বরাবর, অধ্যক্ষ, পাবনা ক্যাডেট কলেজ, পাবনা। (এপিসোড-২)

আগের পর্বের লেজ…

দুই।) ছুটি শেষে কলেজে ফিরলাম। দেখলাম কলেজে সাজ সাজ রব পড়ে গেছে। পাবনা ক্যাডেট কলেজের ইতিহাসে প্রথম আর্মির প্রিন্সিপাল আসছে, কি না জানি হয়। কলেজের বারবার চুল কেটে মাথার সাদা চামড়া বের করে দিল, স্টাফ সামনে দাড়াইয়া থেকে সবার চুল কাটাইতেছে, ব্যাগ একবার স্টাফ চেক করল একবার মকবুল স্যার(ভুগোল ডিপার্টমেন্ট) নিজে। নতুন প্রিন্সিপালের নাম লেঃকর্নেল রেজাউল করিম। মধ্য বয়স্ক স্মার্ট একজন মানুষ। আমার এই ছোট্ট জীবনে দেখা সবচেয়ে ভদ্রলোক। উনার মত ম্যানার আমি আর কারো ভিতর দেখি নাই। অসম্ভব ভাল একজন মানুষ। স্যারের শাষন আমলে কোন ক্যাডেটের কোন ক্ষতি হতে দেন নাই। উনি আসার পর আমাদের কলেজের চেহারাই বদলাইয়া গেল। আর বদলাইয়া গেল সেই সব স্যারের চেহারারা যারা সারাদিন ক্যাডেট এই করছে, ক্যাডেট ঐ করছে নিয়ে থাকত। তারা মুখ কাল করে ঘুরতো। স্যার খেয়াল রাখতেন এত নিয়ম শৃংখলার ভিতরেও কিভাবে ক্যাডেটদের একটু ভাল রাখা যায়। স্যার যা বলত সেটা না শুনলে নিজের কাছেই খারাপ লাগত। মনে এমন একটা মানুষের সাথে চিট করলাম? আর ম্যাডামও ছিল অসাধারন ভাল। ম্যাডামের বয়স আম্মুর বয়সের কাছাকাছি বা বেশিই হবে। ম্যাডাম কিন্তু টিচার মিচার কিছু ছিল না। ম্যাডাম মাঝে মাঝে স্যারের সাথে হাউসে এসে খোঁজ নিতেন সবার। কিযে ভাল লাগত, শুধু আম্মুর কথা মনে হত তখন। হস্পিটালে যারা এডমিট থাকত তাদের জন্য খাবার রান্না করে নিয়ে যেতেন উনি, ক্যান্ডিডেটস টাইমে প্রায়ই বাসা থেকে খাবার পাঠাতেন পরীক্ষার্থীদের জন্য। আমরা স্টাডিট্যুর, পিকনিকে গেলে অবশ্যই স্যারের কাছে বায়না করতাম ম্যাডামকে নিয়ে যাওয়ার জন্য। ম্যাডাম যেতে না পারলে, যেদিন পারবেন ডেট পিছিয়ে ঐ দিন ডেট ফেলার জন্য প্রিন্সিপাল স্যারের কাছে বলতাম। ম্যাডাম গেলেই সবার জন্য বাসা রান্না করে বিভিন্ন পদের খাবার, মিষ্টি, ফলমূল আর সাথে নিরাপত্তা নিয়ে যেতেন। আমরা জানতাম যাই করি না কেন ম্যাডাম ঠিকই স্যার কে ম্যানেজ করে ফেলবে। আউটিং পাওয়া যাবে, তাতে লেট করলে মাফও পাওয়া যাবে, জায়গায় আজায়গায় যাত্রা বিরতি নেয়া যাবে। কিন্তু আব্দার করতে হবে ম্যাডামের কাছে। জীবনে আমি  এই কথাটা কত জনকে বলছি হিসাব নাই, তবে স্যার আর ম্যাডামের মত ভাল মানুষ আসলেই আমি আর দেখি নাই। তাকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল প্রিন্সিপাল হিসেবে, এটা তার চাকরি ছিল। সেখানে ৩০০জন ছেলেকে উনারা নিজেদের ছেলের মতই আদর করতেন। স্যারের সময় থেকে পাবনা ক্যাডেট কলেজের রেজাল্ট আবার ভাল হওয়া শুরু হল। স্যার চলে গেলেন ইলেভেনের একাবারে শেষের দিকে। কলেজের ৬বছরে শুধু মাত্র এই একজন শিক্ষক; যিনি চলে যাওয়ার সময় মন থেকে কষ্ট পেয়েছিলাম। পরবর্তীতে স্যার রাজউক কলেজে জয়েন করেন, এবং রাজউক কলেজ তার আমলে ঢাকা বোর্ডে খুবই ভাল রেজাল্ট করে।

