সেকাল এবং একাল

সেকাল এবং একাল

এই ব্লগে এটা আমার ২য় লেখা। ১ম লেখাটাতে সবাই যেভাবে উৎসাহ দিয়েছেন, তাতে আরেকটা লেখার লোভ সামলাতে আমার কষ্ট হচ্ছে।

কথায় আছে, ইতিহাস নাকি ঘুরে ঘুরে আসে। ইতিহাসের সেই ঘুরে আসার বিষয় নিয়েই এখন আমি আমার নিজের দুটো অভিজ্ঞতা শেয়ার করছি—একটা কলেজের, আরেকটা কর্মক্ষেত্রের।

ক) সেকাল:
আমাদের সময়ে (১৯৮৮–’৯৪) যে ক’জন অ্যাডজুট্যান্ট ছিলেন, আমার ধারণা, স্কোয়াড্রন লিডার চৌধুরী স্যার ছিলেন তাঁদের মধ্যে সবচেয়ে চৌকস। তাঁর আমলে কোনো ক্যাডেট উল্টাপাল্টা কিছু করার আগে ১০০ বার ডান-বাম চিন্তা করে নিতে বাধ্য ছিল।

তিনি ছিলেন এক্স-মির্জাপুরিয়ান। হাঁটতেন বিড়ালের মতো নিঃশব্দে। সবকিছুতেই তাঁর একটা নিজস্ব স্টাইল ছিল। এমনকি শাস্তি দেওয়ার ক্ষেত্রেও। ক্যাডেটদের টেনশন দেওয়ার ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন ১০০-তে ২০০। সকালে প্যারেড গ্রাউন্ডে কোনো ক্যাডেটের অপরাধ ধরা পড়লে তিনি ফল-ইন দিতেন লাঞ্চের সময়। শাস্তির জন্য এতটা দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করা যে কত বড় শাস্তি, সেটা আমরা হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছিলাম।

সিসিআর-এ সবচেয়ে কষ্টকর সময় ছিল শীতকাল। রংপুরের কনকনে হাড়কাঁপানো শীত। কাজেই যথারীতি সকালের পিটি-প্যারেডে লেট। এবারে অ্যাডজুট্যান্ট চৌধুরী স্যার দিলেন নতুন স্টাইলের শাস্তি… উনি প্যারেড না করিয়ে সবাইকে হাউজে ব্যাক করিয়ে দিলেন… সিম্বলিক অ্যান্ড সাইলেন্ট পানিশমেন্ট আপ টু ব্রেকফাস্ট… সবার তো আক্কেল গুড়ুম! তবে সবাই এটাও বুঝে গেলাম, এত আরামের শাস্তি প্রতিদিন জুটবে না। পরদিন সবাই সময়মতো গ্রাউন্ডে হাজির। এবারে আরেক অবাক করা কাণ্ড… আজ তিনি খুশি হয়ে সবাইকে ব্যাক করালেন। আমরাও বুঝে গেলাম, এত আরামের পুরস্কার প্রতিদিন জুটবে না। এরপর থেকে ক্যাডেটরা অনেক দিন পর্যন্ত গ্রাউন্ডে লেট করেনি।

খ) একাল:
মাত্র কয়েক সেমিস্টার আগের কথা। আন্ডারগ্র্যাজুয়েট লেভেলের সিনিয়র স্টুডেন্টদের সাথে আমার ক্লাস… কোর্স ছিল ট্রান্সলেশন স্টাডিজ… আমার সাথে আমার স্টুডেন্টদের অলিখিত চুক্তি হলো ক্লাস আরম্ভ হওয়ার ৫ মিনিট আগেই সবাইকে ক্লাসে থাকতে হবে… নইলে অ্যাসাইনমেন্ট… যাই হোক, ক্লাসের সামনে গিয়ে দেখি কেউই ক্লাসরুমে ঢোকেনি… সবাই বারান্দায় হাঁটাচলা করছে। একটু বিরক্ত হলেও কিছু না বলে আমি চুপচাপ ক্লাসে ঢুকে বোর্ডে মার্কার দিয়ে ৫টা বাংলা বাক্য লিখে সবাইকে ইংরেজিতে অনুবাদ করতে দিয়েছিলাম। এরপর থেকে সেই কোর্সের পরবর্তী কোনো ক্লাসে কেউ আর কোনো দিন দেরি করেছিল কি না, মনে করতে পারছি না। বাক্যগুলো নিচে দিয়ে দিলাম, ইচ্ছা হলে কেউ যাতে চেষ্টা করে দেখতে পারে:

১) শিক্ষার্থীরা শ্রেণিকক্ষে প্রবেশের পূর্বেই শিক্ষকের আচমকা আবির্ভাব ঘটিল।
২) বিদ্যার্থীরা বিদ্যাপীঠের বারান্দাকেই শ্রেণিকক্ষ বলিয়া স্বীকার করিয়া লইয়াছিল।
৩) শিক্ষার্থীদের এহেন আচরণের নিয়মিত পুনরাবৃত্তিতে শিক্ষক বেচারা বড়ই মর্মাহত হইলেন।
৪) কিন্তু তাহাতে বিদ্যার্থীরা বিন্দুমাত্র বিচলিত হইল বলিয়া বোধ হইল না।
৫) শিক্ষক মাত্রই যেন এক আজব অসহায় প্রজাতি, যাহারা শ্রেণিকক্ষ নামক অরণ্যে রোদন করিবার প্রয়াসে নিজেদের জীবনব্রত লইয়া মগ্ন থাকিতে ভালোবাসেন।

৫,৯৭১ বার দেখা হয়েছে

৬৯ টি মন্তব্য : “সেকাল এবং একাল”

  1. কামরুল হাসান (৯৪-০০)

    :khekz: আমি আগেই সন্দেহ করছিলাম আপনি লোকটা বড়ই নিষ্টুর।


    ---------------------------------------------------------------------------
    বালক জানে না তো কতোটা হেঁটে এলে
    ফেরার পথ নেই, থাকে না কোনো কালে।।

    জবাব দিন
  2. জুনায়েদ কবীর (৯৫-০১)

    ভাই, কারেকশনটা আমিই দিই...

