স্বপ্নের মাঝে খুঁজে ফিরি

স্বপ্নের মাঝে খুঁজে ফিরি

এক সাদা শ্মশ্রুমণ্ডিত ব্যক্তি আমার স্বপ্নের মাঝে কদাচিৎ আসত আবার কখনও আসত না। ইদানীং আমার স্বপ্নের মাঝে শুভ্র দাড়িওয়ালা মানুষটি প্রায় আশা যাওয়া করে। যখনি তিনি আসেন আমি বই,খাতা, কাগজ, কলম নিয়ে ভদ্রলোকের সামনে নতজানু হয়ে অত্যন্ত মনোযোগের সাথে জ্ঞান অর্জন করতে থাকি। হটাত স্বপ্ন ভেঙ্গে যাই। তখন আমি পার্থিব আর অপার্থিব জগতের তুলনা করতে পারি না।
মাঝে মাঝে আমি জেগে থেকেও স্বপ্নের সিঁড়িতে বিচরণ করি। ঐ সময় আমার শৈশবের, কৈশোরের একমাত্র শিক্ষাগুরুর সাথে কিছু মধুর স্মৃতি কিংবা শাসনের কঠিন স্মৃতির রোমন্থন করি। এক ভাবলেশহীন ব্যক্তিত্ব কদাচিৎ যার হাসির মুখটা ভেসে উঠে। শাসনের কঠিন বেড়াজালে বন্দী থেকে বারবার ভাঙতে চেয়েও ভাঙতে পারি নাই।
পাঁচ ছেলে ও চার মেয়ের তা আবার পিঠাপিঠি তাদের গর্বিত পিতা। তাই হয়ত এই সংসারের হাল ধরতে গিয়ে কঠোর হতে হয়েছে। আর এই কঠিন শাসনের মাঝে লুকিয়ে ছিল ভালোবাসার চিরন্তন বীজ। একজন মানুষ যিনি তাঁর জীবনকে এক রুটিনের মধ্যে সব সময় রেখেছে। একজন অতীব ধার্মিক মানুষ।আমার জ্ঞান হওয়ার পর হতে এই মানুষটিকে সব সময় মসজিদে পাঁচ ওয়াক্ত নামায আদায় এবং প্রতি সকালে কুরআন তেলাওয়াত করতে দেখেছি।
ফজরের নামায শেষে বাসাই ফিরে আমাদের ঘুম হতে ডেকে তুলতেন। রুটিন মাফিক বাজারের ব্যাগ নিয়ে যেতেন কাচা বাজারে। সপ্তাহে খুব কম সময়ই বাদ পরত এই সকালের বাজার। ছুটির দিন কদাচিৎ আমাকে সাথে করে নিয়ে যেতেন কখনো চুল কাটার জন্য কিংবা ব্যাগ নিয়ে তাঁর সাথে সাথে এক দোকান হতে অন্য দোকানে । তিনি হয়ত মনে মনে ভাবতেন,ছেলে যেন শিখতে পারে কি ভাবে বাজার করতে হয়।
অধিকাংশ সময়ে বাজার হতে বাসায় ফিরেই খবর নিতেন আমার ও আমার ঠিক ইমেডিয়েট বড় বোন পড়াশুনা করছে কি না? কারণ তিনি তো আমার একমাত্র শিক্ষক। বাজারে যাওয়ার আগে আমাকে ঘুম হতে ডেকে তুলতেন। কিন্তু আমি বরাবর অলস প্রকৃতির একজন তাই বাবা চলে যাওয়ার পর খাটের নিচে লুকিয়ে আবার ঘুম দিতাম। বাবা মাকে জবাবদিহি করতে পারে তাই মা এত বড় সংসারের রান্না সামলানোর মধ্যে মাঝে মাঝে আসত আমাদের খোঁজ নিতে।ধরা পরার ভয়ে খাটের নিচের স্থান বদলে চলে যেতাম ছাদের চিলে কোটাতে। অনেক বারই ধরা পড়েছি আর সাথে সাথেই খেয়েছি বাবার উত্তম মধ্যম।