তিন।) এর পর আসেন লেঃ কর্নেল ওয়ালিঊল্লাহ স্যার। অদ্ভুত এক মানুষ। ধোঁয়াশা ক্যারেক্টার। ওয়ালি স্যার আমাদের পাওয়া শেষ প্রিন্সিপাল। নতুন প্রিন্সিপাল আসার আগেই স্যারেরা আবার শুরু করল এবার বুঝবা আসল আর্মি প্রিন্সিপাল কি জিনিস। রেজা স্যার তো ভাল মানুষ ছিল। অনেক তো আরাম করলা। এই, সেই, ব্লা ব্লা। আমরাও স্যার আসার পর শুরুতেই কথাগুলো মেনে নিলাম। কারন প্রথম দিনই প্রেপ টাইমে প্রিন্সিপালের দেখা মিলল ক্যাডেটদের অভায়ারন্য “টয়লেটে”। কনো নোটীশ ছাড়া টয়লেটে প্রিন্সিপালকে দেখে তো মুতা আটকাইয়া ব্লাডার এটাক হইয়া মরতে বসল আমাদের কাউসার। আমরা বুঝে গেলাম তেত্রিশ একরের এখন আর এক ইঞ্চি জায়গাও নিরাপদ না। যেকোন সময় যেকোন জায়গায় ঠাডা পরার মত ধপাস করে প্রিন্সিপাল এসে পরতো। রাতের তিনটা বাজে সিগারেট খাচ্ছি; হাউসে প্রিন্সিপাল, সকালে পিটিতে প্রিন্সিপাল, হেলে দুলে ১০মিনিট পর প্রেপে যাচ্ছি একাডেমী ব্লকের সামনে দাড়াইয়া আছেন প্রিন্সিপাল, লাঞ্চ থেকে বের হয়েই বেল্ট খুলে কাধে নিয়ে আসতেছি রাস্তায় দাড়াইয়া আছে প্রিন্সিপাল, ব্রেকফাস্টে লেট করছি দরজা লাগাইয়া দিছে প্রিন্সিপাল। কলেজ প্রিন্সিপালময় হয়ে গেল। এসব দেখে কিছু স্যার বিশাল উৎসাহে ঝাপাইয়া পরল। স্যার ক্যাডেট এই করছে, ঐ করছে। কিন্তু প্রিন্সিপাল স্যার এক কথায় তাদের আগুনে পানি ঢেলে দিলেন। আমদের সামনেই জানাইয়া দিলেন “আপনাদের আচরনে মনে হয় ক্যাডেটরা আপনাদের শত্রু।” আমরা কনফিউজড। স্যার চান ডা কি? কোন কেস হাউস মাস্টার অফিস পার হয়ে প্রিন্সিপাল পর্যন্ত গেলে হাউস মাস্টারকেও জবাবদিহি করতে হত। কলেজের অবকাঠামোর ব্যাপক পরিবর্তন শুরু হল। টয়লেটে টাইলস, টিভিরুমে বেঞ্চের জায়গায় চেয়ার,হাউসে ব্লকে ব্লকে ফিল্টার,ডাইনিং এ খাবারের মানের উন্নতি, হাউসের কড়িডরে সাউণ্ডবক্স, হাউস মাস্টার,মেডিকাল অফিসার,প্রিন্সিপাল,ভিপি,এডজুট্যাণ্ট সবার অফিস,বাসার ভিতর অন্তযোগাযোগ স্থাপনের জন্য ইণ্টারকম। সবকিছু মিলাইয়া বিশাল হুলুস্থুল অবস্থা। সবই ঠিক কিন্তু প্রিন্সিপালের ভাব খুবই কড়া।  