    ঐ কমেন্ট, যেমন ছিলে...!
    'আহমদ ভাই, ট্রানস্লেশন কেউ কি করতে পেরেছিল???'


    ঐ দেখা যায় তালগাছ, তালগাছটি কিন্তু আমার...হুঁ

    জবাব দিন
  3. ওবায়দুল্লাহ (১৯৮৮-১৯৯৪)

    দোস্ত,
    তুমি লাইগ্যা থাকো।
    তুমি এইখানে সব কিছু বরফ বানাইয়া দিবা - এটা আমি নিশ্চিত।

    দুইটাই দুর্দান্ত হইছে।
    আর তুই পানিশমেন্ট এর ক্ষেত্রে তোগো এডজুট্যান্ট (আমাগো এক্স ক্যাডেট ভাই) থিকা কম স্টাইলিশ না রে 😉
    😀 :clap:


    সৈয়দ সাফী

    জবাব দিন
  4. নাজমুল (০২-০৮)

    আহমেদ ভাই আমাদের কলেজে এক এডজুট্যান্ট ছিলেন নাম মেজর নুরুল আলম(এফ সিসি,২৫ লং কোর্স) এরকম ই পানিশ্মেন্ট দিত 🙁

    ভাইয়া অনুবাদ গুলো কি একটু করে দিবেন ??

    জবাব দিন
  5. মাসরুফ (১৯৯৭-২০০৩)

    :shy: :shy: :shy: ইয়ে আমি এট্টু করি টেরান্সলেশঙ্গুলা-ভুল হৈলে ধরাই দিয়েন :shy: :shy: :shy:

    1) The teacher had suddenly appeared before the students entered the classroom.
    2) Students of the school acknowledged the school verandah as their classroom.
    3)The poor teacher was very sad because of regular repetation of this type of behaviour from students.
    4)But it does not seem that the students are moved a single bit by it.
    5) As if teachers are by default a strange,helpless specis who love to devote to their aim in life to cultivate in the barren field named classroom!

    ৫ টাতেই টেরাই মারলাম,একটাও হইছে কিনা জানিনা।না হইলে আমারে দুষ দিয়েন না কারণ আমার পাঠ্য বিষয় ছিল অর্থনীতি,ইংরেজি না।আনডারগ্র্যাডের বাচ্চাগো কয়ডা ইংলিশ কোর্সে কুনোরকম গেরেড তুইলা সেইটা ভাঙ্গায় নসুর ইংলিশ ডিপার্টমেন্টে যেই কাম করতাছি সেইতার লগে টেরান্সলেশনের কুনো লেনাদেনা নাই।

    তবে হ্যাঁ,সামীউর(ডি ইউ ইংলিশ) রে ধইরা এইগুলা করতে কন-ফটাফট নামায় ফালাইবো।

    জবাব দিন
  6. মুহিব (৯৬-০২)

    আহমদ ভাই মনে হয় মেজর জিয়াদ স্যার এর নাম শুনেন নাই। কলেজে আমরা শুনতাম চৌধুরী স্যার এর কথা। জিয়াদ স্যার আসার পর তার নাম আর শুনি নাই। এম সি সি র এক্স ক্যাডেট, ১৬ বিএমএ লং কোর্স। মাফ চাইছি ভাই উনার কাছে। :boss: :salute:

    শুধু চিন্তা করতাম ক্যাডেট কলেজেই এমন, বিএমএ তে বস না জানি কেমন ছিল!!!!!!!!!!!!!!! :gulli2: :chup: ~x(

    জবাব দিন
  7. জুনায়েদ কবীর (৯৫-০১)

    আহমদ ভাই, ইংরেজীর অত্যাধুনিক যুদ্ধজাহাজ হবার প্রমানস্বরুপ ২ নং টা ট্রানস্লেট কইরা দিলাম...

    The students hunted taken the school varanda as their classroom...!!

    কেমন হইল বস??? O:-) O:-)


    ঐ দেখা যায় তালগাছ, তালগাছটি কিন্তু আমার...হুঁ

    জবাব দিন
  8. মান্নান (১৯৯৩-১৯৯৯)

    আহমদ ভাই, আপনাকে সিসিবিতে দেখে খুব ভালো লাগল। জিপিতে থাকতে একবার আপনার সাথে দেখা হয়েছিল, তারপর আর দেখা হয়নি।

    আপনার দরাজ গানের গলা এখনও মনে পড়ে। আর আপনার ক্রিয়েভিটির আরেক নমুনা দেখলাম আজ। :thumbup:

    মজার ব্যাপার হলো, একদিন বুয়েটের হলে রাত ১০ টায় একজন দাড়িওয়ালা লোক হলের এক ছেলের সাথে আমার রুমে এসে হাজির। আমি সিসিআর এর শুনে সে জানালো সেও এক সময় সিসিআর এ ছিল । অনুমান করেন তো এই লোকটা কে ? ইনিই আমাদের ড্যাশিং স্মার্ট চৌধুরী স্যার। এখন এক্কেবারে তাবলীগ হুজুর। আমি এখনও কারো স্মার্টনেস তুলনা করতে হলে চৌধুরী স্যারের সাথে তুলনা করি।

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।