শিরোনামহীন কিছু কথামালা

আজ যখন বাসা থেকে আই ইউ টি তে ফিরছি তখন থেকেই মাথার মধ্যে এই বিষয়টা শুধু ঘুরপাক খাচ্ছে। আমি বর্তমানে বিডিআর পরিস্থিতি নিয়ে কিছু কথা বলতে চাচ্ছি। এগুলো একান্তই আমার ব্যক্তিগত মতামত। তবে আমার মনে হয় কিছু কথা যা আপনারা দেখছেন না; শুনছেন না সেগুলো আপনাদের জানানো উচিত। আর সে তাড়না থেকেই এ লেখা।

আমার বাসা বিডিআর এর বাইরে পাঁচ নং গেট সংলগ্ন। বিডিআর এর উশৃঙ্খল জওয়ানরা যখন তাদের দাবী দাওয়া আদায়ের নামে বিশৃঙ্খল অবস্থার সৃষ্টি করলো তখন বাসা থেকে আমার ছোট ভাই ফোন করে জানালো যে – বিডিআর এ আর্মিদের সাথে বিডিআরদের সংঘর্ষ হচ্ছে। আমি ঘটনাটা শুনে প্রথমে তো বিশ্বাস করিইনি উপরন্তু আমার ছোট ভাইকে ধমক লাগাই ক্লাসের মাঝখানে আজগুবি জিনিস নিয়ে ফাইজলামি বন্ধ কর। কিন্তু এর পরে যা দেখলাম, শুনলাম তা’ বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছিল। নারকীয় এ সব হত্যাকান্ড যারাই করেছে তারা বিবেকবর্জিত; মানুষ নামের কলংক। মানুষকে বলা হয় আশরাফুল মাখলুকাত। অথচ তাদের পৈশাচিকতা যেন মাঝে মাঝে পশুকেও হার মানায়। বিডিআর এর জওয়ানরা সেদিন যা করেছিল আমার নিজেকে তখন বাংলাদেশী ভাবতে লজ্জা হচ্ছিল। মুক্তিযুদ্ধের সময়কার হত্যাকান্ডের কথা যখন শুনি তখন মনকে এই বলে স্বান্ত্বনা দেই যে হত্যাকারীরা ছিল পাকিস্তানী, একটি ভিন্ন জাতি।কিন্তু বিডিআর এর স্বল্প সংখ্যক জওয়ানরা যা দেখালো তাতে আমাদের গর্ব করার বোধহয় কিছুই থাকলোনা। বিডিআর এর সে ঘটনায় নি:সন্দেহে বিডিআরের সবাই জড়িত ছিল না। কয়েক শত বা কয়েক হাজার বিডিআর সদস্য এর সাথে জড়িত।কিন্তু এখন বিডিআর এর সকল সদস্যদের এর ফল বইতে হচ্ছে। প্রথমেই বলেছি আমাদের এলাকার অধিকাংশ সদস্যই বিডিআর পরিবারের । যারা বিডিআরের ভেতরে কোয়ার্টার পাননা তারা আমাদের এলাকা সহ আশেপাশের এলাকাতে ভাড়া থাকে। তাদের বর্তমান অবস্থা তাই আমি খুব ভালোভাবে দেখতে পাচ্ছি। যেহেতু এখন বিডিআরের সকল সদস্যই পিলখানার ভেতরে বন্দী তাই সকল সদস্যের পরিবারেরাই অনেক দু:শ্চিন্তার ভেতর দিয়ে সময় অতিবাহিত করছে। আশেপাশের অনেকেই হয়তো বলছেন বিডিআরের সকল সদস্যদের মেরে ফেলা উচিত। কারণ তারা যা করেছে তার ফল তাদের পেতে হবে। কিন্তু আমি বলতে চাই কয়েকশ উশৃঙ্খল সদস্যদের জন্য সবার কি শাস্তি পাওয়া উচিত? মিডিয়ায় বর্তমানে বিডিআর প্রধাণ সহ বানিজ্যমন্ত্রী বারবার বলছেন যে নিরপরাধ লোকরা শাস্তি পাবেন না । কিন্তু তাদের বাস্তবে তাদের কথার সাথে কাজের মিল পাওয়া যাচ্ছেনা অনেক ক্ষেত্রেই। কিছু বাস্তব উদাহরণ দেই:

আমার এলাকার বন্ধু শিহাব। ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং এ পড়ছে। ক্যাডেট কলেজে ভর্তির আগে আমরা একই স্কুল রাইফেলস পাবলিকে পড়তাম। শিহাবের আব্বা বিডিআর এর একজন সুবেদার। আংকেলের বাম চোখে একটা সমস্যা দেখা দেয় যার দরুণ উনি ফেব্রুয়ারীর মাঝামাঝিতে হাসপাতালে ভর্তি হন। পরে চোখের অবস্থা গুরুতর হলে উনাকে বিডিআর হসপিটাল থেকে পিজি হসপিটালে রেফার করে। এবং উনি ছুটি পান। হত্যাকান্ডের দিন অর্থাৎ পঁচিশে ফেব্রুয়ারীতে উনি ছুটিতে ছিলেন। কিন্তু পরে যখন সকল বিডিআরের সদস্যদের আবার যোগদান করতে বলা হয় তখন উনি বিডিআরে রিপোর্ট করেন। আমি ঘটনার দিন যখন শিহাবের খোঁজ নেই তখন আংকেল সহ শিহাব বিডিআর থেকে অনেক দূরে অবস্থান করছেন কারণ তখন আংকেলের ছুটি ছিল।কিন্তু গতকাল শিহাব ফোন দিয়ে জানালো ওর বাবা ডিএমসিতে ভর্তি। ভর্তির কারণটা বলছিনা। পাঠকরাই বুঝে নেবেন…..উনার এমনিতেই শরীর খারাপ। শেষ বয়সে এত ঝামেলা বোধহয় তাই সহ্য করতে পারেননি। আজ যখন উনাকে দেখতে ডিএমসিতে গেলাম তখন দেখি উনার আসলেই খারাপ অবস্থা। ঠিকমত হাঁটতে পারছেন না। কথা বলতে কষ্ট হয়। যে লোকটা অসুস্থ, ঘটনার দিন সেখানে উপস্থিতই ছিলেন না তার বোধহয় এটা প্রাপ্য ছিলনা।

আরেকটা ঘটনা বলেই শেষ করছি। আমাদের এলাকার মান্নান আংকেল বিডিআর এ চাকরি করেন। উনি ক্যান্সারের রোগী। আজ উনি বিডিআর ক্যাম্প থেকে ফিরে বাসায় এসে মেয়েকে ধরে হাউমাউ করে কাঁদছিলেন। শেষ বয়সে তিনি আর এতকিছু সহ্য করতে পারছেন না।

আমি শুধু দুটো ঘটনা বললাম। এমন অনেক নিরপরাধ লোকদের আজ এই দশা। যার কথা কেউ বলছেনা, কেউ জানতেও পারছেনা। হ্যা, অনেকেই হয়তো বলবেন অনেক নিরপরাধ আর্মি অফিসারকে বিডিআররা মেরেছে তখন আপনার দরদ কোথায় ছিল। এই কথা যারা বলবেন তাদের অনুরোধ করবো দয়া করে আমার মূল বক্তব্যটুকু অনুধাবণ করার চেষ্টা করুন। আমি কারো উপর দরদ দেখাচ্ছিনা। আমি একজন বাংলাদেশী হিসেবে সকল হত্যাকারীর বিচার চাই। তারা যেভাবে আমাদের দেশের সাহসী সন্তানদের ঠান্ডা মাথায় খুন করেছে আমিও চাই একই নির্মমতায় তাদের শাস্তি দেয়া হোক। কিন্তু এখন বহু নিরপরাধ লোক অল্প কিছু লোকের জন্য খুবই কষ্টে আছে। তারা ঠিকমত খেতে পারছেনা পরিবারের লোকগুলোর চেহারা বিমর্ষ হয়ে যাচ্ছে।

আমি এই লেখাটা আমার বিবেকের তাড়নায় লিখেছি। কারণ নিরপরাধ সামিয়ার বাবা কিংবা আমারই কলেজের মাজহার ভাইয়ের লাশ যেমন আমার চোখে জল এনে দেয় তেমনি শিহাবের নিরপরাধ বাবার বোবা কান্নাও আমাকে বিমর্ষ করে তোলে । জানিনা এই লেখাটা কেউ পড়ছেন কীনা। আমি আর্মির সব বড় ভাইয়াদের অনুরোধ করছি দয়া করে আপনারা রাগের বর্শবর্তী হয়ে নিরপরাধ লোকদেরকে কষ্ট দেবেন না। আমরা চোখের জল দেখতে দেখতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছি।

পরিশেষে সেই বাংলাদেশের কামনায় যেথায় ভাই তার আরেক ভাইকে হত্যা করবেনা, নারীরা তার সম্ভ্রম হারাবেনা তারই কোন ভাই দ্বারা – সেই বাংলাদেশের প্রতীক্ষায় রইলাম।