জরিমানা চালু হইল আবার। তবে হাজারে না,  ১০০ তে। যেকোন জায়গায় লেট করলে জরিমানা, যেটা পকেটমানির টাকা থেকে কেটে নেয়া হত। আমাদের কয়েকজনের দিন গুলো ব্যয়বহুল হয়ে উঠল। কারো ২০০, কারো ৩০০- ৪০০ রেগুলার জমা হতে লাগল কলেজ ফান্ডে। স্যার চালু করলেন ক্যারেক্টার গ্রেডিং সিস্টেম। ক্লাস টুয়েল্ভ এর ডিসিপ্লিন এর পারফরমেন্সের ভিত্তিতে দেয়া হত গ্রেড। সেটা আবার টানাইয়া দেয়া হল হাউসের নোটিশবোর্ডে। দেখলাম Aগ্রেড,Bগ্রেড এভাবে করে Dগ্রেড পর্যন্ত আছে। তবে তিন হাউস মিলাইয়া আমাদের ১৪জনের মত ক্যাডেটের নাম কোন লিস্টেই নাই। খুজতে খুজতে দেখি একদম নিচে,গ্রেডের ছকের বাইরে আলাদা করে বোল্ড করা ১৪টা নাম, ক্যাডেট নাম্বার সমেত ছাপানো হইছে।লিখে দেয়া হইছে যে এদের চরিত্র নাকি প্রশ্নবিব্ধ(Questionable Character)। অত্র তালিকায়  নিজের নামখানা আবিষ্কার করিয়া বড়ই শর্মিন্দা বোধ করিলাম। নটিশবোর্ড হইতে নোটিশখানা হাপিস করিয়া চরিত্রের কালিমা দূর করার চেষ্টাও করিলাম। লাভ হইল না। রাতে আবার লাগাইয়া দিল। দেখে বা শুনলে মনে হবে অবস্থা খুব টাইট।  প্রিন্সিপাল স্যারের ভাব দেখলে মনে হইত খাইয়াই ফেলবে। আসলে লোক ভালই ছিল। যা পানিশমেণ্ট হইত কলেজের ভিতরেই। প্যারেন্টস পর্যন্ত কিছু যেত না। স্যার মানুষ হিসেবেও ভালই ছিলেন। তার শাষনামলে পাবনা ক্যাডেট কলেজের অবকাঠামোগত ব্যাপক পরিবর্তন সাধিত হয়।

NB: ওয়ালি স্যারের সম্পর্কে আর একটা বিষয় লেখার ছিল। যেটা আলাদা পোষ্ট হিসেবে পরে দিয়ে দিব এক সময়,এটা শুধু মাত্র পিসিসি ২১তম ব্যাচের ৫১জন ক্যাডেটের উদ্দেশ্যে বললাম।

২,৬৫৮ বার দেখা হয়েছে

২৪ টি মন্তব্য : “বরাবর, অধ্যক্ষ, পাবনা ক্যাডেট কলেজ, পাবনা। (এপিসোড-২)”

  1. সালাউদ্দিন ফেরদৌস

    দুস্ত, চমৎকার। ভাল লিখছিস, মানে লেখিস-ই ত। আর দুঃখ আমার, বহু কিছু ভুইলে গেছি, তোর লেখায় সেসব চেহারা পাইল। মনে পড়ল। এই ত ব্যাপক, আর কী চাই? সার্থক এই লেখা, আমার জন্য হলেও। কত কত ডিটেইল যে ঝলকে মনে আনিলি!

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।