এই মানুষটাকে দেখেছি লুঙ্গি হাঁটু অব্ধি উঁচু করে, মাথায় গামছা বেঁধে ধবধবে খালি গায়ে প্রখর রোদের মাঝে বাসার সামনে সবজির বাগান জন্য নিজের হাতে কাটা তারের বেড়া বাধতে।আবার কখনও হাতে কোদাল বা কাঁচি দিয়ে তৈরি করতে সবজির বাগান। চোখ বুজলে স্বপ্নের মত দেখতে পাই তাঁর ঘর্মাক্ত শরীর আর তাতে লেগে আছে কাদা মাটি কিন্তু আত্মতৃপ্তিতে ভরা মুখে এক নিষ্পাপ হাসি। আমাকে বাজারে নিয়ে যাওয়া ছাড়াও বাবার লেজুড় হয়ে বিশেষ করে জুম্মার দিনে ছোট হাজী হিসাবে যেতাম মসজিদে। এই মানুষটি জীবনে প্রতিটি পদক্ষেপ, ভালো-মন্দ, ন্যায়-অন্যায়ের শিক্ষা প্রতিনিয়ত দিয়েছেন। মাঝে মাঝে যখন চিন্তা করি আর খুবই অবাক হয় এই ভেবে যে- এই মানুষটি কি ভাবে এত রুটিন মাফিক খাওয়া,ঘুমান,পাঁচ ওয়াক্ত মসজিদে নামায আদায়, ছেলে মেয়েদের সময় করে শিক্ষক হয়ে পড়ানো, এর সাথে জীবিকা নির্বাহের কাজ সে তো ছিলই। আমি তারই জীন আর রক্ত বহন করা একজন, বয়স ছত্রিশ(৩৬) এক ছেলের বাবা হয়ে নিজেকে তাঁর জীবনযাত্রার মত করে গড়তে, মিলাতে বা চলতে পারি নাই।
এক সময় শ্রেষ্ঠ প্রতিষ্ঠানে ভর্তি করিয়ে দেওয়া। বছর যেতে না যেতে এই রুটিন মাফিক মানুষটির গলায় মরণ ব্যাধি ক্যান্সার বাসা বাধে। গলাতে অস্ত্রোপচার ছাড়া কোন উপায় ছিল না। ফলে অস্ত্রোপচার করে ক্যান্সার হতে মুক্ত হলেন তবে শ্বাসনালীতে একটা পাইপ বসিয়ে দেওয়া হোল। খাওয়া-দাওয়া সব কিছু ছিল নরমাল কিন্তু সারাজীবনের জন্য মুখের কথা বলা বা শব্দ কেড়ে নিলো। সময়টা ১৯৮৬ সাল আমি তখন অষ্টম শ্রেণীর ছাত্র। আর এই সবই জানতে পারলাম মায়ের পাঠানো চিঠি মারফত। কথা বলতেন কিন্তু শব্দ আকারে বের হত না তাই তিনি আমার পড়াশুনা সাথে আমার প্রতিনিয়ত জীবনের ভুল ত্রুটি কাগজে লিখে রাখতেন।পরবর্তীতে উনার লেখা সম্বলিত কাগজ আমাকে দিতেন পড়তে যেন আমি সঠিকভাবে মেনে চলাফেরা করি। আমার শিক্ষাগুরুর ও আমার একমাত্র শিক্ষক পারলেন না তার ছেলেমেয়ের শিক্ষকতা চালিয়ে যেতে। আর আমার শিক্ষকতা হতে শিক্ষকের নাম হয়ে গেল এক অসমাপ্ত অতীত।
আজ আমি সমাজে প্রতিষ্ঠিত এক ব্যক্তি। শুধু আমার কথা বললে ভুল হবে তাঁর প্রতিটি সন্তানই আজ সমাজে যে যার জায়গাই প্রতিষ্ঠিত। এটা সম্ভব হয়েছে স্বপ্নদ্রষ্টা এই মানুষটির জন্য। এই জীবনে আমি অফুরন্ত সম্মান,ভালোবাসা আর স্নেহে নিমজ্জিত। জীবন সায়াহ্নে আমরা সবসময় জীবনের হিসাব মিলাতে ব্যস্ত থাকি অথচ জীবনের হিসাব কখনই মিলে না। এই ব্যস্ততার মাঝে কতবার চেষ্টা করেছি আমার এই ব্যক্তিকে উজাড় করে সব কিছু দিতে। কিন্তু আমি পারি নাই। আমি জানি আমার শত জনম লাভ করেও এই ঋণ আমি কখনোই শোধ করতে পারব না।
আমার পার্থিব আর অপার্থিব, বাস্তব-অবাস্তব জগতের এই ব্যক্তিটি আমার “বাবা”। ২৫ শে ডিসেম্বর খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের “বড়দিন”। তারা এই দিনে নেচে গেয়ে আনন্দ উৎসবে মেতে উঠে। ঠিক একই তারিখে গত ২৫ শে ডিসেম্বর ২০০৯ সালে আমাকে উপহার দিয়ে গেল একটা “বড়দিন”। শত চেষ্টা করলেও “বাবা” বলে ডাকার আর শোনার কেউ থাকল না।
“ বাবা কতদিন কতদিন দেখি না তোমায়”………
গ্রেডা,সুদান
০৮/০১/১০

