজুট্যান্টের মিলিত জিজ্ঞাসাবাদের উত্তরে আমরা ঘুম জড়ানো চোখে এই মাত্র “আকাশ থেকে মাটিতে পড়ে কোমরে ব্যথা পাইছি” টাইপ ইমপ্রেশন দিই। কে শীষ দিয়েছে এটা আর বের হয় না। মাকসুদ স্যার পরদিন আমাদের আঠারো জনকে আটটার সময় তার অফিসের সামনে খাকি ড্রেসে ফল ইন হবার অমোঘ বানী শুনিয়ে গটগট করে হেঁটে রওয়ানা দিলেন।

এইটা কি হইল? প্যারেন্টস ডে’র সকালে খাকি ড্রেসে এ্যাডজুট্যান্টের অফিসের সামনে? আমার আর বেগের তখন মাথায় হাত। বেগ আমার হাত ধরে ঝটকা টান দিয়ে নিচে নামতে নামতে বলল, “আমি যা বলব চুপচাপ সায় দিয়ে যাবি। কারেজের কথা বললে স্যার কিছু মনে করবেন না। মাফ করে দেবেন”। স্যার তখন তার মটরবাইকে বাসার দিকে টান দিয়েছেন – আমাদের ডাক শুনে ফিরে আসলেন। বেগ বলল, “স্যার আমরা এক লিটার কোক বাজি ধরেছিলাম শীষ দেয়া নিয়ে। আমি জিতেছি”। আমি সম্মতিসূচক মাথা নাড়লাম। পেট্রোল ট্যাংকের উপর দুই হাত ফেলে রেখে স্যার আমাদের কথা শুনলেন। আপন মনে খানিক মাথা নেড়ে বললেন, “দ্যাখো, খারাপ হবার এটাই সময়। ডোন্ট স্পয়েল ইওরসেল্ফ। যাও, ঘুমাতে যাও”। এইরকম টুইস্টেড হতে যাওয়া জিনিস এত সহজে ঠিক হয়ে যাবে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। অবাক হয়ে স্যারের চলে যাওয়া দেখলাম।

কলেজ থেকে চলে আসার আগের রাত্রে আমরা দুইজন স্যারের বাসায় বেশ রিচ একটা স্ন্যাকস মেরেছিলাম। পরে যখন সার্টিফিকেট, টেস্টিমোনিয়াল ইত্যাদি তোলার জন্য গিয়েছিলাম তখন স্যারের সাথে আড্ডাটা হয়েছিল টু দ্যা পয়েন্টে – আইএসএসবি নিয়ে। সদ্য আইএসএসবি কোয়ালিফাই করে আসা আমার মেমোরিতে সব তখন টাটকা তাজা। স্যার খুঁটিনাটি জিজ্ঞেস করেন, আমি বলে যাই। আমার বিশ্বাস তখন আমাদের যার সাথেই স্যারের দেখা হয়েছে সবার কথাই তিনি মনোযোগ দিয়ে শুনেছেন, মাথায় গেঁথে রেখেছেন। পরে সেটা পরবর্তী ব্যাচের ছেলেদেরকে ব্রিফ করেছেন।

২০০৩ এর কোন এক সময়ে খবর পেলাম স্যার ঢাকা সিএমএইচে এ্যাডমিট হয়ে আছেন। পায়ের হাড়ে ফ্রাকচার (স্যারের হাতে পায়ে হাড্ডিগু্ড্ডিতে মাশাল্লাহ জোড়াতালি ভালোই আছে)। ছোট্ট এক কৌটা টক ঝাল মিস্টি চকলেট নিয়ে গেলাম স্যারকে দেখতে। সেটা পেয়ে অবিশ্বাসের ভঙ্গিতে কয়েকবার বললেন, “ফ মি? ফ মি”? স্যারের কথায় আমি হেসে দিলাম। নাহ, কোন পরিবর্তন নেই। সেই আগের মতোই আছেন।

স্যারের জন্য অনেক অনেক শুভকামনা।

(শেষ)

১,৩৭১ বার দেখা হয়েছে

১২ টি মন্তব্য : “মেজর ম্যাক্স : শুভকামনা”

  1. সায়েদ (১৯৯২-১৯৯৮)

    @ ফয়েজ ভাই, ফৌজিয়ান, কামরুল, জুনায়েদ কবীর,
    সবাইকে :salute: । আপনাদের এই রেসপন্স খুবই উৎসাহব্যঞ্জক।

    @ আহসান ভাই,
    আপনাকে আলাদা থ্যাংকস আর :salute: ।


    Life is Mad.

    জবাব দিন
  2. টিটো রহমান (৯৪-০০)

    সায়েদ ভাই, :clap: :boss: :salute:

    বিলিভ মি। এখনও আমি চামুচ দিয়ে খাওয়া শেষে তার মত সেগুলি গুছিয়ে রাখি। আমার মত অগোছালের জন্য সেটা দর্শনীয় ব্যাপার। মজা হল- চামুচ দিয়ে খেলে প্রতিবারই তার কথা মনে হয়।

    এনিওয়ে..স্যার তো এক্স ক্যাডেট। ওনাকে সিসিবি তে ইনভাইট করা যায় না? উনি দুর্দান্ত কবিতা লেখেন


    আপনারে আমি খুঁজিয়া বেড়াই

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।