২,৫০৭ বার দেখা হয়েছে

২৯ টি মন্তব্য : “শিরোনামহীন কিছু কথামালা”

  1. রকিবুল ইসলাম (৯৯-০৫)
    আমরা চোখের জল দেখতে দেখতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছি।
    নিরপরাধ সামিয়ার বাবা কিংবা আমারই কলেজের মাজহার ভাইয়ের লাশ যেমন আমার চোখে জল এনে দেয় তেমনি শিহাবের নিরপরাধ বাবার বোবা কান্নাও আমাকে বিমর্ষ করে তোলে ।
    জবাব দিন
  2. মাহমুদ (১৯৯০-৯৬)

    সিআইডি'র তদন্ত রিপোর্ট ত অর্ডারি-মাল। ওটা সব সরকারের সময়ই আসে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রনালয় থেকে। সরকার তদন্তভার দেয়ও কর্মকর্তা দেখেশুনেই। এই মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা আব্দুল কাহার আকন্দ যে বংগবন্ধু হত্যা মামলারও তদন্ত করেছিল। তার তদন্ত রিপোর্ট কি হবে সেটা আগে থেকেই জানা যায়।

    কাজেই, সাধারন মানুষের ভূক্তভোগী হওয়া ছাড়া আর কোন ফলাফল ত দেখছি না। এখানেও দেখা যাবে রাঘববোয়ালেরা অধরাই রয়ে যাবে।


    There is no royal road to science, and only those who do not dread the fatiguing climb of its steep paths have a chance of gaining its luminous summits.- Karl Marx

    জবাব দিন
  3. আলম (৯৭--০৩)

    ২৫ ফেব্রুয়ারি তারিখে আমার বারবার তোমার কথা মনে হচ্ছিলো। আমি ভাবসিলাম, তোমাদের বাসা ওইটার ভেতর, তাই একটু আপসেট ছিলাম।।

    শিহাবের বাবার কথা যে বললা, ওনি তার ছুটির কাগজপত্র দেখাননাই? অথবা পিজি হসপিটালে যে চিকিৎসাধীন ছিলেন, সেটার কাগজ নাই?

    জবাব দিন
  4. রাফি (২০০২-২০০৮)

    ধন্যবাদ ভাইয়া। :clap:
    তবে আপনি শুধু বেঁচে থাকাদের কথা বললেন,কিন্তু প্রায় ৮-১০ জন বিডিআর সদস্য কিন্তু ঘটনার দিন বিডিআরের হাতেই নিহত হন।
    আর প্রতিদানে সরকার তাদের ফেব্রুয়ারি মাসের বেতনসহ সবকিছু আটকে রেখেছে।
    এমন অবস্থায় আপনি যা বললেন তা আমার কাছে অত্যন্ত স্বাভাবিক মনে হচ্ছে।


    R@fee

    জবাব দিন
  5. ফয়েজ (৮৭-৯৩)

    মঞ্জুর কালকেই ভেবেছিলাম উত্তর দিব, দেয়া হয় নি।

    দেখ জাতীয় দূর্যোগে এমনটা হয়, অনেক নিরপরাধ লোক ক্ষতিগ্রস্থ হয়ে পড়ে যারা আসলে সেটার যোগ্য নয়। আর এটাতে তো বিডিআর এর একটা বড় অংশ সরাসরি জড়িত ছিল।

    আমি আশা করব যত দ্রুত সম্ভব দোষীরা যাতে চিহ্নিত হয়, নিরপরাধ লোক যারা ছিলেন তারা যেন মানসিক এবং শারীরিক ভাবে মুক্তি পান, বিডিআর আবার তার কাজে গতি ফিরে পাক।

    তবে বিডিআর এর ভিতরে সেনা-সদস্যদের মৃত্যু মেনে নিতে পারছিনা। এটার তদন্ত হওয়া দরকার। এটা অপরাধ কখনই আরেকটা অপরাধ করার লাইসেন্স হতে পারে না। আর বিডিআর জওয়ান যারা নিহত হয়েছিলেন তাদের তদন্ত দ্রুত শেষ হতে হবে। যদি দেখা যায় তারা দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে মৃত্যু বরন করেছেন তবে তাদেরও রাষ্ট্রিয় মর্যাদা দেয়া হবে, আমি এই আশা করি।


    পালটে দেবার স্বপ্ন আমার এখনও গেল না

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।