[দেখতে দেখতে চারটা বছর চলে গেল। আজকে আমার বাবার মৃত্যু বার্ষিকী, সবাই আমার বাবার জন্য দোয়া করবেন]

৮৬২ বার দেখা হয়েছে

৬ টি মন্তব্য : “স্বপ্নের মাঝে খুঁজে ফিরি”

  1. হারুন (৮৫-৯১)

    বাবা

    যদি তুমি না থাকতে বাবা
    আমি কোথায় থাকতাম জানি না
    ভাঁটফুল অশ্বত্থ কিম্বা কাঠ-গোলাপের
    নাম আমার কন্ঠে কখনো ধ্বনিত হতো না
    আমি জানি না কোথায় আমি থাকতাম
    নিজের অস্তিত্ব উপলব্ধির চেতনা রোহিত হতো।
    আমি আমার মায়ের কাছে তোমাকে ভালবাসার
    কথাগুলো কানে কানে বলতে পারি।


    শুধু যাওয়া আসা শুধু স্রোতে ভাসা..

    জবাব দিন
  2. রাজীব (১৯৯০-১৯৯৬)

    মোকাররম ভাই আপনি নিয়মিত লিখ্ছেন দেখে খুব ভালো লাগছে।
    আর লেখা হচ্ছে অনবদ্য।
    হাউজ নিয়া আলাদা গর্ব করি না। কিন্তু আপনার লেখা দেখে মনে হচ্ছে শেরে বাংলা হাউজ নিয়ে এইবার গর্ব করা যেতে পারে।


    এখনো বিষের পেয়ালা ঠোঁটের সামনে তুলে ধরা হয় নি, তুমি কথা বলো। (১২০) - হুমায়ুন আজাদ

    জবাব দিন
  3. রাজীব (১৯৯০-১৯৯৬)
    কিন্তু আমি বরাবর অলস প্রকৃতির একজন তাই বাবা চলে যাওয়ার পর খাটের নিচে লুকিয়ে আবার ঘুম দিতাম। বাবা মাকে জবাবদিহি করতে পারে তাই মা এত বড় সংসারের রান্না সামলানোর মধ্যে মাঝে মাঝে আসত আমাদের খোঁজ নিতে।ধরা পরার ভয়ে খাটের নিচের স্থান বদলে চলে যেতাম ছাদের চিলে কোটাতে। অনেক বারই ধরা পড়েছি আর সাথে সাথেই খেয়েছি বাবার উত্তম মধ্যম।

    😛


    এখনো বিষের পেয়ালা ঠোঁটের সামনে তুলে ধরা হয় নি, তুমি কথা বলো। (১২০) - হুমায়ুন আজাদ

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।